
শেষ আপডেট: 11 October 2019 18:30

অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি হবে, দায়িত্ব আমার উপর। মন্ত্রকের চিরাচরিত কাজ হস্তান্তর করার চেষ্টা, কিন্তু কাজটা আমার পছন্দের।
কাজেই ড. খুল্লারকে বললাম, এখন তো একটা মিটিং আরম্ভ করতে হবে, বিকেলে গেলে হয় না?
এবার অবাক হওয়ার পালা বস্–এর। দিল্লির প্রশাসনিক আদবকায়দায় একেবারেই আনাড়ি আমার কথা শুনে তিনি রাগ করবেন না হাসবেন বুঝতে পারছেন না।
–পাগল নাকি তুমি? না ক্রেজি? (দুটোই কিন্তু এক!) যেতে বলছি এখন আর তুমি বলছ বিকেলে? এসব সুযোগ তোমার জন্য বসে থাকবে নাকি?
সেদিন মিটিঙের ব্যবস্থা করতে হয়েছিল একটা অদ্ভুত উপায়ে। মিটিঙে যোগ দিতে আমার স্বামী এসেছিলেন একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে। আবার ব্যাচমেটও বটেন তিনি। তাঁকেই বললাম, কিছুক্ষণের জন্য অধ্যক্ষ হিসেবে হাল ধরতে। বিষয়গুলি তো তাঁর সবই জানা।
'ই.আর শিট' মানে একজিকিউটিভ রেকর্ড শিট। প্রত্যেক প্রশাসনিক সেবার আধিকারিকের একটি শিট তৈরি করে রাখেন ভারত সরকারের প্রশাসনিক ও কর্মীবর্গ বিভাগ। সেটি আবার নিয়মিত নতুন তথ্য দিয়ে ঘষা মাজা করা হয়। শিক্ষাগত যোগ্যতা, কাজের ক্ষেত্রে বিশেষ অভিজ্ঞতা, ট্রেনিং, পুরস্কার, সম্মান সবই থাকে তাতে। তার একখানি কপি কম্পিউটার থেকে বের করে চললাম বিত্ত সচিবের কাছে, নর্থ ব্লকে।
এখানে উল্লেখ্য, দু'বছর আগেও, যে কোনও আধিকারিকের রেকর্ড শিট ওয়েবসাইট মারফৎ জনসমক্ষে থাকত এবং সাধারণ নাগরিকও তার কপি সোজাসুজি দেখে নিতে পারতেন। এখন এই পুরো তথ্যভাণ্ডার ওয়েবসাইটের নীচে কোনও গোপন গুহায় লুকিয়েছে। কারণ অজানা। যাই হোক, নর্থ ব্লকে বোস মশাই–এর ঘরে ঢুকে দেখি, অতি অমায়িক, সহজ সরল বিত্ত সচিব, একটা প্লেট থেকে তুলে তুলে কী যেন খাচ্ছেন আর নিজের মস্ত অফিস কক্ষের মধ্যে ঘুরছেন। মধ্যপ্রদেশের বাঙালি। সজ্জন এবং সৎ। আমাকে জিজ্ঞেস করলেন অর্থনীতি কোথায় পড়েছি। প্রেসিডেন্সী কলেজ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির বলে বলীয়ান আমি। সঙ্গে আছে ১৯৯২ তে ইংল্যান্ডে পাওয়া বিকাশ অর্থনীতিতে ডিসটিংশন সহ এম.এ ডিগ্রি। অ্যাকাউন্টস–এর খুঁটিনাটি একটু শিখে নিতে হবে। বিত্ত সচিব হাসলেন। পরে শুনেছিলাম, ক্যাবিনেট সচিব মৃদু আপত্তি জানিয়েছিলেন ছ'মাসের মাথায় বদলির প্রস্তাবে। কিন্তু খুল্লার সাহেবের কথা ফেলতে পারেননি। কয়েকদিনের মধ্যে সংসারের হিসেব মেলাতে না পারা আমি বাণিজ্য ও বস্ত্র মন্ত্রকের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হয়ে আবির্ভূত হলাম। একমাস পরেই
আমেরিকার টেক্সাস অ্যাট অস্টিন–এ ছেলের সমাবর্তন। গ্লোবাল পলিসি স্টাডিজ–এ সে মাস্টার্স করেছে। আমার টিকিট কাটা হয়ে গিয়েছিল আগেই। তখন এই স্থানান্তরের খবর জানা ছিল না। সামনেই অর্থনৈতিক বর্ষশেষের প্রস্তুতি। কাজেই বিবেক দংশিত চিত্তে আমি বেশ কয়েক হাজার টাকা লোকসান করে সে টিকিট ফেরৎ দিলাম। এখন তো যাওয়া হতে পারে না।
