
শেষ আপডেট: 18 May 2020 07:29
করোনার আগমনের পর থেকে শুধুমাত্র করোনাতেই লোকজন মারা যাচ্ছে না, অন্যান্য রোগেও মারা যাচ্ছে। এমনকি প্রচুর চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী নিজেদের স্বাভাবিক স্পেশালিটি বদলে বিশেষ প্রশিক্ষণ নিয়ে এখন করোনার চিকিৎসা করছেন। প্রায় সাড়ে চার লক্ষ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী বর্তমানে করোনা চিকিৎসায় নিযুক্ত। এর মানে যাদের করোনা হয়নি তেমন রোগী হয়তো বা ঠিকমতো চিকিৎসা পাচ্ছেন না। তা হলে এসব মৃত্যু কি করোনায় মৃত্যু বলে বিবেচিত হবে? ধরুন যুদ্ধে সবাই তো আর গুলিতে মরে না, অনেকে মরে না খেয়ে, বিনা চিকিৎসায় বা অন্য কারণে। এ নিয়ে রাশিয়ায় এক নতুন রসিকতা আছে।
“ডক্টর, রোগী মারা গেছে। মৃত্যুর কারণ কী লিখব?”
“লেখো করোনাভাইরাস।”
“কিন্তু ওর গায়ে তো গুলির আঘাত, করোনার কোনও সিম্পটম নেই।”
“দ্যাখো, করোনা না থাকলে আমরা হয়তো একে আরও যত্ন করে চিকিৎসা দিতে পারতাম। এটাও করোনার বলি।”
মনে আছে, যখন মৃতের সংখ্যা ছিল দুই বা তিনজন তখন প্রায় আশি বছরের এক বৃদ্ধা মারা যান করোনার উপসর্গ নিয়ে। তাঁর ছিল কিডনি, হার্ট আর ডায়াবেটিসের সমস্যা এবং খুব সম্ভব তিনি এসব জটিলতাতেই মারা গিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যু ওসব জটিলতার কারণে হয় বলে ঘোষণা করায় বেশ সমালোচনা হয়েছিল। মাত্র কয়েক দিন আগে আমার এক ঘনিষ্ঠ ছেলে মারা যায়। সে বেশ কয়েক বছর লিভারের সমস্যায় ভুগছিল। মারাও যায় সেই কারণেই। হাসপাতালে। তারপর মৃত্যু করোনা সংক্রান্ত কি না জানার জন্য সেই ছেলেটির করোনা টেস্ট করানো হয়। রিপোর্ট নেগেটিভ। এসব ঘটনা হয়তো একটা কথাই বলে, সচেতনভাবে এরা করোনা সংক্রান্ত মৃত্যুর সংখ্যা কমাতে আগ্রহী নয়। তবে এ নিয়ে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন মত আছে। যতদূর জানি, ইতালিতে প্রায় সব মৃত্যুকেই করোনায় মৃত্যু বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। অর্থাৎ দেশ ভেদে এই হিসাব করা হয়েছে বিভিন্নভাবে। সর্বজনসম্মত কোনও মাপকাঠি মনে হয় এখনও নেই। এসবের মানে এই নয় যে, অন্যান্য রোগী চিকিৎসা পাচ্ছেন না। তবে চেষ্টা করা হচ্ছে অবস্থা জরুরি না হলে কাউকে হাসপাতালে ভর্তি না করানোর।
[caption id="attachment_221922" align="aligncenter" width="600"]
মস্কো নদীর তীরে বেকার রাস্তা। ছবি: মনিকা সাহা[/caption]
