Date : 14th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
'বিজেপির কথায় চললে আমাদের কাছেও তালিকা থাকবে', পুলিশ কর্তাদের চরম হুঁশিয়ারি ব্রাত্য বসুর!একসময় নীতীশকেই কুর্সি থেকে সরানোর শপথ নিয়েছিলেন! তাঁর ছেড়ে যাওয়া পদেই বসলেন শকুনি-পুত্র‘একজনকে ধরলে হাজার জন বেরোবে...’, আইপ্যাক ডিরেক্টর গ্রেফতারের পরই নাম না করে হুঁশিয়ারি মমতারনববর্ষে বাঙালিয়ানার ষোলো আনা স্বাদ! ঢাকাই কালো ভুনা থেকে আম পেঁয়াজির যুগলবন্দি, মিলবে এই রেস্তরাঁয়‘কোভিড ভ্যাকসিনই হার্ট অ্যাটাকের কারণ!’ শেন ওয়ার্নের মৃত্যু নিয়ে ছেলের মন্তব্যে নতুন বিতর্ক এবার রক্তদান শিবিরেও কমিশনের ‘নজরদারি’! রক্তের আকাল হলে কী হবে রোগীদের? প্রশ্ন তুললেন কুণালমারাঠি না জানলে বাতিল হবে অটো-ট্যাক্সির লাইসেন্স! ১ মে থেকে কড়া নিয়ম মহারাষ্ট্রেআশা ভোঁসলেকে শ্রদ্ধা জানাতে স্থগিত কনসার্ট, গায়িকার নামে হাসপাতাল গড়ার উদ্যোগউৎসবের ভিড়ে হারানো প্রেম, ট্রেলারেই মন কাড়ছে ‘উৎসবের রাত্রি’‘বাংলাকে না ভেঙেই গোর্খা সমস্যার সমাধান’, পাহাড় ও সমতলের মন জিততে উন্নয়নের ডালি শাহের

আধুনিকতাকে পেরিয়ে যাওয়া অবনীন্দ্রনাথ  

পার্থজিৎ চন্দ ‘শিল্পীগুরু অবনীন্দ্রনাথ’ গ্রন্থে রাণী চন্দ লিখছেন, "একে তো মহাদেব, তাঁর ভিক্ষের ঝুলি; ঠিকমতন হওয়া চাই তো! কত টুকিটাকি এটা ওটা ভরে ছেঁড়া কাপড়ের টুকরো দিয়ে বাঁধলেন টেনিস বলের আকার ছোট্ট একটা পুঁটলি। তাতে গুঁজলেন শুকনো এ

আধুনিকতাকে পেরিয়ে যাওয়া অবনীন্দ্রনাথ  

শেষ আপডেট: 7 August 2022 10:41

পার্থজিৎ চন্দ

‘শিল্পীগুরু অবনীন্দ্রনাথ’ গ্রন্থে রাণী চন্দ লিখছেন, "একে তো মহাদেব, তাঁর ভিক্ষের ঝুলি; ঠিকমতন হওয়া চাই তো! কত টুকিটাকি এটা ওটা ভরে ছেঁড়া কাপড়ের টুকরো দিয়ে বাঁধলেন টেনিস বলের আকার ছোট্ট একটা পুঁটলি। তাতে গুঁজলেন শুকনো একটা আমকাঠি; এটি হল মহাদেবের লাঠি। ঝুলির সঙ্গে লাঠি না থাকলে ঝুলি ঝুলবে কিসে?
সারাদিন লাগল ঝুলিটি বাঁধতে। বাঁধেন, খোলেন, গিঁট দেন; গিঁট দেওয়াও মনোমত হয় না- আবার খোলেন। ঝুলিটি ঝুলির মতো হবে তবে তো?… বললেন, দেখছ এই ভিক্ষের ঝুলি? মহাদেবকে রোজই ভিক্ষেয় বের হতে হয়, নইলে সংসার চলে না। আজ পার্বতী বড়ো তাড়নাই দিয়েছেন। মহাদেব ভিক্ষেয় বেরিয়েছেন, পথে এই নীলমণিটি দেখতে পেলেন, তাড়াতাড়ি কুড়িয়ে নিলেন পার্বতীকে দেবেন।" (Abanindranath Tagore)

