Date : 14th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
রহস্য আর মনের অন্ধকারে ঢুকে পড়ল ‘ফুল পিসি ও এডওয়ার্ড’! টিজারে চমকজিৎ-প্রযোজক দ্বন্দ্বে আটকে মুক্তি! ‘কেউ বলে বিপ্লবী, কেউ বলে ডাকাত’-এর মুক্তি বিশ বাঁও জলে?কিউআর কোড ছড়িয়ে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ! কীভাবে রাতারাতি নয়ডার বিক্ষোভের প্ল্যানিং হল, কারা দিল উস্কানি?নয়ডা বিক্ষোভ সামাল দিতে 'মাস্টারস্ট্রোক' যোগী সরকারের! শ্রমিকদের বেতন বাড়ল ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত Jeet: ভুয়ো প্রচার! ভোট আবহে গায়ে রাজনীতির রঙ লাগতেই সরব জিৎ৪ হাজার থেকে নিমেষে ১ লক্ষ ৮৫ হাজার ফলোয়ার! এক স্পেলেই সোশ্যাল মিডিয়ার নতুন তারকা প্রফুল্লসামনে কাজল শেখ, মমতা কথা শুরু করতেই হাত নেড়ে বিরক্তি প্রকাশ অনুব্রতর! সিউড়িতে কী ঘটলEPL: নায়ক ওকাফর! ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে ৪৫ বছরের অভিশাপ মুছল লিডস, রক্ষণের ভুলে ডুবল ম্যান ইউAsha Bhosle: 'এত ভালবাসার সবটাই তোমার...,' ঠাকুমার স্মৃতি আঁকড়ে আবেগঘন পোস্ট নাতনি জানাইয়েরSupreme Court DA: ডিএ নিয়ে সময়সীমা বৃদ্ধির আর্জি, বুধবার রাজ্যের মামলা শুনবে সুপ্রিম কোর্ট

করোনা আগামী পৃথিবীকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে

মনোজ কুমার বিশ্বায়নের ইতিহাসকে মানবজাতির ইতিহাসের অবিভাজ্য অনুষঙ্গ হিসেবে বিচার করলে দেখা যাবে বিশ্বায়ন যেমন পুঁজি, বিনিয়োগ, অর্থনৈতিক প্রবাহ, বাণিজ্য, সংস্কৃতি, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং ভাবধারার প্রভূত আদানপ্রদান ঘটিয়ে সমগ্র মানবসমাজের ইতিবাচক