এবার আসা যাক একটু অন্য দিকে। এই করোনা কি শুধু বিপদই বয়ে আনল? কোনও ইতিবাচক বার্তাই কি সে বয়ে আনেনি? যদি রাশিয়ার কথা বলি তা হলে এটা বিশ্বাস করার অনেক কারণ আছে যে, ভবিষ্যতে এদের স্বাস্থ্যক্ষেত্রে অনেক পরিবর্তন হবে। পুরোপুরি না হলেও সোভিয়েত আমলের স্বাস্থ্যবিধি ফিরে আসবে। এটা পরিষ্কার, এখনও পর্যন্ত করোনা মোকাবিলায় তাদের অন্যতম সহযোগী ছিল সোভিয়েত স্বাস্থ্যব্যবস্থার ধ্বংসাবশেষ। আশা করা যায় এর হাত ধরে সোভিয়েত শিক্ষাব্যবস্থা— যা কিনা বিশ্বের অন্যতম কার্যকরী শিক্ষাব্যবস্থা হিসেবে পরিগণিত হয়েছিল, ফিনল্যান্ড-সহ অনেক দেশ এখন যে ব্যবস্থা অনুকরণ করে— সেটা ফিরে আসবে। এ নিয়ে অনেকদিন যাবৎই কথাবার্তা চলছে। বিভিন্ন শিক্ষাবিদ এ নিয়ে বলছেন। আমরা যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার সঙ্গে জড়িত তাদের বেশিরভাগই সেই মত পোষণ করি। করোনা বিপর্যয় সেটাকে ত্বরান্বিত করতে পারে। করোনা তার রাজত্ব চালিয়ে যাচ্ছে বটে, তবে এরাও ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করছে। কথাবার্তা চলছে মাঝারি ব্যবসায়ীদের সাহায্য করার।
[caption id="attachment_221923" align="aligncenter" width="600"]
জনশূন্য দুবনা। ছবি: প্রতিবেদক[/caption]
এবার আসা যাক করোনার বর্তমান অবস্থায়। আগেই বলেছি, গত ২ মার্চ থেকে প্রতিদিন আক্রান্তের সংখ্যা ১০ হাজারের বেশি করে বাড়ছে। এখন সেটা কমের দিকে। তবে ১৪ মে প্রথমবারের মতো সেটা ন’হাজারের নীচে হলেও ১৫ মে সেটা ১০ হাজার ৪৫৩। আজ পর্যন্ত সর্বমোট টেস্টের সংখ্যা ৬৪,১৩,৯৪৮। তা হলে কি করোনা পিছু হটছে? এখানে বলা দরকার, যদিও প্রতিদিন করোনা পজিটিভের সংখ্যা বাড়ছে, সেই সঙ্গে বাড়ছে সুস্থ হয়ে ফিরে আসা মানুষের সংখ্যা। ১৫ মে-র সংখ্যাটা এমন হল— মোট পজিটিভ ২,৬৩,০১৩ (+১০,৪৫৩), সুস্থ ৫৮,৩২১ (+৪,৬৭৩), মৃত ২,৪২৫ (+১১১)। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, প্রতিদিন প্রায় দশ হাজার নতুন রোগী ধরা পড়লেও সুস্থ হয়ে ফিরছেন বহু মানুষ আর সে তুলনায় মৃত্যুর সংখ্যা বেশ কম। পাশাপাশি আমেরিকায় মোট পজিটিভ ১৪,১৭,৮৮৯ (মৃত ৮৫,৯০৬), ব্রিটেনে ২,৩৪,৪৩১ (৩৩,৬৯২), স্পেনে ২,২৮,৬৯১ (২৭,১০৪), ইতালিতে ২,২২,১০৪ (৩১,১০৬), ব্রাজিলে ১,৯২,০৮১ (১৩,২৭৬), ফ্রান্সে ১,৭৮,১৮৪ (২৭,০৭৭), জার্মানিতে ১,৭৪,০৯৮ (৭,৮৬১)। এই তথ্য জন হপকিন্স ইউনিভার্সিটির সাইট থেকে পাওয়া যাবে (https://coronavirus.jhu.edu/map.html)।