
শেষ আপডেট: 25 December 2023 12:18
পিয়ালী দত্ত চক্রবর্তী
মাঝে মাঝে বুঝতে খুব অসুবিধা হয় সত্যিই কি আমরা সময়ের সঙ্গে এগোচ্ছি নাকি সমগতিতে পিছনের দিকে হাঁটছি?
চারিদিকে রাজনৈতিক ক্ষমতা আর না জানি কোন পথে উপার্জনের টাকাপয়সার তীব্র অহংকারের চাপে পড়ে আমাদের, মানে বাঙালিদের সংস্কৃতি একবারেই পথে বসতে চলেছে। প্রচুর টানা হ্যাঁচড়া করে একটা বিরাট বস্তা বা জগদ্দল পাথরকে হয়তো নাড়িয়ে দেওয়া যায় বা তোলাও যায়। কিন্তু একটা জাতির সংস্কৃতি, যেটা বেওসাদার গোষ্ঠীর অফুরন্ত টাকার বিশাল দেখনদারি আর টাকা থাকলে যা ইচ্ছে তাই করার ডোন্ট কেয়ার হাবভাব আর হম্বিতম্বির আস্ফালনের জুতোর তলায় পিষে যেতে যেতে থেঁতলে দলা পাকিয়ে লুটিয়ে পড়ে মৃত্যুর অপেক্ষা করতে করতে প্রতিদিন বেঁচে থাকা অভ্যাসে পরিণত করে নিয়েছে। তাকে ঠেলেঠুলে কোনওমতে জাগিয়ে রাখা সত্যিই সম্ভব কিনা বা কতদিন সম্ভব জানি না!
আমি বাঙালি-অবাঙালি ভেদাভেদ করতে একদম আগ্রহী নই। কিন্তু আমার বক্তব্য কিছু ব্যক্তি বা সমষ্টির প্রতি, সে বাঙালিই হোক বা অবাঙালি, আমরা আমাদের যার যার সংস্কৃতি ভুলে একটা অদ্ভূত জগাখিচুড়ি সংস্কৃতিতে মেতে থাকতে পছন্দ করি। যেখানে প্রায় পুরোটাই অর্থের আস্ফালন আর তার উপর ভর করেই ক্ষমতার অপব্যবহার।
এক্ষেত্রে প্রায় প্রত্যেকের মনের মধ্যে একটাই ধারণা বদ্ধমূল--'যার অর্থ আছে, ক্ষমতা তারই এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করার পূর্ণ অধিকারও একমাত্র তারই আছে।'
এই প্রসঙ্গে একদম সাম্প্রতিক একটা ঘটনা না বললেই নয়। আমরা হাওড়া শহরের একটি তথাকথিত অভিজাত রেসিডেন্সিয়াল কমপ্লেক্সে বাস করি। এটি হাওড়া ময়দান সংলগ্ন একটি কসমোপলিটন এলাকায় অবস্থিত। অভিজাত বললাম বটে কিন্তু লেখার সময় বেশ ইতস্ততঃ লাগছিল। আসলে বাংলা ভাষায় অভিজাত শব্দের মানেটা ছোটবেলা থেকে যেভাবে জেনে এসেছি, এখানে কিন্তু সেটার সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা অর্থ। এখানে আভিজাত্য মানে একদম সহজ। কালচার ফালচার ওসবে মারো গোলি। টাকা আছে আর সেই টাকা দিয়ে দুনিয়া কিনে নিতে পারি। টাকা আছে আর সেটা দেখাব না, এ কোই কাম কি বাত হ্যায় ক্যা? ফুট লে কাঙ্গালি বাঙ্গালি কাহিঁকে!
