
শেষ আপডেট: 16 August 2020 09:26
বিশ্ব ক্রিকেটে তাঁর শুরুটা হয়েছিল সুনামির মতো। সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে যেমন সবকিছু ধুয়ে-মুছে যায়, তেমনই ধোনির ব্যাটিংয়ে বিপক্ষ স্রেফ উড়ে যেতেন। সে শোয়েব আখতারের পাকিস্তানই হোক, কিংবা মুরলীধরণের শ্রীলঙ্কা, রেয়াত করেননি কাউকে। আর এই ব্যাটিংয়ের জোরেই দীনেশ কার্তিক, পার্থিব পটেলদের টপকে সৌরভের টিমে নিজের জায়গা পাকা করেছিলেন ধোনি। ‘মাহি মার রাহা হ্যায়’ কথাটা ছড়িয়ে পড়েছিল আসমুদ্র-হিমাচল। ঝাঁকড়া চুলের মাহির দিওয়ানা হয়ে উঠেছিলেন সবাই।
প্লেয়ার হিসেবে যতটা বিধ্বংসী ছিলেন ধোনি, অধিনায়ক হিসেবে আবার ঠিক ততটাই শান্ত। কোনও ম্যাচে কোনও পরিস্থিতিতে তাঁকে দেখা যায়নি নিজের প্লেয়ারের উপর চিৎকার করছেন, কিংবা হতাশা প্রকাশ করছেন। ২০০৭ টি ২০ বিশ্বকাপের ফাইনালে শেষ ওভারে যোগিন্দর শর্মাকে গিয়ে বলা তাঁর কথাটার জন্যই প্রথম টি ২০ বিশ্বকাপ এসেছিল ভারতের ঝুলিতে। অন্য যে কোনও অধিনায়ক থাকলে সেই সময় হতাশায় ম্যাচ ছেড়ে দিতেন। কিন্তু ধোনি আলাদা। চিরকাল মাঠে সবার আশার বিপরীতে কাজ করেছেন তিনি। এমন সব সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যাতে তথাকথিত ক্রিকেট বিশেষজ্ঞরা অবাক হয়েছে। কিন্তু হারা ম্যাচকেও জিতিয়েছে ধোনির সেইসব সিদ্ধান্ত। ওই যে, সাফল্যটাই আসল।
যত দিন গড়িয়েছে, তাঁর ব্যাটিংয়ে মরচে পড়েছে। ইচ্ছে করলেই তখন আর হেলিকপ্টার ওড়ে না। কিন্তু তাতে কী। ফিটনেস তো একই রকম রয়েছে। তার জেরে শুধুমাত্র সিঙ্গল- ডাবলসেই ১০০ বা তার বেশি স্ট্রাইক নিয়ে খেলতে দেখা গিয়েছে ধোনিকে। মাথাটা একই রকম শান্ত থেকেছে তখনও। উইকেটের পিছনে তাঁর ক্ষীপ্রতা শেষদিন পর্যন্ত ছিল একই রকম। বিশেষ করে স্টাম্পিংয়ের ক্ষেত্রে। ওভাবে চোখের নিমেষে স্টাম্প করা দেখে অবাক হয়েছিলেন ধোনির আইডল, আর এক কিংবদন্তি অস্ট্রেলীয়, অ্যাডাম গিলক্রিস্টও।
সমালোচকদের কোনও দিন পাত্তা দেননি ধোনি। আইপিএলে চেন্নাই সুপার কিংস দলটার মূল টিম বছরের পর বছর এক থেকেছে। সবাই বলেছেন, টি ২০ তরুণদের খেলা। সেখানে বয়স্কদের জায়গা নেই। কিন্তু ধোনি জানেন খেলার অমোঘ সত্য, ‘ফর্ম ইজ টেম্পোরারি, বাট ক্লাস ইজ পার্মানেন্ট’। তাই তাঁর বুড়ো সৈন্যদের নিয়েই বিশ্বের সেরা টি ২০ টুর্নামেন্টের অন্যতম সফল দল তৈরি করেছেন ধোনি। তাঁর দেখানো পথে গিয়েই কিন্তু সাফল্য পেয়েছে মুম্বই ইন্ডিয়ান্সও।