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সংক্রমণ অনুযায়ী মৃতের সংখ্যা। সেই হিসেবে রাশিয়ায় এখনও পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ১ শতাংশর কম, যা কিনা আশাব্যঞ্জক। যদিও অনেকেই রাশিয়া সঠিক তথ্য প্রকাশ করছে না বলে লিখছে, তবে জন হপকিন্স ইউনিভার্সিটির সাইটে রাশিয়ার এই তথ্য রয়েছে বলে পশ্চিমে সবাই এটাকে অবিশ্বাস করে না। আরও একটা কথা এখানে বলা দরকার। ২০২০ সালের এপ্রিলে মস্কোয় ১১ হাজারের বেশি মানুষ মারা গিয়েছেন, যা ২০১৯ সালের এপ্রিলের চেয়ে এক হাজারের মতো বেশি। যদিও ২০১৮ সালের এপ্রিলের মোট মৃত্যুর চেয়ে কম। এটা নিয়ে পশ্চিমি মাধ্যম বিভিন্ন কথা লিখছে। তারা বলতে চাইছে, রাশিয়ায় করোনা-মৃত্যু আসলে অফিসিয়াল সংখ্যার চেয়ে ৭০ শতাংশ বেশি। সেটা সত্যি হলেও সংখ্যাটা ৩৫০০-র বেশি হবে না। আর সেটা আমেরিকা, ব্রিটেন, ইতালি, স্পেন, ব্রাজিল বা ফ্রান্সের চেয়ে অনেক কম। তবে কথাটা সেখানে নয়। অন্য দেশের কথা জানি না, রাশিয়ায় যেকোনও মৃত্যুই সনাক্ত করা হয়, পোস্টমর্টেম হয়, ডেথ সার্টিফিকেটে কারণ উল্লেখ থাকে। যদি একাধিক অসুখ থাকে, ক্রমানুসারে সেটা উল্লেখ করা হয়। বিভিন্ন দেশে যেখানে করোনায় মৃতের কাছে যেতে অনেকে ভয় পেয়েছে, এখানে প্রতিটি মৃত্যুরই পোস্টমর্টেম হয়েছে। শুধু তাই নয়, তারা করোনা পজিটিভ ছিলেন কি না সেটা টেস্ট করা হয়েছে। এতসব করার পরেও করোনা-মৃত্যুকে লুকোনোর কোনও যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। কিন্তু পশ্চিমি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও রাজনৈতিক শক্তির রুশ-ফোবিয়া এত বেশি যে তারা এই সময়েও বিভিন্ন ভ্রান্ত তথ্য দিয়ে এ দেশের প্রশাসনকে প্রশ্নের সম্মুখীন করতে চাইছে। যখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা ন্যাটো ইতালিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে গড়িমসি করছিল তখন চিন, রাশিয়া, কিউবার মতো দেশই সেটা করেছে। এমনকি আমেরিকাকেও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু পরবর্তীতে এই সাহায্যের পেছনে রাশিয়ার খারাপ উদ্দেশ্য খুঁজে বেড়িয়েছে এই সমস্ত সংবাদমাধ্যম। ফলে তাদের পেশাগত যোগ্যতা ও রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন না এসে পারে না।
[caption id="attachment_221924" align="aligncenter" width="600"]
মস্কোর ব্যস্ততম মেট্রো স্টেশন প্লাসাদ রেভ্যুলুতসিই।[/caption]
করোনার লকডাউন অভিমন্যুর চক্রব্যুহে প্রবেশ করার মতো। সে জানত কীভাবে সেখানে ঢুকতে হবে কিন্তু সেখান থেকে বেরোনোর পথ জানে না। ভয় একটাই, যদি তাড়াহুড়ো করা হয় তাতে সেকেন্ড ওয়েভের মুখোমুখি দাঁড়াতে হতে পারে। এ যেন লেনিনের সেই বিখ্যাত উক্তির মতো— “আজ খুব তাড়াতাড়ি হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু আগামীকাল