
শেষ আপডেট: 2 September 2018 08:51
কত স্বপ্ন বেঘোরে মারা যায় অন্ধকার পথের চড়াই উৎরাইয়ে। একার লড়াই লড়তে লড়তে দম বেরিয়ে যায়। আর এগোনো হয় না। যে দু এক জন পারে, নিজের জেদে কিংবা কোনো এক আরো জেদি, হাত ধরে টেনে নিয়ে যাওয়া ব্যক্তির সাহচর্যে, আলোয় পৌঁছয় আঁধার পেরিয়ে, তখন তার জন্য আরো কত হাজার হাজার ওয়াট আলো।
স্বপ্নকে মরতে দেয়নি স্বপ্না। তাই আজ সে আলোকিত। কিন্তু আমরা বরং সেই পেছনের অন্ধকার পথটার দিকে তাকাই।
এক পাশে মরচে পড়ে যাওয়া পরিকাঠামো, অন্য পাশে পাশের বাড়ির লোকটার অপমান। এর মাঝখান দিয়ে ঠিকরে বেরিয়েছে স্বপ্না। জেলা, রাজ্য পেরিয়ে এশিয়ার সেরা। কিন্তু পথটা কি এত সহজ ছিল?
মেয়েটার তখন বছর ১৩ বয়স। রিকশাচালক বাবার স্ট্রোক হলো প্যাডেল করতে করতেই। তারপর থেকে বিছানায়। রোজ সকালে অভাবের অ্যালার্মে ঘুম ভেঙেছে। উঠেই আবার চলে গিয়েছে ট্র্যাকে। থামেনি। ছুটেছে স্বপ্না।
কিন্তু কেন এমন হলো? কেন এমন হয়? একবার নয়। দু’বার নয়, বারবার হয়। স্বপ্নার ক্ষেত্রে হয়। দীপা কর্মকারের ক্ষেত্রে হয়। মেনস্ট্রিম স্পোর্টসের বাইরে থাকা সমস্ত খেলা কেন আক্রান্ত এ দেশে? স্বাধীনতার এত বছর পরেও, কোনও ১৫ অগস্ট লাল কেল্লার মঞ্চ থেকে কেন কোনও প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেন না ভারতের জাতীয় ক্রীড়ানীতি? উত্তর দেন না কেউ। কারণ উত্তর নেই।
শেপ ব্লাটার যখন ফিফা সভাপতি তখন একবার ভারত সফরে এসে বলেছিলেন, ‘ভারতীয় ফুটবল ঘুমন্ত দৈত্য।’ আর ফিফা রিপোর্টে লিখেছিল, এ দেশের মাটি প্রতিভা জন্ম দেওয়ার ক্ষেত্রে কখনও কৃপণতা করেনি। কিন্তু বিচ্ছুরণের জন্য আর যা যা লাগে তাঁর জোগান দেয়নি সিস্টেম। পরিকাঠামো দেয়নি। দেয়নি পুষ্টিও। এ শুধু ফুটবলের জন্য নয়। মেনস্ট্রিম স্পোর্টসের বাইরের খেলাধূলাতে এ কথা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক।
স্বপ্নাদের বেড়ে ওঠার সময়তে কেউ গিয়ে হ্যাজাক জ্বালে না। নিজেদের হিম্মতে তেরঙা পতাকা উড়িয়ে স্বপ্নের ভোর আনেন স্বপ্নারা। একটা সাফল্য এলে তারপর হামলে পড়েন সবাই। না হলে সেই অন্ধকার। ক্রীড়ানীতির কথা তুলে আনেন প্রশাসনের কর্তা-ব্যক্তিরা। পিঠ চাপড়ে দেন। চাকরির প্রতিশ্রুতিতে ভরে ওঠে স্বপ্নাদের টালির চালের ঘর। বাড়ির সামনের যে কাদা রাস্তা মেরামতের আবেদন নিয়ে যাওয়ায় অপমান করেছিলেন ঠিকাদার, তিনিই আবার লোক লাগিয়ে ঝুড়ি ঝুড়ি মাটি ফেলে দেন। যে বিডিও অফিস একদিন তাড়িয়ে দিয়েছিল এসসি সার্টিফিকেটের আবেদন করায়, তাঁরাই আবার বাড়িতে ছুটে আসেন। দশ লক্ষ, তিরিশ লক্ষের অঙ্কে ভরে যায় সংবাদ শিরোনাম। আবার দিন এগোয়। ক্রীড়ানীতির ফাইলে জমে ধুলো।
কিন্তু যারা স্বপ্নার মতো এতটা পারে না। ভিতরে বারুদ মজুত থাকলেও পরিকল্পনাহীনতার হোস পাইপ দিয়ে সেই বারুদকে মিইয়ে দেওয়া হয়। ফোটার আগেই ঝরে পড়ে কুঁড়ি। আর তাদের দীর্ঘশ্বাস নিয়েই ট্র্যাকে ছোটেন স্বপ্না।