Date : 14th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
ভোটের ডিউটিতে কড়া নিয়ম! প্রিসাইডিং ও সেক্টর অফিসারদের জন্য একগুচ্ছ নির্দেশিকা কমিশনের'বন্ধু' মোদীকে ফোন ট্রাম্পের! ৪০ মিনিট ধরে হরমুজ প্রণালী নিয়ে কী আলোচনা হল?লোকাল ট্রেনের টিকিটে বিরাট ছাড়! ৫ টাকার টিকিট এখন কত পড়বে? জেনে নিন বিস্তারিতTB Vaccine: যক্ষ্মা প্রতিরোধে কতটা সফল নতুন টিকা? ট্রায়ালের রিপোর্টে আশার আলোর পাশাপাশি উদ্বেগের সুর বিজ্ঞানীদের'বাঙালি ব্রিটিশদের সামনে মাথা নত করেনি, আর এই বহিরাগতরা আমাদের কী করবে?' বিজেপিকে তোপ অভিষেকেরসাইলেন্ট লাং ডিজিজ: কাশি মানেই কি ক্যানসার? দূষণে ফুঁসছে ফুসফুস, কখন দরকার ট্রান্সপ্লান্ট?'ইগো সরিয়ে রাখুন', নিজেদের মধ্যে মতভেদ সরিয়ে এক হয়ে লড়ার নির্দেশ অভিষেকেরভাইরাল ভিডিও হাতিয়ার করে শাহের তোপ! হুমায়ুনকে ‘দিদির এজেন্ট’ বলে কটাক্ষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরগরমে মেজাজ হারালেন কর্মীরা! চুঁচুড়ায় নিজের দলের লোকেদেরই বিক্ষোভের মুখে দেবাংশুবার্নল-বোরোলিন বিতর্ক, ‘লুম্পেনদের’ হুঁশিয়ারি দিয়ে বিপাকে ডিইও, কমিশনকে কড়া চিঠি ডেরেক ও’ব্রায়েনের

শব্দের অন্দরে ‘টাইফয়েড’, ইতিহাসে উগ্রপন্থা! ‘টিফো’র চিলতে সুতো কীভাবে ফুটবলকে গ্লোবাল করল?

ইতালির আল্ট্রা-সংস্কৃতি থেকে শুরু হয়ে জ্বর আজ কলকাতা, কোচি, ডর্টমুন্ড, মাদ্রিদ,—সবখানে ছড়িয়ে পড়েছে। অস্যার্থ: টিফো ক্লাবকে বড় করে, ক্লাব টিফোকে নয়।

শব্দের অন্দরে ‘টাইফয়েড’, ইতিহাসে উগ্রপন্থা! ‘টিফো’র চিলতে সুতো কীভাবে ফুটবলকে গ্লোবাল করল?

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস

রূপক মিশ্র

শেষ আপডেট: 26 October 2025 17:06

রূপক মিশ্র 

‘টিফো’। ছোট্ট শব্দ। দু’অক্ষরের। অথচ কী গভীর ব্যুৎপত্তি, জটিল ইতিহাস! এটিমোলজি বলছে, এর শিকড়ে গাঁথা ইতালি। আদি অর্থে টাইফয়েড রুগির অনুষঙ্গ! ইতিহাস ক্লিন্ন উগ্রপন্থী সমর্থকদের অন্ধ আনুগত্যে। তারপর অর্থবিস্তার। বদ রক্তটুকু বাদ দিয়ে যে কোনও ক্লাব সমর্থকদের ভাবাবেগের অভিজ্ঞান হয়ে ওঠা! মূলত ফুটবল। তারপর সীমানা ছাড়িয়ে সাইক্লিং, ফর্মুলা ওয়ানের চৌহদ্দিতে ছড়িয়ে পড়া!

কীভাবে ডানা মেলল টিফো? ঢেকে দিল তৃতীয় বিশ্বের ময়দানকেও? হালফিলে ইস্ট-মোহনের ডার্বিতেও রাজনৈতিক তরজার গ্রাফিক ভাষ্য সুবিশাল সমস্ত ব্যানার৷ বাদ নেই রিয়াল মাদ্রিদ, বরুসিয়া ডর্টমুন্ডের মতো সমর্থকধন্য ক্লাবও।

বাদ যাবেই বা কী করে? টিফো মানে তো নিছক নান্দনিক ব্যানার নয়! খেলার আগের রাতে হাজারো হাত রঙে ভিজে যায়, সেলাইয়ের শব্দে জেগে থাকে পাড়া, আর ভোর হলেই স্টেডিয়ামে সেই কাপড়ের সমুদ্রে আছড়ে পড়ে ভালোবাসা। তীরে ধাক্কা খাওয়া তরঙ্গের মতো!

