
শেষ আপডেট: 8 August 2022 08:19
নস্টালজিক বাঙালির একটি অন্যতম অভ্যেস হল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (Rabindranath Tagore)। মুদ্রাদোষও বলা চলে। একেবারে শিশুকাল থেকেই। এই একবিংশ শতকের মুখে এসেও বাচ্চারা যেসব কবিতা বলে বাহবা পায়, তার মধ্যে ‘বীরপুরুষ’ বা সহজপাঠের ‘আমাদের ছোট নদী’ থাকে। এখনও হোমটাস্কের পাতায় শিলং পাহাড়ে ঝর্নার জল বেড়ে গিয়ে কর্ণফুলি বা উস্রি নদীতে বন্যা হয়। অবরে-সবরে ছবি আঁকার খাতা, দাড়িওয়ালা, খড়্গনাসা ঠাকুরের পোর্ট্রেটে ভরে ওঠে। হারমোনিয়ামে গলা সাধতে গিয়ে ‘আয় তবে সহচরী’ বা পাড়ার ফাংশনে ‘ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে’-র প্রস্তুতি-সাজের শাড়ি সবই এই অভ্যস্ত যাপনের অংশ। এরকম অনেক আসঙ্গের মধ্যে দিয়ে বাঙালির জীবনে রবীন্দ্রনাথের প্রবিষ্ট হওয়ার এই প্রক্রিয়া চিরকালীন। প্রথমে বোঝা যায় না, এই গাঁটছড়া আসলেই আজন্মের-- শুধু বয়েস বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর রূপান্তর ঘটে।
এই অভ্যাসের প্রতিক্রিয়া যে বাঙালি মননে সবসময়ে ইতিবাচক হয়েছে এমনটা নয়। ‘সঙ্কোচের বিহ্বলতা নিজেরে অপমান’ যে আয়াসে একজন গড়পড়তা বাঙালি গুনগুন করবেন, কার্যক্ষেত্রে তার যাপনচর্যায় ফুটে ওঠে সম্পূর্ণ উল্টো ছবি। সেই বাঙালির অধিকাংশের বিরুদ্ধে অভিযোগ পরশ্রীকাতরতার, উদ্যম-বিমুখতার, এমনকি রবীন্দ্রনাথ জোরালোভাবে যে সম্প্রীতির কথা বলেছিলেন তার সম্পূর্ণ বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে উৎকট সাম্প্রদায়িকতার। এই উত্তরাধিকার-ভ্রষ্ট বাঙালির খাজনার ভাঁড়ার যতই শূন্য হয়েছে, অলিতে-গলিতে কবিপ্রণামের বাজনা তত জোরদার হয়েছে।
রবীন্দ্র-গান, বিশেষ করে কয়েকটি গান, সহজিয়া সুরের কারণে অল্প আয়াসেই গাওয়া যায়। এইসব গানের রচনা-নৈপুণ্য এত অনুপম যে বাণীর ভারে সুরের প্রগতি রুদ্ধ হয় না, যেকোনও পঙক্তি সহজেই গলায় তুলে নেওয়া যায়। লক্ষ্য করার বিষয়, তাঁর সমসাময়িক গীতিকারদের এই সর্বজনগ্রাহ্যতা নেই, একই কথা প্রযোজ্য ভারতীয় লঘুসঙ্গীতের ক্ষেত্রেও। বাঙালি প্রজন্ম অতএব তাঁর সহজপাচ্য সুরটুকু তুলে নিয়েছে, বাণীর অংশটুকু রয়ে গেছে অবহেলিত। তাছাড়া, নোবেল প্রাপক, জাতীয়সঙ্গীত রচনাকার, সর্বোপরি তাঁর শালপ্রাংশু অথচ কোমল অবয়ব নিয়ে রবীন্দ্রনাথ এমন এক বিভা, যার সামান্য পরিচিতি অবলম্বন করলেই সংস্কৃতিবান তকমা পাওয়া যায়। এমন সুযোগ হাতছাড়া করে কে!