অনেক দেরি হয়ে যাবে।” (Today is too early, tomorrow will be too late)। মনে পড়ায় স্প্যানিস ফ্লুয়ের কথা, যখন সেকেন্ড ওয়েভে অনেক বেশি মানুষ মারা গিয়েছিলেন। অন্যদিকে, ঘরে বসে থাকতে থাকতে মানুষ দিশেহারা। কে জানে, ভিয়েতনাম বা বিভিন্ন যুদ্ধের পর যেমন ভিয়েতনাম সিনড্রোম দেখা দিয়েছিল, করোনার পর যদি সেটা দেখা দেয়? তাছাড়া অর্থনীতি বলে একটা কথা আছে। দেশের, মানুষের ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্য নির্ভর করে অর্থনীতির স্বাস্থ্যের ওপর। তাই অনির্দিষ্টকালের জন্য লকডাউনে গেলে সেটা যাতে ঘোমটা দিতে গিয়ে পেছন উদলা (আলগা) না হয় সেটাও দেখার ব্যাপার আছে। তাই দীর্ঘদিনের লকডাউনের পর রাশিয়া আবার একটু একটু করে খুলতে শুরু করেছে। এতদিন পর্যন্ত শুধু আশপাশের খাবারের দোকানে যাওয়া যেত, খোলা ছিল ওষুধের দোকান আর বাড়ির কুকুর-বিড়াল নিয়ে একশো মিটারের মধ্যে ঘুরতে যাওয়ার অনুমতি ছিল। স্পেশাল পাস নিয়ে বাইরে যাওয়া যেত। এখন বিভিন্ন কলকারখানা, ছোট ছোট দোকানপাট এসব দিয়ে শুরু হয়েছে লকডাউন তোলার কাজ। এমনকি বাচ্চাদের নিয়ে দিনে দু’ঘণ্টা ঘোরার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। অনুমতি দেওয়া হয়েছে বাইরে শরীরচর্চা করার। তবে সেটা করতে হবে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে এবং প্রতিটি রাজ্য সেটা নিজেরাই ঠিক করবে। শর্ত একটাই, প্রস্তুত বেডের কম করে হলেও ৫০ শতাংশ যেন মুক্ত থাকে। এটা বলা হচ্ছে এই জন্য যে, এরা সেকেন্ড ওয়েভের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। সব পরিকল্পনামাফিক কাজ করলে এরপর পার্ক খুলে দেওয়া হবে। খুলবে সেলুন, ছোট ছোট ক্যাফে, যেসব দোকানে সরাসরি বাইরে থেকে ঢোকা যায়, মানে যেগুলো বড় সুপারমার্কেটের অংশ নয় সেগুলো। তৃতীয় পর্যায়ে থাকবে সুপার আর হাইপার মার্কেট, সিনেমা, থিয়েটার, স্পোর্টস কমপ্লেক্স, হোটেল, রেস্তোরাঁ এইসব। এতদিন হোটেল রেস্তোরাঁ শুধু হোম ডেলিভারি দিতে পারত। যেহেতু এখানে মে মাসে স্কুলের পরীক্ষা শেষ হয় আর ইউনিভার্সিটির সেশন শেষ হয় জুন মাসে, তাই শেষপর্যন্ত ক্লাস চালিয়ে যাওয়া হবে অনলাইনে আর এসব খুলবে নতুন শিক্ষা বছরে সেপ্টেম্বরে। যদিও অবস্থার বিচারে সেটা পিছিয়ে যেতে পারে। কারণ, সব কিছুর মূলে রয়েছে মানুষের নিরাপত্তা।
তবে এটা ঠিক, এই দেশের করোনা থেকে মুক্ত হতে এখনও অনেক দেরি। এখনও পর্যন্ত নতুন করোনা পজিটিভের সংখ্যা সুস্থ হয়ে ফিরে আসা মানুষের চেয়ে বেশি। তার মানে প্রতিদিনই রোগীর সংখ্যা বাড়বে। আর সেটা চলবে ততদিন, যতদিন না সুস্থ হয়ে ফিরে আসা মানুষের সংখ্যা নতুন আক্রান্তের চেয়ে বেশি হয়।
