
শেষ আপডেট: 2 May 2023 12:03
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ক্যারিবিয়ান সমুদ্রে, ভেনেজুয়েলার কিছু উত্তরেই আছে দুটো দ্বীপ। একটু খুঁটিয়ে না দেখলে ম্যাপের বইতেও চট করে নজরে আসবে না। সেই দ্বীপপুঞ্জের ইতিহাসে তিনিই কার্যত মুকুটহীন রাজচক্রবর্তী। এতে কোনো দ্বিমত নেই, বিতর্কও নেই। তাঁর পোশাকি নামই ছিল 'দ্য প্রিন্স'। 'ক্রিকেট' নামে যদি কোনো বই লেখা হ'ত, তার সবচেয়ে বড় অধ্যায় ব্র্যাডম্যানের পরে তাঁর জন্যই বরাদ্দ থাকত। তিনি—ব্রায়ান চার্লস লারা (Brian Lara Birthday)।
স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের নাম শুনলেই যে তাৎক্ষণিক সমীহ ও শ্রদ্ধার ভাবটা চলে আসে, তার অনেকটাই সংখ্যাতত্ত্বের কৃতিত্ব। ব্র্যাডম্যান (Bradman) যখন খেলতেন, লাইভ সম্প্রচার বা টিভি ক্যামেরার দুনিয়ায় আমরা তখনও আসিনি। তাঁর টেস্টে ব্যাটিং গড় ৯৯.৯৪। কোনো মানুষের পক্ষে এরকম অতিমানবীয় সংখ্যায় পৌঁছনো সম্ভব—তা না দেখলে বিশ্বাস করা মুশকিল। বাকি সবটাই প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ।

কিন্তু তার অর্ধশতাব্দী পরে ত্রিনিদাদের যে অতিমানবীয় ব্যাটিং শৌর্য আমাদের সামনে ধরা দিল—তাকে তো অস্বীকার করার জায়গা নেই! ১৯৯৪ সালের ২ জুন, এজবাস্টনে ইংল্যান্ডের ঘরোয়া ক্রিকেটে ডারহ্যামের মুখোমুখি ওয়ারউইকশায়ার। সেবার ওয়ারউইকশায়ার সই করিয়েছিল মনোজ প্রভাকর এবং অ্যালান ডোনাল্ডকে। অথচ প্রভাকরের চোট। অতএব, তড়িঘড়ি তাঁর বদলি খোঁজা হল, ২৫ বছরের তরুণ ওয়েস্ট ইন্ডিজের (West Indies) ব্রায়ান লারা। বাকিটা ইতিহাস। টসে জিতে ব্যাট করতে নেমে ডারহ্যাম ৮ উইকেটে ৫৫৬ তুলে ডিক্লেয়ার করে দেয়। ২০৪ করেছিলেন জন মরিস। জবাবে ব্যাট করতে নেমে শুরু হয় বিধ্বংসী লারা-ঝড়। একাই ৪২৭ বলে তোলেন ৫০১, তাতেও উইকেট ফেলা যায়নি। মেরেছিলেন ৬২-টা চার, ১০-টা ছয়। ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে এটাই আজও এক এবং একমাত্র একজন খেলোয়াড়ের করা ৫০০ রান (Unbeaten world record)।

ব্রায়ান লারার ব্যাটিং শৌর্য যেন যুগপৎ সমৃদ্ধ ক্রিকেট ব্যাকরণ এবং চোখের আরাম। বাঁ হাতি ব্যাটিং-এর শিল্প যেন ছাপিয়ে যেতে পারে ইতালির নবজাগরণকেও। ২০০৪ সালে আবারও এরকম এক বিশ্বরেকর্ড করেছিলেন তিনি। ওয়েস্ট ইন্ডিজে খেলতে এসেছে ইংল্যান্ড, অধিনায়ক মাইকেল ভন। অ্যান্টিগায় চতুর্থ টেস্ট। তার আগের তিনটি টেস্টেই জিতেছে ইংল্যান্ড। টসে জিতে ব্যাট নিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। নামলেন আজকের 'ইউনিভার্স বস'—ক্রিস গেইল এবং ডারেন গাঙ্গা। গাঙ্গা ১০ তুলেই আউট। নামলেন ব্রায়ান লারা। তারপরের ঘটনা টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে আর ঘটেনি। ৫৮২ বল খেলে ৪০০ রানে নট আউট থাকলেন ব্রায়ান লারা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ তুলল ৭৫১। সেবার ইংল্যান্ড ফলো-অন খেয়েও ম্যাচ ড্র করেছিল বটে, তবে ব্রায়ান লারার সেই মহাকাব্যিক ব্যাটিং রয়ে গিয়েছে পাকাপাকিভাবে। অপরাজিত—আজও।
জন্মেছিলেন ১৯৬৯ সালের আজকের দিনে, ত্রিনিদাদের সান্তাক্রুজে। বিরাট বড় পরিবার, ১১ ভাইবোনের মধ্যে ১০-তম। ওই একবারই দশম স্থানে ছিলেন তিনি। খেলার দুনিয়াতে, ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিশ্ববিখ্যাত সেই দলে বা পরে যেখানেই তিনি খেলেছেন, ব্রায়ান লারার সঙ্গে কার্যত সমার্থক হয়েছিল তিন নম্বর জায়গাটা। ব্র্যাডম্যানের পরে তিনিই ছিলেন দ্বিতীয়, যিনি দুইবার ত্রিশতরান করেছিলেন। দ্বিশতরানের বিচারেও তিনি তিন নম্বরে। করেছেন নয়টি দ্বিশতরান, তাঁর ওপরে শুধু কুমার সঙ্গাকারা এবং ডন ব্র্যাডম্যান। ২০০৭ সালে তিনি অবসর নেন। সচিন তেণ্ডুলকরের মত অসাধারণ স্পিচ নয়, স্রেফ তিনটি শব্দে তিনি শো শেষ করেছিলেন। "ডিড আই এন্টারটেইন?"

আজ চুয়ান্ন বছরে পা দিলেন তিনি। আপাতত রয়েছেন এদেশেই, সানরাইজার্স হায়দরাবাদ (Sunrisers Hyderabad) দলের কোচের দায়িত্বে। আইপিএল আজ 'এন্টারটেইন' শব্দটাকেই নতুন করে লিখছে। ব্রায়ান লারার জন্য কোনো আইপিএল ছিল না। পাঁচদিনের, চারদিনের সাদা পোশাক, লাল বলের খেলাতেই তিনি যা বলার বলে দিয়ে গিয়েছেন।
আজও যা কেউ টপকাতে পারেনি।