
কলকাতা লিগ ফুটবলের ডার্বির প্রথম গোলদাতা নেপাল চক্রবর্তী।
শেষ আপডেট: 11 July 2024 17:18
শনিবার কলকাতা লিগের ডার্বির একটা আলাদা মাহাত্ম রয়েছে। একটা দিক হল, সেদিন লিগের ডার্বির শতবর্ষ হিসেবে ম্যাচটি হবে। দ্বিতীয়ত, ওই ম্যাচে লিগের ডার্বিতে যিনি প্রথম গোল করেছিলেন, সেই নেপাল চক্রবর্তীর পরিবারকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে আইএফএ-র তরফ থেকে।
নেপালবাবুর একমাত্র পুত্র সেদিন মাঠে থাকবেন কিনা, সেটি এই প্রতিবেদনের বিষয় নয়। এখনকার তরুণ প্রজন্ম সেই মহান ফুটবলার সম্পর্কে কিছুই জানে না, জানার কথাও নয়। তবে এটা বলতে পারি, ইস্টবেঙ্গলের ইতিহাস জানতে গেলে তাঁর কথাও জানতে হবে। আপাদমস্তক বাঙালি ব্রাক্ষণ পরিবারের সন্তান ১৯২৫ সালের ডার্বি ম্যাচে নায়ক বনে গিয়েছিলেন। যে কোনও প্রথম কিছুর একটা আলাদা তাৎপর্য রয়েছে। নেপাল বাবুর গোলটাও ইতিহাসে রয়ে গিয়েছে, থেকে যাবেও।
বর্তমান বাংলাদেশের ঢাকা জেলার বিক্রমপুরে এক বর্ধিষ্ণু পরিবারে ২২ শে অক্টোবর ১৯০০ সালে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ছোট থেকেই ফুটবলের প্রতি আগ্রহ থাকলেও, বাড়ির চাপে পড়াশোনার ক্ষেত্রে সময়টা বেশি দিতে হতো।
গ্রামের স্কুল থেকে পাশ করে কলকাতায় চলে আসেন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে। ভর্তি হলেন যাদবপুরের বিই কলেজে। তখন তার নাম ছিল ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ এডুকেশন। যাদবপুরে মেস ভাড়া করে থাকতে শুরু করেন। কিন্তু ফুটবলের প্রতি অমোঘ আকর্ষণ খুব তাড়াতাড়ি ময়দানের সঙ্গে ওঁর পরিচিতি বাড়িয়ে দিয়েছিল।
১৯১৯ সালে কুমারটুলি ক্লাবে যোগ দেন নেপালবাবু। তখন কুমারটুলি ছিল দ্বিতীয় ডিভিশনের দল। কিন্তু সেই বছর দ্বিতীয় ডিভিশনে অসাধারণ খেলে চ্যাম্পিয়ন হলেও তৎকালীন আইএফএ-র নিয়মের ফাঁসে প্রথম ডিভিশনে ওঠার ছাড়পত্র পেল না। ব্রিটিশ শাসিত আইএফএ ভারতীয় ফুটবলকে কুক্ষিগত করে রাখতো। তাদের নিয়ম ছিল দুটি ভারতীয় টিমের বেশি প্রথম ডিভিশনে খেলতে পারবে না। আর ব্রিটিশদের দল প্রথম ডিভিশন লিগে শেষ স্থান পেলেও তাকে অবনমন করানো চলবে না। পরবর্তীতে ১৯২৪ সালে ইস্টবেঙ্গল ক্লাব বহু প্রতিবাদ আন্দোলন করে তাদের এই অন্যায় আইন পরিবর্তন করতে বাধ্য করে।
১৯২০ সালে আইএফএ শিল্ডে কুমারটুলি ক্লাব অবতীর্ণ হয়। দারুনভাবে শুরু করে তারা পৌঁছে যায় ফাইনালে। কিন্তু ফাইনালে সাহেবদের টিম ব্ল্যাক ওয়াচের কাছে ২-০ গোলে হেরে যায়। সেই খেলা যারা দেখেছিলেন, তাদের সবার ধারণা হয়েছিল, সাহেবরা অন্যায় ভাবে প্রায় জোর করেই কুমারটুলিকে হারিয়ে দিয়েছিলো। পরের দিনের স্টেটসম্যান পত্রিকায় এই বিষয়ে বিস্তারিত সংবাদ ও বেরিয়েছিল। সেখানে অনেকটা অংশ জুড়ে ছিল নেপাল চক্রবর্তীর কথা ও। নেপাল চক্রবর্তীর কথা লিখতে গিয়ে স্টেটসম্যান পত্রিকা লিখেছিলো “Runs like a Horse and shoots like a Bullet”
