
গ্রাফিক্স: শুভ্র শর্ভিন
শেষ আপডেট: 3 April 2025 13:55
দ্য ওয়াল ব্যুরো: হার্দিক ও ক্রুণাল—পান্ডিয়া ভ্রাতৃদ্বয়ের তিন বছর অভাব-অনটনের সঙ্গে লড়াই, খিদে মেটাতে দু’বেলা ম্যাগি খেয়ে কাটানোর গল্প এখন প্রবাদ। যার নির্যাস—পরিশ্রম করো, ফল মিলবে—অভিষেক ভার্মার মতো তরুণ ক্রিকেটারের জীবন পর্যন্ত বদলে দিয়েছে।
এই অনুপ্রেরণার কিসসা সকলের সামনে তুলে ধরেছিলেন নীতা আম্বানি৷ ঘরোয়া ক্রিকেটের আঙিনা থেকে দুই ভাইয়ের উঠে আসা এমনি এমনি নয়। তার আড়ালে নীতা আম্বানির বড় অবদান রয়েছে। নিজের গরজে রঞ্জি দেখতে যেতেন, পরখ করে নিতে চাইতেন উঠতি প্রতিভা আর সেই সুবাদে কীভাবে হার্দিক ও ক্রুনালের সঙ্গে মোলাকাত—বেশ কিছুদিন আগে একটি সাক্ষাৎকারে সে কাহিনি শুনিয়েছেন নীতা।
সে ছিল আইপিএলের উন্মেষ পর্ব। তখনও সবকিছু থাকবন্দি হয়নি। আইনকানুন থেকে বিনোদন, জয়ের ফর্মুলা থেকে শট বাছাইয়ের ধরনধারন—সবই পরীক্ষানিরীক্ষার স্তরে। তাই নীতা আম্বানির এই স্বতঃপ্রণোদিত উদ্যোগ, আজ যা ‘স্কাউটিং’ নামে সুবিদিত, তেমন প্রচার কিংবা প্রসার—কোনওটাই পায়নি।
পাঁচ বারের আইপিএল চ্যাম্পিয়ন মুম্বই ইন্ডিয়ান্স। সতেরোবারের টুর্নামেন্টে পাঁঁচখানা খেতাব জয়—নি:সন্দেহে শ্লাঘনীয় সাফল্য। কিন্তু নিছক ট্রফির হিসেবকে দূরে সরিয়ে আরেকটু ব্যাপকতর দৃষ্টিতে তাকালে আমরা বুঝতে পারব, শুধু আইপিএলে নয়, ভারতীয় ক্রিকেটেও স্কাউটিং-কে একটি মডেলের চেহারা দিয়েছে মুম্বই ইন্ডিয়ান্স। নেহাত ‘যাকে মনে ধরল তাকেই তুলে আনলাম’-গোছের নয়, বিধিবদ্ধভাবে ঝাড়াই-বাছাইয়ের পরই প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে একের পর তরুণ ক্রিকেটারের আত্মপ্রকাশের মঞ্চ করে দিয়েছে তারা। যার সাম্প্রতিকতম নজির অশ্বিনী কুমার এবং ভিগ্নেশ পুথুর৷
কিন্তু ঠিক কীভাবে স্কাউট ও স্পটাররা কাজ করে? কতগুলি ধাপ মেনে চলা হয়? আসুন, জেনে নেওয়া যাক৷
মুম্বই ইন্ডিয়ান্সের টিম ম্যানেজমেন্ট পিরামিডের আদলে গড়া। যার শীর্ষে তিনজন: হেড কোচ মাহেলা জয়বর্ধনে, ডিরেক্টর রাহুল সাঙ্ঘভি এবং চিফ ডেটা পারফরম্যান্স ম্যানেজার দেবযানী সিকেএম (যিনি ২০১১-র বিশ্বকাপজয়ী টিম ইন্ডিয়ার অ্যানালিস্ট হিসেবেও কাজ করেছেন)। মূলত এই ত্রয়ীই টিমের যাবতীয় ক্রিকেটীয় সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন৷ যার অন্যতম হচ্ছে স্কাউটিং।
