হিসেব যাই বলুক না কেন, দু’জনের তুল্যমূল্য হিসেবে দাপটের নিরিখে আলকারাজের দিকেই পাল্লা ভারী! সৃজনশীলতা, সাহস, নিখুঁত রণকৌশল আর সময়ে ঝুঁকি নেওয়ার মুনশিয়ানা তাঁকে আলাদা গোত্রে বসিয়েছে।

সিনার ও আলকারাজ
শেষ আপডেট: 8 September 2025 12:43
দ্য ওয়াল ব্যুরো: টেনিস দুনিয়ায় একদা তিন তারকার রমরমা ছিল—ফেডেরার, নাদাল, জোকোভিচ। দশকের পর দশক তাঁরা প্রতিপক্ষদের ছারখার করেছেন, গ্র্যান্ড স্ল্যাম ভাগ করে নিয়েছেন। টেনিস টুর্নামেন্ট, তা মাপে যেমনই হোক না কেন, মানেই বিগ থ্রি।
কিন্তু প্রজন্ম বদলেছে। ফেডেরার বিদায় নিয়েছেন। নাদাল চোটের সাঁড়াশি চাপে থামতে বাধ্য হয়েছেন। জোকোভিচ এখনও লড়ছেন বটে। কিন্তু বয়সের ধাক্কায় ঝাঁঝটা আর সেই আগের মতো জোরালো নেই।
আর এই শূন্যতার অন্তরালেই পলি জমে জমে গড়ে উঠেছে নতুন সাম্রাজ্য। যৌথ মালিকানায় কার্লোস আলকারাজ (Carlos Alcaraz) আর ইয়ানিক সিনার (Jannik Sinner)। আর কেউ চ্যালেঞ্জ জানানোর সাহস পর্যন্ত করে না, এতটাই নিরুপদ্রবে গ্র্যান্ড স্ল্যামের পর গ্র্যান্ড স্ল্যাম খেলে যান দুজনে। লড়াই স্রেফ দুই তারকার। লক্ষ্য একটাই: আধিপত্যের তকমাকে ‘যুগ্ম’ থেকে ‘এককে’ নিয়ে আসা!
কষ্টকল্পনা নয়। পরিসংখ্যানই এর প্রমাণ দিচ্ছে। ২০২২ থেকে এখনও পর্যন্ত পুরুষদের সিঙ্গলসে খেলা ১৩টি গ্র্যান্ড স্ল্যামের মধ্যে ১০টিই আলকারাজ–সিনারের জিম্মায়। শুধু এবারের ইউএস ওপেন নয়, তার আগের ফরাসি ওপেন, উইম্বলডন—সব জায়গাতেই এই দুই নাম আলোচনার কেন্দ্রে। বাকি তিনটি ট্রফি ভাগ করে নিয়েছেন জোকোভিচ।
আর অন্যরা? টেলর ফ্রিৎস, আলেকজান্ডার জভেরেভ, বেন শেলটন, জ্যাক ড্রেপার—নাম বিস্তর, প্রতিভাও মন্দ নয়। কিন্তু ধারাবাহিকতা আর ক্ষমতায় কেউ সিংহাসনের আশপাশে ছায়াটুকু ফেলছেন না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাকিদের থেকে এই যোজনবিস্তৃত ফারাকের কারণ একাধিক। সিনার, আলকজারাজ—দু’জনেই তরুণ। দু’জনেই পরিশ্রমী। দু’জনেই ব্যতিক্রমী প্রতিভা। কিন্তু আসল, মৌলিক পার্থক্যটা কোথায়? সেটা স্পষ্ট হল রবিবার, নিউইয়র্কে। সিনারের সার্ভিস মেশিনের মতো নির্ভুল হলেও, আলকারাজের বহুমাত্রিক খেলার সামনে তা অসহায়। আলকারাজ শুধু শক্তি দিয়ে হারান না—শটের বৈচিত্র, হঠাৎ ড্রপশট, চমকে দেওয়া অ্যাঙ্গেল, আর প্রতিপক্ষকে দমবন্ধ করে দেওয়া গতি—এসব মিলিয়েই তৈরি হয় তাঁর দাপট।
ইতালীয় প্রতিপক্ষও ফেলনা নন। তাঁকে তুলনা করা হয় তরুণ বয়সের জোকোভিচের সঙ্গে। অদম্য রক্ষণ, দীর্ঘ র্যালিতে অবিচল ধৈর্য। কিন্তু আলকারাজের সৃজনশীলতা আর কোর্টে ‘নাটকীয় মোড়’ আনার ক্ষমতার কাছে সেই প্রতিরক্ষা ভেঙে পড়ে। ফ্লাশিং মেডোয় ফাইনাল শেষে সিনার নিজেই স্বীকার করলেন, ‘আজ আমি কোর্টে খুবই প্রেডিক্টেবল ছিলাম। ও খেলা বদলে দিল। যদি সত্যি আলকারাজকে হারাতে চাই, তবে আমাকেও নতুন কিছু চেষ্টা করতে হবে!’
