রোহিত শর্মা টেস্ট কেরিয়ারের মধ্যজীবনে মধ্যাহ্নের সূর্যের মতোই দীপ্তি ছড়িয়েছেন। দু’হাতে তুলেছেন রান। বারবার ঘুরপাক খেতে খেতে অবশেষে দলে নিজের জমি, নিজের হক বুঝে নিয়েছেন।

গ্রাফিক্স: শুভ্র শর্ভিন
শেষ আপডেট: 15 May 2025 17:20
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ঠিক যেন তিন অঙ্কের শেক্সপিয়রীয় ট্র্যাজেডি। যার প্রথম অঙ্ক ধোঁয়াশায় ভরা। মধ্যাঙ্ক ঠাসবুনট। আর অন্তিম অঙ্কে নায়কের বিপর্যয় তাকে পতনের দিকে টেনে নিয়ে গিয়েছে।
রোহিত শর্মার টেস্ট কেরিয়ারকে ফিরে দেখতে বসে নাট্যতত্ত্বের মূলসূত্রের সঙ্গে এর মিল খুঁজে পাওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। সাড়া জাগানো শুরুয়াত নয় রোহিতের। অপেক্ষা করেছেন, ধৈর্য ধরেছেন উপযুক্ত মঞ্চের জন্য। তারপর যখন সুযোগ হাতে এসেছে, দেখিয়েছেন ‘ক্লাস’, মেলে ধরেছেন প্রতিভা।
রোহিত শর্মা টেস্ট কেরিয়ারের মধ্যজীবনে মধ্যাহ্নের সূর্যের মতোই দীপ্তি ছড়িয়েছেন। দু’হাতে তুলেছেন রান। বারবার ঘুরপাক খেতে খেতে অবশেষে দলে নিজের জমি, নিজের হক বুঝে নিয়েছেন। অর্জন করেছেন আস্থা, বিশ্বাস আর ভালবাসা। আর সবশেষে যখন একটি সম্ভাবনাময় কেরিয়ার উচ্চকিত সমাদর আর সম্ভাষণে বিদায়ের অবসর খুঁজছে, তখন বিতর্ক, সংশয় আর প্রশ্নকে কাঁটার মুকুট করে নিষ্ক্রান্ত হলেন রোহিত। ইতি টানলেন টেস্ট কেরিয়ারে। অথচ রয়ে গেল প্রশ্ন: যে সম্ভাবনা নিয়ে রঙ্গমঞ্চে আবির্ভূত হয়েছিলেন, তার পূর্ণ সদ্ব্যবহার কি করে উঠতে পারলেন?
প্রথম অঙ্ক: অভিষেক
ঘরোয়া ক্রিকেটে অসাধারণ পারফরম্যান্সের সুবাদে ২০১০ সালেই টেস্টে অভিষেক হওয়ার কথা ছিল রোহিতের। বিপক্ষ দল: দক্ষিণ আফ্রিকা। ভেন্যু: নাগপুর। অথচ মাঠে নামার আগেই চোট পান। তাও ব্যাট হাতে নেটে নেমে নয়, ট্রেনিংয়ের ফাঁকে ফুটবল খেলতে গিয়ে! হাতের সুযোগ ফসকে যায়। বদলি হিসেবে বেছে নেওয়া হয় ঋদ্ধিমান সাহাকে।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কতটা নিষ্ঠুর, তার হাতেগরম প্রমাণ আবির্ভাবের মঞ্চেই বুঝে যান রোহিত। সম্ভাবনা আর প্রতিশ্রুতি দেখিয়েই তো দলে সুযোগের আহ্বান। অথচ চোটের কারণে বাদ পড়ার পর ফের একবার অধিকারের আসন ফিরে পেতে রোহিতকে অপেক্ষা করতে হয় তিন বছর! ডারউইনের যোগ্যতমের উদ্বর্তন, নিজের জায়গা পাকা করতে প্রাণান্তকর লড়াইয়ে সামিল একঝাঁক তরুণ ক্রিকেটারের ভিড়ে ফের একবার মিশে যান রোহিত।
আবার কেঁচে গণ্ডুষ। নতুন করে নিজেকে প্রমাণের পালা। কিন্তু এপিকের বীরোদ্ধত নায়কের মতো লড়ে যান তিনি। ঘরোয়া ক্রিকেটে বাইশ গজ শাসন করতে থাকেন। দাপটের সঙ্গে। অবশেষে শিকে ছেঁড়ে। তিন বছর বাদে, ২০১৩ সালে। এবার বিপক্ষ টিম ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ঘরের মাঠে খেলা। ওই সিরিজের লাইমলাইট পুরোটাই শুষে নেন আরেক মুম্বইকর—শচিন তেন্ডুলকর। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানাচ্ছেন মাস্টার ব্লাস্টার। আর সেখানেই নতুন তারকা হিসেবে উঠে এলেন রোহিত। নামলেন ছ’নম্বরে। হাঁকালেন দু’দুটো সেঞ্চুরি।
