
শেষ আপডেট: 16 October 2021 06:30
বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও চিন সীমান্তবর্তী সব রাজ্যেই এই নয়া সীমারেখা বলবৎ হয়েছে। কিন্তু পাঞ্জাব ছাড়া আর কোনও রাজ্য সরকারই নয়া সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সরব হয়নি। হতে পারে, পুজোর ছুটির কারণে নবান্নের কর্তারা এই ব্যাপারে এখনও প্রকাশ্যে মুখ খোলেননি। পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী চরণজিৎ সিং চান্নী দিল্লি গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ’র সঙ্গে দেখা করে বলে এসেছেন, এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার পরিপন্থী। রাজ্যগুলির অধিকারে হস্থক্ষেপ। পাঞ্জাবে কৃষক বিদ্রোহ দমনে সোজা আঙুলে ঘি ওঠেনি। বিএসএফের ক্ষমতা বৃদ্ধির পিছনে আঙুল বাঁকানোর চেষ্টার আভাসও দেখছেন কেউ কেউ। আর পাঞ্জাবে তো কয়েক মাস পরেই বিধানসভার নির্বাচন। হয়তো সেই কারণে চান্নী একটু বেশি সক্রিয়। যদিও পাঞ্জাবের সদ্য ক্ষমতাচ্যুত কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী অমরিন্দর সিং দিল্লির সিদ্ধান্তের প্রশংসা করছেন। তিনি এখন আবার কংগ্রেস বিরোধী শিবিরের মানুষ। যে রাজ্যগুলির উপর এই সিদ্ধান্ত বলবৎ হয়েছে তার মধ্যে কংগ্রেস শাসিত আর এক রাজ্য হল রাজস্থান। এছাড়া বিরোধী শাসিত রাজ্য হল পশ্চিমবঙ্গ। বাকি রাজ্যগুলি বিজেপি শাসিত অথবা সরকার তাদের নিয়ন্ত্রণ আছে।
পশ্চিমবঙ্গে শাসক দল তৃণমূল দিল্লির সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছে। সৌগত রায়, কুনাল ঘোষরা মুখ খুলেছেন। অন্যদিকে, সমর্থন জানিয়েছেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। ফলে এ রাজ্যেও পুজোর ছুটি শেষে এ নিয়ে রাজনীতি তুঙ্গে উঠবে ধরে নেওয়া যায়। কিন্তু কিছু বিষয় আছে রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে বিচার-বিবেচনা জরুরি।
প্রথম সমস্যা। পুলিশ ও বিএসএফের মধ্যে কাজের এলাকার পরিধি নিতে বিবাদ-বিতর্ক-সংঘাত দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। তার চাইতেও বড় সমস্যা সীমান্তে বিএসএফের কাজকর্ম নিয়ে এলাকাবাসীর অভিজ্ঞতা মোটেই সন্তোষজনক নয়। সবচেয়ে বড় অভিযোগ হল, ময়দানে নেমে তারা অনেক সময়ই স্বদেশি আর বিদেশি নাগরিকের ফারাক করে না। যদিও আন্তর্জাতিক আইন, চুক্তি ইত্যাদি অনুযায়ী কোনও পরদেশির উপরও অন্যায়ভাবে নির্যাতন করা যায় না। এমনকী কাঁটাতারের বেড়া পেরনো মানুষকেও বাঁচার সুযোগ না দিয়ে নির্মমভাবে গুলি করে মারা চলে না।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মতো আমাদের দেশেও সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর ভূমিকা সন্তোষজনক নয়। সন্দেহবশে আটক, নির্যাতনের অভিযোগ বিস্তর। মানবাধিকার হরণের একাধিক ঘটনায় অধিকার রক্ষা সমিতিগুলি এই বাহিনীর বিরুদ্ধে সরব। মুর্শিদাবাদের সাগরপাড়া থানার সাহেবনগর গ্রাম পঞ্চায়েতের বর্ডার সংলগ্ন গ্রাম ‘চককাক মারী’র ঘটনাটির কথাই ধরা যাক। গত ফেব্রুয়ারিতে ওই গ্রামের বছর সত্তর বয়সি কৃষক মোফাজুল শেখকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে বিএসএফের বিরুদ্ধে। গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা সমিতির ডোমকল শাখার অনুসন্ধানকারী টিমের কাছে গ্রামবাসীরা অভিযোগ করেন, বৃদ্ধ নিজের জমি থেকে অদূরে নীচু জমিতে ঘাস কাটতে গিয়েছিলেন। বিএসএফ ক্যাম্পে নাম এন্ট্রি করেই ঘাস কাটতে যান। তবু রেহাই মেলেনি। সাহেবনগর গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রাক্তন সদস্য মাইনুল হক বলেন, বিএসএফ ক্রমশ গ্রামের ভিতরে ঢুকে পড়ছে। বিএসএফ ক্যাম্প ইনচার্জ সনু কুমার অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
এ বছর ফেব্রুয়ারিতেই হিউম্যান রাইটস ওয়াচ নামের সংগঠনটি সাংবাদিক বৈঠক ডেকে বিএসএফের কার্যকলাপ নিয়ে সরব হয়। বছর দশেক আগে ওই সংগঠনটি তাদের ‘ট্রিগার হ্যাপি’ শীর্ষক রিপোর্টে বিএসএফের নির্দয়তার ছবি তুলে ধরেছিল।
তাদের বক্তব্য, ওই রিপোর্ট প্রকাশের পর ভারত সরকারের তরফে বলা হয়, সীমান্ত রক্ষী বাহিনীকে নন-লেথাল অস্ত্র ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যাতে মৃত্যু এড়ানো যায়। কিন্তু আর একটি সংগঠন বাংলার মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ দাবি করে, তারা ২০১১ থেকে এ পর্যন্ত বাংলার সীমান্তে ১০৫টি হত্যার ঘটনা নিয়ে তদন্ত কর দেখেছে, পরিস্থিতির কোনও পরিবর্তন হয়নি। যদিও বিএসএফের অতিরিক্ত ডিজি (ইস্ট) পঙ্কজকুমার সিং সংবাদমাধ্যমের কাছে দাবি করেছেন, বিএসএফ মৃত্যু এড়ানো সম্ভব, এমন অস্ত্রই ব্যবহার করছে। প্রাণের ঝুঁকি নিয়েই এগুলির ব্যবহার করছেন জওয়ানেরা। অন্যদিকে, বাংলার মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চের অভিযোগ, বছর পাঁচেকের মধ্যে বাংলা সীমান্ত এলাকায় ২৪০টি ঘটনার তদন্তে তারা দেখেছে অন্তত ৬০টি ক্ষেত্রে বিএসএফের পক্ষে হত্যা এড়ানো সম্ভব ছিল।
কাজের এলাকার পরিধি বৃদ্ধির ফলে এই ধরনের অভিযোগ আরও বেড়ে যাওয়া অসম্ভব নয়। তাতে অঞ্চল বিশেষে কোনও গোষ্ঠী, সম্প্রদায়কে ঘিরে স্পর্শকাতরতাজনিত ভারসাম্য বিঘ্নিত হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। কারণ, পুলিশের সঙ্গে আধা সেনার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলা করার চরিত্রগত ফারাক আছে। পুলিশ কাজ করে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি, পরিনতির কথা বিবেচনায় রেখে। অন্য বাহিনী সে দায় ততটা পালন করে না, এটাই বাস্তব। বিধানসভা ভোটে কোচবিহারের শীতলকুচির ঘটনা আমাদের নিশ্চয়ই মনে আছে। বুথের গোলমাল থামাতে আধা সেনার গুলিতে পাঁচজনের প্রাণ যায়। নিহতদের একজন নাবালক। ওই ঘটনার প্রাথমিক তদন্তেও দেখা গিয়েছিল, গুলি না ছুঁড়েই পরিস্থিতি সামলানো যেত। বাংলার বিধানসভা ভোটে যত আধা সেনা মোতায়েন করা হয়েছিল, সেনা শাসনাধীনে থাকা কোনও দেশেও এত ফৌজ নামিয়ে ভোটের নজির খুব একটা নেই। শুধু বাংলার ভোটই নয়, দেশের অভ্যন্তরেও কথায় কথায় আধা সেনা মোতায়েনের প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। ঘটনাচক্রে কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দেশের মধ্যেও অনেক সময় প্রধানমন্ত্রীর মতো বিশেষ বিমানে চলাফেরা করেন। তাঁর জন্য বরাদ্দ বিএসএফের একটি বিমান।