কদর্যভাবে অশালীন, রুচি যেখানে ভীষণভাবে অরুচিকর, জবরদস্তি অর্থের আস্ফালন আর সেটা দেখানোর প্রক্রিয়া হল--কথায় কথায় ওপেন এয়ার ডিজে বক্সের সঙ্গে উদ্দাম নৃত্য আর সঙ্গে পানীয়র ফোয়ারা। যে গানের না আছে মাথা না আছে মুণ্ডু।
বিষয়টা এই পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকলেও মানা যেতো। যে যেরকম পরিবেশে বড় হয়েছে, মানে বেড়ে উঠেছে তার কালচার তো তেমনই হবে! উঁহু, শুধু তাই নয়, এদের চমক ধমকও কিন্তু সাংঘাতিক। মানে ধরুন আপনি বললেন, "না এটা চলতে পারে না.. প্রথমত ওপেন এয়ার ডিজে বক্স বাজানো বিশেষত একটা বহুতল আবাসনে যেখানে বয়স্ক মানুষ এবং বাচ্চারা আছে সেখানে সম্পূর্ন বেআইনি"। আপনি NATIONAL GREEN TRIBUNAL এর আইনের কথা মনে করিয়ে দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের কাছে অভিযোগ জানানোর কথা যেই না স্মরণ করালেন, সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে গেলো ব্যক্তিগত আক্রমণ।
আমাদের শয্যাসঙ্গিনী হোয়াটস্যাপের মাধ্যমে ঘোষিত হল সে আক্রমণ। অকথ্য গালিগালাজ, তির্যক মন্তব্য ইত্যাদি ইত্যাদি। কী অদ্ভুত এই সুন্দর মাধ্যমটি। এখানে কেউ একটি মন্তব্য করার সঙ্গে সঙ্গেই কিছু লোক আবার ফেউ ধরে বিভিন্ন সমর্থন যোগ্য ইমোজি দিয়ে যার নেপথ্যেও রয়েছে আরও একটি হোয়াটস্যাপ গ্রুপ। এরকম শয়ে শয়ে গুপ্ত হোয়াটস্যাপ গ্রুপ খুলে আপনি কিন্তু আপনার শত্রুকে একেবারে পিষে ফেলতে পারেন।
সে যাক। যে প্রসঙ্গে ছিলাম। আপনারই কমপ্লেক্সে রাত ১১টার পর ওপেন এয়ার ডিজে বক্সের বিকট আওয়াজ আর উদ্দাম নৃত্য সহযোগে পার্টি অনুষ্ঠিত হবার বিরুদ্ধে আপনি যেই আপনার বক্তব্য জানালেন.,সঙ্গে সঙ্গে ওই দন্ডমুন্ডের কর্তৃত্ব ফলানো হোয়াটস্যাপ গ্রুপে একদল লিখতে থাকলেন, "যার অসুবিধে হবে সে কানে তুলো গুঁজে থাকবে। কিন্তু পার্টি হবে.. হবে এবং হবেই! রাত ১২ টার পর থেকে আসল সেলিব্রেশন চলবে। সারারাত খানা পিনা গানা বাজানা। লাইফ মে মস্তিষ্ক কি জরুরত নহি, জরুরত হ্যায় মস্তি, মৌজ।"
আশ্চর্য ভাবে তারা এসব মন্তব্য করছেন ওই হোয়াটস্যাপ গ্রুপেই যেখানে আরও প্রায় আশি জন ফ্ল্যাট ওনার রয়েছেন। কী অদ্ভুত. ব্যাপার! দু' একজন ছাড়া বাকিরা কিন্তু নিশ্চুপ! ধরুন দুর্ভাগ্যক্রমে কোনও দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের সিনিয়র অফিসার ছিলেন ওই গ্রুপেই, আর তিনিও ওই প্রতিবাদের পক্ষেই সওয়াল করলেন। ব্যস উনিই হয়ে গেলেন আসল টার্গেট। এই লোকটাই তার মানে অন্যান্যদের ওসকাচ্ছে। আর একটি বিশেষ গোষ্ঠীর সারারাত ব্যাপী উদ্দাম আনন্দে বাধা সৃষ্টি করছেন।