তখন আবার শিল্প মন্ত্রকের পদ খালি। সেই দায়িত্বও আমি সামলাচ্ছি– মনে মনে ভাবছি, কবে কেউ নিযুক্ত হবেন খালি জায়গায়! কদিনের মাথায় এল বিস্ময়ের ধাক্কা! একজন এলেন শিল্প মন্ত্রকের উপদেষ্টা হয়ে। জয়েন করলেন, এবং ফোনে জানালেন, আমার সঙ্গে এক কাপ কফি খেতে আসছেন। এসে বললেন, তাঁকে কোনও ব্যক্তিগত কাজে আমেরিকা যেতে হবে মাসখানেকের জন্য। আমি কি তাঁর দায়িত্ব মাসখানেক সামলাতে রাজি আছি– এ'কদিন যেমন ভাবে সামলাচ্ছিলাম– তাহলে তাঁকে তার প্লেনের টিকিট ফেরৎ দেওয়ার ঝামেলায় পড়তে হয় না। তিনি দু–একদিন কাজ করেই বিদেশ পাড়ি দিলেন এবং আমি ভাবতে লাগলাম, নিজের নির্বুদ্ধিতার কথা। একই ভাবে কারও ঘাড়ে দায়িত্ব চাপিয়ে আমি ছেলের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে যেতে পারতাম কিনা! না, সেটা মাথায় আসেনি।
কাজের দায়িত্বের সামনে চিরকাল পরিবারের ভালোবাসার দাবি নির্মোহ ভাবে দূরে সরিয়ে দিয়েছি। আশ্চর্য এই যে, আমার এই কর্মপরায়ণতাকে আমার পরিবারের সদস্যরাও সর্বদা হাসিমুখে সয়ে এসেছেন। আজ যখন লেখা ও ভ্রমণই আমার একমাত্র অবলম্বন, তাঁদের ভালোবাসার মর্ম আরও বেশি করে বুঝি। বিত্ত সচিব কে যেমন কথা দিয়েছিলাম, ফাইন্যান্সের সঙ্গে অ্যাকাউন্টস–এর খুঁটিনাটিও শিখে নিলাম। বাজেটের বিভাগীয় নির্মাণ, বাজেট পেশ হবার পর তাকে আক্ষরিক অর্থে এবং পদে পদে মেনে চলে অর্থের মঞ্জুরি দেওয়া– সেটা খুব কঠিন নয় বটে কিন্তু সতর্ক থাকতে হয়, যাতে কোনও ভুল আমার হাতে না ঘটে। আর্থিক উপদেষ্টার টিমে সাধারণত বিত্ত এবং অ্যাকাউন্টস দুই দিকেই খুবই দক্ষ অফিসার থাকেন, পান থেকে চুন খসার উপক্রম হলেই তাঁরা রে রে করে ওঠেন। কাজেই নিজের স্বাভাবিক সংবেদনাকে সতর্কতার বর্মে মুড়ে বসে কাজ করতে থাকাও আমার পক্ষে খুব কঠিন। তবে ভালো এবং মৌলিক কাজের জন্য অর্থ মঞ্জুর করার জন্য তৎপর থাকতাম, এটা আমার টিমও জানত।
কাজ করতে গিয়ে দেখলাম, আর্থিক উপদেষ্টারা যাতে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক চাপ থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে রাখতে পারেন, তার জন্য বেশ পাকাপোক্ত ব্যবস্থা আছে। উপদেষ্টার 'গোপনীয় মূল্যায়ন' যা তাঁর কাজের দক্ষতার এবং সততার বার্ষিক বিশ্লেষণ, তা কেবল বিভাগীয় সচিব নন, বিত্ত সচিবও যুগ্ম ভাবে করেন। ফলে বিভাগীয় মন্ত্রী চাপ দিয়ে উপদেষ্টাকে দিয়ে অন্যায় কিছু করিয়ে নিতে পারেন না। এটা একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ রক্ষাকবচ। বাণিজ্য মন্ত্রকের অফিসাররা সাধারণ ভাবে খুবই তৎপর ও দক্ষ হতেন। বাণিজ্য সচিব তাঁর টিমকে এ ভাবেই বেছে তৈরি করেছিলেন। মাঝে মাঝে অতি উৎসাহে তাঁরা নানা আবদারও করতেন দ্রুত মঞ্জুরির জন্য, কিন্তু যেহেতু আমি এর আগে মন্ত্রকের দুটি দায়িত্বে এক দশক কাটিয়েছি, আমাকে সকলে চিনতেন এবং আমি যে কেবল নিষেধ করার জন্যই মঞ্জুরির বিষয়ে কড়াকড়ি করছি না, তা তাঁরা বুঝতেন।
