গত কয়েকমাস ধরেই ব্যাপারটা হব হব করছিল। শেষ অবধি হয়েই গেল। সোমবার ভোরে মায়ানমারে ব্যারাক থেকে বেরিয়ে এল সেনা। এদিনই বেলার দিকে সংসদের অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা ছিল। তার আগে শাসক ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসি পার্টির নেতারা সবাই বন্দি হলেন। রাস্তাঘাট, রেলপথ, বিমানবন্দর, জাহাজবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ভবনগুলি মিলিটারি দখল করে নিল। বড় বড় শহরে টেলিফোন আর ইন্টারনেট হয়ে গেল স্তব্ধ। আন্তর্জাতিক বিমানের ওঠানামা বন্ধ হয়ে গেল। শেয়ার বাজার আর ব্যাঙ্কের দরজাতেও তালা পড়ে গেল।
ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসি পার্টির প্রতিষ্ঠাতা নোবেলজয়ী আউং সান সু কি-ও বন্দি হয়েছেন। তাঁকে সেনাবাহিনী কোনদিনই পছন্দ করে না। তিনি কয়েকদিন ধরেই আশঙ্কা করছিলেন, অভ্যুত্থান হতে পারে। দেশবাসীর উদ্দেশে আহ্বান জানিয়েছেন, আপনারা সেনাশাসন মেনে নেবেন না। রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করুন। কিন্তু এখনও পর্যন্ত কেউ নেত্রীর ডাকে সাড়া দিয়ে রাস্তায় নেমেছে বলে খবর নেই।
মায়ানমারের মানুষ সেনাশাসনে অভ্যস্ত। সেনাবাহিনীও জানে, কেউ বিদ্রোহ করলে কীভাবে দমন করতে হয়। তাছাড়া সেদেশের সংবিধানেই বলা আছে, দেশে গুরুতর সংকট উপস্থিত হলে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করবে এবং শান্তিশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবে। অর্থাৎ সেনাবাহিনীই মায়ানমারের অভিভাবক।
সেনাকর্তারা বলছেন, ভোটে ব্যাপক জালিয়াতি হয়েছিল। গণতন্ত্র উচ্ছন্নে যাচ্ছিল। তার বিহিত করতেই তাঁরা ক্ষমতা দখল করেছেন।
গত ৮ নভেম্বর মায়ানমারে ভোট হয়। সু কি-র পার্টি ৪৭৬ টি আসনের মধ্যে পায় ৩৯৬ টি। সেনাবাহিনী তখন থেকেই বলছিল, ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসি জোচ্চুরি করে ভোটে জিতেছে। তাই সু কি আশঙ্কা করছিলেন, যে কোনও সময় সেনাবাহিনী ব্যারাক ছেড়ে বেরিয়ে আসবে। তাঁর অভিজ্ঞতা আছে। '৯০ সালেও তিনি ভোটে জিতেছিলেন। সেবারও সেনাবাহিনী তাঁকে ক্ষমতা ভোগ করতে দেয়নি।
আর্মি জেনারেলরা বোঝাতে চাইছেন, গণতন্ত্রের জন্য তাঁদের খুব দরদ। গণতন্ত্র বিপন্ন হচ্ছে দেখে আর ব্যারাকে বসে থাকতে পারেননি। যখনই সেনা অভ্যুত্থান হয়, তখনই সেনাকর্তারা ওইরকম বলেন। ওকথা সত্যি নয়। সত্যি কথাটা হল, তৃতীয় বিশ্বের এইসব ছোট ছোট দেশের সেনানায়করা অত্যন্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষী। ক্ষমতা ও পদমর্যাদার লোভে তাঁরা সবকিছু করতে পারেন।