ভারতীয় ক্রিকেটের অনেক প্রচলিত ধারণাকে ভেঙেছেন ধোনি। এক, প্রাক্তন অধিনায়কের সঙ্গে পরবর্তী অধিনায়কের সম্পর্ক ভাল হয় না। ধোনি ও কোহলিকে দেখে কখনও তা মনে হয়নি। বরং নিজেরই সাজানো বাগানে ধীরে ধীরে বিরাটকে একজন দক্ষ মালি করে তুলেছেন ধোনি। দুই, দলে একাধিক গোষ্ঠী তৈরি হয়। খবর ছড়িয়ে পড়ে মিডিয়াতে। তার প্রভাব পড়ে দলের পারফরম্যান্সে। অতীতে মহম্মদ আজহারউদ্দিন, কিংবা সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের সময়েও তা হয়েছে। ধোনির সময়ও কখনও বীরেন্দ্র সেহওয়াগ, কখনও গৌতম গম্ভীরের সঙ্গে তাঁর খারাপ সম্পর্কের রটনা ছড়িয়েছে সংবাদমাধ্যমে। কিন্তু ওই রটনা অবধিই। ২০১১ বিশ্বকাপ জিতে উঠে শচীনকে ঘাড়ে নিয়ে যখন ওয়াংখেড়ে প্রদক্ষিণ করছেন বিরাটরা, তখন কিন্তু তাঁদের পিছনে এক অন্যের কাঁধে হাত দিয়ে হাঁটছিলেন ধোনি, সেহওয়াগ, গম্ভীর, জাহির খানরাই। এই ছবিটাই সবকিছু প্রমাণ করে দেয়।
ধোনির বরফ শীতল মানসিকতার পরিচয় প্রতি মুহূর্তে দেখা গিয়েছে। তারই ফলশ্রুতি ডিআরএস-এর নাম হয়ে যাওয়া 'ধোনি রিভিউ সিস্টেম'। কিংবা প্রচলিত গানের শব্দ বদলে হয়ে ওঠা ‘আনহোনি কো হোনি কর দে মহেন্দ্র সিং ধোনি।’ নিজের সাফল্যের সময় তো বটেই, ব্যর্থতার সময়েও মাথা সেই ঠান্ডাই ছিল। কোনওদিন তার অন্যথা হয়নি। কীভাবে নিজের মাথা এত ঠান্ডা রাখতেন মাহি তার ব্যাখ্যা হয়তো কেবল তিনিই করতে পারবেন।
জীবনে ছক ভেঙে অনেক কিছু করছেন ধোনি। তাঁর মতো ক’জন সেলিব্রিটি কেরিয়ারের মাঝে নিজের বায়োপিকে নিজের প্রথম ভালবাসার কথা তুলে ধরতে পারেন। মাহি পেরেছেন। আবার তাঁর বায়োপিক করা সুশান্ত সিং রাজপুত মারা যাওয়ার পরে সবার সামনে তিনি বলেছেন, সুশান্ত নেই, তাই তাঁর বায়োপিকের কোনও সিকুয়েল হবে না। আবার দু’বছরের নির্বাসন কাটিয়ে আইপিএলে চেন্নাই সুপার কিংস ফিরে আসার সময় প্রথমবার তাঁর চোখে জল দেখেছে ক্রিকেট বিশ্ব। যে জল আর একবারই দেখা গিয়েছিল। ২০১৯ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে মার্টিন গাপটিলের ডাইরেক্ট থ্রোয়ে রানআউট হয়ে প্যাভিলিয়নে ফেরার সময়। ধোনি কি তখনই জানতেন ভারতীয় জার্সিতে এই তাঁর শেষ মাঠে নামা।
হয়তো জানতেন ধোনি। যেমনটা তিনি জানতেন, সবকিছুর একটা শেষ থাকে। যত বড় ক্রিকেটারই কেউ হোন না কেন, সবাইকে একদিন থামতে হয়। আর যত বয়স বাড়ে, তত তাঁর ধার কমতে থাকে। এই কুড়ি বিশের ক্রিকেটে সেটা বোঝার ক্ষমতা ভারতীয় সমর্থকদের অনেকেরই নেই। তারা শুধু চায় জয়। কিন্তু একটা সময়ের পরে নিজের পছন্দের প্লেয়ারের ফর্ম খারাপ হলে তাঁকে কটাক্ষ করতেও ছাড়ে না কেউ। আর আজকের সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে শুরু হয় ট্রোল। সেটা জেনেই হয়তো কেউ তাঁকে নিয়ে ট্রোল করার আগেই নিজেই সরে পড়লেন মাহি। ক্রিকেট জীবনে যেভাবে কোনওদিন কাউকে সুযোগ দেননি, শেষ বেলাতেও দিলেন না। ফের একবার বুঝিয়ে দিলেন সাফল্যটাই আসল। তাই তার স্বাদ থাকতে থাকতেই শুরু করলেন নিজের দ্বিতীয় ইনিংস। সেখানেও হয়তো তিনি বুঝিয়ে দেবেন, টেকনিক নয়…….।