দ্য ওয়াল ব্যুরো: তাঁকে বলাই হতো হুইসপারিং ডেথ, তাঁর আত্মজীবনীর নামও তাই, যাকে বলা হয় নিঃশব্দ ঘাতক। কোন সময়ে তাঁর বোলিং আপনার শরীর স্পর্শ করে উইকেট নিয়ে চলে যাবে, কেউ টেরই পেত না। তিনি মাইকেল হোল্ডিং, ক্যারিবিয়ান স্বপ্নের দলের আরও এক অন্যতম সারথী।
ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়েও যিনি মূলধারায় সমানে রয়েছেন। তাঁর ক্রিকেট নিয়ে বিশ্লেষণ শুনলে সারা রাত কাবাড় হয়ে যাবে। সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো শোনেন তাঁর দরাজ কন্ঠস্বরে ধারাভাষ্য।
এর আগেও দুনিয়ায় বর্ণবৈষম্য ছিল। তিনি যখন খেলতেন, সেইসময়ও বিদেশের মাঠে সাদা চামড়ার মানুষরা তাঁদের গায়ের রং নিয়ে মজা করতেন। তাঁদের নিয়ে হেয় করতেন। তিনি বরাবরই প্রতিবাদী। ক্রিকেট যখন খেলতেন, দল থেকে বসিয়ে দেওয়ার কোনও উপায়ই ছিল না। বরং কোচ দলে প্রথম পাঁচজন যে ক্রিকেটারের নাম লিখতেন, তার মধ্যে মাইকেল হোল্ডিংও থাকতেন।
গত বছর আমেরিকায় পুলিশের বর্ণবাদী আচরণের শিকার হয়ে জর্জ ফ্লয়েড নিহত হওয়ার পরে ক্রিকেটমহলের প্রথম প্রতিবাদ করেছিলেন হোল্ডিংই। ক্যারিবিয়ান এই দীর্ঘদেহী কিংবদন্তি প্রাক্তন পেসার বলেই ছিলেন, ‘‘বর্ণবৈষম্য সমাজের একটা রোগ। এই রোগকে নির্মূল করতে গেলে সকলের সাহস দরকার, প্রতিবাদ দরকার।’’
সম্প্রতি হোল্ডিং ধারাভাষ্যের মাঝেই একটি বই লিখছেন, তাতে সবিস্তারে বর্ণবৈষম্য নিয়ে কলম ধরেছেন। তিনি নিজেও নাকি অতীতে এই রোগের শিকার হয়েছেন। ইংলিশ কাউন্টি ক্রিকেটে সাম্প্রতিকালে একটি ঘটনা ঘটেছে, যেখানে দেখা গিয়েছে ওলি রবিনসন নামে এক ক্রিকেটার এই নিয়ে প্রতিবাদ করতে তাঁকে দল থেকে চিরতরে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ভারতীয়রা এটি নিয়ে মুখ খুলেছেন, বাদ যাননি হোল্ডিংও। তিনি বছরের বেশিরভাগ সময়ে কাটান ইংল্যান্ডেই, সেই দেশে থেকে মুখ খেলার মধ্যেও বুকের পাটা লাগে।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রাক্তন নামী ফাস্ট বোলার বর্ণবৈষম্য নিয়ে কথা বলেছেন ইংল্যান্ডের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী ক্রিকেটার এবনি রেইনফোর্ড-ব্রেন্টকে নিয়ে। কেবল গায়ের রঙের কারণেই রেইনফোর্ড-ব্রেন্টকে অনেক কঠিন পথ পাড়ি দিতে হয়েছিল। শুনতে হয়েছিল অনেক কঠিন কথা। হোল্ডিং বলেছেন, এমন কিছু তাঁর সঙ্গে হলে তিনি সহ্য করতে পারতেন না। মুখ বুজেও মেনে নিতেন না, মনে হয় না আমি এত দিন বেঁচে থাকতাম। ইংল্যান্ডে এবনির সঙ্গে যা হয়েছিল, সেটা আমার সঙ্গে হলে তা সহ্য করার মতো মানুষ আমি ছিলাম না। আমি খুবই আগ্রাসী মনোভাবের ছিলাম। একবার নিউজিল্যান্ড সফরে আমি লাথি মেরে স্টাম্প ভেঙে ফেলেছিলাম।
জামাইকায় জন্ম হোল্ডিংয়ের। সেখানে অবশ্য কোনও দিনই বর্ণবৈষম্যের শিকার হতে হয়নি। কিন্তু দেশের বাইরে গেলে এ জীবনে বহুবার বর্ণবাদী মন্তব্য শুনতে হয়েছে তাঁকে। তিনি সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, ‘‘জামাইকায় থাকা কালে এরকম অবস্থার মধ্যে পড়িনি। কিন্তু বিদেশে খেলতে গেলে, বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়া কিংবা ইংল্যান্ডে বহুবার আমাদের গায়ের রং নিয়ে নানা বক্রোক্তি করা হয়েছে। এই নিয়ে অনেকেই মুখ খুলত না, কিন্তু আমি আক্রমণাত্মক বরাবরই, তাই তাঁদের ছেড়ে কথা বলিনি।’’
তিনি আরও বলেছেন, ‘‘এই সময়ে বর্ণবৈষম্য নিয়ে কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে দুনিয়া আস্তাকুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। কেউ ওই প্রতিবাদী মানুষের পাশে থাকে না। এটাই আমাদের সমাজের রোগ।’’
তিনি নিজেও বহুবার অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস পাননি। এই নিয়ে বলেছেন, ‘‘আমার কিছু করার ছিল না। সবসময় এর প্রতিবাদ করলে আমার ক্রিকেট জীবনটাই ছোট হয়ে যেত।’’
এদিকে, ওয়েস্ট ইন্ডিজের বরেণ্য প্রাক্তন তারকা যে কোনওদিন আইপিএলে ধারাভাষ্য দেবেন না, সেটিও এদিন জানিয়ে দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, টি ২০ ক্রিকেট কখনই ক্রিকেটের পর্যায়ে পড়ে না। বরং টেস্ট ক্রিকেটের আকর্ষণকে কমিয়ে দিয়ে নিজেদের আখের গুছিয়ে চলেছেন সব দেশের ক্রিকেট কর্তারা। তিনি টোয়েন্টি ২০ ক্রিকেটকে নিষিদ্ধ করার দাবি তুলেছেন। সেই জন্যই বহু অর্থের হাতছানি সত্ত্বেও তিনি আইপিএলে কোনওদিন ধারাভাষ্য দিতে আসেননি।