আধা সেনার এমন আচরণের বহুমাত্রিক কারণ আছে। প্রথমত, তাদের হাতে লাঠি তেমন একটা থাকে না। থাকে বন্দুক। সাধারণ প্রয়োজনেও সেটাই তারা ব্যবহার করে। দ্বিতীয়ত, এই ধরনের বাহিনীর জওয়ানদের বেশিরভাগেরই চিন, পাকিস্তানের সীমান্তে কাজ করতে হয় যেখানে ৩৬৫ দিন গোলা-গুলি চলে। তারা যুদ্ধ করে শত্রুর বিরুদ্ধে। অন্যদিকে, পুলিশের কাজ নাগরিকদের নিয়ে। সাধারণ নাগরিক কোনও কারণে অশান্ত হয়ে অস্ত্র ধরলেও পুলিশ প্রথমেই গুলি চালিয়ে হত্যা করতে পারে না। তৃতীয়ত, ঘন ঘন কাজের জায়গা বদলি, থাকা-খাওয়ার অনিশ্চিয়তার কারণেও তাদের মধ্যে অসহিষ্ণুতা তুলনামূলকভাবে খানিক বেশি। কার্যত যাযাবরের জীবনযাপন করতে হয় এই বাহিনীকে। এতটা প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে কিন্তু সেনাকেও কাজ করতে হয় না।
সীমান্ত সুরক্ষা বিশেষজ্ঞদের একাংশ মানছেন সীমান্ত অপরাধ, বিশেষ করে জাল নোট, মাদক ইত্যাদির পাচার অনেক বেড়ে গিয়েছে। তাদের মতে, এই পরিস্থিতিতে পুলিশে আরও লোকলস্কর নেওয়া এবং আধুনিকীকরণ জরুরি। তাতে সামগ্রিকভাবেই আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।
গত সোমবার কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক বিজ্ঞপ্তি জারি করে বলেছে, উত্তর-পূর্ব ভারতে অসম বাদে বাকি রাজ্য এবং কাশ্মীর ও লাদাখ এলাকার পুরোটাই আগের মতো বিএসএফের নজরদারির আওতায় থাকবে। অন্যদিকে, পাঞ্জাব, অসম এবং পশ্চিমবঙ্গ এবং রাজস্থানে সীমান্ত থেকে ৫০ কিলোমিটার এলাকা তারা নজরদারী চালাবে। যা এতদিন ১৫ কিলোমিটার ছিল। অন্যদিকে, সীমান্তে ৮০ কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে থাকা সমস্ত এলাকায় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী নজরদারি চালাতে পারত গুজরাটে। নয়া বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, গুজরাটেও তারা পশ্চিমবঙ্গ, পাঞ্জাব ও অসমের মধ্যে ৫০ কিলোমিটার দূরত্ব পর্যন্ত নজরদারি চালাতে পারবে।
সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কাজের এলাকার পরিধি নিয়ে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তিটি জারি হয়েছিল ২০১৪ সালে। ১৯৬৮ সালে চালু হওয়ার বিএসএফ আইন অনুযায়ী সীমান্তরক্ষী বাহিনী তাদের জন্য নির্ধারিত এলাকার মধ্যে ভারতীয় ফৌজদারি দণ্ডবিধি, পাসপোর্ট আইন, চোরাচালান প্রতিরোধ আইন, মাদক পাতার প্রতিরোধ আইন, অস্ত্র আইন এবং শুল্ক আইনে যে কোনও ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করতে এবং তল্লাশি করতে পারবে। একই উদ্দেশ্যে তারা যে কোনও বাড়ি, প্রতিষ্ঠানেও হানা দিতে পারে। এছাড়া দেশ বিরোধী ষড়যন্ত্র প্রতিরোধ সংক্রান্ত যাবতীয় আইনেও তাদের ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা আছে। প্রশ্ন হল, এই সব অপরাধের কি কোনও গণ্ডি আছে? এমন অপরাধের প্রবণতা যদি বাড়তে থাকে তখন কি গোটা দেশে সেনা নামাব?
পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা 'সুখপাঠ'