
শেষ আপডেট: 28 April 2020 15:49
আমাদের আদি বাড়ি পূর্ববঙ্গের যশোর জেলায়। আর আমার ঠাম্মার ফরিদপুর। ছোটবেলা থেকে একান্নবর্তী পরিবারে বড় হওয়ার সুবাদে গল্প শুনে ওপার বাংলার ওপর বরাবরই আমার কেমন যেন ঘরের টান। তারপর কৈশোরে বাবার কাছে প্রথম শোনা ৭১-এর গল্প। ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হয়েও ভাষার জন্য প্রাণ দিতে পারে যে দেশের মানুষগুলো, তাঁদের না দেখেই তাঁদের সঙ্গে গড়ে ওঠে আমার ভাষার বন্ধন।
আমি লন্ডনে থাকাকালীন ইউনিভার্সিটি, কর্মক্ষেত্র, বাড়িভাড়া সূত্রে ওপার বাংলার একাধিক মানুষ আমার বন্ধু হয়ে ওঠেন। শুধু আমার ভাষা বাংলা বলে যে ভালবাসা আমি তাঁদের কাছে পেয়েছি তা ভোলার নয়। আমি একা ছাত্রাবস্থায় ছিলাম বলে বাড়িতে অতিথি আপ্যায়ন করে সুস্বাদু খাবার রান্না করে খাওয়ানো, বা বাড়িভাড়া কম করে নেওয়া অথবা দুর্গাপুজোয় শাড়ি উপহার, একসঙ্গে প্রতিমাদর্শন অনেক প্রাপ্তি ঘটেছিল।
আমি নিজে পশ্চিমবঙ্গের ধর্মনিরপেক্ষ এবং বামঘেঁষা পরিবেশে বড় হওয়ার দরুন কখনও কোনও ক্ষেত্রেই ধর্ম আমাদের বন্ধুত্বের মধ্যে বাধা হয়ে ওঠেনি। আশ্বাস পেয়েছি, আমি বাঙালি তাই আমি তাঁদের আপনার জন। তাই হয়তো সারা পৃথিবীতে ধর্মের উৎসব, দেশ স্বাধীনের উৎসব, আরও নানাবিধ উৎসব অনেক থাকলেও আমাদের বাঙালিদেরই আছে পৃথিবীর একমাত্র ভাষার উৎসব। লন্ডনেই প্রথম আমি বৈশাখী উৎসবে সামিল হই।
বৈশাখীতে আসলে বাঙালির নববর্ষ এবং রবীন্দ্রজয়ন্তী একসঙ্গে উদযাপন করা হয়। ওপার বাংলার মানুষের আয়োজনে বিদেশের মাটিতে এত বাঙালিকে নিজেদের দেশের বিভেদ ভুলে শুধু ভাষার টানে একত্রিত হতে দেখে আমার রোমাঞ্চ হয়েছিল, ভাষার প্রতি টান আরও মজবুত হয়েছিল সেই পরবাসে। তাই পরে কর্ম এবং বিবাহসূত্রে নিউইয়র্কে চলে আসার পর নিউইয়র্কের ছোট্ট বাংলাদেশ কুইনসের জ্যাকসন হাইটস আমার সর্বাধিক প্রিয় জায়গা হয়ে উঠতে সময় নেয়নি।
আমরা একাধিক সাবওয়ে (মেট্রো) পাল্টে জ্যাকসন হাইটস ছুটে গেছি কখনও বৈশাখী, কখনও বইমেলা, কখনও একুশে ফেব্রুয়ারি, কখনও শুধুই ভাল বাঙালি খাবারের অজুহাতে, আসলে কিন্তু গেছি শুধু বাংলাভাষা শুনব বলে, মানুষগুলোর সান্নিধ্য পাব বলে, যাঁদের চেষ্টায় আমার বাংলা পৃথিবীর সর্ববৃহৎ বৈচিত্র্যপূর্ণ স্টেট নিউইয়র্কের অন্যতম একটি সরকারি ভাষা। আমরা এপারের মানুষ বাংলাদেশের মতো বাংলাভাষাকে অতটা ভালবাসি না হয়তো, কিন্তু দেশ থেকে ১০০০০ মাইল দূরে আত্মীয়পরিজন, বাঙালি আড্ডা, খাওয়া এসব কিছু মিস করি বলে প্রায় সকলেই বাঙালি পরিমণ্ডলটাকে আঁকড়ে ধরি খানিক। আর প্রতিবছর এইসময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও দুই বাংলার মানুষ মিলে উদযাপন করি বৈশাখী।
কিন্তু এবছর করোনাভাইরাসের দাপটে সারা পৃথিবীতেই এখন লকডাউন চলছে, মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলেছে, তাই এবছরের বৈশাখীতে উৎসবের আমেজ নেই; ভিডিয়ো কলিংয়ের মাধ্যমে কেবল কিছু প্রতীকী সাংস্কৃতিক আড্ডা যাতে খানিক মানসিক তৃপ্তি পাওয়ার চেষ্টা যে, করোনার ভয়াবহতা আমাদের প্রাণের উৎসবের উদ্যমের কাছে হার মেনেছে। কিন্তু আমরা জানি, সত্যিটা আসলে তা নয়! পরিসংখ্যানের কঠিন বাস্তবটা অব্যক্ত যন্ত্রণা হয়ে গলার কাছে দলা পাকিয়ে ক্রমশ জমাট বাঁধছে।
