
শেষ আপডেট: 28 March 2023 17:29
আমরা এতদিন জানতাম রাজ্যের প্রত্যন্ত অঞ্চলে, যেখানে শিক্ষার আলো পৌঁছয়নি, সেখানে ভুত-প্রেত-পিশাচসিদ্ধরা রাজত্ব করে। কদাচিৎ সেখান থেকে নরবলির সংবাদও পাওয়া যায়। কিন্তু খোদ কলকাতা শহরে শিশুবলি হতে পারে কেউ ভাবেনি। বোঝা যাচ্ছে, আমাদের সমাজে গুরুতর কিছু সমস্যা রয়ে গিয়েছে এই একবিংশ শতাব্দীতেও। সেই সুযোগে মাথা তুলছে অন্ধবিশ্বাস (Superstition) ও নৃশংসতা।

গত রবিবার সকালে তিলজলা থেকে এক শিশুকন্যা নিখোঁজ হয়ে যায়। তার বাড়ির লোক থানায় ডায়েরি করে। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, শিশুটিকে কুকুর তাড়া করেছিল। সে তখন দৌড়ে একটি গলিতে ঢুকে যায়। গলির মধ্যে একটি ফ্ল্যাটে পুলিশ তল্লাশি করে। তখন তাকে পাওয়া যায়নি। রাত ১০ টা নাগাদ ফের তল্লাশি করা হয়। সেই সময় একতলার ফ্ল্যাটে গ্যাস সিলিন্ডারের পিছন থেকে তার বস্তাবন্দি দেহ উদ্ধার হয়। পরে অলোক কুমার নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
২০১৪ সাল থেকে তিলজলার ওই ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকতেন অলোক। ২০২০ সালে তাঁর বিবাহ হয়। তাঁর স্ত্রী একাধিকবার অন্তঃসত্ত্বা হয়েছিলেন। কিন্তু প্রতিবারই গর্ভস্থ সন্তান নষ্ট হয়ে যায়। তখন অলোক তান্ত্রিকের শরণাপন্ন হন। তান্ত্রিক তাঁকে বলে, নবরাত্রির আগে একটি নাবালিকাকে বলি দিতে হবে। তাহলে তাঁর স্ত্রী সুস্থ সন্তান প্রসব করবেন। তান্ত্রিকের কথায় বিশ্বাস করে অলোক নরবলি দেওয়ার সুযোগ খুঁজতে থাকেন।
রবিবার সকালে ওই শিশুকন্যা কুকুরের তাড়া খেয়ে অলোকের ফ্ল্যাটের কাছে চলে এসেছিল। সেই সুযোগে অলোক তাকে ধরে নিয়ে যান। বাড়িতে তাঁর স্ত্রী ছিলেন না। অলোক ভারী কোনও বস্তু দিয়ে শিশুটির মাথায় আঘাত করেন। পরে গলায় দড়ির ফাঁস দিয়ে তাকে হত্যা করেন। মৃত্যুর আগে শিশুটিকে যৌন নির্যাতনের সম্ভাবনাও পুলিশ উড়িয়ে দিচ্ছে না।
সোমবার ঘটনার কথা জানাজানি হতে তিলজলা অঞ্চলে বিরাট অশান্তি সৃষ্টি হয়। অবরোধ, পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ইত্যাদি চলতে থাকে। পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ফাটায়। শেষে র্যাফ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
এর আগে ২০১০ সালের এপ্রিলে বীরভূমে নরবলি হয়েছিল। সেবার বোলপুর থেকে ছয় কিলোমিটার দূরে এক কালীমন্দিরের বাইরে ৩৫ বছর বয়স্ক এক ব্যক্তির মুণ্ডহীন পাওয়া যায়। তাঁর মুণ্ডটি দেহ থেকে কিছু দূরে পড়েছিল। ভোরে মন্দিরের পূজারি প্রথমে দেহটি দেখতে পান। পরে পুলিশের স্নিফার ডগ নিকটবর্তী দোনাইপুর গ্রামের এক বাসিন্দাকে খুঁজে বার করে। নরবলির অভিযোগে তিনি গ্রেফতার হন।
২০১৭ সালে পুরুলিয়ার বরাবাজার অঞ্চলে এক ব্যক্তিকে বলি দেওয়া হয়েছিল। ২০১৯ সালে পশ্চিম মেদিনীপুরে একটি সাত বছরের শিশুকে বলি দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে অভিযুক্ত ছিল এক কিশোর। তার ধারণা হয়েছিল, নরবলি দিলে সে অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী হবে।
এর আগে কোনও বড় শহরে নরবলির খবর পাওয়া যায়নি। কিন্তু অন্ধ বিশ্বাসের কারণে আত্মহত্যার কথা শোনা গিয়েছে। ২০১৮ সালে খোদ রাজধানী দিল্লির বুরারি অঞ্চলে একই পরিবারের ১১ জন আত্মহত্যা করে। তাদের ধারণা হয়েছিল, এক মৃত পূর্বপুরুষ গলায় দড়ি দিতে নির্দেশ দিয়েছেন।
মানুষ যখন অন্ধবিশ্বাসের কবলে পড়ে তখন তার বোধবুদ্ধি লোপ পায়। সে নিজের বা অপরের প্রাণ নিতে দ্বিধা করে না। কিন্তু কীভাবে মানুষ অন্ধবিশ্বাসের কবলে পড়ে? মানুষ যখন লৌকিক উপায়ে জীবনের সমস্যা সমাধানের পথ খুঁজে পায় না, তখনই অলৌকিকে বিশ্বাসী হয়ে ওঠে।
আমাদের সমাজে সাধারণ মানুষ হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা পায় না, সরকারি দপ্তরে গিয়ে হয়রানির শিকার হয়, পুলিশও তার অভিযোগ শোনে না। এই অবস্থায় সে নানা দেবতা ও অপদেবতার শরণাপন্ন হয়। অর্থাৎ কুসংস্কারের একটা বড় কারণ হল অসহায়তা। সেজন্যই বহু বিজ্ঞানের ছাত্র, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী ব্যক্তির মনেও কুসংস্কার বাসা বেঁধে থাকে।
যারা কুসংস্কারের সুযোগে ফয়দা তোলে, মানুষকে নরবলি দেওয়ার পরামর্শ দেয়, তাদের অবশ্যই কঠোর শাস্তি দিতে হবে। একইসঙ্গে মানুষের অসহায়তা দূর করার জন্যও উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। নইলে এই ধরনের নৃশংস ঘটনা ঘটতেই থাকবে।