
শেষ আপডেট: 21 August 2020 15:38
অনেক দিন পরে এই মার্কিন মুলুকে যে কোনও মতভেদ অগ্রাহ্য করে শুধুমাত্র একটা কারণে রক্তগরম হতে বাধ্য সমস্ত ভারতীয়ের। এই একপেশে শ্বেতাঙ্গ সাম্রাজ্যে এক কৃষ্ণকলি নির্বাচন যুদ্ধের প্রাক্কালে তাঁর লাইভ বক্তৃতায় বিশ্বের দরবারে ঘোষণা করলেন, 'আই বিলং টু ইন্ডিয়ান হেরিটেজ'।
ঔদ্ধত্যের প্রাচীর ভেদ করে,কৃষ্ণকলির বাস্তবায়িত রূপ যখন মানুষের সামনে আসে, তখন এপিনেফ্রিনের হুড়োহুড়িতে টিকে থাকার লড়াইটা যেন চাগাড় দিয়ে যায় মস্তিষ্কে। রাজনৈতিক ভ্রান্তিবিলাসের ঊর্ধ্বে তখন মতবাদ একটাই, পরিবর্তন। ভরসা হয়, এই কৃষ্ণকলিই একমাত্র তা আনতে পারেন। মনে পুঞ্জিত হতে থাকে একটাই বিশ্বাস, হিলারি ক্লিনটনের সেই কথা, 'গ্লাস সিলিং উইল বি শ্যাটার্ড সাম ডে' হয়তো আগত। হাল্লা রাজার দেশে ভারতীয় তথা অভিবাসীদের 'সারভাইভাল'-এর একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়ায় তাই, 'কৃষ্ণকলি' কমলা হ্যারিস।
২০২০ সালের বিপর্যয় চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অহংকার কীভাবে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে। এক অতিমারীর প্রকোপে ধুলিসাৎ হয়ে গেছে বিশ্বের এক নম্বর চিকিৎসা পরিষেবা। মৃত্যু মিছিলে প্রশ্ন উঠেছে একটাই, ডিসেম্বর থেকে সতর্কীকরণ থাকলেও, কতটা গাফিলতি বা গা-ছাড়া মনোভাব থাকলে একটা উন্নত দেশ বদলে যেতে পারে মৃত্যুপুরীতে। প্রসঙ্গত, বিশ্ব অর্থনীতিতে ধস নামলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপি তখনও ২১.৪৪ ট্রিলিয়ন ডলার!প্রশ্ন উঠেছে হু-এর দুর্নীতি নিয়ে।
পাসপোর্টের রং যাই হোক, সেই মুহূর্তে 'ইন্টেলিজেন্স ফেইলিওর'-এর অর্থ বোঝার আগেই অসহায় সবাই। এমতবস্থায় কী করলে বাঁচতে পারবে বোঝার মধ্যেই ঘটে যায় আরও একটি রোমহর্ষক ভয়ানক ঘটনা। শ্বেতাঙ্গ এক পুলিশ অবলীলায় নিজস্ব দাপটে দিনের আলোয় রাস্তায় শ্বাসরুদ্ধ করে মারে এক 'কালো'কে। ভাইরাল হওয়া ছবিটিতে ধরা পড়ে কতটা 'উপভোগ্য' কৃষ্ণাঙ্গ হত্যা!
নড়েচড়ে বসে সারা বিশ্ব। 'থার্টিন্থ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট' অবশ্য বরাবরই প্রহসন এই দেশে। আফ্রিকান-আমেরিকান শব্দটি যতটা দ্রুততায় রূপান্তরিত হয়েছে 'কালো'তে, ততটাই ক্রমবর্ধমান হয়েছে 'হুড এরিয়ার' আতঙ্ক।
এরই মধ্যে বেজে ওঠে ভোটের ডংকা। অতএব ধামাচাপা দিতে হবে সবটাই। সেক্ষেত্রে অর্থলোভ বহুযুগ ধরে একমাত্র চিরাচরিত সমাধান। ইমিগ্র্যান্টস হঠাও, চাকরি পাবে দেশের লোক। ভুল-ঠিক নির্বিশেষে, এসবের মধ্যেই চাকরি হারায় তিন কোটির বেশি মানুষ।
'ডেমোক্র্যাটস্' আর 'রিপাব্লিক'-এর লড়াইয়ে কোণঠাসা হয়ে দমবন্ধ অবস্থা তখন 'ল্যান্ড ওফ ইমিগ্রেন্টস'-এর বাসিন্দাদের। দেশে থেকে রাজার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে গেলে চাই এক বলিষ্ঠ প্রতিনিধি। অনেকটা ফিনিক্সের ভস্ম থেকেই তখন সামনে আসে 'ওম্যান অফ কালার', কমলা হ্যারিস, ডেমোক্র্যাটসদের সম্ভাব্য ভাইস প্রেসিডেন্ট। প্রথম সাউথ এশিয়ান আমেরিকান এবং দ্বিতীয় অ্যাফ্রো-আমেরিকান যিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে কর্মরত একজন মহিলা।
