গতকাল ফিডে মহিলা দাবা বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠেছেন নাগপুরের অষ্টাদশী। টুর্নামেন্টে বাঘা বাঘা প্রতিপক্ষদের কুপোকাত করেছেন। শেষচারের লড়াইয়ে যাকে হারিয়েছেন, সেই তান ঝংই বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে এক নম্বর।

দিব্যা দেশমুখ
শেষ আপডেট: 24 July 2025 13:50
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ‘চেস প্রডিজি’, বাংলায় বললে ‘দাবার বিস্ময় প্রতিভা’ তকমাটা এতদিন পুংলিঙ্গবাচক ছিল। মানে, প্রতিভাবান কিশোর বা তরুণ দাবাড়ু মানেই হয় তিনি ডি. গুকেশ (D. Gukesh), নয়তো আর. প্রজ্ঞানন্দ (R Praggnanandhaa)। কালেভদ্রে আলো ফেলেছেন নিহাল সারিন (Nihal Sarin), রৌণক সাধওয়ানি (Rounak Sadhwani)। কিন্তু স্পটলাইটজুড়ে ছেলেদের একাধিপত্য স্পষ্ট।
সেই দেয়ালে ফাটল ধরালেন দিব্যা দেশমুখ (Divya Deshmukh)। গতকাল ফিডে মহিলা দাবা বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠেছেন নাগপুরের অষ্টাদশী। টুর্নামেন্টে বাঘা বাঘা প্রতিপক্ষদের কুপোকাত করেছেন। শেষচারের লড়াইয়ে যাকে হারিয়েছেন, সেই তান ঝংই বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে এক নম্বর। সবাই ধরেছিল অনায়াসেই ফাইনালে জায়গা পাকা করবেন চিনের দাবাড়ু। কিন্তু আগের সমস্ত ধাপের মতো সেমিফাইনালেও ‘জায়ান্ট কিলার’ তকমার মান রেখেছেন দিব্যা। নিখুঁত কৌশলে ফাঁদ পেতে বন্দি করেছেন দুর্ধর্ষ প্রতিদ্বন্দ্বীকে। এখন লড়াই ফাইনালে। কে উঠবেন, তা জানা যাবে আজ। আর যদি শেষ যুদ্ধেও শেষ হাসি হেসে ফেলেন দিব্যা, তাহলে স্রেফ অঘটনঘটনপটীয়সী নয়, ঘটনাময় ইতিহাসের তালিকায় নিজের নাম খোদাই করে ফেলবেন!
চলতি টুর্নামেন্টে যাত্রাপথ মোটেই মসৃণ ছিল না। কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হন স্বদেশীয় প্রতিপক্ষ, গ্র্যান্ডমাস্টার হারিকা দ্রোনাভাল্লির। নাটকীয় টাই-ব্রেকে পরপর দু’টি গেম জিতে সেমিফাইনালের টিকিট পাকা করেন দিব্যা। শেষ চারের যুদ্ধে তান ঝংইয়ের বিরুদ্ধে প্রথম গেমে ড্র। তারপর ধাপে ধাপে জয়ের সরণি বেয়ে এগিয়ে চলা।
কিন্তু আশ্চর্যের হলেও সত্যি, আজকের এই মহাকাব্যিক সাফল্যের আগে দেশের তাবড় খেলা-অনুসন্ধিৎসুদের বড় অংশ দিব্যার নাম পর্যন্ত শোনেননি। মেয়েদের দাবার দুনিয়া কুক্ষিগত ছিল কোনেরু হাম্পির (যিনি ঘটনাচক্রে বিশ্বকাপের আরেক সেমিফাইনালে খেলছেন) মতো গুটিকয়েক দাবাড়ুতে। সেই কক্ষপথে দিব্যা দেশমুখ ঘুরপাক খাননি। ফলে তাঁর এই উড়ান, এক অর্থে, দেশের ক্রীড়াসংস্কৃতির অন্ধকার দিককেও চিনিয়ে দেয়। যা ঘোরতরভাবে হাতেগোনা খেলার দাপটে অন্ধকারে ঢাকা, পুরুষ আধিপত্যে সংকুচিত।
জর্জিয়ায় উত্থানের গল্পের শুরুটা যদিও হয়েছিল নাগপুরে। এই শহরেই দিব্যার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। বাবা-মা, জিতেন্দ্র ও নম্রতা দেশমুখ, দুজনেই চিকিৎসক। বড়দি ব্যাডমিন্টনে নাম লেখালে দিব্যার মনে খেলাধুলো নিয়ে আগ্রহ দানা বাঁধে। তবে দিদির পথে নয়, নিজের রাস্তা খুঁজে নেন পাঁচ বছর বয়সে। ঠিক করেন, দাবার বোর্ডই হবে লড়াইয়ের মঞ্চ। এখানেই লিখবেন ইতিহাস, যা দেশের কেউ আজ পর্যন্ত করে দেখাতে পারেননি!