১৯১৯ আর ১৯২০ সালে একাধারে কলকাতা লিগ এবং আইএফএ শিল্ডে অসাধারণ খেলে নেপাল চক্রবর্তী ময়দানে সারা ফেলে দিয়েছিলেন। ১৯২১ সালে নেপাল চক্রবর্তী চলে আসেন ইস্টবেঙ্গল ক্লাবে। ১৯২১ থেকে ১৯২৮, দীর্ঘ আট বছর ইস্টবেঙ্গল ক্লাবে সুনামের সঙ্গে ফুটবল খেলেছিলেন।
মূলত সেন্টার ফরোয়ার্ডের খেলোয়াড় হলেও ইস্টবেঙ্গল ক্লাবে তিনি শুরু করেন লেফট আউট পজিশনে। ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের প্রথম লেফট আউট পজিশনে খেলা খেলোয়াড় ছিলেন নেপালবাবু।
দুরন্ত গতিতে ছোট জায়গায় দৌড় ও গোলার মতো শটের পাশাপাশি আরও একটা বিশেষত্ব ছিল কর্নার থেকে সরাসরি গোল করার। বেশ কিছু খেলায় কর্নার থেকে সরাসরি বাঁকানো শটে উনি গোল করেছিলেন। ময়দানে তখন একটা কথাই লোকমুখে ঘুরত "নেপালের কর্নার"।
নেপাল চক্রবর্তীর খেলোয়াড় জীবনে বহু স্মরণীয় খেলা তিনি উপহার দিয়েছিলেন দর্শকদের। তার মধ্যে শ্রেষ্ঠ যদি বলা হয় তবে প্রথমেই চলে আসবে ২৮ শে মে ১৯২৫ সালের কলকাতা লিগের প্রথম ডার্বির প্রসঙ্গ।
সেই খেলায় নেপাল চক্রবর্তীর একমাত্র গোলে ইস্টবেঙ্গল ক্লাব ১-০ গোলে মোহনবাগানকে হারিয়েছিল। সেই ঐতিহাসিক ম্যাচের পর ময়দানে আরও একটি সম্মিলিত নাম বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে "পঞ্চ পান্ডব", - সূর্য চক্রবর্তী, নেপাল চক্রবর্তী, মনা মৌলিক, মোনা দত্ত ও হেমাঙ্গ বসু ।
লাল হলুদের এই কিংবদন্তি প্রতিদিন সকালবেলায় অল্প গরম জলে দুটি কাঁচা ডিম ফাটিয়ে তার সঙ্গে কিছুটা চিনি মিশিয়ে খেয়ে রাস্তায় দৌড় শুরু করতেন। ওঁর কাছে ওটাই ছিল দম বাড়ানোর কৌশল। যার সুফলতা তিনি পেয়েছিলেন খেলার মাঠে। এছাড়াও আরেকটা কাজ করতেন, বাড়ির সামনের মাঠে শক্ত বাতাবি লেবু দিয়ে প্র্যাক্টিস করা। যাকে ঢাকার ভাষায় বলা হতো "জাম্বুরা"। তখনকার ব্রিটিশ ফুটবলারদের ভারী বুটের সঙ্গে লড়াই করতে গেলে নিজেদের পা কেও শক্তিশালী করে তুলতে হবে। সেইসময়ে বলের ওজন ও অনেক বেশি ছিল, তাই সেই ভারী বল দিয়ে গোলার মতো শট মারতে গেলে সর্বাগ্রে দরকার লোহার মতো পা। ওই "জাম্বুরা "দিয়ে নিয়মিত প্র্যাক্টিস তাদের পা কে আরও শক্তিশালী করে তুলতে সাহায্য করতো।
নেপাল চক্রবর্তীর কর্মজীবনের কিছু কথা আলোচনা করা যাক। ১৯২৩ সালে তিনি যখন ইস্টবেঙ্গলের হয়ে অসাধারণ ফুটবল খেলছেন, তখন কোনও একটা ম্যাচে ওনাকে দেখেন জামশেদপুর টাটা থেকে আগত একজন সিনিয়র অফিসিয়াল। তৎক্ষণাৎ উনি নেপাল চক্রবর্তীকে প্রস্তাব দেন জামশেদপুরে টাটা কোম্পানিতে চাকরি করার, পাশাপাশি তাদের টিমের হয়ে খেলার।
নেপাল চক্রবর্তী প্রথম শর্তে রাজি থাকলেও দ্বিতীয় শর্তে বেঁকে বসলেন। কারণ তিনি ইস্টবেঙ্গল ক্লাব ছেড়ে কখনই যেতে চান না। শেষ পর্যন্ত ঠিক হয় লিগ, শিল্ডের খেলায় তিনি ইস্টবেঙ্গলের হয়েই খেলবেন, আর সেই সময় কোম্পানি ওঁকে সবেতন ছুটি মঞ্জুর করবেন। বছরের বাকি সময় তিনি জামশেদপুরে থাকবেন আর ওখানেই চাকরি করার পাশাপাশি তাদের হয়ে খেলবেন।