দু’ভাগে যদি ভাগ করে নেওয়া যায় মতামত,দেখা যাবে মানুষের মনে কমলা হ্যারিসের ঠিক কিরকম জায়গা।
১। গ্রিন কার্ড হোল্ডার, বর্ণবৈষম্য বিরোধী বা আমেরিকান সিটিজেন (ব্যতিক্রম সাপেক্ষ), তাঁদের মতামত অনুযায়ী হ্যারিস পুরোটাই একটা রাজনৈতিক গিমিক। কমলা হ্যারিসের মা, শ্যামলা গোপালনের নাম নিছক একটি আদিখ্যেতা, কারণ এই লেখিকা কোনও একটি সাক্ষাৎকারে, কোনও এক দিন দাবি করেছিলেন, উনি 'এশিয়ান আমেরিকান' নন।
আবার দেশের নাগরিক আগে চাকরি পাবেন, এতে কোনও ভুল নেই এবং অনথিভুক্ত অভিবাসন বা 'আনডকুমেন্টেড ইমিগ্রেশন' বহুযুগ ধরে অপব্যবহার করেছে এই দেশকে। অতএব ভোট দেওয়ার ক্ষমতা থাকায় রিপাবলিকের জয় তাদের কাছে আবারও কাম্য। হ্যারিসের জয় 'ওমেন এম্পাওয়ারমেন্ট' অবশ্যই কিন্তু তাতে বদলে যায় না দেশের ভবিষ্যৎ। 'আমার সন্তান এবং আমি নাগরিক', অতএব চাকরি পাওয়া আমাদের নাগরিক দাবি। আর রেসিসম্ নিয়ে গলা কাঁপালেও উত্তর একটাই, বহুযুগ ধরে চলা এই অন্যায় রোখা অসম্ভব।
২। লিগাল ভিসা হোল্ডার-- এদের মতামত অনুযায়ী একসময় আমেরিকান ভিসা তছনছ করেছে যারা, নিষ্কাশিত করা হোক তাদের। কিন্তু যারা নিজেদের যোগ্যতায় ঢুকেছে এই দেশে, যাদের ছাড়া এই দেশের তথ্যপ্রযুক্তি চলবে না, তাদের কেন ফিরে যেতে হবে শুধুমাত্র এই অকস্মাৎ রাজনৈতিক দাবানলে? হঠাৎ করেই একটা ই-মেলে,সাজানো সংসারে অনিশ্চয়তার পরিবেশ। রিনিউ হয়নি H1B ভিসা, L1B ভিসার শেষে H1Bতে পরিবর্তন বন্ধ। পরিণতি একটাই, ফিরতে হবে দেশে। করোনার প্রকোপে এখন নতুন হায়ারিং-ও বন্ধ। অতএব হয়তো বুকে দুধের শিশুকে নিয়ে যে মানুষটা নিশ্চিন্ত ছিলো যে তার গ্রিন কার্ড প্রসেসিং চলছে, হঠাৎই মন্থর বা বিলম্বিত হয়ে গেল তার নিশ্চিত ভবিষ্যত।
আশার আলো একমাত্র তখন হ্যারিসের 'ড্রিম অ্যাক্ট' বা 'এ পাথ টু সিটিজেনসিপ ফর আনডকুমেন্টেড ইমিগ্রেন্টস'। টিকতে গেলে দাঁতে দাঁত চেপে লড়তে হবে রাজার সঙ্গে। আওয়াজ ওঠে আর একটা, কর দিতে রাজি কিন্তু বন্ধ হোক বর্ণবিদ্বেষ। আসুক ডেমোক্র্যাটস্। খড়কুটো ধরে বাঁচতে চাওয়া ইমিগ্র্যান্টসদের আবেগে ঢাকা পড়ে যায় একটা বাস্তব, ভোট দেওয়ার ক্ষমতা কিন্তু এদের নেই। তা পুরোটাই সিটিজেনদের হাতে।
সারাংশ একটাই, কমলা হ্যারিস একটি সোচ্চার আবেগ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে থাকা অগুণতি ভারতীয় বা অভিবাসীদের এবং কৃষ্ণাঙ্গদের এই দেশে পড়ে থাকার একমাত্র শেষ সম্বল।
এ প্রসঙ্গে আরও কয়েকটি তথ্য জরুরি। প্রথমত, এটা একেবারেই নির্ভুল যে তছনছ হয়েছে আমেরিকান ভিসা পদ্ধতি। কনসালটেন্সির দাপটে টাকা দিয়ে শয়ে-শয়ে ঢুকেছে ইমিগ্র্যান্টস, সেটা বন্ধ হওয়া উচিত। কিন্তু যে দলই জিতুক, সেখানে দেশের নাগরিক হোক বা ইমিগ্র্যান্টস, চাকরি পাওয়ার একমাত্র মাপকাঠি হওয়া উচিত 'মেরিট বেসড্ এমপ্লয়মেন্ট'। শুধু নাগরিকত্ব না থাকার কারণে কাজ হারাবে দক্ষ কর্মচারী, তাহলে সেটিও কিন্তু রাজনৈতিক গিমিক।