তাহলে কী করা যায়। এই অফিসারকে একেবারে পিষে ফেলো, "আরে দাদা আপনি একাই পলিউশন অফিসার নাকি। এতো চুলকানি কিসের দাদা আপনার। আগেরবার পায়ে ধরে ক্ষমা চেয়ে পার পেয়েছেন। মনে রাখবেন সে বার যিনি ক্ষমা করেছিলেন তিনি অনেক বড়ো মানুষ ছিলেন। এবার কিন্তু কোনও লাফড়া হলে সোজা গায়ে হাত উঠে যাবে"।
আরে.. আরে.. চমকে উঠলেন নাকি, ভুলে গেছেন বোধহয় আমরা কোথায় বাস করি। না না রেল লাইনের ধারে কোনও ঝুপড়িতে নয়। এক অভিজাত রেসিডেন্সিয়াল কমপ্লেক্সে ! কিন্তু মুশকিল হল কাঁচা পয়সার জেরে এখানে উঠে এসেছেন এমনই কিছু মাটির মানুষ, যাদের কথাবার্তাতেও সেই গন্ধই স্পষ্ট। কারণ 'মা মাটি আর মানুষের' কল্যাণে প্রশাসন এখন তাঁদের পকেটে। হ্যাঁ একদম ঠিক ধরেছেন! এরা গুটখার ব্যবসায়ীই হোক বা মাছের কারবারি কিংবা ট্রান্সপোর্টের ব্যবসা করা মাটি থেকে উঠে এসে অট্টালিকায় বসবাস করা কিছু মানুষ, যাদের কাছে বিষয়টা আকাশের চাঁদ পাওয়ার মতো। আর চাঁদে যদি কলঙ্করা নিজেরাই গিয়ে উপস্থিত হয়, তাহলে তার অবস্থা খারাপ হবে, এটাই তো স্বাভাবিক।
কিন্তু প্রশ্ন অন্য জায়গায়। একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমাদের কী কী অধিকার? আর সে অধিকার রক্ষা করার দায়িত্ব কার? প্রশাসন নাকে তেল দিয়ে ঘুমোতে পারে কী করে যেখানে প্রশাসনের বিভিন্ন দফতরে লিখিত অভিযোগ করার পরেও একজন ব্যক্তিকে ক্রমাগত আক্রান্ত হতে হয়। সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয়, যিনি প্রতিবাদ করছেন তিনি নিজেই দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের এর একজন সিনিয়র ইঞ্জিনিয়ার। আরও একজন যিনি বিশিষ্ট জনপ্রিয় লেখক ও সরকারি অফিসার। কেউ বা আবার সিনিয়র সফটওয়্যার কর্মী।
এইসব দেখে আমার তপন সিংহের আতঙ্ক সিনেমার কথা ভীষণ মনে পড়ে যায় ..."মাস্টারমশাই আপনি কিন্তু কিছুই দেখেন নি"। প্রশ্ন এটাই আর কতদিন ওই মাস্টারমশাই এর ভূমিকায় আমাদের সবাইকে অভিনয় করে যেতে হবে জানি না। সত্যিই কি নিরপেক্ষ প্রশাসন বলে কিছু আছে, নাকি সেটাও সোনার পাথর বাটিরই নামান্তর? আমি প্রশাসনের কাছে একটাই প্রশ্ন রাখতে চাই, মাইনে তো আপনারা সরকারের কাছ থেকে পান। সেটাও আবার আমাদের মতো সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকায়। তাহলে দায়িত্ব পালন বা আইন বলবৎ করার সময় এরকম একপেশে টাকার কাঙাল হয়ে যান কী করে?