এই যে বারবার রণকৌশলে বদল আনা, অ্যান্টিডোটের অনুসন্ধান—এতেই যেন ‘দুরন্ত’ পারফরম্যান্সের সীমা-পরিসীমা অতিক্রম করে চলেছেন দুজনেই। একবার আলকারাজ হারলে জানিয়ে দেন সিনারের অস্ত্র নির্বিষ করার মন্ত্র খুঁজে আনবেন। পরের বার সিনারের মুখেও শোনা যায় নিজেকে আরও ধারালো করে তোলার প্রতিশ্রুতি!
নোভাক জোকোভিচ (Novak Djokovic) একসময় ছিলেন এই মঞ্চের (ইউএস ওপেন) একচ্ছত্র নায়ক। বয়স এখন ৩৮। এ বছরও চারটি গ্র্যান্ড স্ল্যামের প্রতিটির সেমিফাইনাল খেলেছেন। কিন্তু ফাইনালের টিকিট তিনবারই কেড়ে নিয়েছে সিনার বা আলকারাজ। ‘অদম্য’ ফিটনেস হাত ছেড়েছে। মেনেও নিয়েছেন জোকোভিচ, ‘বেস্ট অফ ফাইভে ওদের হারানো সত্যিই কঠিন। হয়তো বেস্ট অফ থ্রিতে এখনও কিছুটা সুযোগ আছে!’ এই অকপট স্বীকারোক্তিই বলে দেয়, পালাবদল সম্পূর্ণ। লড়াই শুধু রাজদণ্ডের একক মালিকানা নিয়ে!
সিনার গত দেড় বছরে হারিয়েছেন প্রায় সবাইকে। শুধু আলকারাজের কাছে রেকর্ড ১–৬। স্পেনীয় তারকার প্রথম সার্ভ জয়ের হার ইউএস ওপেনে ছিল ৮৩ শতাংশ। পুরো টুর্নামেন্টে প্রতিপক্ষ মাত্র তিনবার সার্ভিস ভেঙেছেন। তরুণ ইতালীয় টানা ২৭টি হার্ড কোর্ট স্ল্যাম ম্যাচ জিতেছিলেন, দেখাচ্ছিল অপ্রতিরোধ্য। তাঁর কাঁধে বলগা লাগালেন সেই আলকারাজ!
কেবল তথ্য নয়। এসবই প্রমাণ করে, নতুন জমানার টেনিস মানে মূলত সিনার বনাম আলকারাজ… সংক্ষেপে ‘সিনকারাজ’! আর হাড্ডাহাড্ডি এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার চক্করে সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছে টেনিস বিশ্ব। নতুন এক যুগের গল্প লেখা হচ্ছে। বিগ থ্রি-র বিদায়ের পর ভয় ছিল, দর্শক কি আগ্রহ হারাবে? সেই দুশ্চিন্তা মুছে দিয়েছেন আলকারাজ–সিনার। তাঁরা শুধু প্রতিদ্বন্দ্বী নন… একে অপরের শ্রেষ্ঠ প্রতিদ্বন্দ্বী। যেমন ছিল স্যাম্প্রাস–আগাসি, ফেডেরার–নাদাল, নাদাল–জোকোভিচ। সেই তালিকার সাম্প্রতিকতম সংযোজন এই দুই মুখ।
হিসেব যাই বলুক না কেন, দু’জনের তুল্যমূল্য হিসেবে দাপটের নিরিখে আলকারাজের দিকেই পাল্লা ভারী! সৃজনশীলতা, সাহস, নিখুঁত রণকৌশল আর সময়ে ঝুঁকি নেওয়ার মুনশিয়ানা তাঁকে আলাদা গোত্রে বসিয়েছে। সিনার যে পিছিয়ে নেই, উইম্বলডনের ঘাসেই তার প্রমাণ মিলেছে। যদিও দিনের শেষে নিউইয়র্ক বুঝিয়ে দিল রাজদণ্ড হাতে নেওয়ার দৌড়ে কিছুটা হলেও এগিয়ে যিনি, তাঁর নাম কার্লোস আলকারাজ!