জ্যোতিষশাস্ত্রের প্রতি আগ্রহ কি শুধুই কৌতূহল, নাকি ধীরে ধীরে তা গভীর এক অন্ধবিশ্বাসে বদলে যাচ্ছে?

প্রতীকী ছবি
শেষ আপডেট: 30 July 2025 20:14
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বর্তমানে দেশের যুবসমাজের মধ্যে জ্যোতিষশাস্ত্রের প্রতি আকর্ষণ চোখে পড়ার মতো বাড়ছে। মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা এই প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে একের পর এক জ্যোতিষীর বিজ্ঞাপন ও তাঁদের ফলোয়ার সংখ্যা বেড়ে চলেছে।
চাকরির অনিশ্চয়তা, ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েন কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ - সব মিলিয়ে তরুণ-তরুণীরা যুক্তিবাদকে ছাপিয়ে গ্রহ-নক্ষত্রের দিকে ভরসা খুঁজছে। এই আগ্রহ কি শুধুই কৌতূহল, নাকি গভীর এক অন্ধবিশ্বাসে বদলে যাচ্ছে?
এই প্রবণতা শুধু শহরেই নয়, গ্রাম ও মফস্বলেও সমানভাবে দেখা যাচ্ছে। ব্যক্তিগত জ্যোতিষী থেকে শুরু করে অনলাইন প্রতিষ্ঠানগুলো তরুণদের লক্ষ্য করে নানা রকম প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন, যা কৌতূহলের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বাসকেও প্রভাবিত করছে।
কৌতূহল নাকি অন্ধবিশ্বাস?
কেউ কেউ বলেন, এটি নিছকই কৌতূহল। সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে জ্যোতিষশাস্ত্রকে জানার আগ্রহ থেকেই এই প্রবণতা। এটি অনেক সময় বিনোদন বা মানসিক স্বস্তির মাধ্যম হিসেবেও কাজ করে।
তবে অনেকেই এটিকে একপ্রকার অন্ধবিশ্বাস মনে করছেন। কারণ, তরুণরা যখন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো (যেমন বিয়ে, চাকরি, পড়াশোনা) নিতে জ্যোতিষশাস্ত্রের উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, তখন তা ভাবার বিষয় বটে।
মূল প্রশ্ন হল - কৌতূহল থেকে শুরু হওয়া এই আগ্রহ আদৌ নিরীহ তো? নাকি ধীরে ধীরে এটি অন্ধবিশ্বাসে রূপ নিচ্ছে, যার প্রভাব ব্যক্তি ও সমাজের উপর পড়ছে?
এই আকর্ষণের পেছনে রয়েছে কিছু স্পষ্ট কারণ:
ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা: চাকরির বাজার, উচ্চশিক্ষার প্রতিযোগিতা ও সম্পর্কের অনিশ্চয়তা তরুণদের দুশ্চিন্তায় ফেলে দিচ্ছে। সহজ ও দ্রুত সমাধানের আশায় তারা জ্যোতিষশাস্ত্রের দ্বারস্থ হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাব: ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউবে জ্যোতিষভিত্তিক কনটেন্ট হু হু করে ছড়িয়ে পড়ছে। অলৌকিক শক্তির দাবি করা জ্যোতিষীরা তরুণদের সহজেই প্রভাবিত করছে।
সহজলভ্যতা: মোবাইল অ্যাপ, ওয়েবসাইট - সবই এখন হাতে হাতে। এই অ্যাক্সেসিবিলিটি তরুণদের আরও বেশি করে আকৃষ্ট করছে।
পারিবারিক প্রভাব: বহু পরিবারেই জ্যোতিষশাস্ত্র একটি চলমান বিশ্বাস। ছোটবেলা থেকেই এই পরিবেশে বড় হওয়ায় তরুণরাও স্বাভাবিকভাবে এর প্রতি বিশ্বাসী হয়ে ওঠে।
সমস্যার দ্রুত সমাধান খোঁজা: হতাশ তরুণরা যখন অন্য কোথাও সমাধান খুঁজে পায় না, তখন এই ‘দ্রুত ফলের প্রতিশ্রুতি’ তাদের ভরসার জায়গা হয়ে দাঁড়ায়।
বিশেষজ্ঞদের মতামত:
একজন মনোবিজ্ঞানী জানিয়েছেন, "চাপ বা উদ্বেগে মানুষ এমন কিছু খোঁজে যা মানসিক স্বস্তি দেয়। জ্যোতিষশাস্ত্র অনেকসময় সে ভূমিকা পালন করে। তবে এটি একধরনের সাময়িক স্বস্তি, স্থায়ী সমাধান নয়।"
শিক্ষাবিদদের মতে, শিক্ষা ব্যবস্থায় বিজ্ঞানচিন্তা এবং সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ আরও জোরদার করা প্রয়োজন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পাঠ্যক্রমে বিজ্ঞানমনস্কতা ও যুক্তিবাদী ভাবনার গুরুত্ব বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
বিজ্ঞানীরা এই প্রবণতাকে কড়া ভাষায় সমালোচনা করেছেন। সমাজবিজ্ঞানীরা বলেছেন, এটি মানুষের মাঝে পারস্পরিক বিশ্বাসের অভাব তৈরি করতে পারে এবং সামাজিক বিভেদের কারণ হতে পারে।
এই প্রবণতার কিছু গুরুতর ক্ষতিকর দিক রয়েছে:
আর্থিক শোষণ: অলৌকিক সমাধানের নামে পাথর, আংটি, পুজোআচ্চার পরামর্শ দিয়ে জ্যোতিষীরা মোটা টাকা হাতিয়ে নেন।
মানসিক নির্ভরশীলতা: জীবনের ছোটখাট সিদ্ধান্তেও জ্যোতিষীর মত নেওয়ার প্রবণতা আত্মবিশ্বাস ও চিন্তাশক্তি কমিয়ে দেয়।
ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ: চাকরির সুযোগ ছেড়ে দেওয়া, চিকিৎসার পরিবর্তে পুজোর আশ্রয় নেওয়া ইত্যাদি ভুল সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে বড় ক্ষতি ডেকে আনতে পারে।
যুক্তিবাদী চিন্তার অভাব: সমস্যার মূলে না গিয়ে অলৌকিক সমাধানের উপর নির্ভরশীলতা যুক্তিসংগত চিন্তা ধ্বংস করে।
সামাজিক সমস্যা: রাশি না মেলার কারণে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া কিংবা পারিবারিক দ্বন্দ্ব তৈরি হওয়া, এসব জ্যোতিষনির্ভর আচরণের ফলাফল।
এই প্রবণতা রুখতে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি:
বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা: স্কুল-কলেজে যুক্তিবাদী শিক্ষা, কৌতূহল ও বিশ্লেষণী চিন্তাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
সচেতনতা বৃদ্ধি: গণমাধ্যম, এনজিও, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সব জায়গায় প্রচার চালাতে হবে জ্যোতিষশাস্ত্রের অবৈজ্ঞানিক দিক সম্পর্কে।
পারিবারিক সহায়তা: পরিবারকে যুক্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে হবে।
মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা: উদ্বেগ বা হতাশার সময় তরুণরা যেন উপযুক্ত পরামর্শ ও সহায়তা পায়, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
আইনি পদক্ষেপ: প্রতারক জ্যোতিষীদের বিরুদ্ধে কড়া আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে আর্থিক শোষণ বন্ধ হয়।
এই পদক্ষেপগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে যুবসমাজকে অন্ধবিশ্বাসের বেড়াজাল থেকে মুক্ত করে একটি যুক্তিবাদী, বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ গঠন করা সম্ভব হবে।