স্কাউটিংয়ের প্রথম ধাপ: ট্রায়াল৷ এর হিসেব সহজ৷ কোনও বিশেষ পজিশনে খেলোয়াড় লাগলে বিজ্ঞপ্তি জারি করো, খবর ছড়িয়ে দাও৷ তারপর নির্দিষ্ট দিনে হাজির হওয়া তরুণ ক্রিকেটারদের থেকে যাকে পছন্দ, তাকে ছেঁকে নাও৷ এরপর নিলামের লিস্টিতে (অকশন পুলে) নাম তোলো।
এ ছাড়া প্রতিভা বাছাইয়ের দ্বিতীয় একটি পদ্ধতি রয়েছে। যেটা দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। বিসিসিআই রঞ্জি কিংবা মুস্তাক আলি ট্রফি ছাড়াও একগুচ্ছ প্রথম শ্রেণির ও লিস্ট এ ক্রিকেটের আয়োজন করে থাকে৷ যার মধ্যে রয়েছে বিজয় মার্চেন্ট ট্রফি (অনূর্ধ্ব ১৬), কোচবিহার ট্রফি (অনূর্ধ্ব ১৯), সিকে নায়ড়ু ট্রফি (অনূর্ধ্ব ২৩)। ইদানীং চালু হয়েছে রাজ্যভিত্তিক টি-২০ লিগও৷ এর আগে নেহাল ওয়াধেরা, এখন ভিগ্নেশ, অশ্বিনীদের এই সমস্ত টুর্নামেন্ট থেকেই তুলে এনেছে স্কাউট বাহিনী!
সব সময় যে হেড অফিস থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত লোকেরাই ঘুরে ঘুরে খুঁজে বেড়ায়, এমনটা নয়। আঞ্চলিক স্তরেও অনেক ‘স্পটার’কে কাজে লাগানো হয়৷ এদের হিন্দিতে ‘খবরি’, ইংরেজিতে ‘ইনফর্মার’, বাংলায় ‘খবরদাতা’ বলা যেতে পারে। যাদের কাজই হচ্ছে নতুন, সম্ভাবনাময় কোনও ক্রিকেটার দেখলে তৎক্ষণাৎ উপরমহলে খবর পাঠানো৷ এরা নিজেরা প্রকাশ্যে আসে না। আড়ালে থেকে কাজ করে।
এই প্রসঙ্গে মুম্বই ইন্ডিয়ান্সের সঙ্গে যুক্ত, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্তার ব্যাখ্যা, ‘ধরা যাক দেশের কোনও প্রান্তের একটি কোচিংয়ে বছর ষোলোর একজন ক্রিকেটার বেশ প্রতিশ্রুতিমান৷ একথা জানার পরই ক্যাম্পের কোচকে খেলোয়াড়টির উপর বিশেষ নজর দিতে বলা হয়। কিন্তু সবই চুপিসারে। যাতে ওই কিশোর বা তরুণ কিচ্ছুটি জানতে না পারে। কারণ জানতে পারলেই ও নার্ভাস হয়ে যেতে পারে। তখন হিতে বিপরীত। তিন বছর বাদে সে কোন্ জায়গায় যেতে পারে—তার লক্ষ্যমাত্রা মাথায় নিয়ে নকশা এঁকে ফেলা হয়।’
তবে সব সময় বিশেষ প্রতিভার খোঁজই যথেষ্ট নয়। ওই মরশুমে কোন কোন জায়গায় খেলোয়াড়ের ঘাটতি রয়েছে, সেই ভ্যাকান্সিও গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। কোনও বছর হয়তো একজন উদীয়মান রহস্য স্পিনারের খবর পাওয়া গেল৷ কিন্তু দলে আর স্পিনার দরকার নেই। সেক্ষেত্রে তাঁকে ছেড়ে নজর ফেরাতে হয় পিঞ্চহিটারের দিকে৷