করোনা আগামী পৃথিবীকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে

শেষ আপডেট: 16 April 2020 17:24

মনোজ কুমার

বিশ্বায়নের ইতিহাসকে মানবজাতির ইতিহাসের অবিভাজ্য অনুষঙ্গ হিসেবে বিচার করলে দেখা যাবে বিশ্বায়ন যেমন পুঁজি, বিনিয়োগ, অর্থনৈতিক প্রবাহ, বাণিজ্য, সংস্কৃতি, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং ভাবধারার প্রভূত আদানপ্রদান ঘটিয়ে সমগ্র মানবসমাজের ইতিবাচক অগ্রগমনের সহায়ক হয়েছে, এরই পাশাপাশি অত্যন্ত নেতিবাচক বেশকিছু ক্ষতিকর ও বিপজ্জনক অবস্থার সৃষ্টি করেছে। কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের পর আমেরিকার আদিবাসীদের একদিকে যুদ্ধ করে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করা হয়েছে এবং অন্যদিকে মারাত্মক যৌনরোগসহ নানা ধরনের ছোঁয়াচে রোগ দিয়ে তাদের নির্মূল করা হয়েছে। কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কার যদি ইতিহাসের একটি মাইলফলক হয়, তাহলে ইতিহাসের বিপর্যয় কাকে বলা যাবে? গত বছর ডিসেম্বর থেকে কোভিড-১৯ নামে একটি প্রাণঘাতী ভাইরাস সমগ্র পৃথিবীতে ছড়াতে শুরু করে। মাত্র ৩ মাসের মধ্যে এই ভাইরাস পৃথিবীর দুই শতাধিক রাষ্ট্রে ছড়িয়ে পড়ে। অদ্যাবধি মোট আক্রান্তের সংখ্যা ২১ লক্ষের কাছে এবং মৃতের সংখ্যা লক্ষ পেরিয়ে দেড় লক্ষের দিকে ছুটছে। মারাত্মক এ ছোঁয়াচে রোগটি কোনও সীমান্ত মানে না, ধর্ম মানে না, মানে না গায়ের চামড়ার রঙ, মানে না ধনী-গরিব এবং শাসক ও শাসিতের পার্থক্য। ইংরেজ কবি জেমস শার্লি তাঁর একটি কবিতার শিরোনাম দিয়েছিলেন, Death The Leveler. অর্থাৎ মৃত্যু সবাইকে সমান করে দেয়। কারণ মৃত ব্যক্তি যত বড় ধনসম্পদশালীই হোন না কেন, তার সেই সম্পদ চিতায় বা কবরে নিয়ে যেতে পারেন না। অবশ্য মিশরের ফারাওদের কবরে কিছু মূল্যবান সম্পদ পাওয়া গেছে। তারপরও বলা যায় মৃত্যু সামাজিক অসাম্যকে বহন করে। একজন দিনমজুরের মৃত্যুর খবর সংবাদপত্রের পাতায় স্থান পায় না। কিন্তু সমাজপতি বা রাজনীতিবিদদের মৃত্যুর খবর পত্রপত্রিকার পাতায় গুরুত্ব সহকারে ছাপা হয়। একইভাবে গুরুত্ব পেতে দেখা যায় নামকরা বিজ্ঞানী ও শিল্পসাহিত্যের মানুষদের। মৃত্যু-পরবর্তী যেসব আচার-অনুষ্ঠান হয় তাতেও গরিব-ধনীর পার্থক্য প্রবলভাবে ধরা পড়ে। আজকে অবশ্য মানুষের মৃত্যু বর্ণিত হচ্ছে ‘করোনা রোগী’ রূপে। করোনা সর্ব-সংহারক। ‘The glories of our Blood & state/ Are shadows, not substantial things;/ There is no Armour against Fate/ Death lays his icy hands on kings…’. (Death The Leveler) পৃথিবীতে নানা কারণেই প্রতিদিন অনেক মানুষ মারা যান। কিন্তু করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু যেন কিছুক্ষণের জন্য হলেও মৃত্যুকে বা মৃত্যুর চিন্তাকে আমাদের মনে গভীর স্পর্শ করতে পেরেছে। জীবন আমাদের অনেকগুলো প্রশ্নের সামনে নিয়ে দাঁড় করিয়েছে। আমাদের প্রতিদিনের ইঁদুর দৌড় কিংবা ২৪*৭ ব্যস্ততায় কেমন যেন ভাটা পড়ে গিয়েছে। প্রতিদিনের বিভিন্ন শহরের জ্যাম নিয়ে কাউকে এখন শাপশাপান্ত করতে হয় না। সপ্তাহ-শেষে ‘রাত্রিযাপন’-এর বিনোদনের চিন্তা, রাষ্ট্রীয় রাজনীতি থেকে শুরু করে অফিস রাজনীতি (এই শুনছি ত্রাণ বিলি নিয়েও শুরু হয়েছে রাজনীতি) সব কিছুতেই কিছুটা বিরতি। তবে এত কিছুর পরও খাদ্যহীনতা, চাকরিহীনতা, চিকিৎসাহীনতার এই মহামারীতেও পূর্ণিমার বিশাল চাঁদ আকাশে উপস্থিতিতে বিরতি দেয়নি। কেউ কেউ আবার বললেন, এটা নাকি ‘গোলাপি চাঁদ’। এমনটি কদাচিৎ হয়। ঋষি অরবিন্দ বলেছিলেন, ‘ঊষার অব্যবহিত পূর্বেই রাত্রি সর্বপেক্ষা নিকষ আঁধার হয়।’ এটা যেমন সত্য, ঠিক তেমনই সত্য হল রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রভাতের আলো ফোটার সময়টিও এগিয়ে আসে। করোনার এই হামলা কি আমাদের পৃথিবীর নতুন ভোরের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়ার পূর্বাবস্থা? আমাদের ঘৃণা, হিংসা, অহংকার, ঈর্ষার লাগামহীন প্রতিযোগিতা নিজেদের কেবল ক্লান্তই করে তুলেছে। সেই ক্লান্তিকেই আমরা বিজয় বলে ধরে নিয়েছি। অস্কার ওয়াইল্ডের দি পিকচার অব ডোরিয়েন গ্রে উপন্যাসের মতো আমাদের স্বপ্নকল্পিত ছবি এত বেশি পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছে যে, আমরা তাতে তাকাতে ভয় পাই। পৃথিবী আমাদের থমকে দিয়েছে। করোনা-পরবর্তী বিশ্ব যে পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আমাদের মনে হয় নীচের ক্ষেত্রগুলিতে পরিবর্তন দৃশ্যমান, আগামীর গর্ভেই শুধু নয়, বর্তমানেও তা পরিষ্কার।