সেটা কংগ্রেস পরিচালিত ইউনাইটেড প্রোগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স, যাকে সংক্ষেপে ইউপিএ বলে তার শেষ পর্ব। রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে দুর্নীতির প্রবণতা শীর্ষে, কাজকর্মে শিথিলতা এসেছে। ২০১৪ তে সরকার বদল যে অবশ্যম্ভাবী, তা মন্ত্রীদের শরীরী ভাষা ও হাবেভাবেই স্পষ্ট হয়ে যেত। ২০১০ এ কমনওয়েলথ গেমস্ অনুষ্ঠিত হয়েছিল দিল্লিতে। গেমস্–এর দৌলতে দিল্লি শহরের পরিকাঠামোর যেমন উন্নতি হয়েছিল, গেমস্ ঘটিত আর্থিক কেলেঙ্কারিও কিছু কম হয়নি। কেলেঙ্কারির হোতাদের প্রতি রাজনৈতিক দলের ক্ষমাসুন্দর মনোভাব মনে বিরক্তি তৈরি করত।
বাণিজ্য মন্ত্রকের কাজকর্মেও ঢিলেঢালা ভাব এসে গিয়েছে। খুল্লার চলে গেছেন টেলিকম রেগুলেটরি অথরিটি বা ট্রাই–এর চেয়ারম্যান হয়ে। তাঁর জায়গায় যিনি আসছেন, তিনি সুভদ্র হলেও বাণিজ্য মন্ত্রকের কাজে তাঁর কোনও ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা নেই। বরং শাসকদলের এক হেভিওয়েটের প্রতিভূ হিসেবেই তাঁর অবস্থানকে দেখা হতো। তিনি অবশ্য আমার কাজকর্মে কোনও বিঘ্ন সৃষ্টি করেননি, বরং আমাকে মন্ত্রকের 'লক্ষ্মীঠাকরুণ' বলে সস্নেহে পরিহাস করতেন। পরপর দুবছর নিরানব্বই দশমিক পাঁচ শতাংশের উপর বাজেট বরাদ্দ ব্যয় করিয়ে আমি তাঁর আস্থাভাজন হয়েছিলাম। মন্ত্রীর পক্ষ থেকে প্রচ্ছন্ন অনুরোধ এসেছিল মাত্র দু'বার। কিন্তু ফাইলে আমার বিস্তৃত নোট পড়ে তিনি ক্ষুণ্ণ হলেও, কোনও উষ্মা প্রকাশ করেননি। নতুন সরকার আসার আগেই বিশেষ সচিব পদমর্যাদায় উন্নীত হলাম।
বাণিজ্য মন্ত্রক ছোট হলেও ছ'–সাত জন সচিব পদমর্যাদার অফিসার ছিলেন নানা দায়িত্বে। তাঁরাও সকলে নতুন পদ পেয়েছেন। এখান থেকে আইএএস নামক পিরামিডের সূচ্যগ্র শীর্ষ দেখা যাচ্ছে। অল্পই দূরত্ব। দেড় লক্ষ যুবক যুবতী আমরা আইএএস পরীক্ষায় বসেছিলাম, ১৯৮০ সালে। দীর্ঘ ৩৪ বছর পার করে সঙ্গীরা কেউ মৃত, কেউ নিহত, কেউ দুর্নীতির জালে জড়িয়ে অপসারিত। ১২৫ জন ভারতীয় প্রশাসনিক সেবায় যুক্ত হয়েছিলাম। এবার আমাদের মধ্যে জনা ষাটেক পৌঁছবেন 'সচিব' পদমর্যাদায়, সেটাই শীর্ষ। ঈষৎ উত্তেজনা বিরাজ করছে ব্যাচের কথোপকথনে। কফি পানের মিটিং হচ্ছে মাঝে মাঝেই। এমনই এক গোধূলি সন্ধিকালে ঘটে গেল অপ্রীতিকর ঘটনা।
