
শেষ আপডেট: 25 July 2019 18:30

আন্ধেরির স্পেশাল ইকনমিক জোনের ভিতর শ'তিনেক কোম্পানি ছিল । এই জোনের সোনা ও হিরে জহরতের কোম্পানিগুলি আমেরিকার বাজারে রপ্তানি করত। এদের নামডাকও ছিল যথেষ্ট। এছাড়া ছিল ইলেট্রনিক্স হার্ডওয়ার ও কম্পিউটার সফ্টওয়্যারের রফতানি কারকরা। ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোশিয়েশন ছিল বেশ কয়েকটি। দিল্লির বাণিজ্যমন্ত্রকের কর্তাদের সঙ্গে ট্রেড পলিসি নিয়ে মিটিঙের আগে এবং বছরের অন্যান্য সময়েও এঁরা নানা বিষয় নিয়ে কথা বলতে আসতেন। কলকাতার চেয়ে মুম্বাইয়ের অর্থ অনেক বেশি, কিন্তু কলকাতায় কাজ করতে গিয়ে যে পরিবেশের সঙ্কীর্ণতা ও ষড়যন্ত্রের ছায়া সর্বদা অনুভব করতাম, এখানে তা ছিল না। কলকাতার মতো এখানে ইউনিয়নের বাধা ছিল না। কাজেই কাজের গতি অনেকটা বাড়িয়ে ছিলাম একটি আধুনিক ফাইল মনিটরিং সিস্টেম ব্যবহার করে। এতে আমি দেখতে পেতাম কোন ফাইল কার টেবিলে আটকে আছে। এছাড়া কাস্টমস–এর কাজের মানদণ্ড বেঁধে দেওয়ার ফলে ব্যক্তিগত মর্জি ব্যবহার কমানো গিয়েছিল। এক্সপোর্টের ব্যবসায় সময় অতি মূল্যবান জিনিস। কয়কঘণ্টার দেরিতে পণ্যবাহী প্লেন বা জাহাজ ছেড়ে যেতে পারে। কাজেই অফিসের তৎপরতা বৃদ্ধিতে শিল্প বাণিজ্য মহল খুব খুশি । বাণিজ্য বিভাগের কাছে যথেষ্ট টাকা । তিন বছরে জোন এর পরিকাঠামোয় অনেক পরিবর্তন ও বিস্তার আনতে পেরেছিলাম। অর্থনীতির পূর্ব অধ্যাপক বিদগ্ধ ডক্টর রাহুল খুল্লার তখন বাণিজ্য সচিব। তাঁর স্নেহ যেমন পেয়েছিলাম, কাজও শিখেছিলাম প্রাণ ভরে।
অশোভন নয়, বেআইনিও বটে। আমরা সকলে সারভিস কনডাক্ট রুলের অধীন। বুঝলেন, মনঃক্ষুণ্ণ হলেও কথা রাখলেন। আমি নিজে সীমা বেঁধে দেওয়ায় অন্য অফিসারদেরও মেনে নিতে হল। সাময়িক স্বস্তি। তবে মাঝে মধ্যে হাস্যকর পরিস্থিতি হত। একদিন এক জহরত শিল্পের মালিক দেখা করতে এলেন। অনেকটা সময় বিদেশে কাটান , ফলে আমাকে চেনার সুযোগ আগে হয়নি। প্রাথমিক সৌজন্য বিনিময়ের পরে বললেন, শুনেছি আপনি একজন লেখক। আপনার জন্য একটি কলম এনেছি। বলে সুদৃশ্য বাক্সে শয়ান যে কলমটি দেখালেন, তা ২৪ ক্যারাট সোনায় তৈরি, ক্যাপের মাথায় বসানো একটি হিরে। ড্রয়ার থেকে বার করে আমার পঞ্চাশ টাকা দামের দুটি কলম তাঁকে দেখালাম। বললাম, কিছু মনে করবেন না। আমার নিজের কলমে যাঁদের কথা লিখি , আপনার দেওয়া কলমে তাঁদের কথা লিখতে পারব না। তাছাড়া সারভিস রুল অনুযায়ী এটি সরকারি তোষাখানায় জমা পড়ে যাবে, কেউই ব্যবহার করতে পারবে না। বরং নিজের কাছেই রাখুন। ভদ্রলোক যারপরনাই বিমর্ষ হলেন। এমন কোনও সরকারি নিয়ম আছে, কেউ তাঁকে বলেনি।