রাষ্ট্র পরিচালন ব্যবস্থা

বিবিসির নিরাপত্তা সংবাদদাতা গর্ডন করেরা বলছেন, গোয়েন্দারা যত গোপন তথ্যই সরবরাহ করুক না কেন, ক্ষমতার শীর্ষে যারা আছেন তারা এসব তথ্য কতটা গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছেন এবং তা কাজে লাগাচ্ছেন তার ওপরই নির্ভর করে এসব তথ্য শেষপর্যন্ত মানুষের কতটা উপকারে আসবে। যে তথ্য মানুষের চলাচল সীমিত করে এর আরও ব্যাপক বিস্তার ঠেকাতে কাজে লাগবে। সোজা কথায়, স্বাস্থ্য নিরাপত্তার স্বার্থে গোয়েন্দা নজরদারির জন্য দেশগুলোর ওপর ভবিষ্যতে দেশের ভিতরে যেমন, তেমনই বাইরেও আন্তর্জাতিক পরিসরে চাপ বাড়বে। তবে ভবিষ্যতে আসল পরিবর্তন আমরা দেখব আরও জটিল তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে। যেমন একটা জনগোষ্ঠীর মধ্যে কোনও ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে কিনা, তা বুঝতে বা খুঁজতে ব্যবহার করা হবে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স। নতুন ধরনের মোড়কে জাতীয়তাবাদের প্রকাশ ঘটছে, জননেতাদের মাধ্যমে সেটা প্রকাশিত হলেও জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রকাশ করছে তাদের অভিব্যক্তি। সেটা বারান্দায় হাততালি হতে পারে বা হতে পারে ‘ধন্যবাদ ডক্টর’ সম্বোধন। জনগণের মধ্যে দেখা যাচ্ছে অভূতপূর্ব সংহতি, ধর্ম-ভাষা-আঞ্চলিক ভেদাভেদ জাতীয় ইত্যকার সব বেড়া ভেঙে গেছে করোনার ঝড়ে। সময় এসেছে নতুন করে সমাজ-রাজনৈতিক আলোচনার পরিসর তৈরি ও সেটা জাতীয় সংস্কৃতি হিসাবে গড়ে তোলার। তবে এই সুপ্রাচীন সভ্যতা তার সুমহান ঐতিহ্য নিয়ে এগিয়ে যেতে পারবে। বর্তমানে করোনা ভাইরাস মহামারীতে বিশ্বজুড়ে যে স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর মারাত্মক ত্রুটি অগণন অমূল্য জীবনের বিনিময়ে আমাদের গোচরে এসেছে তাতে নিশ্চিত করেই বলা যায়, বর্তমান রাষ্ট্র পরিচালন ব্যবস্থায় আসতে চলেছে নানাবিধ পরিবর্তন। যে যে আইনকানুন আগে বলবৎ ছিল সেগুলিতে আসবে অনেক পরিবর্তন। অসম্ভব হবে সম্ভব, আবার অতীতের অবাস্তব অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত হবে বর্তমানের বাস্তবিকতা। ফল ফলতে শুরু করেছে। বিনামূল্যে খাদ্য সরবরাহ, কার্ডহীনদের ফুড কুপন বিলি, সরাসরি ভর্তুকির টাকা কিংবা সরকারি সাহায্য জনগণের ব্যাংকের হিসাব খাতায় পাঠানো, সর্বোপরি সকলের ন্যূনতম আয় সুনিশ্চিত করার ভাবনা সেই সকল সিদ্ধান্তের ফল। রাষ্ট্র পরিচালনে সরকারের ওপর জনগণের আস্থা বহুলাংশে ফেরত এসেছে। সরকার সম্পর্কে জনগণের ধারণা উজ্জ্বল হয়েছে। চিকিৎসক, নার্স কিংবা স্বাস্থ্য পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত সকলে ছাড়াও পুলিস-প্রশাসন যেভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে, সমন্বয় করে কাজ করে চলেছেন তাতে জনগণের আস্থা তারা জিতে নিতে পেরেছেন অনায়াসে। জনসচেতনতা তৈরি, বিপন্ন রোগীকে হাসপাতালে পাঠানো, বয়স্কদের সহায়তা, আটক ভিনরাজ্যের শ্রমিকদের আহার ব্যবস্থাপনা, নিভৃতালয়ের আশ্রিতদের দেখাশোনা করা, ইটভাঁটার শ্রমিকদের স্বাস্থ্যপরীক্ষা ও মানসিক স্বাস্থ্যরক্ষায় পরামর্শ কিংবা পথে আশ্রিতদের খাবার বিলি, এরকম অগণন ক্ষেত্রে তারা কাজ করে চলেছেন বিনিদ্র শরীর-মন নিয়ে, লোকচক্ষুর সামনে কিংবা আড়ালে। ক’জন আমরা সে খবর রাখি? সেক্ষেত্রে এই পরিষেবা অনেকাংশে সম্ভব হয়েছে জনমানসে সরকারের ‘ফেরত' আসায়। করোনার কারণে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকার, পঞ্চায়েত বা স্থানীয় প্রশাসন সকলেই একই অভিমুখে একই লক্ষ্য নিয়ে জনগণের সেবায় নিবেদিত। ভারতে যেটা প্রায় লুপ্তই হতে যাচ্ছিল। সরকারি ক্ষেত্র শুধুমাত্র পরিষেবা দেওয়ায় এবং দৈনিক রাজ্য ও কেন্দ্রীয় স্তরে বুলেটিন প্রকাশ করায় জনগণের ভরসা সরকারের ওপর বহুগুণ বেড়ে গিয়েছে। আগামী কয়েক প্রজন্মের উজ্জ্বল যুবারা ‘সরকারি চাকরি’তে পরিষেবা দিয়ে গর্বিত অনুভব করবেন। এক বিখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ইতিমধ্যে বলেছেন, ‘I will see a rebirth of the patriotic honour of working for the Government.’ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড যে সামাজিক কর্মকাণ্ডের বর্ধিত অংশ সেটা আমরা প্রায় বিস্মৃত হয়ে যাচ্ছিলাম। মনে হচ্ছিল সামাজিক কর্মকাণ্ড যেন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের শাখাপ্রশাখা। বর্তমানে রাজনৈতিক নেতাদের সামাজিক নেতা হিসাবে দেখা যাচ্ছে। জনগণের পাশে থেকে তাদের জীবন-প্রবাহে সাহায্য করা এখন তাদের ধ্যান-জ্ঞান (ব্যতিক্রম তুলে আবার নিয়মকে অপমানিত করবেন না দয়া করে!)। আশা করা যায় স্থানীয় স্তরে অভাব-অভিযোগের মীমাংসায় আগামীতে তারা কালাতিপাত করবেন, পাকিস্তান বা আমেরিকার রাজনীতি নিয়ে নয়। কথায় আছে, সমস্যার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে ভবিষ্যতের সম্ভাবনার বীজ। কে বলতে পারে ই-ভোট অথবা গৃহে থেকে ভোটব্যবস্থার কথা ভাবতে হতে পারে রাষ্ট্রকে, নিদেনপক্ষে ভোটের প্রস্তুতি ও ভোটদান প্রক্রিয়ায় আসতে পারে নানা পরিবর্তন।