[caption id="attachment_221927" align="aligncenter" width="600"]
প্রায় যাত্রীবিহীন মস্কো মেট্রো।[/caption]
পরিসংখ্যান বলছে, মোট আক্রান্তের ৫০ শতাংশের বেশি মানুষ কোনওরকম বাহ্যিক লক্ষণ ছাড়াই করোনা পার করছেন। মোট ৮০ শতাংশ মানুষ করোনা ভাইরাস হালকাভাবেই অতিক্রম করছেন আর মাত্র ৫ শতাংশ মানুষের অসুখ জটিলতা সৃষ্টি করছে। এসব যদি এভাবেই চলতে থাকে তবুও শেষ রোগীটি সুস্থ হয়ে ফিরে আসতে আসতে অনেক সময় কেটে যাবে। এটা বিশেষ করে স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর বিরাট মানসিক চাপ। ইতিমধ্যে এই চাপ সহ্য করতে না পেরে কয়েকজন আত্মহত্যা করেছেন বলে খবর বেরিয়েছে, যদিও সেটা তদন্তসাপেক্ষ। সরকার থেকে স্বাস্থ্যকর্মীদের বিভিন্নভাবে উৎসাহিত করা হচ্ছে। ভলেন্টিয়ার হিসেবে যোগ দিয়েছেন অনেক মেডিক্যাল ইনস্টিটিউটের ছাত্রছাত্রী। এ ছাড়াও বয়স্ক মানুষ, যারা সত্যিকার অর্থেই রিস্ক জোনে, তাদের সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছেন অনেক স্বেচ্ছাসেবী। যদিও পশ্চিমি কিছু কিছু গোষ্ঠী সরকারের সমালোচনা করছে অনবরত, তবুও মূল রাজনৈতিক শক্তি এক হয়ে নেমেছে এই দুর্যোগ মোকাবিলায়। ইতিহাসে পড়েছি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এমনকি চার্চও (উল্লেখ করা যেতে পারে, স্ট্যালিনের সময় চার্চের ওপর অত্যাচার নেমে এসেছিল) সবাইকে যুদ্ধে যোগ দিয়ে পিতৃভূমিকে রক্ষায় অনুপ্রাণিত করেছিল। এখানেও অর্থোডক্স চার্চ, ইসলামি ধর্মীয় নেতা, ইহুদি প্রধান ও বৌদ্ধ ধর্মীয় প্রধান (এ দেশে এই চারটি ধর্মের যথেষ্ট অনুসারী আছেন) এ ব্যাপারে নিজেদের অনুসারীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, করোনা নিয়ন্ত্রণে সরকারি আদেশ পালন করতে। সব মিলিয়ে যুদ্ধ যুদ্ধ অবস্থা। যুদ্ধকালীন সময়ে যেমন, এই সময়েও তেমনই তৈরি হয়েছে বিভিন্ন স্টাব বা অপারেশন সেন্টার। আমাদের ইনস্টিটিউটও বাদ নেই। এসব সেন্টার নিয়মিত অনলাইন ব্রিফ করছে নিজেদের কর্মীদের। এককথায়, এই যুদ্ধে জয়ী হতে কিছু ব্যতিক্রম বাদে জাতি আবার একত্রিত হয়েছে। কয়েক দিন আগে, ৯ মে ছিল বিজয়ের ৭৫ বছর। বিশাল পরিকল্পনা ছিল। করোনার প্রকোপের কারণে সেটা হয়নি। তবুও লক্ষ লক্ষ মানুষ অনলাইনে তাতে অংশ নিয়েছেন। ক্ষমতায় আসার পর পুতিন সেন্টার বা নিজের হাতে প্রচুর ক্ষমতা কুক্ষিগত করেন। ইদানীং সংবিধান পরিবর্তনের কথা চলছে। কথা চলছে কেন্দ্রের ক্ষমতা কমানোর কথা, বিকেন্দ্রীকরণের কথা। ২২ এপ্রিল এ বিষয়ে