
শেষ আপডেট: 31 August 2020 16:17
গত সন্ধ্যায় শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান হয়েছে। পরের দিন সকালে মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকও হয়ে গিয়েছে। কিন্তু কার কী মন্ত্রক ঘোষণা হয়নি তখনও। দুপুরে তাঁর হোম অফিসে বসে রয়েছেন প্রণব মুখোপাধ্যায়। এমন সময়ে হঠাৎ চন্দ্রশেখর রাওয়ের ফোন। অধুনা তেলঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী তিনি। এপার থেকে প্রণব বললেন, “কনগ্র্যাচুলেশনস চন্দ্রশেখর জি। ইউ হ্যাভ অ্যাটেন্ডেড দ্য ফার্স্ট মিটিং অব দ্য ক্যাবিনেট!” তার পরে এ কথা সে কথার পর চন্দ্রশেখর যে বিষয়টা তুললেন সে ব্যাপারে একটা রিপোর্ট আগেই এনে রেখেছেন প্রণব। বললেন, “ওকে ওকে, আই উইল ডিসকাস দ্য সেপারেট স্টেট ইস্যু উইথ ইউ ইন দ্য কামিং উইক।”
২০০৪ সাল। লোকসভা ভোটের পর বড় চমক দিয়েছিলেন সনিয়া গান্ধী। ‘অন্তরাত্মার ডাকে’ সাড়া দিয়ে প্রধানমন্ত্রী পদের দাবি থেকে সরে এসেছিলেন কংগ্রেস সভানেত্রী। দেশের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদের জন্য বেছে নিয়েছিলেন মনমোহন সিংহকে। সেই মনমোহন, দু’দশক আগে ইন্দিরা গান্ধী জমানায় অর্থমন্ত্রী থাকাকালীন যাঁকে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর করেছিলেন প্রণব। ফলে সনিয়ার এই সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া তাঁর পক্ষে খুব সহজ ছিল না। কিন্তু অতিশয় মর্যাদার সঙ্গেই তা মেনে নিয়েছিলেন তিনি। মনমোহনকে বরাবর ‘ডাক্তার সাব’ বলতেন প্রণব। বোধকরি তাঁর ধারণা ছিল মনমোহনকে প্রধানমন্ত্রী করলেও তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর দায়িত্ব পাবেন। এমনিতেই বাজপেয়ী জমানায় সংসদীয় হোম স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন প্রণব। মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকের পর সে সবেরই ফাইল ঘাঁটছিলেন। তেলঙ্গানা পৃথক রাজ্যের বিষয়টিও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের আওতায় পড়ে।
কিন্তু সন্ধেয় যখন পোর্টফোলিও ঘোষণা হল, দেখা গেল প্রতিরক্ষা মন্ত্রী করা হয়েছে প্রণবকে। অথচ মজার ব্যাপার হল, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পদে যাঁকে বেছে নিয়েছিলেন মনমোহন (পড়ুন সনিয়া), সেই শিবরাজ পাটিল সে বার লোকসভা ভোটেই জেতেননি। তখন রাজ্যসভারও সদস্য নন শিবরাজ। তবে হ্যাঁ, তাঁর অন্য যোগ্যতাও ছিল। দশ নম্বর জনপথের আজ্ঞাবহ সৈনিক হিসেবে পরিচিতি ছিল তাঁর। সে দিনও বাইরে হতাশা প্রকাশ করতে দেখা যায়নি প্রণবকে। তবে দেওয়াল লিখন নিশ্চয়ই আরও ভাল করে পড়ে ফেলেছিলেন কীর্ণাহারের এই ব্রাহ্মণ সন্তান। রাজীব গান্ধী জমানা থেকে দশ নম্বর জনপথের সঙ্গে আস্থার সম্পর্কের যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে তা বুঝি আর মেটার নয়। তিনি মধ্যরাত পর্যন্ত জেগে জোট সরকারের অভিন্ন কর্মসূচি তৈরি করবেন, জটিল থেকে জটিলতর বিষয়ের নিষ্পত্তির জন্য শ’খানেক মন্ত্রিগোষ্ঠীর নেতৃত্ব দেবেন, শরিকদের মান অভিমান সামলাবেন, লোকসভায় তথা সংসদের অধিবেশন মসৃণ ভাবে চালানোর চেষ্টা করবেন— কিন্তু এক নম্বর হতে পারবেন না।
