এই বিশেষ পদ্ধতির উদ্দেশ্য - একটি নির্দিষ্ট ধরনের মাইটোকন্ড্রিয়াল জেনেটিক রোগ সন্তানের শরীরে না পৌঁছনো।

প্রতীকী ছবি
শেষ আপডেট: 17 July 2025 12:50
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ব্রিটেনে প্রথম বার পরীক্ষামূলক এক চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যবহার করে সফলভাবে জন্ম নিল আটটি সুস্থ শিশু। এই বিশেষ ইন-ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন (IVF) পদ্ধতিতে তিনজন ব্যক্তির ডিএনএ ব্যবহার করা হয়েছে— মা, বাবা এবং এক ডোনারের। উদ্দেশ্য, একটি নির্দিষ্ট ধরনের মাইটোকন্ড্রিয়াল জেনেটিক রোগ সন্তানের শরীরে না পৌঁছনো।
কেন এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হল?
আমাদের শরীরের বেশিরভাগ ডিএনএ কোশের নিউক্লিয়াসে থাকে। কিন্তু কোশে মাইটোকন্ড্রিয়া নামক এক ধরনের গঠনে, সামান্য কিছু ডিএনএ থাকে, সেখানে যদি জেনেটিক মিউটেশন ঘটে, তা হলে তা মারাত্মক হতে পারে। এর ফলে শিশুর মধ্যে পেশিশক্তি হারানো, খিঁচুনি, বিকাশে বাধা, অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়া, এমনকী মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
সাধারণ আইভিএফ পদ্ধতিতে এমন মিউটেশন আগে থেকেই শনাক্ত করা সম্ভব হয়। কিন্তু কিছু জটিল ক্ষেত্রে তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে না। আইভিএফ-এ মহিলার ডিম্বাণু এবং পুরুষের শুক্রাণুকে শরীরের বাইরে নিষিক্ত করে তৈরি হওয়া ভ্রূণ ইউটেরাসে স্থানান্তর করা হয়।
এই বিশেষ পদ্ধতিতে জিনঘটিত সমস্যাকে এড়াতে গবেষকরা একটি অভিনব পদ্ধতি তৈরি করেন— যেখানে মায়ের ডিম্বাণুর নিউক্লিয়াস থেকে জেনেটিক উপাদান নিয়ে তা এমন এক ডোনার ডিম্বাণুতে প্রতিস্থাপন করা হয়, যার মাইটোকন্ড্রিয়া সুস্থ, এবং নিজের নিউক্লিয়ার ডিএনএ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ফলে ভ্রূণের গঠনে ব্যবহৃত হয় শুধু মা-বাবার জেনেটিক তথ্য, সঙ্গে ডোনারের মাইটোকন্ড্রিয়ার ডিএনএ।
বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এর গুরুত্ব কী?
এই পদ্ধতি আইভিএফ-এর ইতিহাসে “একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক”, জানিয়েছেন কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি ফার্টিলিটি সেন্টারের ডিরেক্টর ড. জেভ উইলিয়ামস। তিনি বলেন, “বিকল্প রিপ্রোডাকটিভ পদ্ধতির এই নতুন দিকটি আরও দম্পতিকে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর গর্ভধারণে সাহায্য করবে।”
সন্তানের জন্মের ক্ষেত্রে তিনজনের ডিএনএ ব্যবহার - এই পদ্ধতি ২০১৬ সালে ব্রিটেনে এক আইন সংশোধনের পর ক্লিনিক্যাল প্রয়োগের অনুমোদন পায়। বর্তমানে এটি অস্ট্রেলিয়ায় অনুমোদিত হলেও, আমেরিকা-সহ বেশিরভাগ দেশে এটি এখনও নিষিদ্ধ।
ব্রিটেনের নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটি এবং অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ ইউনিভার্সিটির বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, তাঁরা এই পদ্ধতি প্রয়োগ করেন মোট ২২ জন রোগীর ওপর। তাতে আটটি সুস্থ শিশুর জন্ম হয়েছে, যাদের মধ্যে মাইটোকন্ড্রিয়াল রোগের কোনও লক্ষণ নেই। একজনের প্রেগন্যান্সি এখনও চলছে।
তবে তার মধ্যেও একটি শিশুর মাইটোকন্ড্রিয়া নিয়ে সতর্কতা রয়েছে:
আটজন শিশুর মধ্যে একজনের মাইটোকন্ড্রিয়ার অস্বাভাবিকতা তুলনামূলক বেশি দেখা গিয়েছে, জানিয়েছেন ফ্রান্সিস ক্রিক ইনস্টিটিউটের স্টেম সেল বিশেষজ্ঞ রবিন লাভেল-ব্যাজ। যদিও এই মাত্রা রোগ সৃষ্টির জন্য যথেষ্ট নয় বলে মনে করা হচ্ছে, তবুও সন্তানের বিকাশ পর্যবেক্ষণ জরুরি বলে মত গবেষকদের।
ডোনারের ডিএনএ: শিশুর পরিচয়ে কতটা ভূমিকা?
লাভেল-ব্যাজ জানান, ডোনারের কাছ থেকে পাওয়া জেনেটিক উপাদানের পরিমাণ খুবই সামান্য— ১ শতাংশেরও কম। ফলে শিশুর বৈশিষ্ট্য বা আচরণে ডোনারের কোনও ছাপ থাকবে না। তিনি ব্যাখ্যা করেন, “যেমন কারও শরীরে হাড়ের মজ্জা (Bone Marrow) প্রতিস্থাপন করা হয়, তখনও অনেক বেশি পরিমাণে বাইরের ডিএনএ শরীরে প্রবেশ করে।”
আইনগত ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ:
ব্রিটেনে এই পদ্ধতিতে সন্তান নেওয়ার জন্য প্রতিটি ক্ষেত্রে দেশের ফার্টিলিটি রেগুলেটরের অনুমোদন লাগবে। এখনও পর্যন্ত ৩৫ জন রোগী এই পদ্ধতির জন্য অনুমোদিত হয়েছেন।
তবে অনেক দেশেই এখনও এই প্রযুক্তি নিষিদ্ধ। আমেরিকায় FDA-র কাছে ক্লিনিক্যাল রিসার্চের অনুমতি চাওয়া নিষিদ্ধ, কারণ এতে জেনেটিক পরিবর্তন উত্তরাধিকারসূত্রে সন্তানের শরীরে পৌঁছতে পারে। বিষয়টি নিয়ে বিজ্ঞান, নীতিনির্ধারণ ও নৈতিকতার আলোচনা এখনও চলছে।