বস্ত্র মন্ত্রকের মন্ত্রী বদল হয়ে এলেন এক শিল্পপতি–ব্যবসায়ী রাজনীতিক, যাঁর প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা শূন্য। এসেই তিনি বাস্তুসম্মত নয় বলে অন্য একটি বড় কক্ষ হস্তগত করলেন সচিবকে সরিয়ে। মন্ত্রীর বাস্তুদোষ ঘরটিতে বসতে গেলেন সচিব। পরিবার আত্মীয়বর্গকে নিজের অফিসে বসিয়ে রাখতেন। একবার ছেলেকে ব্যক্তিগত সহায়ক নিযুক্ত করতে উঠে পড়ে লেগে গেলেন। আর্থিক উপদেষ্টা হিসেবে আমার টেবিলেই সে প্রস্তাব নাকচ করলাম। কোন মায়াজালে বস্ত্র সচিবকে বশ করেছিলেন জানি না, সোনার তরবারিকে রোখে এমন শক্তি নাকি পৃথিবীতে নেই, বুঝতে পারলাম। বেশ কয়েকশো কোটি টাকা মঞ্জুর করার জন্য মিটিং হচ্ছে। টাকাগুলি পৌঁছবে বিশ্বস্ত কিছু ডেভেলপারদের হাতে, যাঁরা টেক্সটাইল পার্ক তৈরির জন্য পরিকাঠামো তো দূরের কথা, জমিও জোগাড় করে উঠতে পারেননি। সংশ্লিষ্ট অফিসাররা প্রবল অসন্তোষ ও চাপের মুখে পড়ে বিপন্ন হলেন, আমি তাঁদের পাশে দাঁড়ালাম। আমাদের সম্মিলিত প্রতিরোধে আর্থিক অনুমোদন করা গেল না। ইলেকশনের প্রাক্কালে তা হয়ে দাঁড়াতো এক বিকট 'হরির লুঠ'।
আমার বিরুদ্ধে মন্ত্রী স্বয়ং চিঠি লিখলেন প্রধানমন্ত্রীকে– অভিযোগ, আমার 'উন্নয়নবিরোধী' নেগেটিভ মনোভাব। বিত্ত সচিব নিজে তদন্ত করলেন। তাতে সাক্ষ্যপ্রমাণ সহ সব কাগজপত্র হাজির করলাম। পরেরদিন সকালে সচিব হিসেবে যোগ দেব আবাসন মন্ত্রকে, তার পূর্ব সন্ধ্যার গভীর পর্যন্ত চলেছে এই তদন্ত পর্ব।
যাইহোক, শেষ পর্যন্ত সম্মিলিত চেষ্টা এবং আমার আর্থিক উপদেষ্টা হিসেবে দেওয়া মন্তব্যগুলি ফলপ্রসূ হল। ভুয়ো টেক্সটাইল পার্কের নামে কেন্দ্রীয় সরকারের কয়েকশো কোটি টাকা নয় ছয় হতে হতে বাঁচল। কিন্তু বাস্তুশাস্ত্র যে বিজ্ঞানসম্মত নয়, তা হাতে হাতে প্রমাণ হল। কামরা বদল সত্ত্বেও, মন্ত্রী মহোদয় কিছুদিন পরই চেয়ার হারালেন, নির্বাচনেও হারলেন। দল বদল করে এখনকার শাসক দলেও যোগ দিয়েছিলেন– তার বিশদ ফলাফল সংবাদও প্রকাশ হয়নি।
অলঙ্করণ - সৌজন্য চক্রবর্তী
(ক্রমশ)
অনিতা অগ্নিহোত্রীর জন্ম কলকাতায়। প্রেসিডেন্সী কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি পডেছেন। সাহিত্যের সব ধারাতেই আনা গোনা। অতল স্পর্শ, মহুলডিহার দিন, আয়নায় মানুষ নাই, কবিতা সমগ্র, মহানদী ইত্যাদি চল্লিশটিরও বেশি বইয়ের লেখক। কর্মসূত্রে ছিলেন ভারতীয় প্রশাসনিক সেবা বা ইন্ডিয়ান অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিসে। কাজে ও না কাজে ঘুরেছেন পূর্ব ও মধ্য ভারত। পড়ুন দ্য ওয়ালের পুজো ম্যাগাজিনের বিশেষ একটি লেখা https://www.four.suk.1wp.in/pujomagazine2019/%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%b9%e0%a7%81-%e0%a6%ab%e0%a6%b2-%e0%a6%90%e0%a6%b6-%e0%a6%b0%e0%a7%8b%e0%a6%b7-%e0%a6%93-%e0%a6%aa%e0%a6%bf%e0%a6%97%e0%a6%ae%e0%a6%bf-%e0%a6%b8%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%9c-2/