দ্বিতীয়ত,আনডকুমেন্টেড ইমিগ্রেশন থেকে নাগরিকত্ব পাওয়ার রাস্তা যেমন দেশের জন্য অবশ্যই বেঠিক কিন্তু সঠিক আইনে আসা অভিবাসীদের সন্তানদের জন্মগত নাগরিকত্ব অবশ্যই কাম্য। ঠিক যেভাবে কাম্য 'DACA' বা হ্যারিসের 'ড্রিম এ্যাক্ট' প্রোপোজাল। কারণ যে বাচ্চাটি বছরের পর বছর এই দেশে শিক্ষালাভ করে বড় হয়েছে, শুধু তার বাবামা 'ইল্লিগ্যাল ইমিগ্র্যান্টস' বলে তাকে নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করা একেবারেই অনৈতিক। এক্ষেত্রে ব্রিটেনে কী হয় তাই দিয়ে মার্কিনি আইনের সংজ্ঞা দেওয়াও সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।এ ই দেশ কিন্তু স্বাধীন হয়েছে ব্রিটিশদের থেকেই এবং প্রযুক্তিগত ভাবে দেখলে বৈপরীত্য সবকিছুতেই।
তৃতীয়ত, সমস্ত তর্কের ঊর্ধ্বে, হাভার্ড ইউনিভার্সিটি (ঐতিহাসিক ব্ল্যাক ইউনিভার্সিটি) থেকে গ্র্যাজুয়েট করা, সমাজের পিছিয়ে পড়া শ্রেণি বা কৃষ্ণাঙ্গদের নিয়ে লিগ্যাল এডুকেশন প্রাপ্ত হ্যারিসের বড়ো হয়ে ওঠা ব্ল্যাক ব্যাপটিস্ট চার্চ এবং হিন্দু টেম্পলে। রাজনৈতিক টিকিট হলেও, হ্যারিসের উপলব্ধি বা অনুভূতি যে যে কোনও শ্বেতাঙ্গের থেকে বেশি হবে তা বলা বাহুল্য। অন্য দিকে হ্যারিসের না হলেও, তার মায়ের নামের পাশে চেন্নাই বাসস্থান দেখে গর্বে বুক ফুলতে বাধ্য, কারণ আমাদের মতো অনেকেরই এখনও শিকড় বাঁধা দেশে।
জামাইকান-আমেরিকান বাবার মেয়েকে ছোটবেলায় ক্যালিফোর্নিয়ায় খেলতে নেওয়া হতো না বর্ণবৈষম্যে। সেই মেয়ে যখন সেক্সুয়াল অ্যাসল্ট বা হোমিসাইডের বিপক্ষে আইনত কার্যভার নিতে পারে এই দেশে, তখন বুকের পাটা লাগে বৈকি। না, হ্যারিসের গায়ের রং কালো নয়। কিন্তু রেসিসম্ শুধু ত্বকের রং দেখে হয় না এদেশে। ফর্সা গায়ের রঙে ঝরঝরে ইংরেজি বলা ভারতীয়কেও এখানে শুনতে হয় নানা মন্তব্য। ঝাঁচকচকে শাসনতন্ত্রের মোড়কে ঢাকা থাকে মহিলাদের তাচ্ছিল্য করার পুরুষ-উগ্র জাতীয়তাবাদ।
হ্যারিস যেন এই তর্জনের বিরুদ্ধে জ্বলন্ত প্রতিবাদ।
সব দেশেই, রাজনীতি মাত্রই রাজার নীতির লড়াই। তাতে সাধারণ মানুষ দাবার বোড়ে ছাড়া কিছু নয়। কিন্তু এদেশে বেশিরভাগ শ্বেতাঙ্গই সেই রাজার আশীর্বাদভাজন। তাই তাদের দাপটে নাস্তানাবুদ অন্য রং। এমন উন্নত প্রথম সারির দেশে দুর্নীতির রংও তাই সাদা। কিন্তু ব্যতিক্রম থাকে সব কিছুরই। যেমন জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুতে নতজানু হয়েছিল শ্বেতাঙ্গ পুলিশ, তেমনই আজ সবরকম ফ্যাসিবাদকে পদদলিত করার অভিপ্রায়ে, জনপ্রিয়তা বা সংখ্যাগত সম্ভাবনার যৌক্তিকতার ওপরেও স্থান পাচ্ছে সাম্যবাদের আবেগী আহ্বান, যার কাণ্ডারী হতে পারেন কৃষ্ণকলি, কমলা হ্যারিস।
(নিউ জার্সির বাসিন্দা সুষ্মিতা রায়চৌধুরী একজন ব্লগার ও লেখিকা।)