একদিন এলেন একগুঁয়ে এক বৃদ্ধ। তাঁর বহু পুরনো এক সমস্যার সমাধান হয়েছে, তিনি খুব খুশি। ধন্যবাদ জানিয়ে ফিরে যাবার কালে বললেন, আজ আমি আপনাকে যা দিতে এসেছি, তা আপনার ফেরানোর সাধ্য নেই। তাই নাকি? কেন? টেবিলে রাখলেন সোনার তৈরি এক লক্ষ্মী ঠাকুরুন। গর্বভরে বললেন, এটি ফেরালে আপনার ধনবৃদ্ধি হবে না। কাজেই এঁকে ফেরাতে পারবেন না আপনি। আমি বললাম, আমার ধন না বাড়ে, না কমে। কারণ সরকারের দেওয়া ধন তো আমার বাঁধা । বরং আপনি দু'বেলা জাঁকজমক করে দেবীকে খুশি করুন। আপনার সমৃদ্ধি বাড়বে। হাতে আসা লক্ষ্মী কেউ ফেরায়! বিরক্ত হয়ে বলতে বলতে ফিরলেন প্রবীণ শিল্পপতি। এই হল মুম্বাই। টাকা চেনে, আবার কাজের মর্ম বোঝে। পিছনে তাকিয়ে অশ্রুপাত করে না, কেবলই সামনে এগিয়ে চলে। তিন বছর মুম্বাইয়ে কাজ করেছি, মনে পড়ে না কাজ ফেলে রাখার জন্য কখনও কারও উপর রাগ করতে হয়েছে। জুনিয়র কর্মীদের কোনও কাজ অবেলায় দিলে তারা তা শেষ না করে বাড়ি যাবে না। একবার সন্ধেবেলা দিল্লি গিয়ে শুনি পরের দিন সকাল আটটায় মিটিং নেবেন বাণিজ্যমন্ত্রী। অথচ যে তথ্য দরকার তা আমার কাছে নেই। ফোন করলাম করণিকের বাড়িতে। তিনি বললেন, চিন্তা করবেন না। সকাল ছটায় অফিসে গিয়ে সব রেডি করে আপনাকে ফ্যাক্স করে দেব। আপনি ফিরে অনুমোদন নিলেই হবে। সকাল সাড়ে সাতটায় দিল্লির শীতল সকালে নির্দিষ্ট ফ্যাক্স মেশিনটির কাছে গিয়ে দেখি, আউট ট্রের উপর শুয়ে আমার দরকারি কাগজগুলি। এখানে সকলেই নিজের কাজের বাইরে কিছু না কিছু করে, তবে মূল জীবিকায় আঁচ লাগতে দেয় না। মহার্ঘ শহর । এখানে জীবন যাপনের খরচ অনেক বেশি। দেশাই বলে এক মহাপ্রাজ্ঞ মারাঠি আমার সরকারি গাড়ি চালাত। লতায় পাতায় কোথায় যে নিজেকে ছড়িয়ে রেখেছে তার ঠিকানা নেই। কাজে ঢিল দিলে বকতাম। মাথা নীচু করে বলত, সরি। তারপর আরও কিছু বললে, প্রত্যুত্তর— একবার সরি বোলা না? দেখো আগে নহীঁ হোগা। এরপর আর কিছু বলা যায় না। গাড়ি চালানো বাদ দিয়েও অন্য জরুরি দরকারে দেশাই হামেশা হাজির। পুরো মুম্বাই তার চেনা।
(ক্রমশ)
অনিতা অগ্নিহোত্রীর জন্ম কলকাতায়। প্রেসিডেন্সী কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি পডেছেন। সাহিত্যের সব ধারাতেই আনা গোনা। অতল স্পর্শ, মহুলডিহার দিন, আয়নায় মানুষ নাই, কবিতা সমগ্র, মহানদী ইত্যাদি চল্লিশটিরও বেশি বইয়ের লেখক। কর্মসূত্রে ছিলেন ভারতীয় প্রশাসনিক সেবা বা ইন্ডিয়ান অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিসে। কাজে ও না কাজে ঘুরেছেন পূর্ব ও মধ্য ভারত।