ISS নিয়ে নস্টালজিয়া থাকবেই। তবে এই পদক্ষেপ এক অধ্যায়ের সমাপ্তি যেমন, তেমনই নতুন অধ্যায়ের সূচনাও বটে।

শেষ আপডেট: 8 February 2026 18:53
দ্য ওয়াল ব্যুরো: পৃথিবীর কক্ষপথে ২৫ বছর কাটানোর পর অবশেষে অবসর নিচ্ছে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন (ISS)। ২০৩০ সালে নাসা এই ফুটবল মাঠের আকারের গবেষণাগারটিকে নিয়ন্ত্রিতভাবে কক্ষপথ থেকে নামিয়ে প্রশান্ত মহাসাগরে 'ফেলে দেওয়ার' পরিকল্পনা করেছে (International Space Station retirement)। শুনতে ট্র্যাজেডির মতো লাগলেও, মহাকাশ গবেষণার ভবিষ্যতের জন্য এটি এক অত্যন্ত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ (ISS deorbit 2030)। এটা কোনও 'শেষ' নয়, বরং এক অপরিহার্য বিবর্তন বলা যেতে পারে।
পঁচিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে মহাশূন্যের অন্ধকারে নীরব প্রহরীর মতো ভেসে থাকা এই স্টেশন। এখানে দিনে ১৬ বার সূর্যোদয়–সূর্যাস্ত দেখা যায়, আর জাতীয় সীমানা মিলিয়ে যায় দেশ বিদেশের মহাকাশ অভিযাত্রীদের উপস্থিতিতে।
কেন ২০৩০-এ অবসর নিচ্ছে ISS?
ISS-কে কখনওই চিরস্থায়ী বিকল্প ভাবা হয়নি। ১৯৯৮ সালের ২০ নভেম্বর ‘জারিয়া’ (Zarya) মডিউল উৎক্ষেপণের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু। রাশিয়ায় নির্মিত, আমেরিকার অর্থায়নে তৈরি এই মডিউলই প্রথম শক্তি ও প্রপালশন জোগায়। ২০০০ সাল থেকে মানুষ সেখানে বসবাস শুরু করে।
চরম তাপমাত্রার ওঠানামা, বিকিরণ, মাইক্রোমিটিওরয়েডের আঘাত - মহাশূন্যের কঠিন পরিবেশে টানা ২৫ বছর কাটিয়েছে এই আউটপোস্ট। এখন তাতে বয়সের ছাপ স্পষ্ট। পুরনো মডিউলগুলিতে ছোট ফাটল ও লিক ধরা পড়েছে। এখনও সামাল দেওয়া গেলেও রক্ষণাবেক্ষণের খরচ বছর বছর বাড়ছে।
২০৩০ মানে স্টেশনের বয়স অনেক, তার ছুটি প্রয়োজন। তাই নিয়ন্ত্রিত অবসরই নিরাপদ ও অর্থনৈতিকভাবে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত।
কীভাবে নিরাপদে নামানো হবে?
৪০০ টনের এই বিশাল কাঠামোকে এমনিই পড়তে দেওয়া যায় না। তাই নাসা স্পেসএক্স-কে দিয়ে একটি বিশেষ ‘US Deorbit Vehicle’ তৈরি করাচ্ছে। সেটি ISS-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে ইঞ্জিনের সাহায্যে ধীরে ধীরে পৃথিবীর দিকে ঠেলে আনবে।
গন্তব্য ‘পয়েন্ট নেমো’ (Point Nemo) - দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের এমন এক এলাকা, যা পৃথিবীর সবচেয়ে দূরবর্তী জলভাগ, ‘স্পেসক্র্যাফ্ট সমাধিক্ষেত্র’ নামেও পরিচিত। প্রবল তাপে অধিকাংশ অংশ পুড়ে যাবে, যা বাকি থাকবে তা সমুদ্রে ডুবে যাবে, মানুষের নাগালের বহু দূরে।
মানবজাতির জন্য ISS-এর অবদান
ISS ছিল অনন্য মাইক্রোগ্র্যাভিটি ল্যাবরেটরি। মাধ্যাকর্ষণহীন পরিবেশে মানবদেহ কীভাবে বদলায়— হাড়ের ঘনত্ব কমা, পেশির ক্ষয়— এসব গবেষণা পৃথিবীতে অস্টিওপোরোসিসের মতো রোগের চিকিৎসায় সহায়ক হয়েছে।
জীববিজ্ঞান ছাড়াও পদার্থবিদ্যা, বস্তুবিজ্ঞান, জলবায়ু পরিবর্তন— নানা ক্ষেত্রে পরীক্ষা হয়েছে এখানে। সবচেয়ে বড় কথা, পৃথিবীতে যেসব দেশ নানা ইস্যুতে বিরোধে জড়ায়, তারা এখানে একসঙ্গে কাজ করেছে। কূটনীতি ও প্রকৌশলের যুগ্ম সাফল্য এই স্টেশন।
বেসরকারি মহাকাশ সংস্থার জন্য কেন সুখবর?