শব্দটা ইতালীয়—‘tifo’—বাচ্যার্থে জ্বর। আর ‘তিফোসি’মানে সেই জ্বরে আক্রান্ত রুগি। সময়ের সঙ্গে শব্দের বিস্তার ঘটল, ছাড়িয়ে গেল সীমা। আজ পৃথিবীর যে কোনও মাঠ, যেখানে সমর্থকেরা নিজেদের ক্লাবকে ভালোবাসে, সেখানে টিফো একবগগা আনুগত্যের জীবন্ত ভাষ্য!

কাঠখোট্টা যারা, বলবে গ্রাফিক ব্যানার। আর ইতিহাসবিদরা মেলে ধরবেন সন-তারিখের কিস্তি। ফুলে-ফেঁপে ওঠে ছয়-সাতের দশকে, ইতালির ক্লাব সংস্কৃতির ঋদ্ধ পরিমণ্ডলে। এসি মিলানের Fossa dei Leoni, ইন্টারের Curva Nord, রোমার Commando Ultras, লাজিওর Irriducibili-র মতো উগ্রপন্থী আল্ট্রা গ্রুপ কেবল খেলোয়াড়দের চিয়ার করত না, প্রতিপক্ষকে মাঠে নামার আগেই স্নায়ুর লড়াইয়ে পিষে দিতে গ্যালারিকে সাজাত চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়ার স্পর্ধিত ক্যানভাসে! ম্যাচের আগের রাত থেকে কেটে-কুটে কাপড় জোড়া, ডাইং, হ্যান্ড-পেইন্টিং, তারপর নির্দিষ্ট সেকশনে বসিয়ে দেওয়া ‘হোল্ডার’—এক বিশাল ও গোপন অপারেশন। টিফো শুধু সমর্থনের উল্লাস নয়, আত্মপরিচয়ের ভাষাও বটে। কে, কার, কতটা?—যাবতীয় প্রশ্নের ‘চওড়া’ জবাব।

টিফো ইতালির গণ্ডি পেরলো দ্রুতই। ফ্রান্সে মার্সেই, প্যারিস সাঁ-জার্মাঁ; জার্মানিতে বরুসিয়া ডর্টমুন্ডের ইয়েলো ওয়াল—যেখানে একাই প্রায় ২৫ হাজার সমবেত দর্শক কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে কার্ড-বোর্ড তুলে হলুদ-কালো ঢেউ তোলে! স্পেনে রিয়াল মাদ্রিদ, আতলেতিকো, সেভিয়া—সবাই টিফোকে বানাল আইডেন্টিটির শিরদাঁড়া। পূর্ব ইউরোপে পোল্যান্ড, সার্বিয়া, ক্রোয়েশিয়া, তুরস্ক—টিফো এখানে আরও তীব্রভাবে রাজনৈতিক। আর দক্ষিণ আমেরিকা? সেখানে তো গ্যালারি বরাবরই থিয়েটার! আর্জেন্টিনার hinchadas, ব্রাজিলের torcidas organizadas—ওরা মুখে ‘টিফো’ না বললেও এই আর্টের প্রকৃত দীক্ষাগুরু!

ইতালির গ্যালারি-শিল্প তৃতীয় বিশ্বের ময়দানে এল কীভাবে? উত্তরটা সহজ—ইন্টারনেট আর সস্তা প্রিন্ট টেকনোলজি। বিশের দশকের পর ইউটিউব, ফেসবুক, টুইটার, ইন্সটাগ্রাম—সব জায়গায় ম্যাচ ডে ভ্লগ, ফ্যান-ক্যাম, ড্রোন ফুটেজ। টিফো হয়ে উঠল ভাইরাল কনটেন্ট। আগে যেটা দেখতে স্টেডিয়ামে যেতে হত, এখন সেটা চোখের সামনে মেলে ধরল স্মার্টফোন। সঙ্গে ব্যানার প্রিন্টিংয়ের দাম কমে যাওয়া, ভিনাইল-ফ্যাব্রিকের সহজলভ্যতা এবং স্বেচ্ছাসেবী সমর্থক-গ্রুপের ক্রাউডফান্ডিং। যে কারণে কেরালা ব্লাস্টার্সের ম্যানজাপ্পাদা, বেঙ্গালুরু এফসির ওয়েস্ট ব্লক ব্লুজ, ইস্ট–মোহন গ্যালারি—সবেতেই টিফোর অপ্রতিহত দাপট!

