
শেষ আপডেট: 6 April 2020 14:28
ভারতে এইমুহূর্তে করোনার পরেই যেটা সবচেয়ে আলোচ্য বিষয়, তা বোধহয় ‘বড়লোকের বেটির লম্বা চুল’!
ক্লাসিকাল নাচের তালিম নিয়ে বড় হওয়া আমি নিছক নাচ ভালবেসে এই গানটির একটি ভিডিও আপলোড করি। শুরু হয় কাটাছেঁড়া এবং কলম ধরার আর্জি। আমজনতা থেকে সেলিব্রিটি অনেকেই এই নাচের ভিডিও বানাচ্ছেন এবং তাদের সম্মুখীন হতে হচ্ছে সমালোচনার, তাই একটু গভীরে ঢুকতেই হল।
কে এই রতন কাহার?
বীরভূমের খুব সাধারণ মানুষটি এই গানের স্রষ্টা। ১৯৭৬-এ স্বপ্না চক্রবর্তী প্রথম এই গানটি স্বাঙ্গীকৃত করেন। গানটি গোল্ডেন ডিস্ক অ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনীত হয়। কিন্ত পাবলিসিটি পান শ্রীমতি চক্রবর্তী অনেকটাই বেশি, কে আর মনে রাখে গীতিকারকে!
এরপর রতন কাহারকে শোনা যায় আকাশবাণীতে। কিন্ত সেও কদাচিৎ। পেশাদার গায়ক এবং আরও অনেকেই এই গানটি নিয়ে অনেক চর্চা করেছেন, অনেকের মুখেমুখেই এই পল্লিগীতি জনপ্রিয় হলেও, অন্ধকারে হারিয়ে যান স্রষ্টা!
এই যে তথ্যগুলি আমি সামনে আনলাম, তার কারণ একটাই।
অনেকের মতো আমিও জানতাম না রতন কাহারের সম্বন্ধে এত বিস্তারিতভাবে। পাঞ্জাবি ‘র্যাপার’ বাদশার ঔদ্ধত্যে এতটা গভীরে তলিয়ে দেখলাম।
লাস্যময়ী জ্যাকলিন ফার্নান্ডেজের প্রলোভনসঙ্কুল নৃত্যকলায় এইমুহূর্তে বলিউড চার্টের এক নম্বর জায়গা দখল করা এই গানটিতে বাদশা ভুলে যান রতন কাহারের নামটি উল্লেখ করতে। ভুলে যান, না অজ্ঞতা, সেটা অজানা। কিন্তু দুটোই সমান অন্যায়। ধিক্কার জানাই এই আত্মশ্লাঘাকে। কিন্তু নাচটি করলেই বাদশাকে সমর্থন করা হচ্ছে বললে, কোথাও ক’টা প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।
এই কি প্রথমবার? এই সুর চুরি বা গান চুরি কি প্রথমবার? আজ যে তোলপাড় শুরু হয়েছে আগেও তা ছিল। তাহলে এখন কিছুটা দ্বিচারিতা হয়ে যাচ্ছে না? এই গান-সুর চুরির একটি বিধিবৎ নামকরণ আছে, যাকে বলা হয় কুম্ভীলকবৃত্তি বা প্ল্যাগারিজম। একটু অতীত ঘাঁটলে প্ল্যাগারিজমের দায়ে যে সব নাম উঠে আসবে, বলিউডে তা বেশ অস্বস্তিকর। স্বয়ং আরডি বর্মন থেকে প্রীতম, অনু মালিক থেকে হালফিলের জিৎ গাঙ্গুলি। আরও অবাক করে দিয়ে বলতে পারি আর একটি নাম, এআর রহমান। তামিল চলচ্চিত্র ‘মে মাধাম’-এ ওঁর আবহসংগীত বহুপ্রচলিত পশ্চিমী ক্লাসিকাল একটি গান থেকে অনুপ্রাণিত।
এখন কথা হল, বাদশার মতো এঁদের গানে নৃত্য পরিবেশনা করলে এত প্রতিবাদ হয় না কেন?