নেপাল চক্রবর্তী এমন একজন প্রকৃত ইস্টবেঙ্গল অন্ত প্রাণ মানুষ ছিলেন, যার কাছে চাকরির হাতছানি থেকেও ইস্টবেঙ্গলের হয়ে খেলা অনেক বেশি গৌরবের ছিল। যতদিন ফুটবল খেলেছেন ইস্টবেঙ্গল ছেড়ে ময়দানের আর অন্য কোনও ক্লাবে নাম লেখাননি।
জীবনে সব কিছুই মসৃন ভাবে চলে না। বহু ঘাত প্রতিঘাতের সম্মুখীন হতে হয়। নেপাল চক্রবর্তীর জীবনে সেরকমই একটি বছর ছিল ১৯২৮ সাল। জামশেদপুরের টিমের সাথে খেলা ছিল একটি গোরাদের টিমের। খেলাটি হচ্ছিল জামশেদপুরে। নেপাল চক্রবর্তীর ক্রীড়া কুশলতায় গোরাদের হিমশিম অবস্থা। কিছুতেই আটকানো যাচ্ছে না নেপাল চক্রবর্তীর গতিকে। আর কিছু উপায় না পেয়ে নেপাল বাবুর তল পেটে বুটের লাথি মেরে বসলেন গোড়া ফুটবলার। শুধু তাই নয় তিনি সেই অবস্থায় পরে যেতে আবারও সেই প্লেয়ার জোড়া পায়ে তলপেটের উপর লাফিয়ে পড়লেন।
মাঠেই সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়লেন তিনি। হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তার একপ্রকার জবাব দিয়েই দিলেন। কিন্তু ঈশ্বর সহায় ছিলেন। প্রায় মাস কয়েক যমে মানুষে টানাপড়েনে অবশেষে নেপাল চক্রবর্তী সুস্থ হয়ে উঠলেন। ওঁর এই অবস্থা দেখে ওঁর মা ও শারীরিক আর মানসিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লেন। সুস্থ হয়ে নেপালবাবু বাড়িতে ফিরলে ওঁর মা বলেছিলেন "প্রতিজ্ঞা করো, এই খেলা তুমি আর জীবনে খেলবে না। যে খেলা তোমাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিল, আর তুমি কোনওদিন সেই খেলা খেলবে না। আজ তুমি নতুন জীবন পেলে, কিন্তু আবার যদি সেই খেলা তুমি খেলো তবে হয়তো আমার আর জীবন থাকবে না"। অসম্ভব মাতৃভক্ত নেপাল বাবু সেইদিনের পর আর কোনওদিন ফুটবলে পা স্পর্শ করেননি। সারা জীবন মনের মধ্যে সুতীব্র কষ্ট বয়ে বেরিয়েছিলেন, কিন্তু মায়ের কাছে দেওয়া কথার অন্যথায় হতে দেন নি।
১৯৬০ সালে জামশেদপুরের চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করে চলে আসেন কলকাতায়। ১৯৬৭ সালে পুত্রের চাকরির বদলির দারুন, পুরো পরিবারের সাথে চলে আসেন জলপাইগুড়িতে।
১৯৭০ সালের শেষের দিক থেকে শরীর খারাপ হতে শুরু করে। ধরা পরে লিভারের ক্যান্সার। পরিবারের কাছে বলতেন, ‘‘মায়ের কাছে কথা রাখতে গিয়ে জীবনে কোনওদিনই আর ফুটবলে পা দিইনি, এটা যে কত কষ্টের সেটা বলে বোঝানো যাবে না। হয়তো ইস্টবেঙ্গলের হয়ে আরও কয়েকটা বছর খেলার সুযোগ পেতাম। কিন্তু সেই ১৯২৮ সালের পেটের আঘাত, যা এতদিন বয়ে বেড়াতে হচ্ছিলো, আজ হয়তো তাই সেই জায়গায় মারণ রোগের রূপ ধারণ করল। সেই সময় ঈশ্বরের কৃপায় নতুন জীবন পেয়েছিলাম, এবারে হয়তো ঈশ্বর আর সহায় হবেন না।’’
নিয়তির পরিহাস বড় বেদনাদায়ক। চলে গেলেন নেপাল চক্রবর্তী। ২৮ অক্টোবর ১৯৭৩, সব যন্ত্রণাকে জয় করে জীবনের ময়দান ছেড়ে চলে গেলেন চিরকালের মতোই।