প্রণব হয়তো সরকারের এক নম্বর হয়ে উঠতে পারেননি, কিন্তু সর্বভারতীয় রাজনীতি এবং কংগ্রেসের রাজনীতিতে অনন্যই থেকে গিয়েছেন। অতি ব্যবহৃত শব্দবন্ধ হলেও নিঃসন্দেহে বলা যায়, তাঁর মৃত্যুর পর ভারতীয় রাজনীতিতে একটি যুগের অবসান হল। প্রণবের ঘরানার রাজনীতি সর্বভারতীয় স্তরে আবার ফিরে আসবে কিনা সন্দেহ। সংঘাত, প্রতিহিংসা, ঘৃণায় ভরা রাজনীতিতে প্রণব ছিলেন চরম বৈপরীত্য। বরাবর বলতেন, রাজনীতিতে আমরা পরস্পরের প্রতিপক্ষ। শত্রু নই। মতাদর্শের ফারাক থাকলেও ব্যক্তিগত পরিসরে বন্ধু সম্পর্ক থাকাটাই বাঞ্ছনীয়। তাই সংঘাতের পরিবর্তে আলোচনাই পথ হতে পারে।
কংগ্রেসের মধ্যে যেমন কখনও গোষ্ঠী রাজনীতি করেননি প্রণব, তেমনই সর্বভারতীয় রাজনীতিতেও তাঁর বন্ধুর অন্ত ছিল না। শাসক জোটের শরিক দলে তো বটেই, তাঁর বিরোধী জোটেও তাঁর বন্ধু ছিল। অটলবিহারী বাজপেয়ীর সঙ্গেও প্রায় পারিবারিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল প্রণবের। দীর্ঘ কয়েক বছর এক সঙ্গে মর্নিংওয়াক করতেন দুজনে। তার পর কোনও দিন বাজপেয়ীর বাড়িতে চা খেতে যেতেন প্রণব। কোনও দিন বাজপেয়ী আসতেন তাঁর বাড়িতে। প্রণব অকাতরেই বলতেন, তাঁর দেখা সেরা সাংসদদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বাজপেয়ী। লুটিয়েন দিল্লির রাজনীতিতে তাঁকে বলা হত, দ্য ম্যান অব কোয়ালিশন। ২০০৪ সালে মাত্র ১৪৫ টি আসনে জিতেছিল কংগ্রেস। কিন্তু তা নিয়েও কংগ্রেস যে পাঁচ বছর স্থায়ী সরকার দিতে পেরেছিল তাঁর অন্যতম কৃতিত্ব ছিল প্রণবেরই।
প্রণবের এই খাপ খাইয়ে নেওয়ার মানসিকতার জন্যই হয়তো প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গেও কখনওই বিরোধ হয়নি তাঁর। মনে পড়ে প্রধানমন্ত্রী পদে শপথ নেওয়ার পর পরই রাষ্ট্রপতি ভবনে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদী। সেদিন দুজনের আলোচনা হয়েছিল খুবই ঘরোয়া পরিবেশে। প্রণববাবুর কাছেই শোনা, প্রধানমন্ত্রী তাঁকে বলেছিলেন, “দাদা কোনও ভুল ত্রুটি হলে কান ধরে ডেকে আনবেন, আমি চলে আসব। যখনই কোনও নতুন ডেভেলপমেন্ট হবে আমার মন্ত্রী অফিসাররা আপনার সঙ্গে দেখা করে আপডেট করবেন। আপনার পরামর্শ নেবেন।”