রাণী চন্দ’র অসামান্য গদ্য ও স্মৃতিকথার সব থেকে বড় আকর্ষণ, সেখান থেকে উঁকি দেন রক্তমাংসের অবনীন্দ্রনাথ; এখানেও দিয়েছেন। একজন মানুষ সারাদিন ধরে মহাদেবের ভিক্ষের ঝুলি বাঁধছেন এবং পছন্দ হচ্ছে না বলে খুলে ফেলছেন! পুতির মধ্যে আবিষ্কার করছেন নীলমণি; মুহূর্তে হাতের কাছে পাওয়া, ফেলে দেওয়া জিনিসগুলি হয়ে উঠছে শিল্পের ও সৃষ্টির উপাদান। (Abanindranath Tagore)

জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত শিল্প ও সুন্দরকে আশ্রয় করে বেঁচে থাকার অকল্পনীয় প্রকাশ’ই সম্ভবত ‘অবনীন্দ্রনাথ’। তিনি ছবির মতো গদ্য লিখেছেন, অসামান্য ছবি এঁকেছেন; নিজেই হয়ে উঠেছেন ছবি ও গদ্যের জগতের পৃথক অ্যভেনিউ।
শিল্পগুরু পরিচয় তাঁর ক্ষেত্রে সার্থক তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু বাংলা গদ্যের অনুপম জাদুশিল্পী হিসাবে তাঁর কাছে আমাদের ঋণ ফুরাবার নয়। একটি ভাষায় শুধুমাত্র এমন অসামান্য সাবলীল, ঝরঝরে গদ্য রচনা করবার পথিকৃৎ হিসাবেই তাঁর পৃথক এক পরিচয় স্থাপিত হতে পারে।
কী আছে তাঁর গদ্যে? কী আছে তাঁর প্রবন্ধমালায়?

হাতের কাছে পড়ে থাকা জিনিসপত্র নিয়ে তিনি যে দক্ষতায় শিল্প সৃষ্টি করতেন, কাটুম-কাটাম করতেন ঠিক সে দক্ষতাতেই তিনি গদ্য রচনা করতেন। শিশুদের মনোজগতের হদিশ পাওয়া শ্রেষ্ট দুই বঙ্গ-সন্তানের নাম নিশ্চিতভাবেই সুকুমার রায় ও অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

অবনীন্দ্রনাথের গদ্যের সব থেকে বড় আকর্ষণ তার স্বাদুতা। শিশুদের কল্পনাকে রূপকথার মাঠে পক্ষীরাজ-ঘোড়ায় চাপিয়ে মুক্তি দেবার ক্ষেত্রে তিনি সরল বাক্যগঠনে আস্থা রেখেছিলেন। তদ্ভব শব্দের পাশাপাশি তিনি বহু ক্ষেত্রে কথ্যভাষায় ব্যবহৃত ‘আকাঁড়া’ শব্দ ব্যবহার করেছেন। (Abanindranath Tagore)

যদিও অবনীন্দ্রনাথের শিল্পবোধের ক্ষেত্রে সিনক্রেটিক-প্রবণতার ছাপ স্পষ্ট তবু আমাদের পুরাণ ও পাশ্চাত্যের মিথ যে এক নয় তা অনুধাবন করেছিলেন তিনি। করেছিলেন বলেই আখ্যানমূলক গদ্য রচনার সময়ে থিতু চরিত্রগুলিকে যথাসম্ভব রক্তমাংসের করে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন।

