Date : 15th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
‘কেকেআরের পাওয়ার কোচ রাসেল ২৫ কোটির গ্রিনের থেকে ভাল!’ আক্রমণে টিম ইন্ডিয়ার প্রাক্তন তারকাবিহারে আজ থেকে বিজেপি শাসন, রাজনীতির যে‌ অঙ্কে পদ্মের মুখ্যমন্ত্রী আসলে নীতীশেরই প্রথম পছন্দঅশোক মিত্তলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইডি, ক'দিন আগেই রাজ্যসভায় রাঘব চাড্ডার পদ পেয়েছেন এই আপ সাংসদ West Bengal Election 2026: প্রথম দফায় ২,৪০৭ কোম্পানি বাহিনী! কোন জেলায় কত ফোর্স?IPL 2026: ভাগ্যিস আইপিএলে অবনমন নেই! নয়তো এতক্ষণে রেলিগেশন ঠেকানোর প্রস্তুতি নিত কেকেআর TCS Scandal: যৌন হেনস্থা, ধর্মান্তরে চাপ! নাসিকের টিসিএসকাণ্ডে মালয়েশিয়া-যোগে আরও ঘনাল রহস্যক্যান্ডিডেটস জিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে গুকেশের মুখোমুখি সিন্দারভ, ড্র করেও খেতাবের লড়াইয়ে বৈশালীIPL 2026: চেন্নাইয়ের বিরুদ্ধে হেরে টেবিলের তলানিতে কেকেআর! গুরুতর বদলের ইঙ্গিত রাহানের নববর্ষের 'শুভনন্দন'-এও মুখ্যমন্ত্রীর SIR তোপ! বাংলায় পয়লা বৈশাখের শুভেচ্ছা প্রধানমন্ত্রীরইরানের সব পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ করে‌ দেওয়া হয়েছে, দাবি আমেরিকার, চিন্তা ইরানি ল্যান্ডমাইনও

ব্লগ: হ্যারিসন রোড/ চুয়াল্লিশের তিন

একরাম আলি বিশাল জংশন স্টেশন। ট্রেনগুলো ধুঁকতে ধুঁকতে আসে আর থেমে যেতে বাধ্য হয়। সামনে যাওয়ার রাস্তা নেই যে! সামনে যাওয়ার আর দরকারও নেই অবশ্য। গাঁ-গঞ্জ ঝেঁটিয়ে-আসা ধুলোমলিন ট্রেনটাকে তখন ঘিরে ধরে কুলির দল, রকমারি হকার, দোকান, হাজারো যাত্রী,