রবীন্দ্রনাথ নিজে অবশ্য সাহিত্যগ্রাহিতা সম্পর্কে বলেছেন যে, ‘যেখানে আর্টের উৎকর্ষ সেখানে গুণী ও গুণজ্ঞদের ভাবের উচ্চশিখর। সেখানে সকলেই অনায়াসে পৌঁছবে এমন আশা করা যায় না-- আমাকে যদি জিজ্ঞাসা করো এ সমস্যার মীমাংসা কী, আমি বলব-- মেঘদূত গ্রামের দশজনের জন্যেই, কিন্তু যাতে সেই দশজনের মেঘদূত নিজের অধিকার উপলব্ধি করতে পারে, তারই দায়িত্ব দশোত্তরবর্গের লোকের।’ (ছিন্নপত্রাবলি-- ইন্দিরা দেবীকে লেখা চিঠির অংশ)
এখন প্রশ্ন হল, এই দশোত্তরবর্গের লোক কারা? ষাট-সত্তর বছর আগেও এরা ছিলেন বাঙালি মধ্যবিত্ত– এঁরাই আকাদেমি, রবীন্দ্রসদন চত্বরে থিয়েটার আন্দোলন করেছেন, দলবেঁধে চলচ্চিত্র উৎসব দেখতে গেছেন, শক্তি সুনীল শরৎ উঠে এসেছেন এঁদের মধ্যে থেকেই। ক্রমে খোলাবাজার এসে শিখিয়েছে বিক্রয়যোগ্য পণ্য না হলে বা সরকারি সংরক্ষণ না পেলে এই রসগ্রাহিতার কোনও কদর নেই। এই দুটোর কোনও শর্তই পূরণ হয়নি। অতঃপর সেই মধ্যবিত্ত শ্রেণি মন দিয়েছে গ্রাসাচ্ছাদনের কাজে, খোলা অঙ্গনে এখন সংস্কৃতি-– যশাকাঙ্ক্ষীর নিরেট আনাগোনা।
এর সবচেয়ে বড় নিদর্শন হল করোনা মহামারীর সময়েও পঁচিশে বৈশাখের মরিয়া অনলাইন উদযাপন। ধরা যাক, ক-বাবু হয়তো সকালবেলায় পোস্ট করেছিলেন:
‘বিধাতার রুদ্ররোষে
দুর্ভিক্ষের দ্বারে বসে
ভাগ করে খেতে হবে সকলের সাথে অন্নপান।
অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।’
তিনিই হয়তো বেলা গড়ালে পোস্ট করলেন লকডাউনের অবসরে তৈরি করা লোভনীয় খাদ্যের ছবি। এর পাশাপাশি ত্রাণ এবং দানের মানবিক ছবির বন্যায় ভেসেছে সামাজিক মাধ্যম। একই সঙ্গে উঠে এসেছে চল্লিশ কিলোমিটার হেঁটে আসা ক্ষুৎপিপাসু পরিযায়ী শ্রমিকদের ছিন্নভিন্ন শরীর। এই দেখানেপনার স্রোতে রবীন্দ্রানুরাগী বাঙালি যে অপমানের স্তর স্পর্শ করেছে, তাতে করে তার সমান হওয়া খুবই কঠিন। সত্যদর্শী রবীন্দ্রনাথ এই পরিণতি আন্দাজ করতে পেরেছিলেন বলে মনে হয় না। একের দুঃখ অনেকের মধ্যে সনাক্ত করার যে নজির রবীন্দ্রনাথ বারবার রেখে গিয়েছেন তাঁর অসংখ্য গান, কবিতা, গল্প ও নাটকে, এসব দেখেশুনে মনে হয় তা হয়তো অনাবিষ্কৃত বা অচর্চিতই রয়ে গেল এখনকার বাঙালির নির্বিকার জীবনচর্যায়।
(ড. প্রসেনজিৎ সরখেল কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর। মতামত ব্যক্তিগত।)