অবনীন্দ্রনাথ তাঁর আখ্যানগুলিতে স্থান-কাল-পাত্র পরিবর্তন না-করেও সেগুলিকে আশ্চর্য ‘বাংলা’য় স্থাপন করতে পেরেছিলেন। উদাহরণের পর উদাহরণ দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া যায় তাঁর এই জাদুকরী ক্ষমতার প্রকাশ, ‘নালক’-এ তিনি লিখছেন, ‘নালক পাঠশালা থেকে মায়ের হাত ধরে যখন বাড়ি ফেরে, হয়তো শালগাছের উপরে তালগাছগুলোর মাথা দুলিয়ে পুবে-হাওয়া বইতে থাকে, বাঁশঝাড়ের কাকগুলো ভয়ে কা-কা করে ডেকে ওঠে। নালক মনে মনে ভাবে আজ যদি এমন একটা ঝড় ওঠে যে আমাদের গ্রামখানা ঐ পাঠশালার খোড়ো চালটাসুদ্ধ একেবারে ভেঙে-চুরে উড়িয়ে নিয়ে যায়, তবে বনে গিয়ে আমাদের থাকতে হবে, তখন আর আমাকে ঘরে বন্ধ করার উপায় থাকে না।’
আবার ‘রাজকাহিনী’র ‘বাপ্পাদিত্য’-অংশে তিনি লিখছেন, ‘তুষের আগুন যেমন প্রথম ধিক-ধিক করে, শেষে ধূ-ধূ করে জ্বলে ওঠে, তেমনি গোহের পর থেকে রাজপুতদের উপর ভীলদের রাগ ক্রমে ক্রমে অল্পে-অল্পে বাড়তে বাড়তে একদিন দাউ-দাউ করে পাহাড়ে-পাহাড়ে, বনে-বনে দাবানলের মতো জ্বলে উঠল।’
ক্রিয়াপদের সঠিক ব্যবহার যে গদ্যের প্রাণভোমরা তা অবনীন্দ্রনাথের গদ্যের সামনে বসে থাকতে থাকতে টের পাওয়া যায়। (Abanindranath Tagore)

নন্দনতত্ত্বের ক্ষেত্রে অবনীন্দ্রনাথের সব থেকে বড় অবদান তাঁর চিন্তার স্বচ্ছতা ও সাবলীল প্রকাশ। ওরিয়েন্টাল আর্ট ইত্যাদি বিষয়ে তাঁকে পথিকৃৎ মনে করা হলেও শিল্প ও সুন্দরের প্রশ্নে তিনি ‘মৌলবাদি’ ধারণা পোষণ করতেন না। বাগেশ্বরী শিল্প-প্রবন্ধাবলি থেকে শুরু করে তাঁর রচনার বিপুল ক্ষেত্রে বারংবার এটির সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। যেমন ‘সুন্দর’ নামক একটি প্রবন্ধে তিনি লিখছেন, ‘মেঘের সঙ্গে ময়ূরের মিত্রতা, তাই কোনো-একদিন নিজের গলা থেকে গন্ধর্বনগরের বিচিত্র রঙের তারা-ফুল-গাঁথা রঙিন মালা ময়ূরের গলায় পরিয়ে দিয়ে মেঘ তাকে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দিলে। মানুষ প্রথমে ভাবলো, এমন সুন্দরে কাজ নেই। তারপর হঠাৎ একদিন সে দেখলে বকের পাঁতি পদ্মফুলের মালার ছলে সুন্দর হয়ে মেঘের বুক থেকে মাটির বুকে নেমে এস; মানুষ বললে ময়ূর ও বক এরা দুইটিই সুন্দর।’
এখানেও লক্ষ করার, শিল্প ও নন্দনতত্ত্ব নিয়ে কথা বলার সময় তিনি থিতু রইলেন মুখের ভাষার কাছে। এমনকি তাঁর শিল্প-বিষয়ক প্রবন্ধগুলির কাছে ফিরে গেলে দেখা যাবে তিনি সুন্দর ও অসুন্দরের মধ্যে পড়ে থাকা সীমাটিকেও মুছে দিচ্ছেন। ‘দেখা’র অসীম ক্ষমতায় দেখার চোখটিই যে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে তা তিনি অনুধাবন করেছিলেন ও বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন। বাঁধা-নৌকো ও ছাড়া-নৌকো দু’টিই যে নিজের শর্ত নেমে সমান সুন্দর তা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন অবনীন্দ্রনাথ।

শিল্প ও সুন্দরের মধ্যে আবহমান কাল ধরে ছড়িয়ে রয়েছে সহজের ছন্দ। এ ছন্দ থেকে বিচ্যুত হলে ‘সর্বনাশ’। শুধুমাত্র বস্তুজগতের বাহ্যিক রূপ’কে ফুটিয়ে তোলাই যে শিল্প ও শিল্পীর কাজ হতে পারে না তা দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করেছিলেন তিনি তাঁর ‘রূপ’ নামক প্রবন্ধে। দেখা ও না-দেখার প্রকৃত প্রকাশের পথ ধরে নির্মিত হতে পারে সার্থক শিল্প।
যতদিন যায় তত এ ভাবনা দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হয়ে ধরা দিচ্ছে- বাঙালি’র স্মৃতি-সত্তা-মননের সার্থক রূপকারদের একজন হলেন অবনীন্দ্রনাথ।