বিশেষ করে, কলকাতার ডার্বিতে ইদানীং সময়ে টিফো এক উত্তেজক যুদ্ধ। একদিকে লাল-হলুদের ব্যানারে উঠে আসে ছিন্নমূল জনতার লড়াই আর মেহনতি মানুষের পরিশ্রমের ঘাম, অন্যদিকে সবুজ-মেরুনের গ্রাফিকে গাঁথা ঐতিহ্য আর সাবেকিয়ানার প্রচ্ছন্ন গর্ব। ২০২৩-এর সেপ্টেম্বরে যুবভারতীতে দেখা গিয়েছিল সেই দৃশ্য—ইস্টবেঙ্গল গ্যালারির বিশাল ব্যানারে লেখা, ‘We Rise From the Dust’! প্রত্যুত্তরে মোহনবাগানের বেগুনি-সবুজ চিত্রকল্প: ‘Legacy Can’t Be Bought’! হাজার হাজার দর্শক, সমান তালে গেয়ে চলা স্লোগান, আলোর নিচে কাপড়ে ফুটে ওঠা ইতিহাস—কলকাতার ডার্বি আজ ‘এশিয়ার ইয়েলো ওয়াল’!

টিফোর ভূগোলই শুধু বদলায়নি, কালে-কালান্তরে বদলেছে অর্থনীতিও। একটা বড় টিফো বানাতে কী লাগে? কাপড়/ভিনাইল, পেইন্ট/প্রিন্ট, দড়ি, কার্ডবোর্ড এবং সবচেয়ে জরুরি—‘রিহার্সাল’। খরচ ক্লাবভেদে আলাদা। ইউরোপে মাঝারি মাপের টিফো ১০–৩০ হাজার ইউরো পর্যন্ত উঠতে পারে; দক্ষিণ এশিয়ায় ৫০ হাজার থেকে কয়েক লক্ষ টাকায় ভালো টিফো তৈরি করা সম্ভব। অনেক সময় ক্লাব স্পনসর করে। তবে ‘আসল’ শক্তি সমর্থক! সদস্যপিছু ১০০–৫০০ টাকা, টি-শার্ট বিক্রি, স্টিকার-মার্চ—এই ছোট ছোট স্রোত মিলেই বড় নদী। এক একটা টিফো ৯০ মিনিটের গৌরব। আড়ালে সপ্তাহের পর সপ্তাহ স্বেচ্ছাশ্রম!

এখানেই বিতর্ক। টিফো কি নিছক শিল্প? নাকি রাজনৈতিক পোস্টার? ইতালিতে বা পূর্ব ইউরোপে বহুবার টিফো হয়েছে বিতর্কিত ইতিহাস-চিহ্ন, র‍্যাডিকাল স্লোগান, সেন্সিটিভ প্রতীক। ইউরোপিয়ান ফুটবল সংস্থা (UEFA) এখন নিরাপত্তা-প্রোটোকল কড়া করেছে। ফায়ার সেফটি, পাইরো টেকনিক্স নিষেধ! স্টেডিয়ামে ঢোকানোর আগে ব্যানারের অনুমোদন লাগে। এর ফলে টিফোর আকাঁড়া শক্তি কিছুটা নিয়ন্ত্রিত, কিন্তু একই সঙ্গে এসেছে গ্যালারির নতুন পেশাদারিত্ব। ফায়ার-রিটার্ড্যান্ট কাপড়, পুনর্ব্যবহারযোগ্য ফ্রেম, ম্যাচ-ডে-তে দুই তরফের দলের রোল চার্ট। খেলা যেমন ট্যাকটিক্যাল, টিফোও তেমনই। মিনিট ০০:১৫–তে কার্ড উঠবে, ০০:৩০–এ পতাকা, ০০:৪৫–এ বার্তা—ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে সিঙ্ক!