নাগরিক চেতনা

জনমানসে বিজ্ঞানে আবার পুনঃপ্রতিষ্ঠা পেয়েছে। যুক্তি ও জ্ঞান মানস-সমাজে তাদের মর্যাদা ফিরে পেয়েছে। ফলত মানুষ বাধ্য হচ্ছেন বিশেষজ্ঞের কথা শুনতে ও বিশ্বাস করতে। সরকার পরিচালনা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ও সেই পরিচালনায় যে আন্তরিক, চিন্তাশীল ও একনিষ্ঠ হতে হয় পরিচালকদের, সেটা পরিষ্কার হয়েছে। এছাড়াও অর্থনৈতিক ফলাফল অন্য অনেক বিষয় মধ্যের এক বিষয় সেটা মেনে সিদ্ধান্ত নেওয়া এই বোধ জন্ম নিয়েছে। আমেরিকায় কুড়ি হাজারেরও বেশি মৃত্যু এই ভাবনার কেন্দ্রে। রাষ্ট্র পরিচালনায় সরকারের ওপর জনগণের আস্থা খুব গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সত্যকথনের ওপর সেই আস্থা নির্ভর করে। আর এই অকালে সেটা প্রশ্নাতীত। ১৯১৮-১৯ সালের বিগত মহামারীর সময়ে জন এম বেরি বলেছিলেন, ‘Those in the authority must retain the public trust’ and the way to do that ‘is to distort nothing, to put the best face on nothing, to try to manipulate none.’

আন্তর্জাতিক বিশ্ব

করোনার সংক্রমণ ও এর বিশ্বায়নের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে বড় সংকটে পড়তে যাচ্ছে এককেন্দ্রিক বিশ্বকাঠামোর দেশ যুক্তরাষ্ট্র। অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে খারাপ সময় পার করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। শুরুতে তেমন একটা পাত্তা না দিলেও বর্তমানে আমেরিকায় করোনা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয় জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি আক্রান্তের সংখ্যা যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে অদ্যাবধি সাড়ে ৬ লক্ষেরও বেশি মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন এবং মৃত্যু হয়েছে কমপক্ষে ৩৩ হাজার মানুষের। তবে আমেরিকার শক্তির অবক্ষয়ের পেছনে বেশ কিছু উপাদান সক্রিয়। এগুলো হচ্ছে চিনের অর্থনীতির বিস্ময়কর উত্থান। আরও রয়েছে পারমাণবিক শক্তির ক্রমবিস্তৃতি, মুক্তবাণিজ্যে অনেক দেশের অনীহা, সামাজিক নিরাপত্তায় ব্যয় বেড়ে যাওয়া, ফলে অনিবার্যভাবে সামরিক খাতে ব্যয় সংকোচন করতে হয়। এ ছাড়া রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যগত মিত্র যেমন ইউরোপ ও জাপানের শক্তি কমে যাওয়া।