ব্লগ: হ্যারিসন রোড/ চুয়াল্লিশের তিন

শেষ আপডেট: 8 January 2019 13:57

একরাম আলি

বিশাল জংশন স্টেশন। ট্রেনগুলো ধুঁকতে ধুঁকতে আসে আর থেমে যেতে বাধ্য হয়। সামনে যাওয়ার রাস্তা নেই যে! সামনে যাওয়ার আর দরকারও নেই অবশ্য। গাঁ-গঞ্জ ঝেঁটিয়ে-আসা ধুলোমলিন ট্রেনটাকে তখন ঘিরে ধরে কুলির দল, রকমারি হকার, দোকান, হাজারো যাত্রী, কালো কোটের ধুরন্ধর টিকিটচেকার, ভিখিরি, রংবেরঙের নানান সাইনবোর্ডের কোনওটাতে বিকটযৌবনার আবক্ষ আবেদন, মুহুর্মুহু ট্রেনের ঘোষণা আর ভারী হাওয়ায় সবকিছুর দলা-পাকানো প্রকাণ্ড একটা শব্দ। হকচকিয়ে যাওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। এত যে ব্যস্ততা, তার দুটো মাত্র কারণ-- হয় ট্রেনে উঠতে হবে, নয় স্টেশন-নামের এই মেলাপ্রান্তর থেকে বেরোতে হবে। বেরিয়ে সোজা শিয়ালদাগামী ট্রাম, যেটা হাওড়া ব্রিজ ওরফে রবীন্দ্র সেতুতে ঢুকবে। নীচে ধীরগামিনী গঙ্গা। ক্ষণতরঙ্গে, সূর্য-চন্দ্রের বিকিরণে, নদী মাত্রেই তো অপরূপা। সে চঞ্চলা; বড়ো কথা-- সে বয়ে যেতে পারে। কিন্তু মানুষের যে তর সয় না! এমন একটা ভুবনবিখ্যাত নদীর গায়েই ব্যস্ততম আর ঘিঞ্জি বাজার বানিয়ে ফেলেছে সে। পরপর দোকানের নামগুলোতে দেশনেতা, দেবদেবী, নিজেদের বংশানুক্রমিক পদবি, কোনওটাতে আবার স্বনাম জ্বলজ্বল করছে। সেটা গত শতকের চুয়াত্তর সাল। মাস অক্টোবর। দিন মনে নেই। হাওড়া থেকে শিয়ালদা— এত বাস বা অন্যান্য যানবাহন তখন ছিল না। দরকারও ছিল না। তবু বীরভূমে, আমাদের গাঁয়ে, রাস্তাটির তখনই বেশ রমরমা। কেউ বিদঘুটে ছেঁড়া লুঙ্গি পরে বেরোলে সঙ্গীসাথিরা বলে উঠত— এহ্, এ যে একেবারে হাওড়া-শিয়ালদা রে! অর্থাৎ, এপাশ-ওপাশ দেখা যায়! তবু এই পথটুকু, এই হ্যারিসন রোড— মহাত্মা গান্ধী রোড তখন যার নিতান্তই পোশাকি নাম-- পর্বে পর্বে ভাগ করা। মেছুয়া থেকে চিৎপুরের চরিত্র মোটের ওপর একরকম। চিৎপুর থেকে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ একটু আলাদা। সেন্ট্রাল থেকে কলেজ স্ট্রিটের বর্ণবাহার অন্য। আবার কলেজ স্ট্রিট থেকে কলেজ স্কোয়ার একসুতোয় বাঁধা হলেও, তার পর থেকে আমহার্স্ট স্ট্রিট পর্যন্ত মেজাজে ছিল ভিন্ন। সেখান থেকে পূরবী ওই তো একটুখানি, তবু তার নিজস্ব চেহারা ছিল। পূরবী থেকে বৈঠকখানা যেন শিয়ালদার আগের পর্ব, একটা কিছু শুরু হতে যাচ্ছে। তারপরই শুরু খাস শিয়ালদা। আচমকা কন্ডাক্টরের ‘চিৎপুর, চিৎপুর’ ডাকে নড়াচড়া। কোলে ব্যাগ, সিটের তলায় হোল্ডঅল, মাথায় ফ্যান। দু-দিকে বিশাল সব দোকানপসার। দেখতে দেখতে কোনওটাই আর দেখা হয় না। চিন্তা নেই, বেড়াতে তো আসিনি। এসেছি পড়তে। আপাতত বছর দুয়েক। গোটা জীবনের কথা তখনও জানি না। একসময় কানে আসে ‘পূরবী, পূরবী’। কাঁধে ব্যাগ, হাতে হোল্ডঅল, ঠেলেঠুলে নেমে পড়ি। উলটোদিকে পরপর তিনটে মেস। ঘুরেফিরে মাঝেরটায়, মানে প্যারামাউন্ট বোর্ডিং হাউসে, দোতলার একটা থ্রি-বেডেড ঘরে দশ দিনের চুক্তিতে থাকার জায়গা হতে যাচ্ছে। অফিস-কাম-ম্যানেজারের থাকার ঘরে স্বয়ং সুধাময়কৃষ্ণ দালাল খাটে উপবিষ্ট। বাবরি চুলে পুরোনো কলপ। দাড়িগোঁফ নিখুঁত কামানো। সাদা পাঞ্জাবি। ধুতির কোঁচা লুটিয়ে মেঝেয়। সেখানে