১. ‘ওল্ড ইজ গোল্ড’: ৭০/৮০-র দশকে হিন্দি বা বাংলা গান নকল হতে ইংরেজি গান তথা বিদেশি গান থেকে এবং ভারতীয়দের মধ্যে সেই সময় পাশ্চাত্য সংগীতের চর্চা এখনকার চেয়ে অনেকটাই কম ছিল। পঞ্চমদা তো অবিস্মরণীয় সব সুরের স্রষ্টা, হোক না ক’টা নকল, প্রীতমকে নিয়ে কাটাছেঁড়া করলেও পুরনোর প্রতি অপ্রয়োজনীয় চরম জ্ঞাতিত্ব আমাদের সমালোচনাটাকে বড্ড একপেশে করে দেয়।
২. কানেকশন: বড় ব্যানারের সিনেমার সঙ্গে যুক্ত বা নামকরা সঙ্গীতসম্রাজ্ঞীর সঙ্গে বিয়ে বা ধরুন এই ‘ভাইরাল’ শব্দটির উৎসের আগে যাঁদের নাম, তাঁদের যা কানেকশন তাতে সমালোচনা করা অনুচিত।
৩. বাঙালি-পাঞ্জাবি রেষারেষি: বাঙালি হয়ে পাঞ্জাবি একজন র্যাপারকে সঙ্গীতশিল্পী বলা শুধু লজ্জাজনক নয়, অনেকাংশে পাপ। অতএব তক্কে তক্কে থাকো কবে একটা অন্যায় হয়, অমনি ছেঁকে ধরব সমবেতভাবে আর প্রতিবাদে গর্জে উঠবে হাজার কণ্ঠ। সে ঠিক আছে, কিন্তু লুকিয়ে আমেজ নিচ্ছেন না তো ভিডিওটির? স্বীকার করা যদিও খুব কম বাঙালির ধাতে আছে।
২০০৬-এ প্রীতমের সুরে ‘ভিগি ভিগি’ যদি সোশ্যাল নেটওয়ার্কে গেয়ে শোনাতাম, ক’জন প্রতিবাদটা করত বলতে পারেন? গানটা শোনা বন্ধ করেছেন ক’জন? মহীনের ঘোড়াগুলি নিয়ে তো অনেক নস্টালজিয়া বাঙালিদের মধ্যে, আপনারা প্রীতমকে বয়কট করেছেন কি? হ্যাঁ, কপিক্যাট আখ্যা নিয়েও আপনাদের বসার ঘরে উষ্ণতা ছড়িয়েছে এই গানগুলি অনেকবার।
বাদশা যা করেছেন তার সমর্থন করব, এতটা মূর্খ আমি নই। কিন্তু অযথা এই মহামারীর সংকটময় মুহূর্তে নিছক কেউ যদি ‘গেন্দা ফুল’ গানটায় নাচে বা দু’কলি গায়, তাকে ‘অবিবেচক’ আখ্যা দেবেন না।
আর যদি মনে হয়, ভিডিওটিতে নারী-শরীরের অমর্যাদা হয়েছে বা নারীকে পণ্যদ্রব্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, তাহলে কম করে ৭০ শতাংশ বিজ্ঞাপন বন্ধ করার আর্জি জানান। পুরুষদের দাড়ি কামানোর বিজ্ঞাপন হোক বা ঘরের সুগন্ধি বা নিছক একটা ফলের রস, কোনওটাতেই মেয়েদের সম্মোহন বৃত্তি লাগে না, কিন্তু তাও তা ব্যবহৃত হয়ে চলেছে।
