
ওয়াকফ নিয়ে প্রতিবাদ।
শেষ আপডেট: 13 April 2025 12:45
তিনজন মানুষ মারা গেছেন হিংসার বলি হয়ে। জ্বলেছে দোকানপাট। পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে অ্যাম্বুলেন্স। ঘটনা এমন যে, নিন্দা জানানোর ভাষাও কম পড়ছে। তবে মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে, এ জিনিস তৈরি করা নয় তো (Waqf Act Protest)? কেননা দু-সম্প্রদায়ের মানুষরাই বলেছেন যে, এমন অনেক মানুষজনকে এলাকায় দেখা গেছে যাদের তাঁরা আগে কখনও দেখেননি। এদেরই ইন্ধনে তৈরি হয়েছিল দাঙ্গা পরিস্থিতি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শেষমেশ হাইকোর্টের অর্ডারে নেমেছে কেন্দ্রীয় বাহিনী। অথচ এই হিংসার কোনও প্রয়োজনই ছিল না। ইতিমধ্যেই এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন যে, ওয়াকফ আইন এ রাজ্যে বলবৎ হবে না। যদিও সেটা তিনি সত্যিই করতে পারেন কি না যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয়—- সে এক প্রশ্ন বটে। কিন্তু তবুও বলব, এই হিংসার কোনও প্রয়োজন ছিল না। প্রতিবাদী মুসলিম নাগরিকদের উচিত ছিল শান্তিপূর্ণভাবে ওয়াকফ আইনের প্রতিবাদ করা।
আইনটির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রয়োজন অবশ্যই আছে। তবে একটি কথা মেনে নেওয়া আবশ্যক। গোটা দেশে বহু ওয়াকফ সম্পত্তি বেদখল হয়ে গেছে। বহু ওয়াকফ বোর্ডের হিসেব-নিকেশের স্বচ্ছতা নিয়েই উঠেছে প্রশ্ন। কাজেই আইনটির কিছু পরিবর্তন অবশ্যই প্রয়োজনীয় ছিল। এবং এই প্রথম যে আইনটির পরিবর্তন হল তা নয়। এর আগেও একাধিকবার এই আইনের পরিবর্তন হয়েছে। তবে এবার যে-পরিবর্তনগুলি করা হয়েছে তার অধিকাংশ পরিবর্তনই আপত্তিকর। আইনটি খুঁটিয়ে পড়ে আমার মনে হয়েছে এটি অসংবিধানিক, এবং একইসঙ্গে আমাদের দেশের ধর্মনিরপেক্ষতা ও যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর এক আঘাত। সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতিটিও এই সংশোধনীগুলির মাধ্যমে সূক্ষ্মভাবে করার চেষ্টা হয়েছে।
মূল যে কারণগুলি নিয়ে মুসলিম সম্প্রদায়ের অসন্তুষ্টি, সেই কারণগুলিকে ছোট করে দেখার সত্যিই কোনও যুক্তি নেই। যেমন, ১৯৯৫ সালের আইনে বলা ছিল ওয়াকফ বোর্ড ও কেন্দ্রীয় ওয়াকফ কাউন্সিলের সদস্যরা মুসলিম সম্প্রদায়েরই হবেন। সংশোধনের পর এখন কিন্তু বোর্ড এবং কাউন্সিল দু'জায়গাতেই অন্তত দু'জন অমুসলিম সদস্য থাকবেন। এই পরিবর্তনের সত্যিই কি কোনও প্রয়োজন ছিল? তাই পাল্টা প্রশ্ন উঠছেই যে, বিভিন্ন মন্দির গুলোর যে ট্রাস্টি বোর্ড আছে সেখানে একইভাবে অহিন্দু বা নিম্নবর্ণের হিন্দুদের রাখা হবে তো? রামমন্দিরের ট্রাস্টি বডিতে যদি দু'জন মুসলিম সদস্যকে রাখা হয়, তা কি মেনে নেবেন সনাতনীরা? ১৯৯৫-এর আইনে বলা ছিল বোর্ড এবং কাউন্সিলে অন্তত দু'জন মহিলা সদস্য থাকবেন। নতুন আইন মোতাবেক মাত্র দু'জন মহিলা সদস্যই এখন থাকতে পারবেন বোর্ড এবং কাউন্সিলে। সংশোধনী এনে আগের আইনের 'অন্তত’ শব্দটির বিলুপ্তি ঘটানো হয়েছে। এটিও আপত্তিকর। বিজেপির থেকে একটি ন্যারেটিভ ছড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে যে, এই সংশোধনীগুলির ফলে নাকি মুসলিম মহিলারা উপকৃত হবেন। বোর্ড এবং কাউন্সিলের মহিলাদের প্রতিনিধির সংখ্যা বাড়ানোর বদলে নির্দিষ্ট করে দিয়ে, মুখে যা বলা হচ্ছে তার উলটো পথেই হাঁটা হল নাকি?
