বাইশ গজের লড়াই আর কখনও লাতিন আমেরিকা কিংবা ইতালিতে ‘জনগণের খেলা’ হয়ে উঠতে পারেনি। ইংরেজ শাসনের দ্রুত অপসারণ একটা কারণ।

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 22 July 2025 18:53
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ইতালি আর আর্জেন্তিনা। দুটো আলাদা গোলার্ধের দেশ। ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন ইতিহাস। কিন্তু রোম ও বুয়েনস আইরেসকে একসূত্রে গেঁথেছে স্বৈরাচারের সংস্কৃতি। দু’দেশেই শাসনক্ষমতায় এসেছিলেন দাপুটে নায়ক। ইতালিতে (Italy) বেনিতো মুসোলিনি (Benito Mussolini) আর আর্জেন্তিনায় (Argentina) হুয়ান পেরন (Juan Peron)।
প্রথমজনের শাসনে যুদ্ধ আর ধ্বংস, অন্যজন মুদ্রাস্ফীতি আর দেউলিয়াপনায় দেশকে খাদের কিনারে টেনে আনেন। অথচ, এতকিছুর পরেও দুই একনায়কের মধ্যে ছিল এক আশ্চর্য মিল—তাঁরা জাতীয় ঐক্য গড়ার হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগান ফুটবলকে। আর চুপিসারে মুছে দেন ক্রিকেটের ঐতিহ্য। দমচাপা পড়ে বাইশ গজের যুদ্ধ। রক্তে তুফান তোলে ডিফেন্ডার-স্ট্রাইকারের মারকাটারি লড়াই।
শুনতে অবাক লাগলেও সত্যি, আজ থেকে এক শতাব্দী আগে, ইতালিতে ক্রিকেট (Cricket) খেলা হত। যেমন তেমন করে নয়, রীতিমতো রমরমিয়ে। ১৭৯৩ সালে নেপলস বন্দরে নোঙর করা ব্রিটিশ নৌসেনাদের হাতে চালু হওয়া একটা খেলা একশো বছর পরে, ১৮৯৩ সালে, ব্রিটিশ ব্যবসায়ীদের টাকায় গড়ে তোলা জেনোয়া ক্রিকেট অ্যান্ড ফুটবল ক্লাবের দৌলতে সারা দেশে প্রবল জনসমর্থন লাভ করে। ক্রিকেট ও ফুটবল—এক ক্লাবে, এক ছাদের তলায়। পরবর্তীকালে শুধুই ফুটবল ক্লাব হিসেবে জেনোয়া ঘরোয়া লিগে অংশ নেয়, সাফল্য পায়। কিন্তু এই একটি দল মিলান, তুরিনের মতো ইতালির অন্যান্য শহরে ছড়িয়ে দেয় ক্রিকেটের বীজ।
গবেষক সিমোনে গাম্বিনোর কথায়, ‘১৮৭০ সালে ইতালির একীকরণের পর ইংরেজরা প্রভূত বিনিয়োগ করে, বিশেষত উত্তরের শিল্পাঞ্চলে। টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রি বিকশিত হয়। সেই সূত্রে দেশে বিস্তার লাভ করে ক্রিকেটের উন্মাদনা। কিন্তু মুসোলিনি যেহেতু মন থেকে ইংরেজদের ঘৃণা করতেন, ইংল্যান্ড-প্রভাবিত কিছুই সহ্য করতে পারতেন না, তাই তাদের বয়ে আনা ক্রিকেটকে সুকৌশলে ছেঁটে ফেলেন!’
এরপর রাজনীতির মতো ফুটবলেও (Football) ‘ফাসিস্ত যুগে’র শুরু। টাকা ঢেলে দেশের সর্বত্র স্টেডিয়াম তৈরি করলেন মুসোলিনি। ঘরোয়া লিগের কাঠামো পুনর্বিন্যস্ত হল। ১৯৩৪ সালে বিশ্বকাপের আসল বসল ইতালিতে। সবই মুসোলিনির অঙ্গুলিহেলনে। দাপট এতটাই যে, মাঠের খেলাতেও প্রভাব ফলালেন। রেফারিদের ভয় দেখানো, আর্থিক প্রলোভন… গুচ্ছের অভিযোগ উঠে এল। সেমিফাইনালের আগের রাতে অস্ট্রিয়া ম্যাচের রেফারি ইভান একলিন্ডকে আমন্ত্রণ জানান ডিনারে। পরদিন সেই রেফারিই ইতালিকে বিতর্কিত পেনাল্টি ‘উপহার’ দেন। শেষমেশ বিশ্বকাপ জেতে আজুরিরা। কিন্তু সেই সাফল্য মুসোলিনির পেশিশক্তির নির্লজ্জ প্রকাশে আজও কলঙ্কিত।
প্রায় একই চালচিত্র ধরা পড়ে আর্জেন্তিনায়। দশ বছর পরে। গদিতে বসেন মুসোলনি-তুল্য স্বৈরাচারী নেতা হুয়ান পেরন। ফুটবলের ‘রাজনৈতিক শক্তি’ তিনিও তক্তে চেপে ধরে ফেলেছেন। ইতালির মডেল অনুসরণ করে সরকারের তরফ থেকে সমস্ত ক্লাবকে ঢালাও ঋণ দেওয়া হয়। গড়ে ওঠে ঝাঁ-চকচকে স্টেডিয়াম। রেসিং ক্লাব লাভ করে ১ কোটি ৬৭ লক্ষ পেসো। পরে এই ক্লাবের সঙ্গেই জুড়ে যায় পেরনের নাম!