ততদিনে ওয়ান ডে-তে নিজের আঁট আরও মজবুত করেছেন। নামছেন ওপেনে। বিস্ফোরক কায়দায় শুরু করছেন। সেহওয়াগের উত্তরসূরি পেয়ে গেল ভারত?—এই প্রশ্নে যখন সরগরম দেশের ক্রিকেট মহল, তখন টেস্টেও ব্যাটিং অর্ডারে নীচে নামা ওই একই ব্যাটসম্যান স্রেফ ক্ষমতার পরিধি… প্রসারিত ‘রেঞ্জে’র কারণে চর্চায় উঠে আসেন।
কিন্তু দুর্দান্ত অভিষেকের পর আচমকা তলিয়ে যেতে শুরু করেন রোহিত। এতটাই, যে ২০১৩ সাল থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে তাঁর ব্যাট থেকে সাকুল্যে একটি সেঞ্চুরি আসে। ৪৫ ইনিংসে তোলেন মাত্র ১২৯৭ রান। গড় সাদামাটা—৩৩.২৬।
দ্বিতীয় অঙ্ক: উত্থান
প্রথম সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার তিন বছর বাদে লাল বলের ক্রিকেটে অভিষেক হয়। আরও তিন বছর পর টেস্টে ওয়ান ডে-র মতো পছন্দসই ওপেনিং স্লটে ব্যাট হাতে নামার সুযোগ পান রোহিত শর্মা। ২০১৯ সালের অক্টোবর মাসে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে চার ইনিংস মিলিয়ে দুটি সেঞ্চুরি এবং একটি ডবল সেঞ্চুরি করেন।
২০১৯-২৪ সাল পর্যন্ত রোহিতের ব্যাট থেকে এসেছিল ২৫৫২ রান। ৫৪ ইনিংসে ওপেনার রোহিত ৫০-এর উপরের গড়ে রান তোলেন। এই ছ’বছরে একমাত্র দিমুথ করুণারত্নের ব্যাটিং গড় তাঁর চাইতে বেশি ছিল। কেকের উপর টপিং ইংল্যান্ড সিরিজ (২০১১)। ছয় ইনিংসে করেন ৪৯০ রান। গড় প্রায় ৪৫। সর্বোচ্চ ১২৭। ব্যাট হাতে ঝলসে ওঠা রোহিত পান অধিনায়কের বাড়তি দায়িত্ব। সেখানেও সমান উজ্জ্বল। অস্ট্রেলিয়াকে ২০২৪ সালে ঘরের জমিতে ৪-১ ফলাফলে হারানো অধিনায়ক রোহিতের অন্যতম কৃতিত্ব।
তৃতীয় অঙ্ক: পতন
২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পায়ে চোট পান রোহিত। অক্টোবরে হ্যামস্ট্রিং। এর জেরে বর্ডার-গাভাসকার ট্রফির প্রথম দুই টেস্ট থেকে বাদ পড়েন। পরের বছর সেই ডিসেম্বর মাসে ফের একবার আঘাত পান। এই সময়ই হানা দেয় কোভিড। আক্রান্ত রোহিত। জুলাইয়ে ইংল্যান্ড সিরিজে নামতে পারেননি।
তারপরেই ঘনিয়ে আসে স্খলনের মুহূর্ত। নিউজিল্যান্ড সিরিজ। লজ্জার হার। ঐতিহাসিক বিপর্যয়। ৩-০-তে হোয়াইটওয়াশ টিম ইন্ডিয়া। ঘরে-বাইরে সমালোচনা, বিদ্রূপ। কোণঠাসা রোহিত। এমন অভিজ্ঞতা জীবনে প্রথমবার। টাল সামলাতে ব্যর্থ হন। মিডিয়ার প্রশ্নের জবাবে একের পর এক বেফাঁস মন্তব্য শুরু করেন। ‘বারো বছর বাদে এমন ব্যবধানে হারতে হলে তাতে খুব একটা অসুবিধা নেই…’—রোহিতের কেরিয়ারের বিনাশকে আরও ত্বরান্বিত করে। বর্ডার-গাভাসকার বিপর্যয়ে কফিনে পুঁতে দেয় শেষ পেরেক।
নায়কের বিপর্যয়, ট্র্যাজেডির করুণ রস পাঠক, দর্শকের চোখ ভিজিয়ে দেয়। ভেতরের পুঞ্জীভূত বিষাদ যেন হু-হু করে বাইরে বেরিয়ে আসে। নাট্যতাত্ত্বিকরা এর নাম দিয়েছেন ‘ক্যাথারসিস’, বাংলায় বললে ‘মোক্ষণ’। রোহিতের কেরিয়ার-নাট্যের অন্তিম অঙ্ক দেখার পর খামতি দেখানো বা সমালোচনা করার বদলে যেভাবে প্রশংসা, স্তুতি ছড়িয়ে পড়ছে, তা আসলে মোক্ষণেরই নামান্তর। তাতে যুক্তি কম আবেগ বেশি। তর্ক নেই… অনুভূতির সবটুকু নায়কের পতন দেখে বিষাদঘন।