
বৈভব সূর্যবংশী
শেষ আপডেট: 30 April 2025 07:09
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সমস্তিপুর থেকে সওয়াই মানসিং স্টেডিয়াম। ভূগোলের হিসেবে দূরত্বটা বারোশো কিলোমিটার। বৈভব সূর্যবংশীর কাছে অবশ্য এই ব্যবধানের ফাঁকফোকরে মিশে রয়েছে বহু বছরের পরিশ্রম, চোখের জল আর দু’চোখ ভরা স্বপ্ন।
এই ধরনের জার্নির শুরুটা সহজ হয় না। বৈভবের ছেলেবেলাটাও ছিল দীনতায় ভরা। বাবা নিজে ক্রিকেটার হয়ে উঠতে পারেননি। সংসারের পাকচক্রে নিজের অদম্য খোয়াবকে তিল তিল করে মরে যেতে দেখেন। জানতেন, ক্রিকেটার হওয়ার রাস্তাটা বড্ড পিচ্ছিল। যে কোনও মুহূর্তে হড়কে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। এই সময় বাবা-মায়ের পাশে দাঁড়ানোটা ভীষণ জরুরি। নিজের কৈশোরে এই পাশে থাকা হাত হাতড়ে যান সঞ্জীব সূর্যবংশী, বৈভবের বাবা। স্বপ্ন ধুঁকতে ধুঁকতে ফুরিয়ে যায়। তবু সঞ্জীবের ক্রিকেটার হয়ে ওঠা হয়নি।
ছেলের ক্ষেত্রে এই ভুল করেননি তিনি। পাশে দাঁড়ান। ছেড়ে দেন চাকরি। টাকা রোজগারে এগিয়ে আসে দাদা। সংসারের হাল ধরেন। দুঃসময় কেটে গেলেও ছেড়ে আসা অতীতকে ভুলতে পারেননি বৈভব। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, ‘আজ আমি যেখানে, সবই বাবা-মায়ের জন্য। ভোরবেলা ট্রেনিংয়ে যেতে হত। যে কারণে রাত দুটোয় উঠে মা রান্না করতে বসতেন। ঘুমতেন কয়েক ঘণ্টা। বাবা একমাত্র রোজগেরে, তিনিও চাকরি ছেড়ে দেন। এগিয়ে আসেন দাদা। ঘর খুব মুশকিলে চলত। কিন্তু বাবা সবসময় শক্তি জোগাতেন। বলতেন—তুই পারবি, নিশ্চয় পারবি তুই!’
স্কোরবোর্ডে লেখা থাকবে: একটা সেঞ্চুরির খতিয়ান। রেকর্ড বলবে: সর্বকনিষ্ঠ ক্রিকেটার হিসেবে আইপিএলে শতরান করেছেন বৈভব। কিন্তু অকথিত রয়ে যাবে বছরের পর বছর ধরে সয়ে চলা যন্ত্রণা আর হাড়ভাঙা পরিশ্রমের গল্প!
কীভাবে খিড়কি থেকে সিংহদুয়ারে এসে পৌঁছলেন? বছর চোদ্দোর বৈভব অকপটে কৃতিত্ব দিতে চান রাজস্থান রয়্যালসের টিম ম্যানেজমেন্টকে। রেকর্ড ভেঙে, নজির গড়ে দেশের নয়নের মণি হয়ে ওঠা সমস্তিপুরের ডাকাবুকো কিশোরের মুখে উঠে এসেছে চারজনের নাম—রোমি ভিন্ডার, বিক্রম রাঠোর, জুবিন ভারুচারা এবং রাহুল দ্রাবিড়।
ট্রায়ালে অকুতোভয় শট খেলে সকলের নজর কাড়েন বৈভব। প্রথম দর্শনেই মনে ধরে রোমির। প্রস্তাব রাখেন দ্রাবিড়ের কাছে, মেলে ধরেন বৈভবের পারফরম্যান্স, জানান কোথায় তিনি আলাদা, কোথায় বয়স আর অপরিণতিকে ছাপিয়ে আইপিএলে বাঘা বাঘা বোলারদের শাসন করতে পারেন বছর চোদ্দোর এই কিশোর। সেই সময়ের কথা মনে করতে গিয়ে স্মৃতিভারাতুর গলায় বৈভব বলেন, ‘সবার আগে রোমি স্যারের ফোন এসেছিল। রাহুল স্যারের অধীনে ট্রেনিং করা, ব্যাটিং দেখানো যে কোনও খেলোয়াড়ের স্বপ্ন।‘
এই স্বপ্ন যখন সত্যি হয়ে উঠল, জুটল ম্যাচে নামার ক্যাপ, গায়ে গলালেন রাজস্থানের জার্সি—আগের মতোই ভয়ডরহীন ক্রিকেট খেলেছেন বৈভব। আর এখানেই তিনি সবার থেকে আলাদা। চাপকে মাথায় চেপে বসতে দেন না। শতরানের নজির গড়ে সারল্যভেজা গলায় স্বীকার করেন, ‘বল আমার নাগালে ছিল, আমি মেরে দিই। প্রথম বলের কোনও প্রেসার ছিল না। স্রেফ নিজের স্বাভাবিক খেলাটুকু খেলে গিয়েছি।‘
‘সহজ কথা যায় না বলা সহজে।‘ অনেক কিছুর মতো আপ্তবাক্যকেও নিজের চোখধাঁধানো পারফরম্যান্স নিয়ে ভুল প্রমাণ করেছেন বৈভব সূর্যবংশী।