তথ্যপ্রযুক্তি: অনলাইনে পাঠ

বিগত কয়েক বছর ধরেই ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা আর তথ্যের প্রাচুর্যতার কারণে অনলাইন শিক্ষার ব্যাপারটি মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠতে শুরু করে। এ ক্ষেত্রে তারা সবচেয়ে বেশি আগ্রহী হয়ে থাকেন যাদের জন্য সময়, অর্থ এবং শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় বিষয়ের সব কিছু ইন্টারনেটের মাধ্যমে সহজ থেকে সহজতর হয়ে উঠেছে। করোনাভাইরাসের কারণে অনেক দেশ তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইতিমধ্যে অনলাইন এডুকেশন চালু করেছে। এটি ভবিষ্যতে আরও ব্যাপকহারে চালু হতে পারে। শিক্ষা এখন সর্বজনীন, এখন কোনও নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দিষ্ট কোর্স করার জন্য সুদূর পথ পাড়ি দিতে হয় না, বরং ইন্টারনেটের মাধ্যমে ঘরে বসেই সেই শিক্ষাগ্রহণ করা সম্ভব। ১৯৮৯ সালে সর্বপ্রথম ইউনিভার্সিটি অব ফিওনিক্স-এর মাধ্যমে অনলাইন এডুকেশনের যাত্রা শুরু হলেও বর্তমানে এটি প্রায় ৩৪ বিলিয়নের ইন্ডাস্ট্রিতে পরিণত হয়েছে। ভবিষ্যতে অনলাইন এডুকেশনের হাত ধরেই লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী তাদের জীবনকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে পারবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। বিভিন্ন সমস্যা কাটিয়ে এই ক্ষেত্রে সম্ভাবনা এক আকাশ।

যন্ত্রমানবের কাজকর্ম বৃদ্ধি

শিল্প-কারখানায় উৎপাদনকাজে ক্রমেই রোবটের ব্যবহার বাড়ছে। ধীরে ধীরে যন্ত্রের দখলে চলে যাচ্ছে শ্রমবাজার। আর এবার করোনার প্রাদুর্ভাবে আরও প্রকট আকার দেখা দিচ্ছে। কারণ মানবকর্মীর কারণে বন্ধ রাখতে হচ্ছে কলকারখানা। এদিক থেকে রোবটের কাছে হেরে যাচ্ছে মানুষ। তাই মানব শ্রমিকের প্রয়োজন ফুরিয়ে যেতে বসেছে। ২০২৫ সালের মধ্যে শ্রমবাজারের ৫২ ভাগই চলে যাবে রোবটের দখলে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের এক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। দ্য নিউজ ইন্টারন্যাশনাল এ খবর জানিয়েছে আরও আগেই। প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে যত মানুষ কর্মরত রয়েছেন, ২০২৫ সালের মধ্যে তাদের অর্ধেকই ছাঁটাইয়ের কবলে পড়বেন। সেই জায়গায় কাজ করবে যন্ত্রচালিত রোবট। আর এ আশঙ্কা বাস্তবে পরিণত করতে এর পেছনে কাজ করতে পারে করোনার প্রাদুর্ভাবও। অফিসের কাজ ঘরে বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের বিস্তার বেড়ে চলায় এবার বিখ্যাত প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের কর্মীদের ঘরে বসেই কাজ করার পরামর্শ দিয়েছে। যেমন আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে সার্চ ইঞ্জিন গুগলের ইউরোপিয়ান প্রধান কার্যালয় থেকে প্রথম এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়। গুগলের এমন সিদ্ধান্তের পর বিশ্বব্যাপী পাঁচ হাজার কর্মী নিয়ে কাজ করা মাইক্রোব্লগিং সাইট টুইটার সারা বিশ্বে থাকা নিজেদের কর্মীদের ঘরে বসেই অফিসের কাজ করার পরামর্শ দিয়েছে। করোনার কারণে ছুটে চলা মানুষ বন্দি হয়ে পড়েছে ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে। গতানুগতিক জীবনে এসেছে বেশ কিছু পরিবর্তন, যা মানুষ নিজের চিন্তার জগতে সীমাবদ্ধ রেখেছিল এত দিন। একসময় স্বপ্ন বলে ভাবা পন্থাগুলো সময়ের হাত বদলে বাস্তব হয়ে সামনে দাঁড়িয়েছে। সমীক্ষায় দেখা গেছে, ঘরে বসে অফিস করলে ১৬.৮ ভাগ বেশি কাজ করতে পারছেন মানুষ। বছরে সামগ্রিকভাবে এ কাজের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে অনেক বেশি। ফলে এখন এটা নিয়ে অনেকেই মনে করছেন বিশ্বের প্রতিষ্ঠানগুলো এমন সিদ্ধান্তে স্থায়ীভাবে চলে আসতে পারে। আবার দেখা গেছে, ঘরে বসে অফিসের কাজ করলে মানুষের জীবনযাত্রাও অনেক সহজ হয়ে যাচ্ছে। কর্মদক্ষতাও বৃদ্ধি পাবে। মানসিক দিক থেকেও অনেকখানি ভাল থাকতে পারবেন। সহভাগী কাজ করার অ্যাপ-এর চাহিদা বাড়বে আগামীতে। টেলি-মেডিসিন ক্ষেত্রের পরিধি বিশ্বব্যাপী বাড়তে চলেছে। জীবনের বহুক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়বে সেটা অনুমান করা খুব কষ্টসাধ্য নয়।