গণভোটের কথা ছিল। তবে করোনার কারণে বিভিন্ন রাজ্যের হাতে অনেক ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছে। সেদিক থেকে দেখতে গেলে করোনা সুযোগ দিয়েছে সংবিধানে প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলোর বাস্তবে পরীক্ষা করে দেখার। আসলে সমস্ত দুর্যোগই শুধু বাধাবিপত্তি নয়, নিজের শক্তিকে পরীক্ষা করার সুযোগও। তবে সেটা দুর্যোগ না সুযোগ সেটা নির্ভর করে একান্তই নিজেদের ওপর। করোনা এদের সেই সুযোগ দিয়েছে। করোনার কারণেই স্বাস্থ্যব্যবস্থা ঢেলে সাজানো হচ্ছে, করোনা ভ্যাকসিন তৈরিতে অনুপ্রাণিত করা হচ্ছে, দেশে স্বেচ্ছাসেবী আন্দোলনকে নতুন গতি দিয়েছে। সবচেয়ে বড়কথা, এই দুর্যোগ সমস্ত দেশকে আবার একটা ঐক্যবদ্ধ শক্তিতে পরিণত করেছে। সেটাই বা কম কী? তবে এসবের হিসেবনিকেশ করা যাবে যখন শেষ করোনা রোগী সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়ে নিজের বাড়ি ফিরবেন। যেমনটি ফিরেছেন এক ভদ্রমহিলা তার শততম জন্মদিনে।
এখন মস্কোয় র্যান্ডম (Random) টেস্টের ঘোষণা করা হয়েছে। প্রতিদিন ১ লক্ষ টেস্ট করা হবে আর সেটা করা হবে ওই র্যান্ডম পদ্ধতিতে লোকজনকে আমন্ত্রণ জানিয়ে। এর মাধ্যমে তারা চাইছে করোনার নতুন চিত্র পেতে। বলা হচ্ছে, কয়েক দিন পরে এরকম টেস্টের সংখ্যা কয়েক গুণ বাড়বে। মানে, করোনা-যুদ্ধ চলবে আরও অনেক দিন।
[caption id="attachment_221928" align="aligncenter" width="600"]
ভলগা নদীর তীরে। ছবি: প্রতিবেদক[/caption]
এবার ব্যক্তিগত দু-চারটে কথা। তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যা নিয়ে কাজ করায় আমি ঘরে বসে কাজ করায় এমনিতেই অভ্যস্ত। এই সুযোগে অনলাইন ক্লাস নেওয়া শুরু করলাম। অনেকদিন ধরেই ডিপার্টমেন্ট থেকে বলছিল লেকচারগুলো ভিডিয়ো করা, হয়ে উঠছিল না। এখন অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার সময় সেটা রেকর্ড করছি। ফলে অনেকদিনের ইচ্ছেটা কিছুটা হলেও পূরণ হচ্ছে। মস্কোয় ছেলেমেয়েরা থাকে একই বাড়িতে, বিভিন্ন ঘরে। আগে সবাই যার যার ঘরে বসে থাকত, নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকত, খেত বাইরে। এখন তারা নিজেরা রান্না করে, একসঙ্গে সব কাজ করে। করোনা সাংসারিক বন্ধনকে দৃঢ় করছে, যদিও অনেকেই বলেন, সারাদিন ঘরে থাকার ফলে অনেক সময় অযথা মনোমালিন্য হচ্ছে। আসলে সবই নির্ভর করে মানুষের ওপর। ব্যক্তিমানুষ পরিস্থিতিকে কীভাবে নিতে পারে, পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে কতটা সম্পৃক্ত করতে পারে তার ওপর।