প্রধানমন্ত্রীর এই বিনয়ে খুবই খুশি হয়েছিলেন প্রণব। সেই সঙ্গে বলেছিলেন, "সাংবিধানিক প্রক্রিয়া মেনে চললে আমার সঙ্গে আপনার কখনওই সংঘাত হবে না। তা না হলে কিন্তু আমি প্রশ্ন করব।" প্রণববাবুর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সংঘাত কখনওই হয়নি। বরং ঘরোয়া আলোচনায় ব্যক্তি মোদীর প্রশংসাই করতেন তিনি। বলতেন, ও খুবই পরিশ্রমী। তা ছাড়া প্রধানমন্ত্রীও কথা রেখেছিলেন, অরুণ জেটলি, নির্মলা সীতারামন, রবিশঙ্কর প্রসাদরা প্রায়ই প্রণবের সঙ্গে দেখা করে বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর পরামর্শ নিতেন। মোদী নিজেও যেতেন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে। গত দিওয়ালিতেও প্রণবের বাসভবনে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দীর্ঘ আড্ডা দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রণববাবুর মৃত্যুতে কংগ্রেস রাজনীতিতেও এক প্রজন্মের শেষ হল। তিনিই বুঝি শেষ ব্যক্তি যিনি ১৮৮৫ সাল থেকে কংগ্রেসের ইতিহাস জানতেন। প্রতিটি ঘটনা তাঁর ঠোঁটস্থ ছিল। কংগ্রেসের ইতিহাস ও দর্শন ভাল করে জানতেন বলেই দলের কোনও অধিবেশনে বা ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকের বিবৃতি বা প্রস্তাবের খসড়া রচনার দায়িত্ব থাকত তাঁরই উপরে। দেশের সংবিধান যেমন ছিল তাঁর গুলে খাওয়া, তেমনই কংগ্রেসের সংবিধানও গুলে খাওয়া ছিল তাঁর। কংগ্রেসের সংবিধানের ধারা খুঁজে বের করেই এক সময়ে নরসিংহ রাওকে সরিয়ে সীতরাম কেশরীকে কংগ্রেসের সভাপতি পদে বসানোয় অনন্য ভূমিকা নিয়েছিলেন তিনি। বিনা নির্বাচনেই কংগ্রেসের সভাপতি হয়েছিলেন কেশরী। আবার কেশরীকে সরিয়ে সনিয়া গান্ধীকে কংগ্রেস সভানেত্রী পদে বসানোর সময়ে দলীয় সংবিধানেরই ধারা উল্লেখ করেছিলেন প্রণব।
কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও ইউপিএ সরকারে অপরিহার্য ছিলেন প্রণববাবু। এবং তিনি বুঝতেন তাঁর এই অপরিহার্যতাই তাঁর পথে অন্তরায়। সরকারের এক নম্বর হয়ে ওঠার আশা ইউপিএ সরকারের পত্তনের সময়েই ছেড়ে দিয়েছিলেন প্রণব। বরং ২০০৭ সালেই রাজনীতি থেকে সরে রাইসিনার পথে পা বাড়ানোর আগ্রহ ছিল তাঁর। প্রণববাবুর সেই ইচ্ছা সম্পর্কে হাতেগোনা কয়েক জনই হয়তো অবগত ছিলেন। বাইরে তা কখনওই প্রকাশ করেননি।
কিন্তু রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী বাছাই নিয়ে ইউপিএ-র শরিক ও সমর্থকদের সঙ্গে যখন সনিয়া আলোচনা শুরু করেন, তখন বামেরা আগবাড়িয়ে সনিয়াকে প্রস্তাব দেন, প্রণবকে প্রার্থী করা হোক। সনিয়া তখনই তাঁদের বলেন, "না না, প্রণবকে আমি পার্লামেন্ট আর সরকার থেকে এখনই ছাড়তে পারব না।" তার দু’দিন পর হঠাৎ এক সন্ধ্যায় দশ জনপথ থেকে ফোন আসে প্রণবের কাছে। তাঁকে ডেকে পাঠান সনিয়া। তার পর বলেন, রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসাবে আপনার থেকে ভাল প্রার্থী আর কেউ নেই। কিন্তু আপনিই বলুন, সরকার থেকে চলে গেলে আপনার বিকল্প কে হবে। সনিয়ার গুগলি বুঝতে পারেন প্রণব। হো হো করে হেসে ওঠেন তিনি। হেসে ওঠেন সনিয়াও। কদিন পরে প্রণববাবুই একদিন ঘরোয়া আলোচনায় মজা করে বলেছিলেন, "ভেবেছিলাম কদিন বড় বাড়িতে গিয়ে আরাম করব। নাহ, এ যাত্রায় আর হল না।"