অর্থনীতি: বাড়বে বেকারত্ব

করোনার কারণে পুরো বিশ্বে নেমে এসেছে অর্থনৈতিক ধস। প্রতিনিয়তই দেশে দেশে বাতিল হচ্ছে কলকারখানার অর্ডার। সবকিছু কবে স্বাভাবিক হবে সে বিষয়ে কেউ কিছু জানেন না। করোনা-পরবর্তী সময়ে বড় বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো নতুনভাবে শুরু করতে পারলেও ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যেতে পারে চিরতরে। এতে কর্মহীন হয়ে পড়বে মানুষ। উৎপাদন না হলে, বিক্রি হবে না। মানে লাভ হবে না। যার অর্থ, কর্মীনিয়োগ হবে না। ব্যবসাগুলো স্বল্প সময়ের জন্য অনাবশ্যক কর্মীদের ধরে রাখে এ আশায় যে, পরিস্থিতি ফিরে এলে যাতে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করা যায়। কিন্তু পরিস্থিতি বেশি খারাপের দিকে এগোলে তারা আর কর্মীদের ধরে রাখে না। মানুষ চাকরি হারানোর ভয়ে থাকে। ফলে তারা পণ্য কেনেও কম। আর পুরো চক্র নতুন করে শুরু হয়। আমরা এগোতে থাকি অর্থনৈতিক মন্দার দিকে। এখন পুরো বিশ্ব সেদিকেই যাচ্ছে। ফলে রোবট নিয়োগ বৃদ্ধি পেতে পারে কলকারখানাগুলোয়। এতে চাকরি হারাবেন কোটি কোটি মানুষ। করোনা প্রাদুর্ভাবের ফলে যে বেকারত্ব তৈরি হবে, এতে কত লোক যে বেকার হবে সেটা এখনও স্পষ্ট নয়।

বাড়বে সচেতনতা, কমবে অর্থহীন কাজ

মানুষ নির্দিষ্ট কিছু কাজ করে জীবনধারণ করতে পারে না। তাকে নানা রকম বৈচিত্র্যময় কাজ করতে হয়। এর মধ্যে বিশ্বজুড়ে বহু মানুষ অর্থহীন কাজ করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোভিড-১৯ মোকাবিলায় আমাদের প্রস্তুতির করুণ অবস্থার একাংশের জন্য দায়ী এসব কাজ। এ মহামারী বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, অনেক কাজের কোনও দরকার নেই। কিন্তু প্রয়োজনীয় কাজে দক্ষ কর্মীর অভাব রয়েছে। যে সমাজে অর্থনীতির মূল নীতিমালা হচ্ছে বিনিময়মূল্য। যেখানে জীবনযাপনের মৌলিক প্রয়োজন বাজারেই পাওয়া যায় সেখানে মানুষ অর্থহীন কাজ করতে আকর্ষণ বোধ করে। কিন্তু ভবিষ্যতে করোনাভাইরাসের পর মানুষ এসব কাজ থেকে দূরে সরে আসবে। এতে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়বে।

