গম্ভীরের দর্শন স্পষ্ট—দলে জায়গা পাবে পারফরম্যান্স, নাম নয়। সেই কারণেই দীর্ঘদিনের ব্যর্থতার পরে বিরাট কোহলি ও রোহিত শর্মার মতো বড় নামও দলে টিকে থাকতে পারেননি। আবার একসময় সম্ভাব্য বড় তারকা বলে মনে হওয়া শুভমন গিলও খারাপ ফর্মের কারণে বিশ্বকাপের দল থেকে বাদ পড়েন। এই কঠিন সিদ্ধান্তগুলো প্রথমে সমালোচনার ঝড় তুলেছিল। তবু নিজের পরিকল্পনা থেকে তিনি সরেননি।

কোচ হিসেবে গম্ভীরের দৃষ্টিভঙ্গি ভারতীয় ক্রিকেটে নতুন এক সংস্কৃতির সূচনা
শেষ আপডেট: 8 March 2026 23:18
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ২০২৬ সালের ৮ মার্চ ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে যেন এক নতুন অধ্যায় হিসেবে মনে রাখা হবে। টিমে বিরাট কোহলি নেই। একদা যুবরাজ সিংহের মতো কোনও মেজাজি ব্যাটারও নেই। জয়ের নেপথ্যে নেই কোনও একক ‘মহাতারকা’। বরং এদিন টি–২০ বিশ্বকাপ (T 20 World Cup 2026 Final) ফাইনালে টিম ইন্ডিয়া এমন এক দল হিসেবে উঠে এল, যেখানে দলগত শক্তি, ধুরন্ধর প্ল্যানিং এবং কোচ গৌতম গম্ভীরের (Gautam Gambhir) দর্শনই হয়ে উঠল মহাকাব্যিক জয়ের ভিত্তি।
এই বিশ্বকাপ জয়ের ট্রফি হাতে তুলেছেন অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব। তবে তিনি সেই অর্থে কপিল দেব, মহেন্দ্র সিং ধোনি, সৌরভ গাঙ্গুলি বা বিরাট কোহলির মতো সর্বগ্রাসী ব্যক্তিত্ব নন। দলের মধ্যে হার্দিক পাণ্ড্য, জসপ্রীত বুমরাহ কিংবা অন্যদেরও নিজস্ব গুরুত্ব আছে, কিন্তু কেউই দলের উপরে নয়। এই দলটি যেন একটাই বার্তা দিয়েছে—এখানে ব্যক্তির চেয়ে বড় দল।
ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের অনেকের মতে, এই পরিবর্তনের নেপথ্যে সবচেয়ে বড় ভূমিকা গৌতম গম্ভীরের। দীর্ঘদিন ধরেই ভারতীয় ক্রিকেটে ‘তারকা সংস্কৃতি’র সমালোচক তিনি। কোচ হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর গত দুই বছরে তিনি ধীরে ধীরে নিজের মতো করে দল গড়েছেন—কখনও কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে, কখনও অবহেলিত ক্রিকেটারদের সুযোগ দিয়ে।
গম্ভীরের দর্শন স্পষ্ট—দলে জায়গা পাবে পারফরম্যান্স, নাম নয়। সেই কারণেই দীর্ঘদিনের ব্যর্থতার পরে বিরাট কোহলি ও রোহিত শর্মার মতো বড় নামও দলে টিকে থাকতে পারেননি। আবার একসময় সম্ভাব্য বড় তারকা বলে মনে হওয়া শুভমন গিলও খারাপ ফর্মের কারণে বিশ্বকাপের দল থেকে বাদ পড়েন।
এই কঠিন সিদ্ধান্তগুলো প্রথমে সমালোচনার ঝড় তুলেছিল। সোশ্যাল মিডিয়ায় সমর্থকদের একাংশের আক্রমণের মুখেও পড়তে হয়েছে গম্ভীরকে। তবু নিজের পরিকল্পনা থেকে তিনি সরেননি। বরং বারবার সুযোগ দিয়েছেন এমন ক্রিকেটারদের, যাদের প্রতিভা থাকলেও আলোচনায় খুব বেশি জায়গা পায়নি।
এই দলের গঠনে কয়েকটি বিষয় স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে—বেশ কয়েকজন বাঁহাতি ব্যাটার, বহু অলরাউন্ডার এবং এমন এক অধিনায়ক, যিনি দলের সঙ্গে মানিয়ে চলেন। সব মিলিয়ে দলটি যেন গম্ভীরের ক্রিকেট দর্শনের প্রতিফলন।
গম্ভীরের চিন্তাভাবনার একটা দিক বোঝা যায় তাঁর ব্যক্তিগত অনুপ্রেরণা থেকেও। তিনি প্রায়ই বিপ্লবী ভগৎ সিংয়ের জীবন পড়েন এবং তাঁর প্রিয় নায়ক কার্তার সিং সারাভার কথা উল্লেখ করেন—একজন প্রায় ভুলে যাওয়া স্বাধীনতা সংগ্রামী। গম্ভীর মনে করেন, ইতিহাস যেমন অনেক সময় কিছু মানুষকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেয় আর অনেককে ভুলে যায়, তেমনই ক্রিকেটেও অনেক প্রতিভা আলোচনার বাইরে থেকে যায়।
সম্ভবত সেই কারণেই গম্ভীর সবসময় ‘আন্ডারডগ’দের পাশে দাঁড়াতে চান। খেলোয়াড়দের উপর তাঁর এই আস্থা অনেক সময় বড় ফল দিয়েছে। উদাহরণ হিসেবে ধরা যায় অভিষেক শর্মাকে। টুর্নামেন্টে শুরুতে ব্যর্থ হলেও ফাইনালে গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস খেলেন তিনি। আবার সমালোচনা সত্ত্বেও সঞ্জু স্যামসনের মতো ক্রিকেটারদের উপর আস্থা রেখেছেন গম্ভীর।
কোচ হিসেবে গম্ভীরের এই দৃষ্টিভঙ্গিই ভারতীয় ক্রিকেটে নতুন এক সংস্কৃতির সূচনা করে দিল। অতীতে ভারতীয় দলকে চিহ্নিত করা হত বড় ক্রিকেটারদের নামে—‘কপিলস ডেভিলস’, ‘ধোনির আর্মি’ বা ‘রোহিতের দল’। কিন্তু এই দলটি যেন সেই ধারণাকেই বদলে দিয়েছে।
অনেকের মতে, আজকের এই বিশ্বকাপ জয় শুধু একটি ট্রফি নয়। এটি ভারতীয় ক্রিকেটকে মনে করিয়ে দিয়েছে—তারকার ঝলক ছাড়াও সাফল্য সম্ভব। সঠিক পরিকল্পনা, দৃঢ় নেতৃত্ব এবং সমান সুযোগ পেলে একটি দল কতটা শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে, তারই প্রমাণ গম্ভীরের গড়া এই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ভারত।