ভারতে টিফোর উত্থান নতুন, ডিএনএ পুরনো। কলকাতার গ্যালারি বহু যুগ ধরেই ব্যানার-ফেস্ট। পার্থক্য—আগে হত ছোট, হাতে লেখা। এখন আকারে সুবিশাল, গ্রাফিক্সে টাঙানো। বিশাল স্টেডিয়াম—সাল্টলেকের প্রায় ৬৮–৭০ হাজারের গ্যালারি—এখানে টিফোকে মাথার ওপর তুলে ধরতে দুই টিয়ারের কো-অর্ডিনেশন লাগে। কেরল বা বেঙ্গালুরুতে স্টেডিয়াম ছোট। কিন্তু রূপায়ণ কঠিন—কখনও সমুদ্র-গর্জনের মতো হলুদ ঢেউ, কখনও ইস্পাত নীল দেয়াল। টিফোর এই বাহারি বিন্যাস ভারতীয় দর্শককে ‘নিছক দর্শক’ থেকে ‘পাকা পারফর্মারে’র বৃত্তে টেনে আনছে। এটাই এর সামাজিক অভিঘাত!

অবশ্য টিফো শুধু ‘ভালোবাসা’ নয়; কখনও চারিয়ে দেয় ‘ভয়’-ও। স্টেডিয়ামে এত বড় কাপড়, দড়ি, কাঠামো—সেফটি না মানলে বিপদ। তাই আজ অনেক ক্লাব ‘টিফো-ম্যানুয়াল’ বানিয়েছে। ফায়ার এক্সিট খালি রাখতে হবে; বাজেটের একটি অংশ যাবে ফায়ার-রিটার্ড্যান্ট স্প্রে-তে; ভাঁজ করার লে-আউট আগে থেকে শেখাতে হবে; ম্যাচের পর ১৫ মিনিটের মধ্যে পুরো ব্যানার গুটিয়ে বের করে আনতে হবে (নইলে জরিমানা)।

বড় বড় টুর্নামেন্টে (চ্যাম্পিয়নস লিগ, ইউরো) এগুলো এতটাই কড়া যে, টিফো টাঙানো প্রায় ‘সার্জিক্যাল অপারেশনে’র গোত্রের। কিন্তু এরই মধ্যে সমর্থক-শিল্পীরা খুঁজে নিয়েছে নিজেদের পরিসর—কখনও শহরের ইতিহাস (লিভারপুলের শ্যাঙ্কলি গেট), কখনও কিংবদন্তির মুখ (মারাদোনা, জিদান), কখনও ক্লাবের ট্র্যাজেডি (লিভারপুলের হিলসবোরো), কখনও রসিকতা (ডার্বিতে কৌতুকময় স্ন্যাপ)—টিফো হয়ে উঠেছে স্টেডিয়ামের মূর্ত কথাকার!

আরেকটু গভীরে তাকালে বলা যায়—একেকটা অতিকায় ব্যানার আসলে ‘কোরিওগ্রাফড নাগরিক প্রতিবেদন’। শহরের সমাজ-ইতিহাসও এখানে ঢুকে পড়ে। বার্লিনে ঐক্যের বার্তা, বাসেল বা আয়াখসে যুব-একাডেমির কৌলীন্য, ইস্তানবুলে ভৌগোলিক মহিমা, ওয়ারশতে স্মৃতি—সবই গ্যালারির বর্ণোজ্জ্বল ক্যানভাসে। ভারতেও এর ছায়া পড়ছে—কখনও ভাষা, কখনও নদী-শহর, কখনও শ্রমজীবী ফুটবল, কখনও রাজনৈতিক খোঁচা—ব্যানার হয়ে উঠছে পাবলিক আর্ট।

এরই একটি চর্চিত রূপান্তর ‘টিফো-ট্যুরিজম’। বড় ম্যাচে দর্শক এখন শুধু খেলা নয়, টিফোও দেখতে যায়। ডর্টমুন্ড, মার্সেই, নেপলস—সিজনের ক্যালেন্ডার ছাপিয়ে ফ্যানরা ট্রিপ প্ল্যান করে। এতে ক্লাবও বুঝেছে—টিফো বিনিয়োগ; খরচ নয়। ভালো টিফো মানে মহড়া-করা প্যাশন, সোশ্যাল মিডিয়ায় কোটি ভিউ, ব্র্যান্ডের মূল্য বৃদ্ধি! অর্থাৎ, ক্লাব-সমর্থক দুই পক্ষেই লাভ!

ইতালির আল্ট্রা-সংস্কৃতি থেকে শুরু হয়ে জ্বর আজ কলকাতা, কোচি, ডর্টমুন্ড, মাদ্রিদ,—সবখানে ছড়িয়ে পড়েছে। অস্যার্থ: টিফো ক্লাবকে বড় করে, ক্লাব টিফোকে নয়। কারণ খেলাটা মাঠে ২২ জনের হলেও, আত্মা থাকে গ্যালারিতে। আর সেই আত্মার ভাষ্য দু’অক্ষরের… ‘টিফো’।


```