পাঁচ বছর পর সেই প্রণবই কংগ্রেস তথা ইউপিএ জোটের রাষ্ট্রপতি পদ প্রার্থী হয়েছিলেন। তাৎপর্যপূর্ণ, সরকার ও দলে তাঁর অপরিহার্যতা তখন আর অন্তরায় হয়ে ওঠেনি। কারণ, রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসাবে প্রণবকে প্রার্থী করাই তখন অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল। নইলে শাসক জোটের প্রার্থীকে জেতানো সে যাত্রায় সহজ ছিল না। কেন না ততদিনে ইউপিএ সরকার বিপন্ন হতে শুরু করেছে। শরিকদের অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। টুজি স্পেকট্রাম থেকে শুরু করে কমনওয়েলথ গেমস, আদর্শ, দুর্নীতির অভিযোগে জেরবার শাসক দল। ফলে সর্বভারতীয় রাজনীতিতে কংগ্রেস বিরোধিতার ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়ে গিয়েছে।
ব্যক্তি প্রণবের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা, সকলের সঙ্গে সুসম্পর্কের কারণেই সে বার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জেতা সহজ হয়েছিল। সব রাজনৈতিক দলের নেতার সঙ্গে ব্যক্তিগত ভাবে কথা বলে সমর্থন চেয়েছিলেন প্রণব। সেই প্রথম কংগ্রেসের প্রার্থীকে সমর্থনের জন্য সায় দিয়েছিল শিবসেনা। একমাত্র মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ফোন করে কখনও সমর্থন চাননি প্রণব। বরং তৃণমূলের আচরণে তখন কিছুটা বিরক্তই ছিলেন তিনি। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ের ব্যাপারে সনিয়া গান্ধী যখন সব শরিক দলের সঙ্গে আলোচনা করছেন, তখন মমতাকেও ডাকা হয়েছিল। প্রণবকে প্রার্থী করার ব্যাপারে আপত্তি করেছিলেন মমতা। তাতে মর্মাহতই হয়েছিলেন প্রণব।
কিন্তু পরে দেখা যায়, তৃণমূলের সাংসদদের কেউ কেউ প্রণবের সঙ্গে আলাদা করে দেখা করতে আসছেন তাঁর গ্রেটার কৈলাসের বাড়িতে। কেউ বা ফোন করে ক্রসভোটের কথা জানাচ্ছেন। এই অবস্থায় অনেকে তাঁকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, তিনি যেন একবার মমতার সঙ্গে ফোনে কথা বলে সমর্থন চান। কিন্তু প্রণববাবু তাতে রাজি হননি। শেষ পর্যন্ত মমতাই প্রণববাবুর তালকাটোরার বাড়িতে গিয়ে তাঁকে সমর্থন করার অঙ্গীকার করে এসেছিলেন। এ প্রসঙ্গে বলে রাখা ভাল, ১৯৮৪ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে লোকসভা ভোটে প্রথমবার প্রার্থী করেছিলেন প্রণববাবুই।