আলতো-খোলা কোলাপুরি। পাশের নীচু সোফায় আমি কাঁটা হয়ে বসে। তিনি গলা তুলে ডাকলেন—হরি। ও হরি। কেউ শুনতেও পায় না। হ-অ-রি-ই! গেঞ্জি-লুঙ্গির একজন দরজায় এসে হাজির। হরিকে পাশের ঘরে জানলার ধারের বেডটা রেডি করতে বলায় সে চলে গেল। তিনি পড়লেন আমাকে নিয়ে। তাঁর পরামর্শ— এম এ পড়তে গেলে আমাকে তো থাকতেই হবে কলকাতায়। এই দশদিনে একটা জায়গা জোগাড় করে ফেলা জরুরি। এখানে যে জায়গা ফাঁকা নেই, দেখাই যাচ্ছে। এরপর পোড়খাওয়া মানুষটির হাহুতাশ-- তা ছাড়া আজকালকার ছেলেদের বিশ্বাস করে তিনি তো ডুবেই আছেন। সবাই ছাত্র হয়ে আসে। কিন্তু দিনকাল যে কী খারাপ হয়েছে, বলার নয়। কতরকমের লেখাপড়া, একটা শেষ করে আরেকটায় সেঁধিয়ে গিয়ে ফের ছাত্র সেজে দৌড়োদৌড়ি, পড়া আর শেষ হতে চায় না। চাকরি না-পাওয়া অব্দি চলতেই থাকে। আর চাকরি পেয়ে গেলে তো ব্যস! পুরো তিনতলাটা? সব কেরানিবাবুর দল। হপ্তায় কি দু-হপ্তায় একবার দেশের বাড়ি আর বছরে একবার বউ-বাচ্চা নিয়ে এসে কলকাতা বেড়ানো। ওদিকে গ্রামে দিব্যি বাচ্চা হচ্ছে, দোতলা উঠছে আর এখানে মেসে দেওয়ালের চুনসুরকি খসে খসে পড়ছে। কাকে বলবেন তিনি, কে শুনবে! সামনে জানালা। জানালা ঘেঁষে সিঁড়ি। এ-ঘর থেকে প্রতিটি ওঠানামা দেখা যায়। ওপাশের দুটো ঘরও চোখের সামনে; কেন, তা ক্রমশ প্রকাশ হবে। জানালার নীচে কাঠের সেলফ। পাশে গোদরেজ আলমারি। সুধাময়কৃষ্ণবাবুর পেছনের দেওয়ালে, মাথার ওপরে, গোল অ্যাংলো-সুইস। ঘড়িটা যেন তাঁর মাথার চারপাশে স্বর্গীয় আলোর বলয়। হরি এসে কিছু-একটা বলল। ম্যানেজারবাবু ওর সঙ্গে যেতে বললেন আমাকে। তিনটে বেডের যেটা জানালার ধারে, সেটা হাত বাড়িয়ে ইশারায় দেখাল হরি। মুখে কিছু বলল না। শুধু হাসার মতো ভঙ্গি একটু। তাতেই দেখা গেল, একটু ভেতরে ঢুকে থাকায় তার সামনের দিকের একটা দাঁতে পানের কালো ছোপ স্থায়িত্ব পেয়ে গেছে। হরি চলে যাওয়ার পর ঘরে আমি একা। নিজের শয্যাটির দিকে তাকাই। একটা তক্তাপোষ। তাতে বালিশ আর তোশকের বহু বছরের ময়লা চাপা দেওয়ার অক্ষম চেষ্টা হয়েছে বেডকভার দিয়ে, যেটি নিজেই মলিন। মাথায় কালচে হয়ে-আসা ডিসি ফ্যান। বাকি দুই বোর্ডারের কেউ নেই। তাঁরা নিশ্চয়ই কাজে বেরিয়েছেন। বেলা প্রায় বারোটা ছুঁইছুঁই। আজই ইউনিভার্সিটিতে ভর্তির সময় দেওয়া হয়েছে দেড়টার মধ্যে। দ্রুত হোল্ডঅল খুলি। ঠিকঠাক করে নিই নিজের বিছানা। বিছানায় উঠে জানালার কাছে একটু একটু করে এগিয়ে যাই। খুলি। জানালার একেবারে বুকের ওপর চাপা সরু গলি। গলি নয়, একটুখানি ফাঁক মাত্র, পাশের ইন্ডিয়া হোটেলের সঙ্গে অন্ধকার বিভাজনচিহ্ন। বুঝলাম, জানালা মানে সবসময় আলো-হাওয়া আসার পথ নয়। জানালা কখনো নিরেট দেওয়ালে একটা আয়তন শুধু, দেওয়ালের ওই অংশটি খুললেও উলটোদিকে দেওয়ালই দেখা যায়, সঙ্গে গুমরে ওঠে চারকোনা হতাশা। তবু ওরই মধ্যে কী করে যেন একটু আলো একদিন ঘুরপথে এসে পড়েছিল শেষ বিকেলে। সেদিন বুঝেছিলাম, এই শহরের সবটুকুই অন্ধকার নয়। জীর্ণ মেসবাড়িতেও কখনো এমন বিকেল আসে, , যে-বিকেলের মনে একটা জানালার প্রত্যাশা থাকে।

(চলবে)

লেখক কবি ও প্রাবন্ধিক। লিখেছেন একটি উপন্যাস এবং একটি স্মৃতিকথা

```