সংশোধনী এনে এটিও নিশ্চিত করা হয়েছে যে, সমস্ত ওয়াকফ সম্পত্তিকে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। প্রশ্ন হল, মৌখিক অনুমতির ভিত্তিতে বহু ওয়াকফ তৈরি (Wakf by use) হয়েছে। এই ধরনের ওয়াকফ সম্পত্তির কাগজপত্র কোথায় পাওয়া যাবে? নতুন আইন মোতাবেক এই ধরনের সমস্ত সম্পত্তি সরকার বাজেয়াপ্ত করতে পারবে। এটি কিন্তু একেবারেই উচিত কাজ হবে না।
প্রসঙ্গত বলে রাখা দরকার, পৃথিবীর ইতিহাসে এমন অনেক উদাহরণ আছে যেখানে যে-জমি কিছু মানুষ ব্যবহার করেছেন বছরের পর বছর ধরে কোনও লিখিত কাগজপত্র ছাড়াই তাকে কোর্ট স্বীকৃতি দিয়েছে। যেমন, ৫০ হাজার বছর ধরে অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ সেখানে বসবাস করেছেন কোনও কাগজপত্র ছাড়াই। ১৯৯১ সালে অস্ট্রেলিয়ার কোর্ট কিন্তু এই জমিগুলির ওপর আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষের অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে। এটা মেনে নিতে হবেই যে, একটা সময় জমি হস্তান্তর কাগজপত্র ব্যতিরেকেই সম্পন্ন হত ও মান্যতা পেত।
দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হতে থাকা এই ধরনের ওয়াকফ সম্পত্তিগুলি আজ যদি সরকার কেড়ে নিতে চায় তাহলে তো প্রতিবাদ হবেই। অনেকেই এমন ধারণা পোষণ করছেন যে, জমিগুলিকে আসলে কর্পোরেট মালিকদের হাতে তুলে দেওয়া হবে। এই কাজ কিন্তু ইতিমধ্যেই হয়েছে। কোথাও কোথাও সরকার নিজেই ওয়াকফ সম্পত্তি বিক্রি করেছে বা লিজ দিয়েছে। যেমন, অন্ধ্রপ্রদেশে চন্দ্রবাবু নাইডু এবং ওয়াই এস রেড্ডি সরকার ওয়াকফ সম্পত্তি বিভিন্ন বহুজাতিক সংস্থাকে স্বল্পমূল্যে লিজ দিয়েছে। দিল্লিতে এবং উত্তরাখণ্ডে একই কাজ হয়েছে। কাজেই নতুন সংশোধনীগুলি প্রণয়নের পেছনে রয়েছে কর্পোরেট স্বার্থকে রক্ষা করার সরকারি উদ্দেশ্য–এই কথা যারা বলছেন তাঁদের আশঙ্কাকে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
১৯৯৫ সালের আইনে বলা আছে যে, ওয়াকফ সম্পত্তি সংক্রান্ত কোনও বিতর্ক হলে ওয়াকফ বোর্ড সমীক্ষা করে ঠিক করতে পারবে কোনটা ওয়াকফ সম্পত্তি। নতুন আইন মোতাবেক এক্ষেত্রে ওয়াকফ বোর্ডের কোনও ভূমিকাই থাকবে না। এই ক্ষমতা তুলে দেওয়া হয়েছে জেলাশাসকদের হাতে। এইখানে একটি কথা বলা জরুরি। সারা দেশেই একাধিক ওয়াকফ সম্পত্তি বেদখল হয়ে গিয়ে ব্যক্তি মালিকানায় ভোগ করা হচ্ছে। এই অন্যায় রোখা আবশ্যক। কিন্তু, এই সম্পত্তিগুলি উদ্ধার করার জন্য বোর্ড গঠনের ক্ষমতা যদি সম্পূর্ণভাবে জেলাশাসকের হাতে তুলে দেওয়া হয়, তাহলে দুর্নীতির আর এক দরজা উন্মুক্ত হয়ে যেতে পারে। বরং যেভাবে সংশোধনী এনে ওয়াকফ বোর্ড এবং ওয়াকফ কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের গঠন পরিবর্তন করা হয়েছে, সেইভাবে বিতর্কিত ওয়াকফ সম্পত্তির বিতর্ক মীমাংসার জন্যও কমিটির রূপরেখা ঠিক করে দেওয়া যেত না কি? এই কমিটিতে থাকতে পারেন ওয়াকফ বোর্ডের সদস্য, সর্বমান্য বিশিষ্ট নাগরিক, মুসলিম আইন সম্পর্কে ধারণা থাকা আইনজীবী, এবং জেলাশাসক বা তাঁর প্রতিনিধি। ওয়াকফ সম্পত্তি বিতর্ক নিষ্পণ্ণকারী বোর্ডটির এইরকম গঠন থাকলেই একমাত্র কিছু কিছু ওয়াকফ বোর্ডের দুর্নীতি এবং ভবিষ্যতে জেলাশাসকের একক নিয়ন্ত্রণে হতে পারে এমন সম্ভাব্য দুর্নীতিকে রুখে দেওয়া সম্ভব।