যেখানে একজন সাধারণ মানুষ বিচারের জন্য প্রশাসনের দরজায় দরজায় ঘুরেও কোনো সদুত্তর না পেয়ে সব কিছু মুখ বুজে সহ্য করতে বাধ্য হয়। যদিও এক্ষেত্রে যারা প্রতিবাদ করছেন তারা কেউই সাধারণ মানুষ নন। সমাজে বুদ্ধিজীবী বলতে যাঁদের বুঝি, এঁরা কিন্তু তারাই। এদেরই যদি প্রতিবাদের ভাষা এরকম গলাটিপে বন্ধ করার চেষ্টা করা হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের কী হবে? 'হোয়াটস্যাপ মাতব্বর বর্বর বন্ধু গোষ্ঠী' চ্যালেঞ্জ করেছে যে তারা আগামী বর্ষশেষের রাতে মানে ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৩ এ সারারাত উচ্চগ্রামে ডিজে বাজিয়ে উদ্দাম নৃত্য সহযোগে পার্টি করবেই এই কমপ্লেক্সে। ৩১ ডিসেম্বরের রাত ১১টার পর আমাদের শান্তিতে ঘুমোতে দেবার দায়িত্ব কিন্তু প্রশাসনের। এটা দেখার বিষয়, যে আপনারা আদৌ সে দায়িত্ব পালন করছেন কি না!
নাকি টাকার কাছে নিজেদের মাথা বিকিয়ে ওদের কথা মতো কানে তুলো গুঁজে শান্তিতে নিজেরাই ঘুমোবেন যে যার কাজের জায়গায়। আর এরকম বহু কমপ্লেক্সে বহু মানুষ কানে তুলো গুঁজে আর বালিশে মুখ গুঁজে আপ্রাণ চেষ্টা করবেন ঘুমোতে, কিন্তু পারবেন না। অথবা কোনও বিশেষ কারণে অভিযোগ এড়িয়ে যেতে না পেরে যদিও বা পুলিশ প্রশাসন এসে পড়েন এবং ডিজে বক্সের আওয়াজ কমিয়ে দিয়ে যান, যাবার আগে যিনি complain করেছেন তার নাম, ফোন নম্বরও দায়িত্ব নিয়ে জানিয়ে দিয়ে যাবেন যাতে পরে এই গোষ্ঠী ওই ভদ্রলোক বা ভদ্রমহিলাকে বেশ ভাল করে অপমান ও মানসিক অত্যাচার করতে পারে।
আচ্ছা, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সারারাত উচ্চগ্রামে ডিজে বাজানোর অনুমতি কারা দেন এই শহর ও শহরতলিতে, এই প্রশ্নের উত্তর কারোর জানা থাকলে একটু জানাবেন প্লিজ। অর্থ, দম্ভ, দেখনদারির উৎসব, কারণ কী? "আরে ইয়ার, ইয়ে হেপ্পিওয়ালা নিউ ইয়ার কা সেলিব্রেশন হ্যায় ভাই। কাল সে নয়া সাল!"
উত্তুঙ্গ প্রবল শব্দের ডিজে বক্স, হৈ হৈ, আনন্দ আহ্লাদে, মদের ফোয়ারা ছুটিয়ে চুটিয়ে মস্তি মোচ্ছব চলছে চলবে। কে কোথায় অসুস্থ হয়ে পড়ল তার জন্য সরকার এত্তো এত্তো সুন্দর সুন্দর মাল্টিসুপার হসপিটাল বানিয়ে রেখেছে তো। কেউ যদি বিকট উচ্চগ্রাম উচ্ছ্বসিত শব্দ সহ্য করতে না পেরে মারাও যায়, কার তাতে কী?
সরকার তার নাম 'শব্দশহীদ' হিসেবে স্মরণীয় করে দেবেন। নতুন বচ্ছরকে বরণীয় হতে হবে তো, না কি!
আরে গ্র্যান্ড সেলিব্রেশন করতে গেলে ওরকম দুয়েকটা ছোটোখাটো লোক মরলো কি বাঁচলো.. . তা ভাবলে চলে?
লেখক: ডঃ পিয়ালী দত্ত চক্রবর্তী (পি. এইচ. ডি., সায়েন্স)
সিনিয়র রিসার্চ সায়েনটিষ্ট,
রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট,
অ্যালবার্ট ডেভিড লিমিটেড,
ইন্ডিয়া