শেষ আপডেট: 28 April 2020 14:14
যখন এই লেখাটা লিখছি, লন্ডনের আকাশে তখনও শেষবিকেলের লালচে আলো, আমাদের দেশ ভারতে প্রায় মধ্যরাত। এই শহরে অবশেষে বসন্তের আগমন ঘটেছে। শীতের রুক্ষতা পেরিয়ে নতুন সবুজের প্রলেপ পড়েছে চারপাশে। কিন্তু বিশ্বজোড়া মহামারীর ত্রাসে এই বসন্ত বিষণ্ণতায় ভরা, মৃত্যুর গন্ধমাখা।
একটু আগেই জানালা দিয়ে দেখলাম পুলিশের গাড়ি, অ্যাম্বুলেন্স দাঁড়িয়ে আছে একটা বাড়ির সামনে। আবার বোধহয় কারও অবস্থা সংকটজনক। আর বেশি ভাবতে ইচ্ছা করে না। প্রায় দেড় মাস হতে গেল বাড়ি থেকে অফিসের কাজ করছি। শেষবার বোধহয় ১০-১২ দিন আগে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলাম ডিম-দুধ ইত্যাদি কিনতে। জমিয়ে রাখা খাবারের আয়ু আর বেশিদিন না।
লকডাউনের অনেক আগে থেকেই প্যানিক বাইং শুরু হয়েছিল, তাই নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের যোগান এখনও স্বাভাবিক না। ভোর থেকে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলিতে লম্বা লাইন পড়ে, দু-এক ঘণ্টার মধ্যেই জিনিস প্রায় শেষ হয়ে যায়। অনলাইন ডেলিভারি সংস্থাগুলিও নিয়মিত কাজ করতে পারছে না। ফলে কিছু প্রয়োজন পড়লে লাইন দিয়ে কেনা ছাড়া উপায়ও নেই।
অথচ প্রায় মাসখানেক আগেও এই শহরের রূপ ছিল অন্যরকম। পৃথিবীর অন্যতম ব্যস্ত শহর লন্ডন চলছিল নিজের গতিতেই। স্কুল-কলেজ, অফিস, রেস্তোরাঁ-পাব সবই খোলা ছিল নিয়মমাফিক। প্রশাসন থেকে সাধারণ মানুষ সবাই ভেবেছিল হার্ড ইমিউনিটি দিয়েই কব্জা করে ফেলবে করোনাভাইরাসকে। ব্রিটিশ দম্ভকে গুঁড়িয়ে দিয়ে করোনার করাল গ্রাসে এত বড় শহরটা আজ স্তব্ধ। থমকে লন্ডন, মৃত্যুর পদধ্বনি শুনছে একাকী বিগবেন।
সচেতনতার অভাবের মাশুল দিয়েছে প্রায় ১৬ হাজার প্রাণ! সমগ্র ইউকের স্বাস্থ্য পরিষেবা দেয় ন্যাশনাল হেল্থ সার্ভিস, বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্বাস্থ্যব্যবস্থা বলেই যার পরিচিতি, অপ্রত্যাশিত সংখ্যায় সংকটজনক রোগীর চাপে তাদের অবস্থাও শোচনীয়। বহু স্বাস্থ্যকর্মী প্রাণ হারিয়েছেন ইতিমধ্যে। করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য অন্যান্য অস্ত্রোপচার (ক্যানসার বা অন্য জরুরি চিকিৎসা ব্যতীত) আপাতত স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রশাসন।
হাসপাতালগুলোতে শয্যার অভাবে যে সমস্ত রোগীদের জ্বর, কাশি বা গলাব্যথা জাতীয় মাঝারি মানের উপসর্গ দেখা দিয়েছে, তাঁদের আপাতত বাড়িতেই সেল্ফ আইসোলেশনে থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা। তীব্র শ্বাসকষ্ট জাতীয় সমস্যা থাকলে, তবেই হাসপাতালে ভর্তি হওয়া যাবে। সংক্রমণ রুখতে, অসুস্থ ব্যক্তিকে আগে হেল্পলাইনে ফোন করে নিজের অবস্থার কথা জানাতে বলা হয়েছে। অবস্থা বুঝে বিশেষ সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করে তবেই অ্যাম্বুল্যান্সে রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
লকডাউন চললেও, ব্রিটিশ সরকার গণপরিবহণ ব্যবস্থা সীমিত মাত্রায় চালু রেখেছে, যাতে জরুরি পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত কর্মীরা সঠিক সময়ে কাজে পৌঁছাতে পারেন। জানি না সংক্রমণের এই স্টেজে এরকম সিদ্ধান্ত কতটা বিজ্ঞানসম্মত। ইস্টার উইকেন্ডে নাকি লকডাউন অমান্য করে বেশ কিছু মানুষ রাস্তায় বেরিয়েছিল। যেমনটা আমাদের দেশের একটা অংশও করে চলেছে। উন্নত হোক বা উন্নয়নশীল, স্থান-ভাষা-বর্ণভেদে মানুষের স্বভাব খুব কিছু আলাদা হয় না বোধহয়।
যতটুকু খবর পাওয়া যাচ্ছে, ব্রিটিশ সরকার হয়তো আগামী বেশ কয়েকমাস আন্তর্জাতিক সীমানা বন্ধই রাখতে চলেছে। কবে যে বাড়ি ফিরতে পারব জানি না। যেভাবেই হোক সংক্রমণের হাত থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে। অসুস্থ হলে বিদেশের মাটিতে আদৌ সঠিক চিকিৎসা পাওয়া যাবে কি না সেও এক আশঙ্কা বটে।
দিনের পর দিন মেঘলা আকাশ, ঝোড়ো হাওয়া আর ঝিরঝিরে বৃষ্টিই লন্ডনের আবহাওয়ার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। তবে যেদিন রোদ ওঠে, ঝকঝকে নীল আকাশ সোনারঙে সাজিয়ে দেয় শহরটাকে। গোটা বিশ্ব এখন সেই রৌদ্রোজ্জ্বল দিনের অপেক্ষায়। মহামারীর কালো মেঘ কেটে যাক খুব দ্রুত। একটাই প্রার্থনা, পৃথিবী জুড়ে এতজন মানুষের অক্লান্ত লড়াই যেন সার্থক হয়। আমরা যেন সবাই সুস্থ অবস্থায় নিজদেশে, নিজের পরিবারের কাছে ফিরতে পারি।
(তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী মনোজিৎ কর্মসূত্রে গত দেড় বছর লন্ডনের নিউহ্যামের বাসিন্দা।)