
তৌহিদ হৃদয়
শেষ আপডেট: 21 February 2025 15:26
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ২০০৭ সাল। ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে সেবার বসেছিল ক্রিকেট বিশ্বকাপের (Cricket World Cup) আসর। গ্রুপের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ভারতের মুখোমুখি বাংলাদেশ। সবাই ধরে নিয়েছিল, হাসতে হাসতে লড়াই জিতে নেবে টিম ইন্ডিয়া। কিন্তু সেই ম্যাচ শচিন, সৌরভদের কেরিয়ারে কালরাত্রি ঘনিয়ে আনে। আর মুশফিকুর রহিমদের (Mushfiqur Rahim) উপহার দেয় স্মরণীয় দিন। ভারতকে হারিয়ে একছুটে স্ট্যাম্প উপড়ে নিয়েছিলেন মুশফিকুর। আর টিভির পর্দায় চোখ রাখা বছর বারোর তৌহিদ হৃদয় (Towhid Hridoy) খুশিতে আত্মহারা হয়ে সেদিনই ঠিক করে ফেলেছিলেন, ক্রিকেটার হতে হবে। হতেই হবে।
আর তাই বেশি দেরি না করে দরখাস্ত হাতে হৃদয় হাজির হন বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অফিসে। দাবি একটাই: ভর্তি নিন, সুযোগ দিন। দেশের হয়ে খেলব। সমর্থকদের গর্বিত করব… স্বপ্নের নায়ক মুশফিকুরের মতো দেশকে বিশ্বকাপের মঞ্চে সাফল্য এনে দেব।
সেদিন স্বপ্নপূরণ হয়নি হৃদয়ের। কর্তাব্যক্তিদের ‘না’ শুনে বেরিয়ে আসেন তিনি। কিন্তু হাল ছাড়েননি। বাড়িতে এসে বলতেই পাশে দাঁড়ান বাবা-মা। হতদরিদ্র পরিবারের সন্তান। সম্বল বলতে একফালি চাষের জমি। ছেলের চোখ চেয়ে, সে চোখে স্বপ্ন জমতে দেখে জমিটুকু বেচে দেন মা। হাতে যা টাকা আসে, তাই নিয়ে ফের পাড়ি দেন হৃদয়। এবার গন্তব্য ঢাকা। বেসরকারি অ্যাকাডেমি। ভর্তির একগাদা ফি। তা সত্ত্বেও পাশে দাঁড়িয়েছিলেন মা।
কিন্তু হৃদয়ের জীবনে যেন কোনও কিছুই সহজে মেলার নয়! রাজধানীর সেই অ্যাকাডেমির খোঁজ করার তিনি জানতে পারেন সংস্থার কোনও বৈধ কাগজপত্র নেই, সবই ভুয়ো। প্রথমবার বিনা ট্রায়ালে বাতিল। এবার সংস্থাটাই জালি।
পরপর দু’বার ধাকা খেয়ে হৃদয় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, আর ক্রিকেট নয়। বেছে নেবেন অন্য কোনও পেশা, দেখবেন অন্য কোনও স্বপ্ন। কিন্তু তখনই ফারিস্তার পাঠানো দূত হিসেবে হাজির হন খালেদ মাহমুদ। বাংলাদেশের প্রাক্তন ক্রিকেট অধিনায়ক হৃদয়ের প্রতিভার আন্দাজ পেয়েছিলেন। আস্থা রেখেছিলেন তাঁর উপর। এরপরই হাতে আসে ঢাকার ফার্স্ট ডিভিশনের ক্লাবে খেলার, প্রতিযোগিতায় নামার সুযোগ। মেলে অনূর্ধ্ব-উনিশের জাতীয় দলে ঠাই। মুশফিকুর পারেননি। কিন্তু দেশকে বিশ্বকাপ জিতিয়েছিলেন হৃদয়। ২০২০-তে অনূর্ধ্ব উনিশের বিশ্বজয়ের তাজ মাথায় তোলে বাংলাদেশ। হারায় ভারতের তরুণ ব্রিগেডকে।
গতকাল দুবাইয়ের ইন্টারন্যাশনাল স্টেডিয়ামে নব্বইয়ের কোঠায় পৌঁছে পায়ে ক্র্যাম্প ধরেছিল হৃদয়ের। তবু জমি ছাড়েননি তিনি। ৯৮ থেকে ৯৯ পৌঁছনোর সময় রান আউট এড়াতে যে ঝাঁপটি দিয়েছিলেন, তাতে সাফ ফুটে উঠেছিল জেদ, অগ্রাসন, বিক্রম। আর সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে যখন হেলমেট খুলে চোখ বন্ধ করে ফেলেন হৃদয়, খুব সম্ভবত তাঁর স্মৃতিতে ভেসে উঠেছিল এক ব্যর্থ ট্রায়ালের দুপুর, বঞ্চনা বুকে চেপে নতুন করে যাত্রাশুরুর জেদ আর মায়ের মুখ। ছেলের স্বপ্ন মেটাতে সম্বলের একমাত্র জমিটি বিক্রি করতেও যিনি কসুর করেননি।
কাল দেশকে জেতাতে পারেননি হৃদয়। কিন্তু তামাম ক্রিকেট অনুরাগীর হৃদয় জিতে নিয়েছেন।