এখন মায়ানমারের শাসক হলেন সেনাপ্রধান মিন আউং লাং। আন্তর্জাতিক মহলে তাঁর খুব বদনাম আছে। ২০১৭ সালে তিনিই নাকি রোহিঙ্গাদের গণহত্যা ঘটিয়েছিলেন। রাষ্ট্রপুঞ্জ তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত করছে। ঘৃণাসূচক মন্তব্য করার জন্য ফেসবুক তাঁকে ব্যান করে দিয়েছে।
অভ্যুত্থানের পর ভারত সহ নানা দেশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। আমেরিকা বলেছে, মায়ানমারের ওপরে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে। এই হুমকিকেও সেনাশাসক গুরুত্ব দিচ্ছেন না। তাঁর এত সাহস আসছে কোথা থেকে? কারণ, সেনাবাহিনীর পিছনে আছে চিন।
মায়ানমারে চিনাদের যথেষ্ট স্বার্থ আছে। সেদেশে ইতিমধ্যেই পরিকাঠামো, টাউনশিপ, বন্দর ও বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষেত্রে চিনারা হাজার হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে। ভবিষ্যতে আরও করার পরিকল্পনা আছে। এইসব বিনিয়োগে খুব একটা স্বচ্ছতা নেই। চিনের সঙ্গে মায়ানমারের যতগুলো চুক্তি হয়েছে সবই অসম চুক্তি। চিনারা মায়ানমারের প্রাকৃতিক সম্পদ লুঠ করতে চায়।
চিনাদের আরও কুমতলব আছে। তারা চায়, মায়ানমার তাদের থেকে চড়া সুদে ঋণ নিক। সেই অর্থে দেশের উন্নয়ন করুক। এভাবে মায়ানমারকে ঋণের ফাঁসে পাকাপাকিভাবে জড়িয়ে ফেলাই উদ্দেশ্য।
সু কি চিনের বদমায়েশিটা ধরে ফেলেছিলেন। তাঁর আমলে সরকার বেজিং-এর কয়েকটা প্রকল্প বাতিল করে দিয়েছিল। মায়ানমারে পুঁজি বিনিয়োগের নাম করে চিনারা কিছু বেআইনি কাজ করছে কিনা, তা নিয়েও তদন্ত হচ্ছিল। ওই জন্য চিনারা তলে তলে সেনাবাহিনীকে উস্কানি দিয়েছে। লোভী সেনানায়কদের বুঝিয়েছে, আপনারা ক্ষমতা দখল করুন। সারা বিশ্ব কী বলল দেখার দরকার নেই। আমরা তো আপনাদের পিছনে আছি।
মায়ানমারে চিনের প্রভাব যত বাড়বে, ভারতের তত বিপদ। কারণ ভারত-মায়ানমার সীমান্তে উত্তর-পূর্বের বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের ঘাঁটি আছে। ভারত চেষ্টা করছে যাতে মায়ানমারের সরকার তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়। এ বিষয়ে কথা বলার জন্য গত অক্টোবর মাসে সেনাপ্রধান নারাভানে সেদেশে গিয়েছিলেন। এখন সেনাবাহিনী যদি চিনের কথায় চলে, তাহলে জঙ্গি ঘাঁটি ভাঙতে যাবে না। উল্টে জঙ্গিদের মদত দেবে।
ভারত চায়, মায়ানমারের সেনাবাহিনী ব্যারাকে ফিরে যাক। সেদেশে গণতন্ত্র ফিরে আসুক। কিন্তু বাস্তব প্রয়োজনেই এখন মায়ানমারের সেনাবাহিনীর সঙ্গে ভারতকে ভাল সম্পর্ক রাখতে হবে। চেষ্টা করতে হবে চিনারা যেন কিছুতেই সেদেশে ঘাঁটি না বানাতে পারে। কারণ চিনারা যদি একবার মায়ানমারে জাঁকিয়ে বসে, সঙ্গে সঙ্গে হাত বাড়াবে অরুণাচলের দিকে। বহুদিন ধরেই ওই প্রদেশটি নিজেদের বলে দাবি করছে বেজিং।