পাঁচ বছরের শপথ বাড়িয়ে বলা কথা নয়। দু’বছর বাদেই এর প্রমাণ মেলে। সবে ছয়ে সাতে পা রেখেছেন। ২০১২ সালে অনূর্ধ্ব-৭ জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে নাম লেখান দিব্যা। আর ঘরে ফেরেন পদক জিতে। সেই প্রথম বড় টুর্নামেন্ট। আর শুরুতেই বাজিমাত!
এরপর ২০১৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে আয়োজিত অনূর্ধ্ব–১০ বিশ্বখেতাব, ২০১৭-তে ব্রাজিলে আন্ডার–১২ বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ জয়… উড়ান ছিল বাধাহীন, সাবলীল।
প্রভূত সাফল্যের জেরে খুব অল্প বয়সেই অর্জন করেন মহিলাদের ফিডে মাস্টার (WFM) খেতাব। ২০২১-এ গ্র্যান্ডমাস্টার (WGM)। বিদর্ভ অঞ্চলের প্রথম দাবাড়ু হিসেবে এই স্বীকৃতি অর্জন করেন দিব্যা দেশমুখ। সেই সঙ্গে ভারতের ২২তম মহিলা গ্র্যান্ডমাস্টার হিসেবে রেকর্ড বুকে নাম লেখান।
বছর দুই বাদে হাতে ইন্টারন্যাশনাল মাস্টার (IM) উপাধি। ২০২৪-এ দাবার জগতে সামনের সারিতে এনে এনে দেয় বিশ্ব জুনিয়র (অনূর্ধ–২০) গার্লস চ্যাম্পিয়নশিপ জয়। সেই অভিযান তিনি শেষ করেন অবিশ্বাস্য স্কোরে—১১ গেমে ১০ পয়েন্ট!
স্রেফ চোখধাঁধানো সাফল্য নয়, ধারাবাহিকভাবে ভাল ফর্ম ধরে রাখাই দিব্যাকে বাকিদের থেকে আলাদা করে তুলেছে। ২০২৪-এর ৪৫তম দাবা অলিম্পিয়াডে ভারতের মহিলা দলের সোনাজয়ী সদস্য ছিলেন। দলের জয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। একই বছর ওয়ার্ল্ড টিম র্যাপিড অ্যান্ড ব্লিট্জ চ্যাম্পিয়নশিপে তাঁর পারফরম্যান্স রেটিং ২৬০০-র ওপরে ওঠে, যা এক কথায় অবিশ্বাস্য!
দিব্যার ঝুলিতে ইতিমধ্যে এসেছে: তিনটি দাবা অলিম্পিয়াড সোনা, একাধিক এশীয় ও বিশ্ব বালিকা দাবা খেতাব, বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপে বিশ্ব এক নম্বরকে হারানোর অভিজ্ঞতা।
চেন্নাইয়ের চেস গুরুকুলে গ্র্যান্ডমাস্টার আরবি রমেশের তত্ত্বাবধানে প্রশিক্ষণ নেন দিব্যা। তাঁর খেলার ধরন রীতিমতো ছকভাঙা। বয়স আঠারো হলেও পরিকল্পনায় পরিণতির ছাপ স্পষ্ট। চাল দেওয়ার শৈলী আগ্রাসী হলেও অহেতুক ঝুঁকি নিতে নারাজ। তীক্ষ্ণ রণকৌশল, ঠান্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত আর সৃষ্টিশীলতা—দিব্যার ক্যারিশমায় মুগ্ধ দাবা দুনিয়া। ফাইনালে এই তিন মন্ত্রেই আসবে সাফল্য? উত্তরটা মিলবে চৌষট্টি খোপের লড়াইয়ে।