
শেষ আপডেট: 31 August 2020 17:17
শুধু তাই নয়, উনি নিজে এই বিষয়টা নিয়ে এতই উৎসাহী ছিলেন যে নিজেই গ্রামের মানুষদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে জানতে পেরেছিলেন, বন্ধনের থেকে ক্ষুদ্র ঋণ নিয়ে কীভাবে তাঁরা ও তাঁদের পরিবার উপকৃত হয়েছে। সবটা জানার পরে বেশ সন্তুষ্ট হন তিনি। তার উপর, সেই সময়ে মাইক্রো ফিনান্স ইন্ডাস্ট্রি সবচেয়ে বড় এক সমস্যার মুখোমুখি হয়। চতুর্দিকে যখন মাইক্রো ফিনান্স প্রতিষ্ঠানকে সকলে তুলনা করছেন চড়া সুদের মহাজনদের সঙ্গে, তখন প্রণববাবুই সাধারণ মানুষকে বুঝিয়ে বলেন, বন্ধন একটা পৃথক সংস্থা। তারা প্রতি বছর সুদের হার কমায় এবং একই সঙ্গে অর্থনৈতিক ভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষদের আরও বেশি করে তাদের ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্পের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে। উনি বলেছিলেন, "বন্ধন ইজ় আ ডিফারেন্ট ইনস্টিটিউশন ইন মাইক্রো ফিনান্স স্পেস।"
এর পরে বন্ধনের জন্য আরও বড় একটা সুযোগ এসে যায়। ২০১০ সালের বাজেটের বক্তৃতায় তৎকালীন অর্থমন্ত্রী প্রণববাবু ঘোষণা করেন নতুন ব্যাঙ্ক তৈরি করার অনুমোদন পাওয়ার কথা। এর পরে কাঙ্ক্ষিত আয়-ব্যয়ের বিস্তারিত খতিয়ান-সহ একটি গাইডলাইনও ইস্যু করেন তিনি। তৎকালীন ঋণদাতা সংস্থা হিসেবে নথিভুক্ত বন্ধন সেই ব্যাঙ্কের অনুমোদন পাওয়ার জন্য যাবতীয় গাইডলাইনের আওতায় অন্তর্ভুক্ত ছিল। সেই মতোই অনুমোদনের জন্য আবেদন করা হয় সে বছরই।
বন্ধনের তরফে ব্যাঙ্ক লাইসেন্স চাওয়ার পরের দিনই প্রণববাবুর অফিস থেকে ফোন এসেছিল আমার কাছে। তখন উনি রাষ্ট্রপতি। ফোনে বলেন, তিনি খুবই খুশি হয়েছেন বন্ধন ব্যাঙ্ক লাইসেন্স চাওয়াতে। ওঁর অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে সে সময়ে রাষ্ট্রপতি ভবনে গিয়ে দেখাও করি আমি। প্রণববাবুর সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা হয় নতুন ব্যাঙ্ক বন্ধনের সম্পর্কে। উনি তখন বলেছিলেন, "তোমরা যে কাজটা করছো তা মানুষের উপকারের জন্য করছো। আমি গর্বিত তোমায় নিয়ে। আমি গর্বিত বাংলার জন্য।" প্রণববাবুর সঙ্গে এতটাই স্নেহের বন্ধন ছিল আমার। অভিভাবকের মতোই গাইড করেছেন সবসময়।
এর পরেও উনি প্রায়ই খবর নিতেন বন্ধনের ব্যাপারে। এক সময়ে বন্ধন ব্যাঙ্ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার জন্য প্রস্তুত হলে আমরা ওঁকে অনুরোধ জানাই ব্যাঙ্ক উদ্বোধনের জন্য। উনি রাজিও হন আমাদের অনুরোধে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, সেবার পারিবারিক এক বিপর্যয় ঘটে যাওয়ায় তিনি ব্যাঙ্ক উদ্বোধন করতে আসতে পারেননি। তবে পরের বছর বন্ধন ব্যাঙ্কের প্রথম বর্ষপূর্তিতে উনি এসেছিলেন এবং ওঁর বক্তৃতায় বলেছিলেন, "বন্ধন সংস্থা ব্যাঙ্ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করায় আমি খুব খুশি হয়েছি। আমার আশা, গ্রামীণ অর্থনীতিতে এখনও যে বড় ফাঁকা জায়গাটি রয়েছে, সেটা বন্ধন ব্যাঙ্ক হওয়াতে পূর্ণ হবে।"
অনেক কিছুই মনে পড়ছে আজ। যত মনে পড়ছে তত বুঝতে পারছি, অর্থমন্ত্রী হিসেবে বা রাষ্ট্রপতি হিসেবে ওঁকে আমরা যতটা না পেয়েছি, তার চেয়ে বেশি পেয়েছি একজন বুদ্ধিমান, বিচক্ষণ, হৃদয়বান মানুষ হিসেবে। একসময়ে এমন হয়েছিল, ওঁকে কোনও কিছু বলার আগেই উনি ধরে ফেলতে পারতেন কী বলব। বন্ধনের কাজকর্ম নিয়ে সবসময় উৎসাহ দিতেন উনি। তবে এই দুঃসহ শেষের সময়টায় ওঁর কাছে যেতে পারলাম না। উনি চলে গেলেন।