
শেষ আপডেট: 1 November 2022 14:29
স্বাধীনতার পর ৭৫ বছর কেটে গেলেও পুরুষতন্ত্রের বাঁধন থেকে মুক্তি পায়নি আমাদের দেশের মেয়েরা। তাই দেশে যৌন অপরাধের সংখ্যা এত বেশি। শুধু তাই নয়, ওই ধরনের প্রতিটি অপরাধের পরে নির্যাতিত মেয়েটিকেই দোষী সাব্যস্ত করার চেষ্টা হয়। সেজন্য এখনও চালু রয়েছে টু ফিঙ্গার টেস্ট (2 Finger Test)। এক্ষেত্রে চিকিৎসকরা পরীক্ষা (Virginity Test) করে দেখেন অতীতে মেয়েটির যৌন অভিজ্ঞতা আছে কিনা। তা যদি থাকে, তাহলে অপরাধের গুরুত্ব কমে যায়। অর্থাৎ ধর্ষকের অপরাধ লঘু করে দেখা হয়। অনেক ক্ষেত্রে সন্দেহ করা হয়, আদৌ ধর্ষণ হয়েছিল কি? মেয়েটি স্বেচ্ছায় পুরুষটিকে শরীর দেয়নি তো?
এই মনোভাবের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সর্বোচ্চ আদালত (Supreme Court)। গত সোমবার সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড় ও বিচারপতি হিমা কোহলির বেঞ্চ রায় দেয়, টু ফিঙ্গার টেস্ট কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে। মেডিক্যাল কলেজের সিলেবাসেও যেন বিষয়টি না থাকে।

বছর দশেক আগে ফৌজদারি আইন সংশোধন করে টু ফিঙ্গার টেস্ট নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু আইন সংশোধন করে পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব বদলানো যায় না। তাই দেশের নানা প্রান্তে টু ফিঙ্গার টেস্ট চালু ছিল। ঝাড়খণ্ডে একটি ধর্ষণ ও খুনের মামলার প্রেক্ষিতে এই বিষয়টির দিকে সুপ্রিম কোর্টের দৃষ্টি আকর্ষিত হয়। নির্যাতিতার বয়স ছিল ১৬ বছর। ধর্ষণের পরে তার গায়ে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। হাসপাতালের বেডে সে যখন মৃত্যুযন্ত্রণায় ছটফট করছে, তখন চিকিৎসক তার টু ফিঙ্গার টেস্ট করেন। অভিযুক্ত নিম্ন আদালতে দোষী সাব্যস্ত হলেও হাইকোর্টে মুক্তি পেয়েছিল। সুপ্রিম কোর্ট নিম্ন আদালতের রায় বহাল রেখেছে। বিচারপতিরা মন্তব্য করেছেন, টু ফিঙ্গার টেস্ট ধর্ষিতার ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার ক্ষুণ্ণ করে। ধর্ষণের মামলায় অভিযোগকারিণীর বয়ানকে যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে। অতীতে যদি তাঁর যৌন অভিজ্ঞতা থাকে, তাতে কিছু যায় আসে না।
পুরুষতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য হল সবসময় মেয়েদের সন্দেহ করা। সেজন্য টু ফিঙ্গার টেস্টের পাশপাশি আমাদের দেশের অনেক জায়গায় কুমারীত্ব পরীক্ষাও চালু আছে। পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব অনুযায়ী, কেবল অক্ষতযোনী কুমারীই বিবাহের উপযুক্ত। সুতরাং বিবাহের সময় মেয়েটিকে পরীক্ষা দিতে হয়, অতীতে তার যৌন অভিজ্ঞতা হয়নি। কুমারীত্বের পরীক্ষা নেওয়ার জন্য নানা পন্থা আছে।
গত সেপ্টেম্বর মাসে রাজস্থানের ভিলওয়ারাতে ২৪ বছর বয়সি এক কনের কুমারীত্ব পরীক্ষা হয়। তাতে দেখা যায়, বিয়ের আগে তার যৌন অভিজ্ঞতা হয়েছে। আসলে সে বিয়ের আগে ধর্ষিত হয়েছিল। মেয়ের বাড়ি থেকে সে কথা গোপন করা হয়নি। কিন্তু কুমারীত্ব পরীক্ষায় 'ব্যর্থ' হওয়ার পরে শ্বশুরবাড়ি থেকে তাকে মারধর করা হয়। এরপরে বসে খাপ পঞ্চায়েত। 'নষ্ট মেয়ের' বিয়ে দেওয়ার অপরাধে তার পরিবারকে ১০ লক্ষ টাকা জরিমানা করা হয়।
এবার কুমারীত্ব পরীক্ষা নিয়েও সুপ্রিম কোর্টের কড়া হওয়া উচিত। যদি কোথাও ওই ধরনের পরীক্ষার কথা জানা যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট সকলকে কড়া শাস্তি দিতে হবে। তার চেয়েও বড় কথা সমাজের পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার পরিবর্তন হওয়া দরকার। না হলে আদালত বা প্রশাসন পুরোপুরি সফল হবে না। তাই সমাজের সর্বস্তরে চাই পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার বিরুদ্ধে প্রচার।