আরও একটি বিষয় নিয়ে সর্বধর্মের মানুষের প্রতিবাদ করা উচিত। সংশোধনী এনে নতুন আইনে বলা হয়েছে পাঁচ বছর ধরে ইসলাম ধর্ম পালন করছেন কেবল এমন ব্যক্তিই ওয়াকফ সম্পত্তি দান করতে পারেন। ১৯৯৫ সালের আইনে কিন্তু বলা ছিল, যে কোনও ব্যক্তি এই দান করতে পারেন। এটা তাঁর সাংবিধানিক অধিকার। নতুন আইন একদিকে যেমন একজন ভারতীয় নাগরিকের এই সাংবিধানিক অধিকারকে খর্ব করছে, তেমনই এমনকি সনাতনী ধর্মেও ‘দান’কে যে মহিমা প্রদান করা হয়েছে তাকে খর্ব করছে। পাঁচ বছর ধরে ধর্ম পালন করা মুসলিমরাই কেবল ওয়াকফ সম্পত্তি দান করতে পারবেন এই আইন এনে হিন্দু এবং মুসলিমের মধ্যে বিভাজন আরও তীব্র করার প্রচেষ্টা রয়েছে এই আইনে। অথচ খোঁজ নিলে দেখা যাবে আমাদের দেশের অনেক মন্দির তৈরি হয়েছে মুসলিম ধর্মের কোনও একজন মানুষের জমি-দানে আর হিন্দুরাও দান করেছেন মসজিদ নির্মাণের জমি। দানকে ধর্মীয় রঙে রাঙিয়ে দিতে চাওয়ার এই প্রচেষ্টাকে কোনওমতেই সমর্থন করা যায় না।
নতুন সংশোধনীগুলি যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিরোধীও। কারণ ওয়াকফ বোর্ডগুলির তদারকি করে রাজ্য সরকার। এই আইন প্রণয়নের আগে কেন্দ্র সরকার রাজ্য সরকারগুলির সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা করেনি। অনেকে বলতে পারেন যে, সাধারণের মতামত চাওয়া হয়েছিল বিল সম্পর্কে। ঠিক। কিন্তু রাজ্য সরকারগুলির মুখ্যমন্ত্রীদের বা তাঁদের প্রতিনিধিদের নিয়ে কোনও বৈঠক করা হয়েছিল কি? এটি অবশ্যই করা উচিত ছিল। কেননা বিলটি আইনে পরিবর্তিত হয়ে যাওয়ার পর যে-প্রতিবাদ এবং হিংসা ছড়িয়ে পড়ছে দেশজুড়ে তাকে প্রাথমিকভাবে সামলাতে হচ্ছে রাজ্য সরকারকেই।
আইনটি প্রণয়নের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে মামলা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের দিকে সকলেই তাকিয়ে আছেন। এই মুহূর্তে প্রতিবাদ চললেও এই আইন নিয়ে কোনও ধরনের হিংসাকে কোনওমতেই সমর্থন করা যায় না। রাজ্য সরকারের উচিত হিংসার সঙ্গে যুক্ত প্রতিটি ব্যক্তিকে দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে চিহ্নিত করে উপযুক্ত শাস্তি প্রদান করা। বিষয়টি স্পর্শকাতর এটি ভেবে নাগরিক সমাজও চুপ করে বসে থাকলে চলবে না। আমাদের রাজ্যের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ইতিহাসটি দীর্ঘ ও গৌরবময়। একই বৃন্তের দু-টি কুসুমের একটিতে পোকা ধরলে, অপরটিও দীর্ঘদিন ভাল থাকবে না।
(লেখক: কবি ও অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়। মতামত লেখকের নিজস্ব।)