মার্কিন নেভির পাঠানো কমফর্ট ১০০০ শয্যার ভ্রাম্যমাণ হাসপাতালটি প্রথমে নন-করোনা আক্রান্তদের জন্য পাঠানো হলেও করোনা আক্রান্তর ক্রমবর্ধমান সংখ্যার জন্য গভর্নর কুয়োমো প্রেসিডেন্টকে অনুরোধ জানিয়েছেন, যাতে কমফর্টকে করোনার জন্যই ব্যবহার করা যায়। করোনাভাইরাসের প্রভাবে ধুঁকছে আমেরিকার অর্থনীতি। এই অবস্থায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চাকরির বাজার মার্কিনিদের জন্য বাঁচিয়ে রাখতে এবং করোনাভাইরাসের সংক্রমণ আটকাতে অভিবাসন বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রেসিডেন্ট।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আক্রান্তর সংখ্যা ১০ লক্ষ ১১ হাজারের আশপাশে, মৃতের সংখ্যা ৫৬০০০ ছাড়িয়েছে। এর সিংহভাগই নিউইয়র্ক সিটি মেট্রোপলিটান এলাকায়, মানে নিউইয়র্কের ম্যানহাটন, কুইনস, ব্রংস এবং নিউজার্সির হাডসন, বার্গেন, এসেক্স, মিডলসেক্স। এখানে সম্মিলিতভাবে আক্রান্ত প্রায় ২৭০০০০, মৃত প্রায় ২০০০০। এই মৃত্যুমিছিলে আছেন ১৫০০-রও বেশি ভারতীয়, যাঁদের মধ্যে ৩ জন পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি এবং ২০০০-এর বেশি বাংলাদেশি মানুষ।
একথা স্বীকার করতে বাধা নেই যে, এই পরিসংখ্যান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি হাসপাতালগুলোর স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে বেআব্রু করে দিয়েছে। নিউইয়র্কের নার্সদের সংগঠন সম্মুখসমরে পিপিই এবং অন্যান্য অত্যাবশ্যক জিনিসের স্বল্পতার জন্য স্টেট এবং সংস্থার বিপক্ষে মামলা করেছে। কিন্তু এর ভিতরে আরও একটা পরিসংখ্যান লুকিয়ে আছে। এই নিউইয়র্ক সিটি মেট্রোপলিটন এলাকাতেই বাস করেন সমগ্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ দক্ষিণ এশীয়, লাতিনো এবং কৃষ্ণবর্ণ বংশোদ্ভূত মানুষ।
যাঁদের মধ্যে আবার বেশিরভাগই শ্রমজীবী মানুষ, এখানে যাদের বলা হয় আওয়ারলি পেইড। তাই ২ কোটি কাজ হারানো মানুষের সংখ্যাটাও এখানেই সবচেয়ে বেশি। কিন্তু তবুও রোজগারের জন্য লকডাউনের আগে এবং পরে তাদের মধ্যে অনেক লো স্কিল্ড এসেনসিয়াল কর্মী যেমন নিকাশিব্যবস্থা, খাবার, অনলাইন বাজার ডেলিভারিতে যাঁরা যুক্ত আছেন তাদের কাজে যেতে হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে নিয়মিত। যেহেতু ডাইভারসিটি গ্রিনকার্ড ভিসায় লো স্কিল্ড কর্মী হিসাবে বাংলাদেশ থেকে ৫০০০০ মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে আসেন তাই মৃত্যুমিছিলেও তাদের সংখ্যা বেশি।
যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা বেশ কিছু হাসপাতালে ল্যাপটপ বিলি করছে যাতে চলে যাওয়ার আগে মানুষটা তাঁর পরিবারের লোকজনকে শেষ বিদায়টুকু অন্তত জানাতে পারেন। কিন্তু এপিসেন্টারের এপিসেন্টার কুইনসের চিত্রটা একেবারে অন্যরকম। এখানে রোগীর আধিক্য এত বেশি যে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া থেকে মৃত্যু অবধি সে শুধুই একটা সংখ্যামাত্র, অনেকটা ওই রক্তকরবীর ৬৯ ঙ-র মতো। আনন্দবিহার, বান্দ্রা, সুরাতে আতঙ্কিত মানুষগুলো অথবা পায়ে হেঁটে ৩০০ কিমি পার করতে গিয়ে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করা মানুষটা, গ্রিক আইল্যান্ড বা মেক্সিকো-মার্কিন সীমানায় আটকে থাকা মানুষগুলো আর পৃথিবীর অধীশ্বর মার্কিন দেশের শ্রমিক সকলের কাছেই পরিবারের খালিপেটের সামনে সোস্যাল ডিসট্যান্সিং, কোয়ারেন্টাইন, করোনাভাইরাস এসব কিছু তাৎপর্যহীন শব্দমাত্র।