নাসা আর বিশাল স্টেশনের ‘মালিক’ থাকতে চায় না। বরং ‘গ্রাহক’ হতে চায়। ফলে বেসরকারি সংস্থাগুলির জন্য খুলে যাচ্ছে নতুন দরজা।
Axiom Space, Blue Origin ইতিমধ্যেই ছোট, আধুনিক বাণিজ্যিক মহাকাশ স্টেশনের নকশা করছে। Blue Origin-এর ‘Orbital Reef’ মহাশূন্যে একধরনের ব্যবসায়িক পার্ক হিসেবে চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এর ফলে শুধু সরকারি মহাকাশচারী নয়, সাধারণ গবেষক ও বেসরকারি মহাকাশযাত্রীদেরও কক্ষপথে কাজ করার সুযোগ তৈরি হবে।
সাশ্রয় হওয়া অর্থ কোথায় যাবে?
ISS চালাতে বছরে নাসার প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়। এই অর্থ এখন আরও উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্যে ব্যয় হবে। নাসা ‘লো আর্থ অরবিট’ ছেড়ে গভীর মহাশূন্য অভিযানে মন দিচ্ছে।
এই অর্থ যাবে ‘আর্টেমিস’ কর্মসূচিতে— যার লক্ষ্য মানুষকে ফের চাঁদে পাঠানো এবং সেখানে স্থায়ী ঘাঁটি গড়া। সেখান থেকে মঙ্গল অভিযানের প্রস্তুতি নেওয়া হবে।
ISS ছাড়া গবেষণা কীভাবে চলবে?
বিজ্ঞানে কোনও বিরতি আসবে না। ISS অবসরের আগেই নতুন বাণিজ্যিক মডিউল যুক্ত হতে পারে বা আলাদা ভাবে উৎক্ষেপিত হবে। আধুনিক প্রযুক্তিতে সজ্জিত এই ল্যাবগুলি ১৯৯০-এর হার্ডওয়্যারের তুলনায় অনেক উন্নত হবে।
পাশাপাশি ‘গেটওয়ে’— চাঁদের কক্ষপথে ঘোরার একটি ছোট স্টেশন— আন্তর্জাতিক গবেষণার নতুন কেন্দ্র হবে।
পরিবেশগত প্রভাব কী?
উদ্বেগ থাকলেও ঝুঁকি খুবই কম। পয়েন্ট নেমো জীববৈচিত্র্যহীন অঞ্চল। অধিকাংশ অংশই বায়ুমণ্ডলে পুড়ে যাবে। যে ধাতব টুকরো সমুদ্রে পড়বে, তা সামুদ্রিক প্রাণের জন্য বিষাক্ত নয় এবং সময়ের সঙ্গে কৃত্রিম রিফ হিসেবেও কাজ করতে পারে।
ISS নিয়ে নস্টালজিয়া থাকবেই। তবে এই পদক্ষেপ এক অধ্যায়ের সমাপ্তি যেমন, তেমনই নতুন অধ্যায়ের সূচনাও বটে।