জ্যাকলিনের শরীরী আবেদনে নাচ এবং জৌলুস দুইই ছিল, কিন্তু গানটির মধ্যে আমি কোনওরকম নোংরামো খুঁজে পাইনি, কারণ প্রত্যেকটি গানের আলাদা স্তর বা শ্রেণি থাকে। আইটেম সং, এই নামকরণটি আমার ব্যক্তিগত ভাবে অপমানকর লাগে, কিন্তু তবুও যথেচ্ছ ব্যবহৃত হয়। তাহলে সেটিও বন্ধ করা উচিত। গানের কথায় মেয়েদের অবমাননা সমর্থনযোগ্য কখনওই নয়, কিন্তু এই গানটিতে পাঞ্জাবি ভাষায় সেই ভাবে কোনও শব্দ ব্যবহৃত হয়নি, বরং প্রত্যেকটি পঙক্তিতে প্রেম নিবেদন করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত বলে রাখি, অবাঙালি, প্রধানত উত্তরের অবাঙালিদের অনেক কিছুই খুব অট্ট বা প্রবল, বাঙালিদের অনেকের কাছেই তা ব্যভিচার, সত্যিই দৃষ্টিকটু। কিন্তু বারবার আমি যেটা বোঝাতে চাইছি, এই গানটিতে অন্যায় একটাই, স্রষ্টার নাম উল্লেখ না করা। সানি লিওনের ছবি দেখে মুখ ঘোরান কি সবসময়? যদি না হয়, চটুলতা ভেবে নিয়ে ফিউডাল শব্দটি সরিয়ে রেখে শুধু সেক্সুয়াল ভাবুন। কোমরে প্রজাপতি দেখালে যদি কুরুচিকর হয়, তাহলে এরকম গান আপনাদের জন্য না এবং তাতে কোনও ক্ষতি নেই। আটপৌরে শাড়ি নাভির নীচে অনেকেই পরেন।
৮৫ বছরের হতদরিদ্র মানুষটার নাম-সম্মান অবশ্যই প্রাপ্য। যা স্বপ্না চক্রবর্তীও দেননি, আজ বাদশাও দিচ্ছেন না। মাথার উপর ছাদ না থাকা মানুষটার জন্য লড়তে হলে আরও সোচ্চার হোন সবাই, যাতে ধনী ব্যবসায়ী থুড়ি সঙ্গীতশিল্পী কপিরাইট বা নিদেন পক্ষে অনুপ্রাণিত নামটা দিতে বাধ্য হন। একজন নাচটা করে দেখালে সেটা ভাইরাল হয় না, ইউটিউবে আমাদের ‘ভিউ’ সেটাকে ভাইরাল করে।
আর এক্ষেত্রে তো আরওই করে না, কারণ ‘গেন্দা ফুল’ ভিডিওটিতে দু’টি ভঙ্গিমা ছাড়া কোনও নাচ নেই। তাই সাধারণ মানুষ যারা নাচছেন, তারা হয় পল্লিনৃত্য, নয় কনটেম্পরারি, নয় অন্য কোনও নৃত্যশৈলী ব্যবহার করছেন। তার জন্য ভিডিওটি দেখতে হচ্ছে না বারবার। বরং এই নাচের মাধ্যমেই ‘বড়লোকের বেটি’, যা কিছুদিন আগেও অনেকের কাছে ছিল অশ্রুত, তা এখন লোকের মুখেমুখে। নাচটা যারা করছেন তারা বাদশার অন্যায় সমর্থনের জন্য নয়, গানটির লয়ের সঙ্গে পা মেলাচ্ছেন।
যে নাম অনেকেরই অজানা ছিল, আজ তাতে খ্যাতির ছটা। কিন্তু রতন কাহারের দারিদ্র দূর হল কি!
সরব হোন অন্যায়ের বিরুদ্ধে, হোক প্রতিবাদ, গান পছন্দ না হলে শুনবেন না। কিন্তু তার আগে যুক্তিটা একটু সাজিয়ে নিন!
(নিউ জার্সির বাসিন্দা সুস্মিতা রায়চৌধুরী একজন ব্লগার ও লেখিকা। মতামত ব্যক্তিগত।)