আসলে সারা পৃথিবীতে খেটেখাওয়া গরিব মানুষের অসহায়তাগুলো আদপে এক। যেন হুবহু মিলে যায় ১৮৪৪ সালে কার্ল মার্ক্সের লেখার সঙ্গে (ইকনমিক অ্যান্ড ফিলজ়ফিক ম্যানুস্ক্রিপ্টস)-- ‘পলিটিকাল ইকোনমির চোখে প্রোলেতারিয়েত বা সর্বহারা শ্রমজীবী হল ঘোড়ার মতো— কর্মক্ষমতা বজায় থাকার জন্যে তার যতটা দরকার সে কেবল ততটাই পাবে। যখন সে কাজ করছে না তখন আর তাকে মানুষ বলে বিবেচনা করার দরকার নেই।’ তেমনই পৃথিবী জুড়ে একই ছবি হল চরম সংকটের সময়ও রাজনৈতিক মতবিরোধ, নেতাদের নিজের দোষ ঢাকতে, ভোটবাক্স ভরাতে অন্যকে প্রত্যাঘাত করার প্রবণতা।
সমস্ত নঞর্থকতার মধ্যেও আমি চিরকালই আলো খুঁজতে শরণাপন্ন হই রবীন্দ্রনাথের কাছে-- ‘অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলো/ সেই তো তোমার আলো।/ সকল দ্বন্দ্ব-বিরোধ-মাঝে জাগ্রত যে ভালো,/ সেই তো তোমার ভালো।’ আর তাই তো মার্কিন প্রেসিডেন্ট যখন এই সংকটকালেই হু-কে দেয় ১৩.৭ শতাংশ অনুদান প্রত্যাহার করে নেন তখনই লেডি গাগার উদ্যোগে গ্লোবাল সিটিজেন, বিশ্বের তামাম সঙ্গীতশিল্পী, অভিনেতা, ইউনিভার্সিটি, বিজনেস টাইকুন, রাজনৈতিক ব্যক্তি, ইউএন একসঙ্গে মিলিত হয়ে ভার্চুয়াল কনসার্ট ‘One World: Together at Home’ অনুষ্ঠিত করে হু-র জন্য ১২৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার তুলে দেন। কে নেই সেই তালিকায়? লেডি গাগা, অপরা উইনফ্রি, মিশেল ওবামা, জেনিফার লোপেজ, জন লেনন, বেয়োন্সে, সেলিন ডিয়োন, শাহরুখ খান, প্রিয়াঙ্কা চোপড়া জোনস, রোলিং স্টোনস, জন লেজেন্ড, বিলি জো, ডেভিড এবং ভিক্টোরিয়া বেকহাম, বিল গেটস, অ্যাপল, কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি, মাউন্ট সিনয় ইউনিভার্সিটি এবং আরও অনেক গুণী এবং শ্রদ্ধেয় মানুষ ও সংস্থা, চিকিৎসক, নার্স যাঁরা এই বিপদকালীন সময়ে সাহস যোগান।
অন্ধকারের মধ্যে আলোর রেখার মতো ভেসে আসে গভর্নর কুয়োমোর সাংবাদিক সম্মেলন যে, আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ধীরে হলেও কমতে শুরু করেছে, মৃত্যুর সংখ্যাও প্রতিদিন ধীরে ধীরে কমে এখন ৮০০ থেকে ৪০০। সুখবর হয়ে আসে যে, দুই কোটি জীবিকা হারানো এবং কম রোজগেরে মানুষকে মার্কিন সরকার ১২০০ মার্কিন ডলার করে দেবে। আর তার সঙ্গে নিউইয়র্কের অনথিভুক্ত অভিবাসী যাঁরা ১২০০ মার্কিন ডলারের আওতায় পড়ছেন না তাদের গভর্নর কুয়োমো ৫০০ মার্কিন ডলার দেবেন বলে ঘোষণা করেছেন।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয় বহুপ্রতীক্ষিত আশার খবর যে, জুলাইতেই হয়তো এসে যাবে কোভিড ১৯-এর ওষুধ আর সেপ্টেম্বরের মধ্যেই হয়তো ভ্যাকসিন। ততক্ষণ জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা আমরা-- দুই পারের বাঙালিরা এই ঘরবন্দি জীবনে রবীন্দ্রনাথকে আঁকড়ে নতুন আশায় বুক বাঁধি সেই দিনটার অপেক্ষায়, যেদিন আবার মানুষের হাত স্পর্শ করার, দেশে গিয়ে স্বজনকে আলিঙ্গন করার স্বাধীনতা ফিরে পাব সুস্থ, নতুন এই পৃথিবীতে। সেই দিনই তো হবে আমাদের আসল নববর্ষ-- বৈশাখীর সঠিক উদযাপন।
(শিক্ষিকা আদৃতা মুখোপাধ্যায় বর্তমানে নিউইয়র্ক সিটি মেট্রোপলিটন এরিয়ার বাসিন্দা।)