অর্থনৈতিক সংকট হবে দীর্ঘমেয়াদি

The Organisation for Economic Co-operation and Development (ওইসিডি)-এর প্রধান বিশ্বব্যাপী বড় ধরনের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সংকট সম্পর্কে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা ওইসিডি হুঁশিয়ার করে দিয়েছে যে, বিশ্ব অর্থনীতির ওপর করোনাভাইরাসের প্রভাব কাটিয়ে উঠতে অনেক বছর সময় লেগে যাবে। ওইসিডির মহাপরিচালক এঞ্জেল গুরিয়া বলেছেন, এ মহামারী থেকে যে অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে তার চেয়ে বেশি বড় হয়ে উঠেছে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে এর আকস্মিকতা। তিনি বিবিসিকে বলেছেন, ওইসিডি সরকারগুলোর কাছে আহ্বান জানিয়েছে, তারা যেন তাদের ব্যয়নীতি ভুলে গিয়ে দ্রুত ভাইরাস পরীক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করে এবং ভাইরাসের চিকিৎসার পেছনে মনোযোগ দেয়। করোনাভাইরাস গুরুতর আকারে ছড়িয়ে পড়লে বিশ্বব্যাপী প্রবৃদ্ধির হার অর্ধেকে কমে তা ১ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়াবে বলে সম্প্রতি যে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছিল, গুরিয়া বলেছেন, তা এখন খুবই আশাবাদী একটা পূর্বাভাস বলেই মনে হচ্ছে। মি. গুরিয়া বলেছেন, কত মানুষ চাকরি হারিয়েছেন এবং কোম্পানিগুলোর কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তা এখনও স্পষ্ট নয়। করোনা আমাদের বাজার-কেন্দ্রিক অর্থনীতি ও ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্যবাদের (এটা একটা সামাজিক তত্ত্ব যা রাষ্ট্রের আধিপত্যের চেয়ে ব্যক্তির স্বাধীন কর্ম-তৎপরতা ও তার বিশ্বাসের পূর্ণ স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দেয়) সঙ্গে আমাদের প্রেমের অবলুপ্তি সূচিত করল। সেই সঙ্গে প্রশ্ন তুলে দিয়ে গেল সরকার যদি অসংগঠিত ক্ষেত্রে নিযুক্ত লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের অন্ন-উপায়ের সংস্থান না করে তাহলে ভেঙে পড়বে দেশের পুরো অর্থনীতি। রাষ্ট্রকেন্দ্রিক সকলের জন্য স্বাস্থ্যের এক পরিকাঠামোর প্রয়োজনীয়তা ও সেক্ষেত্রে জিডিপির এক শতাংশ নয় ন্যূনতম চার শতাংশ বিনিয়োগ ও সামুদায়িক স্বাস্থ্য পরিষেবা প্রদান মূল বিচার্য বিষয় হয়ে উঠবে নির্বাচনের ক্ষেত্রে। বেসরকারি ক্ষেত্রের ওপর জন-পরিষেবার বিভিন্ন ক্ষেত্র ছেড়ে নিশ্চিন্ত হওয়ার জো থাকবে না। বিশেষ করে ওষুধ তৈরি, গবেষণা, রোগনির্ণয়, চিকিৎসা প্রদান, অন্যান্য স্বাস্থ্য পরিষেবা প্রদান ও জনসচেতনতা তৈরির ক্ষেত্রে দেশের সরকারি ক্ষেত্র আগামীতে পথপ্রদর্শকের ভূমিকা নিক, জনগণের দাবি থাকবে এটাই। এই সুযোগে রাজ্যের অভিবাসী শ্রমিকদের তথ্য, কারা দেশের বাইরে কী কাজে নিযুক্ত, কারা হারালেন তাদের কাজ, কাদের কোন অসংগঠিত ক্ষেত্রে দক্ষতা আছে, কাদের নেই কিন্তু কোন কাজে নিযুক্ত সেই সকল তথ্য অনেকটাই আহরিত হয়েছে, বাকিটা সময়ে করে উপযুক্ত পরিকল্পনার মাধ্যমে রাষ্ট্রগঠনে কাজে লাগানো যেতে পারে। সেটার বিশদ চিন্তনের ও আলোচনার অবকাশ আছে।

অর্থনৈতিক অসাম্য বৃদ্ধি

সমাজের সর্বনিম্নের স্তরে থাকা মানুষগুলি ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করেন বলে তাদের ক্ষেত্রে সংক্রমণের সম্ভাবনা বেশি। গবেষণায় দেখা গিয়েছে সংক্রমণের পর দু’টি কারণে ঝুঁকি বেশি হয়, প্রথমত বেশি বয়স, দ্বিতীয়ত বর্তমানের শারীরিক অবস্থা। কিছু গবেষণায় এটা উঠে এসেছে যে, খারাপ আর্থ-সামাজিক অবস্থা এই রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আবার এই অবস্থায় থাকা মানুষরা বিভিন্ন ধরনের ক্রনিক রোগের শিকার। অনেকের হৃদপিণ্ডের সমস্যাও থাকে। অর্থনৈতিক অসাম্যের সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্য সচেতনতা ও নিবৃত্তিমূলক (প্রেভেন্টিভ) স্বাস্থ্য পরিষেবারও অসাম্য দেখা দেয়। ফলত করোনার ঝুঁকি তাদের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ বেশি। বিভিন্ন কলকারখানায় কিংবা পরিষেবা ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে কর্মীদের নিজেদের সুরক্ষিত করার উপাদানের অভাব। বাজারের সবজিবিক্রেতা, দুধ সরবরাহকারী, মুদি দোকানের কর্মচারী সবাই মাস্কহীন, কিন্তু মালিক ও ক্রেতা সবাই মাস্কযুক্ত। কাজ বন্ধ, স্কুল-কলেজ চালু হলে দিতে হবে বিল, কিন্তু কাজ কবে আবার শুরু হবে জানেন না অধিকাংশ অন্য রাজ্যে নির্মাণকাজে নিযুক্ত শ্রমিক, তাই কেমন করে ফি দেবেন, সংসার চালাবেন ভাবনা পিছু ছাড়ে না ঘুমেও। জিনিসপত্রের দাম তো বেড়েই চলেছে। ব্রিটিশ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে, যাদের করোনায় সংক্রমণের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি, আক্রান্ত হওয়ার ও ভোগার সম্ভাবনা তাদের জীবন সবচেয়ে বেশি প্রশ্নচিহ্নের মুখে।