গ্রামের স্কুলে পড়াশোনা প্রণববাবুর। বাবা কামদাকিঙ্কর মুখোপাধ্যায় ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী, কংগ্রেসের রাজনীতিক। পড়াশুনায় প্রণব যে খুবই মেধাবী ছিলেন তা নয়। কিন্তু তাঁর জানার আগ্রহ ছিল অপরিসীম। বিশেষ করে রাজনীতির বিষয়আশয় ও রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে অপার আগ্রহ ছিল তাঁর। জহুরির চোখের মতো তাঁকে চিনে নিয়েছিলেন অজয় মুখোপাধ্যায়। ১৯৬০ সালে কংগ্রেস ভেঙে বাংলা কংগ্রেস তৈরি করেছিলেন অজয়বাবু। বাংলা কংগ্রেসের সংবিধান রচনা থেকে শুরু সরকারের বহু বিষয় নিয়ে প্রণবের উপর ভরসা করেছিলেন তিনি। বাংলা কংগ্রেস দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। কিন্তু প্রণবের হাতেখড়ি হয়ে গেছিল। তার পর ফের কংগ্রেসেই ফিরে এসেছিলেন প্রণব।
১৯৬৯ সালে প্রথমবার রাজ্যসভায় নির্বাচিত হন প্রণব মুখোপাধ্যায়। তার পর ব্যাঙ্ক জাতীয়করণ নিয়ে রাজ্যসভায় বক্তৃতার সময়ে নজরে পড়েন ইন্দিরা গান্ধীর। সেই শুরু। তার পর থেকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি প্রণবকে। প্রথমে ইন্দিরা মন্ত্রিসভার ডেপুটি মিনিস্টার হয়েছিলেন তিনি। তার কিছু দিন পরই তাঁকে প্রতি মন্ত্রী করেন ইন্দিরা। তাতে যারপরনাই উজ্জীবিত ছিলেন তিনি। কিন্তু মনে তখনও অশান্তি ছিল যে লোকসভা থেকে তিনি নির্বাচিত হননি। তাই ১৯৮০ সালের লোকসভা ভোটে বীরভূমের বোলপুর আসন থেকে প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন প্রণব। ইন্দিরা গান্ধীর তাতে সায় ছিল না। তিনি আপত্তিই করেছিলেন। কিন্তু প্রণব শোনেননি। ভোটে তাঁর ভরাডুবি হয়েছিল।
ইন্দিরা বুঝেছিলেন, এতে মানসিক ভাবে ভেঙে পড়বেন প্রণব। তাই ছেলে সঞ্জয়কে এয়ারপোর্টে পাঠিয়েছিলেন প্রণবকে রিসিভ করে আনার জন্য। বলে দিয়েছিলেন, ওকে সোজা তাঁর কাছে নিয়ে যেতে। প্রণববাবুর কাছেই শোনা, সেদিন ইন্দিরা গান্ধীর কাছে খুব বকুনি খেতে হয়েছিল তাঁকে। ইন্দিরা তাঁকে বলেছিলেন, "তুমি মন্ত্রী হিসেবে ভাল হতে পারো। কিন্তু মানুষের না়ড়ির গতি বোঝো না। যাও বাড়ি গিয়ে ক্যাবিনেট সেক্রেটারির ফোনের অপেক্ষা করো।" ভোটে না জিতলেও তাঁকে মন্ত্রিসভার সদস্য করেছিলেন ইন্দিরা।
ইন্দিরা গান্ধীর স্নেহের কথা বলতে গেলে উজ্জ্বল হয়ে উঠত প্রণবের চোখ। তাঁর কাছেই শোনা, প্রণবকে আনন্দময়ী মা-র একটি কবচ দিয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। বলেছিলেন, সেটা সব সময়ে গলায় পরে থাকতে। তাই করতেন প্রণব। ইন্দিরার এই স্নেহ ও ভরসার প্রতিদানও দিয়েছিলেন কীর্ণাহারের ভূমিপুত্র। এমার্জেন্সির পর ইন্দিরা গান্ধীর অতি কাছে মানুষরাও যখন দূরে সরে যাচ্ছে, তখন শাহ কমিশনে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় নেত্রীর পক্ষেই দাঁড়িয়েছিলেন প্রণব। আশি সালে ক্ষমতায় আসার পর প্রণবকে ক্যাবিনেট মন্ত্রী করেছিলেন ইন্দিরা। দু’বছর বাদে তাঁকে অর্থমন্ত্রী পদের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। ইন্দিরার যাবতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে তিনি ছিলেন অংশীদার। প্রণববাবুর কাছেই শোনা, তাঁর সঙ্গে আলোচনার পর বহু বিষয়ে মত বদলও করতেন ইন্দিরা গান্ধী। ক্যাবিনেটের অলিখিত নম্বর টু হয়ে উঠেছিলেন তিনি।
ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর পরে তাই হতে পারে প্রণবের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার কোনও প্রকাশ ঘটেছিল। তা অস্বাভাবিকও ছিল না। ইন্দিরা জমানায় মন্ত্রিসভার দ্বিতীয় ক্ষমতাবান ব্যক্তি ছিলেন তিনি। কিন্তু রাজীবের তা পছন্দ হয়নি। তা ছাড়া অরুণ সিংহ, অরুণ নেহেরুরা প্রণব সম্পর্কে রাজীবের কান ভাঙাতে শুরু করেন। ফলে তখন থেকেই দূরত্ব বাড়া শুরু হয়। প্রণবকে দল থেকে বহিষ্কারও করেছিলেন রাজীব। পরে ৮৯ সালে সন্তোষমোহন দেবের উদ্যোগে রাজীব তাঁকে কংগ্রেসে ফিরিয়ে নেন।
ইন্দিরা গান্ধীর ছায়াসঙ্গী হয়ে ওঠার সময় থেকে সনিয়াকে ভাল করেই চিনতেন প্রণব। তবে সে রকম কথা হত না। পরবর্তী কালে সনিয়া গান্ধীর সঙ্গে তাঁর নতুন করে সুসম্পর্কের সূত্রপাত কংগ্রেসের পাঁচমারি অধিবেশনের সময় থেকে। সে সময়ে দলের ওয়ার্কিং কমিটির এক সদস্য সনিয়াকে বলেছিলেন, অধিবেশনে রাজনৈতিক প্রস্তাব লেখার জন্য যোগ্য ব্যক্তি একজনই। কিন্তু তাঁকে হয়তো আপনি পছন্দ করেন না। শুনে সনিয়া বলেছিলেন, "এটা কেমন কথা! ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দের বিষয় এটা নয়। যিনি ভাল লিখবেন, তাঁকেই সুযোগ দেওয়া উচিত।" প্রণবের নাম প্রস্তাব করার পর সনিয়া এককথায় রাজি হয়ে যান।
বলাবাহুল্য দশ নম্বর জনপথের আস্থার পাত্র হয়ে উঠতে কংগ্রেস নেতাদের যে সব গুণ প্রয়োজন তা হয়তো প্রণবের ছিল না। প্রণব বলতেন, "ইন্দিরা গান্ধীর সামনেও আমি কখনও মাথা নিচু করে দাঁড়াইনি। কারণ, আমরা প্রত্যেকেই কংগ্রেসের কর্মী। তাই প্রত্যেকে এখানে সতীর্থ।"
ইউপিএ জমানায় সনিয়া গান্ধীর সঙ্গেও অদ্ভূত ভাল বোঝাপড়া তৈরি হয়ে গিয়েছিল প্রণবের। সনিয়ার স্বার্থ রক্ষায় তিনি বরাবর তাঁর পাশে ছিলেন। সনিয়াও প্রণববাবুর খেয়াল রাখতেন। কংগ্রেসের বৈঠকে প্রণববাবু রেগে গেলে তাঁকে শান্ত হতে বলতেন। শরীরের যত্ন নেওয়ার কথা বলতেন। প্রণববাবু রাষ্ট্রপতি হওয়ার পরেও সনিয়া গান্ধীর সঙ্গে সেই বোঝাপড়া অক্ষুন্ন ছিল। আকছার ফোন করে প্রণবের স্বাস্থ্যের খোঁজ নিতে সনিয়া। মাঝে মধ্যেই প্রণববাবুর আমন্ত্রণে রাষ্ট্রপতি ভবনে তাঁর পরিবারের সঙ্গে নৈশভোজে যেতেন। এতো সুন্দর বোঝাপড়ার মাঝেও কোথাও যেন একটা কিন্তু থেকেই গিয়েছিল। বীরভূমের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে এসে দেশের প্রথম নাগরিক হয়ে উঠেও তাই কোথাও যেন অপূর্ণতা থেকে গিয়েছিল প্রণববাবুর মনে। এক নম্বর হয়ে ওঠা হয়নি তাঁর।