প্রতি বছর প্রতিভাবান ক্রিকেটারদের একটি ডেটাবেস বানিয়ে চলে মুম্বই ইন্ডিয়ান্সের অ্যানালিস্ট টিম৷ খেলোয়াড়পিছু তালিকা বানানো হয়৷ তিন-চারটি টুর্নামেন্ট জুড়ে কোনও একজন ক্রিকেটার কেমন খেলল—তা সার্বিকভাবে নেড়েঘেঁটে দেখেন বিশ্লেষকরা। অশ্বিনী কুমার সেই পরিশ্রমের ফসল৷ গত তিন মরশুম চোটের জন্য নামতে পারেননি অশ্বিনী। কিন্তু মুম্বইয়ের স্কাউটরা নজর সরাননি৷ এবছরও ওঁত পেতেছিলেন৷ মোহালির হয়ে শের-ই-পাঞ্জাব ট্রফিতে বাঁ-হাতি পেসার যথারীতি দুর্দান্ত পারফর্ম করেন। তড়িঘড়ি ট্রায়ালের জন্য ডাক পাঠায় টিম ম্যানেজমেন্ট।
যদিও একটি পজিশনে একজন খেলোয়াড় বেছে নেওয়া যথেষ্ট সমস্যার এবং তা ঝুঁকিপূর্ণও বটে। কারণ, মহা নিলামে বাকি টিম ওই খেলোয়াড়ের দর চড়াবে না—তার কোনও নিশ্চয়তা নেই৷ ফলে জায়গাপিছু চারজন খেলোয়াড় হাতে রাখে মুম্বই ইন্ডিয়ান্স। ভিগ্নেশ ও অশ্বিনীর ক্ষেত্রে এবার সমস্যা দেখা দেয়নি। বেস প্রাইস ৩০ লাখ টাকাতেই দুজন হাতে এসেছে। কিন্তু একই সৌভাগ্য প্রতি বছর হবে, এর কোনও গ্যারান্টি নেই৷
খেলোয়াড়ের খবর দিল স্পটার। প্রাথমিকভাবে নেড়েচেড়ে দেখল স্কাউটরা। এবার আসল কাজ—ফাইনাল গ্রেডিং। প্রকৃত অগ্নিপরীক্ষা এটাই। মুম্বই ক্যাম্পে ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিংয়ের জন্য আলাদা আলাদা কোচ সকলের টেস্ট নেন। বোলার হলে স্রেফ সুইং কিংবা পেস নয়, ডেথ ওভারের ডেলিভারিতে কতটা বৈচিত্র্য আনতে পারছে সে, ব্যাটসম্যান হলে পাওয়ার হিটিংয়ের ক্ষমতা কতটা, খেলোয়াড় হিসেবে অতি দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারছে কি না—এমনই একগুচ্ছ প্যারামিটার ঘেঁটে দেখা হয়। সেই ঝালাইয়ের পরীক্ষায় যারা প্রথমের সারিতে তারা সরাসরি নিলামে চলে যায়, প্রতিশ্রুতি রয়েছে অথচ তখন ঠিক তৈরি নয়—এমন ক্রিকেটারদের প্রথম দলে না রাখা হলেও দলের সঙ্গে এক বছর প্র্যাকটিসের জন্য বেছে নেয় টিম ম্যানেজমেন্ট। তারপর অনেক মাজাঘষার পর ভবিষ্যতের জন্য তৈরি হয় তারা।
আইপিএল যেহেতু নিলাম-ভিত্তিক টুর্নামেন্ট, প্রতি বছর খেলোয়াড় বদল ও দল বদলের সম্ভাবনা রয়েছে, তাই স্কাউটিং নিরন্তর চালিয়ে যেতে হয়৷ একদা যুজবেন্দ্র চাহাল, অক্ষর প্যাটেল, রমণদীপ কিংবা নেহালদের হাতেগড়ে তুলে আনলেও ধরে রাখতে পারেনি মুম্বই। অকশনে অন্য টিম বড় অঙ্কে কিনে নিয়ে গেছে। আজকের নায়ক অশ্বিনী আগামী দিনে থাকবেন কি না, তার ন্যূনতম নিশ্চয়তা নেই৷ ফলে আকরিক ঘেঁটে হিরে তৈরির কাজ জারি থাকে। মুম্বই ইন্ডিয়ান্স এ কাজে পথ দেখিয়েছে, গড়ে দিয়েছে আস্ত মডেল। এখন বাকি ন'টি টিম তার ছায়ানুসরণ করছে মাত্র।