জীবন-চর্চা

করোনা-পরবর্তী জীবনে দেখা যাচ্ছে নানা রামধনু রঙ। স্বাস্থ্যবিধি স্বীকার করে জনগণ তা মেনে চলছে জীবন বাঁচানোর তাগিদে। একাকিত্বের যন্ত্রণা মেনে নিতে নিতে প্রিয়জনের বিচ্ছেদ সহ্য করতে করতে ও অজানা আশঙ্কায় বিদ্ধ হতে হতে এই জীবন আমাদের বাধ্য করেছে অন্তর্লীন হতে। আমরা আসলে কী, জীবনে কী কী গুরুত্বপূর্ণ, কেমন করে জীবন কাটানো আমাদের কাঙ্ক্ষিত, সেগুলোর ভাবনায় জারিত হয়েছে মানবমন। যা রেখে যাবে তা জীবনচর্চায় আনবে ‘বিপুল তরঙ্গ’। কিছুটা আঁচ পাওয়া হয়তো এখনও যাচ্ছে। সম্প্রতি LSR সমীক্ষায় প্রকাশ হয়েছে খাদ্যের অপচয়, জীববৈচিত্রের প্রতি অনুরাগ ও সচেতনতা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো মানুষের জীবনে গুরুত্ব পাচ্ছে। মোবাইল ও বিভিন্ন ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতির গঠনমূলক ও কার্যকরী ব্যবহার বাড়ছে বলে জানিয়েছে বিভিন্ন অনুসন্ধানমূলক সংস্থা। বিভিন্ন ম্যানেজমেন্ট গুরুরা দিচ্ছেন সঠিক জীবনযাপনের সুলুকসন্ধান। কোরিয়ান বিখ্যাত গায়ক য়ো-য়ো মা নিজের গানের ভিডিও ইন্টারনেটে প্রকাশ করছেন যাতে সবাই বিনামূল্যে দেখতে পারে। গানের সিডি বানিয়ে বাজারজাত করা নয়, ভিডিও গেমের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া নয়, কী করে মানুষের ‘কাজে’ আসা যায় সেটাই চিন্তা করছে প্রত্যেকে। হ্যাঁ প্রত্যেকেই, নিজস্ব সামর্থ্য অনুসারে। যন্ত্রের মনে সেঁধিয়ে যাওয়া নয়, সময় হয়েছে যন্ত্রকে মানবমনের কন্দরে সেঁধিয়ে মানবপ্রেমের প্রকাশ করার। সময় এখন ‘not only alone together, but together alone’। ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপে দেখা যাচ্ছে মানুষের সুপ্ত গুণাবলির সুন্দর প্রকাশ, কেউ সঙ্গীতচর্চা করছেন, কেউ আঁকছেন নৈসর্গিক চিত্র, কেউ আবার সুন্দর পদ রান্না করে তাক লাগিয়ে দিচ্ছেন অলস অবসরকে কাজে লাগিয়ে। কেউ তার প্রথম প্রেমকে (হবি) সরিয়ে বাস্তবতা মেনে (?) নিয়েছিলেন, তিনি আবার ফেরত যাচ্ছেন প্রথম আলোয়। কিন্তু খাপছাড়াভাবে কামুর কথা কেন জানি মনে পড়ে: ‘The truth is everyone is bored, and devotes himself to cultivating habits’. আগের মহামারীর সময় বলা কথা বর্তমান মহামারীর সময়েও কি সত্য হিসাবে প্রতিভাত হবে? বেয়াড়া প্রশ্নটা উঁকি দিচ্ছে প্রায়ই মনের অন্দরে। একদিন এই ভাইরাস ঝড় থেমে যাবে। বাইরে ও মনের অন্দরে বইবে জীবনের সতেজ হাওয়া। ঝড়ে টিকে থাকার জন্যে আমরা এখন যে সিদ্ধান্তগুলো নেব কিংবা যে বিকল্পগুলো বেছে নেব, ভবিষ্যতের দিনগুলোতে সেগুলোই আমাদের জীবনধারা বদলে দেবে। মানবসভ্যতা এখন এক অজানা, অদেখা সংকট মোকাবিলা করছে। সম্ভবত আমাদের এই প্রজন্মের সবচেয়ে বড় সংকট। বিভিন্ন সরকার এবং জনগণ আগামী কয়েক সপ্তাহে যে সিদ্ধান্তগুলো নেবেন তা আমাদের ভবিষ্যৎ পৃথিবীর গতিপথ, চরিত্র বদলে দেবে। এই বদলে যাওয়াটা যে শুধু আমাদের স্বাস্থ্যপরিষেবা পদ্ধতিতে হবে, ব্যাপারটা তেমন নয়। বদলে যাবে আমাদের অর্থনীতি, রাজনীতি এবং সংস্কৃতির গতিপথ। আমাদের খুব শক্ত এবং স্থির কিছু সিদ্ধান্ত নিতে হবে, দ্রুত নিতে হবে এবং মাথায় রাখতে হবে সিদ্ধান্তের সুদূরপ্রসারী প্রভাব। এখন আমাদের শুধু সাময়িক বিপদ উদ্ধারের কথা মাথায় রাখলেই চলবে না, বরং ভবিষ্যতে কেমন একটা পৃথিবীতে আমরা বাস করতে চাই, সেটিও মাথায় রাখতে হবে। হ্যাঁ, এই ঝড়ের দিনগুলো শেষ হবে একদিন, টিকবে মানবসভ্যতা, আমাদের বেশিরভাগই বেঁচে থাকব-- কিন্তু বেঁচে থাকব এক ভিন্ন পৃথিবীতে।

```