সমান্তরালভাবে চলতে থাকে ক্রিকেট। কিন্তু এক অপ্রত্যাশিত দুর্ঘটনা ও অভিসন্ধির কবলে পড়ে আস্ত খেলাটাই আর্জেন্তিনার মানচিত্র থেকে লুপ্ত হওয়ার দিকে এগিয়ে চলে।
১৯৪৭ সাল। পেরনের স্ত্রী এভা (ইভিতা) বয়েনস আইরেস ক্রিকেট ক্লাবের মাঠে একটি চ্যারিটি অনুষ্ঠান করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কর্মকর্তারা প্রস্তাব শোনামাত্র পত্রপাঠ খারিজ করে দেন। প্রতিশোধে একনায়ক অধিপতির স্ত্রী ক্লাবের কাঠের প্যাভিলিয়ন গুঁড়িয়ে দেন। ধরানো হয় আগুন। কয়েক ঘণ্টায় পুড়ে ছাই গোটা স্টেডিয়াম! টিমোথি আব্রাহাম ও জেমস কয়নের লেখা বিখ্যাত বই ‘ইভিতা বার্নড ডাউন দ্য প্যভিলিয়নে’ ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা আছে।
রানির গোঁসা থেকে জন্ম নেয় রাজার ক্রোধ। বন্ধ হয় অনুদান। ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকে বড়, বড় ক্লাব। রাজরোষে পড়েন আর্জেন্টিনার ক্রিকেট ইতিহাসের কিংবদন্তি ক্লেমেন্ট গিবসনও । খেলতে যান ইংল্যান্ডে। কেমব্রিজ আর সাসেক্সে তাঁর বিস্তর নামডাক ছিল। ১৯২১ সালে সফরকারী অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দ্বিতীয় ইনিংসে নেন ৬ উইকেট। একা হাতে ঘুরিয়ে দেন ম্যাচ। নাম ছড়ায় এত, যে, ডগলাস জার্ডিন তাঁকে বডিলাইন সিরিজের ক্যাম্পে ডেকে পাঠান! পরে এক সময় ব্যবসা নিয়ে সরকারের সঙ্গে ঝামেলা বাঁধে। শোনা যায়, ইভিতা গিবসনের পেছনে গুন্ডাদের লেলিয়ে দেন। ততদিনে তিনি চলে গিয়েছেন দেশের উত্তর প্রান্তে। খুনিরা আর পিছু ধাওয়া করেনি। কোনওমতে প্রাণে বাঁচেন গিবসন!
কিন্তু ততদিনে আর্জেন্তিনায় ক্রিকেট প্রায় নিশ্চিহ্ন। ঝাঁপ ফেলেছে ইংরেজ পরিবারগুলোর ব্যক্তিগত ক্লাবের আসর। বাইশ গজের লড়াই আর কখনও লাতিন আমেরিকা কিংবা ইতালিতে ‘জনগণের খেলা’ হয়ে উঠতে পারেনি। ইংরেজ শাসনের দ্রুত অপসারণ একটা কারণ। আবার অনেক জায়গায় ক্রিকেটের মূল ভরকেন্দ্র ছিল অভিজাত ক্লাব। যা শ্রমিক-মজুর-খেটে খাওয়া মানুষের পাড়ায় পৌঁছয়নি। অন্যদিকে ফুটবলের উন্মাদনা ততদিনে চিলির আতাকামা মরুভূমির খনিশ্রমিক থেকে শুরু করে মেক্সিকো, উরুগুয়ে, পানামার বস্তি—সর্বস্তরে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে।
ভবিষ্যৎ বদলানো যায়, ইতিহাসের রেখাচিহ্ন পালটানো যায় না। একথা মাথায় রেখেও খেয়ালি মনে প্রশ্নের বুদ্বুদ উঠবেই উঠেব—যদি মুসোলিনি আর পেরন ফুটবলের মতো ক্রিকেটকেও তোল্লাই দিতেন… যদি ভারতের রাজারা শুধু ক্রিকেট নয়, ফুটবলের পৃষ্ঠপোষক হয়ে উঠতেন… যদি ইংরেজদের বদলে স্পেন, পর্তুগাল বা নেদারল্যান্ডস শাসন করত উপমহাদেশ… তাহলে কী হত?
উত্তর একটাই: হয়তো টিম ইন্ডিয়ার তুর্যধ্বনি ব্রাজিলের সাম্বা নাচের ছন্দে পা মেলাত… ইতালি আরও আগে… অনেকটা আগে… ভারতকে ওয়াংখেড়েতে কড়া টক্করের মুখে ফেলত… ক্রিকেটের ময়দানেও জন্ম নিত ‘অন্য মেসি’!