এসব ক্ষেত্রে আমি ছাত্রজীবনের একটা ঠাট্টার কথা বলি। একজন গণিতের ছাত্র আর একজন পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্রকে একটা ইলেকট্রিক কেটলি দেখিয়ে বলা হল— এই দ্যাখো খালি কেটলি। প্রথমে এতে জল ভরতে হবে, তারপর প্লাগে লাগিয়ে সুইচ অন করলে জল গরম হবে। এরপর শুরু হল প্র্যাক্টিক্যাল। দু’জনের হাতে জলভরা দুটো কেটলি দেওয়া হল। গণিতের ছাত্র কেটলি থেকে জল ফেলে নির্দেশ অনুযায়ী নতুন করে জল ভরে কেটলি প্লাগে লাগিয়ে সুইচ অন করল। পদার্থবিদ্যার ছাত্র ভরা কেটলি প্লাগে লাগিয়ে সুইচ অন করল।
আমি পদার্থবিদ্যার ছাত্র, যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হই, অবস্থা অনুযায়ী তার মোকাবিলা করার চেষ্টা করি। ভাল কী মন্দ জানি না, তবে এটা জীবনকে সহজ করে। এরাও সেটাই করছে। করোনার সঙ্গে লড়াই গিয়ে প্রতিদিনের নতুন অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নতুন নতুন পথে চলছে। যেমন, প্রথম দিকে সবাইকে হাসপাতালে নেওয়া হত। ফলে দ্রুত বেডের সংখ্যা কমতে শুরু করে। কিছুদিনের মধ্যেই দেখা গেল অনেকের চিকিৎসা বাড়িতে রেখেই করা যেত। তা ছাড়া করোনাভাইরাস কয়েক দিনের মধ্যে নিজের কাজ সেরে উধাও হয়ে যায়। পরবর্তীতে ঘটনা দু’দিকে যেতে পারে— হয় রোগী সেরে উঠতে শুরু করেন, নয়তো শুরু হয় বিভিন্নরকম জটিলতা। কারও ফুসফুসের সমস্যা, কারও হার্টের ইত্যাদি ইত্যাদি। তখন রোগীকে হয় ছেড়ে দিতে হয়, নয়তো অন্য রোগের চিকিৎসা করতে হয়। তাই এরপর তারা আর করোনা রুগি থাকেন না। অন্য রোগে ভোগেন। আসল কথা হল, তখন সাবেক করোনা রোগীকে অন্যত্র (সেটা বাড়ি হতে পারে, হতে পারে অন্য রোগের হাসপাতাল) স্থানান্তর করে তাকে যথাযথ পর্যবেক্ষণে রাখা। মোদ্দা কথা, এটা একটা জটিল ব্যাপার। তবে এখনও পর্যন্ত এরা সেটা সাফল্যের সঙ্গেই করছে। আশা করা যায়, এই পদ্ধতি কাজ করলে সেকেন্ড ওয়েভ এরা অধিকতর সাফল্যের সঙ্গে উতরাতে পারবে।
মা বলতেন, আমরা আশার দুয়ারে বান্দা খাটি। হ্যাঁ, এখন শুধু আমাদের আশায় থাকতে হবে আর পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক উপায়ে করোনা-নিধনের অস্ত্র খুঁজতে হবে। আর যে কথাটা না বললেই নয় তা হল, করোনার ফলাফল যাই হোক না কেন, প্রেসিডেন্ট, মন্ত্রিসভা, রাজনৈতিক দল ও স্বাস্থ্যকর্মীদের করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জয়লাভ করার আর করোনায় মৃতের সংখ্যা কম রাখার চেষ্টায় আন্তরিকতার কোন কমতি ছিল না।
লেখক গবেষক ও শিক্ষক, জয়েন্ট ইন্সটিটিউট ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ, দুবনা, রাশিয়া
পড়ুন প্রথম কিস্তি