চিত্রকলার ক্ষেত্রে এই ‘নস্টালজিয়া’র প্রকাশ ঘটেছে বারবার। ভারতীয় চিত্রকলার ক্ষেত্রে তাঁর ইন্ডিয়ান সোসাইটি অফ অরিয়েন্টাল আর্ট আধুনিকতার এক ভিন্ন ধারার সন্ধান দিয়েছিল। ভারতীয় পুরাণ-দর্শন ইত্যাদির পুনরুত্থান ঘটেছিল তাঁর চিত্রকলায় এবং এ কারণে তিনি সমালোচিত’ও হয়েছিলেন কারও কারও দ্বারা পরবর্তীকালে। জাতিসত্ত্বার জটিল আতসকাচের নিচে তাঁর ছবিগুলির কাটাছেঁড়া হয়েছে। তবে যে আক্রমণ তাঁর দিকে ধেয়ে এসেছিল তা যে কত অসার তা প্রমাণ দেওয়া অনায়াসে। অবনীন্দ্রনাথের বিখ্যাত ছবিগুলির দিকে তাকালে দেখা যাবে তিনি জীবনের নিভৃততম ও একান্ত মুহূর্তগুলিকে ধরে রাখতে চেয়েছেন। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে ও তার আগের শতকের শেষ দিকে ইউরোপিয়ান চিত্রকলায় যে ভাঙচুর শুরু হয়েছিল সে বিষয়ে ওয়াকিবহাল ছিলেন তিনি। পাশাপাশি এটিও বুঝতে পেরেছিলেন এ-পথ তাঁর পথ নয়। তাঁর ‘গণেশ জননী’ ‘ভারত মাতা’ ‘ভিকট্রি অফ বুদ্ধ’ ‘দ্য পাসিং অফ শাহ জাহান’-সহ অজস্র ছবি গভীরভাবে প্রাচ্য-কে আবিষ্কার করতে করতে চলেছিল। তিনি মুঘল ও রাজপুত ঘরানার চিত্রশৈলীর দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। সে ধারার সঙ্গে জাপানের চিত্রকলার ‘ওয়াশ’ পদ্ধতি মিশিয়ে দেওয়া তাঁর আরও একটি বড় অবদান।
জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তিনি রবীন্দ্রনাথের হাত ধরে জাপানি শিল্পীদের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন। কাছ থেকে দেখেছিলেন তাঁদের ছবি আঁকার পর ছবিটিকে জলে ধুয়ে নেবার পদ্ধতি। ক্যানভাসে ব্যবহৃত রঙের ‘উগ্রতা’ এ পদ্ধতিতে মুছে গিয়ে রঙ হয়ে ওঠে পেলব ও ‘শান্ত’। পরবর্তী সময়ে ওয়াশ-টেকনিকের যে প্রসার তার পিছনে অবনীন্দ্রনাথের অবদান গভীর।

‘দ্য পাসিং অফ শাহ জাহান’ ছবিটিতে মুঘল চিত্রকলার ছাপ স্পষ্ট; বৃদ্ধ শাহ জাহান শেষ-শয্যায়, তাকিয়ে রয়েছেন তাঁর নির্মাণ করা তাজমহলের দিকে। জীবনের সমস্ত কোলাহল ও রক্তপাতের শেষে এ তাকিয়ে থাকা যেন মৃত্যুর দিকে তাকিয়ে থাকা। ছবিটি দেখার পর মনে হতে বাধ্য, ঠিক কী ভাবনার আক্রান্ত ছিলেন শাহ জাহান! তিনি কি সমস্ত অর্জনের অসারতা উপলব্ধি করতে পারছিলেন? না কি নিজের তৈরি করা ‘সুন্দরের’ দিকে এই অসহায় তাকিয়ে থাকা মানুষের আরও গভীরতর বিপণ্ণতার সন্ধান দিয়ে যায়! কিন্তু এ ধারণাও উপরিচরের ধারণা হয়ে বাজতে থাকে একটা সময়ের পর, কারণ আমরা আবিষ্কার করি অবনীন্দ্রনাথ যমুনার উপরে, আকাশে স্থাপন করেছেন পূর্ণ-চাঁদ। তার মুখ কিছুটা ঢেকে দিয়েছে মেঘের দল। মানুষের নশ্বরতার উপরে জেগে রয়েছে অবিনশ্বর প্রকৃতি।

দ্য পাসিং অফ শাহ জাহা

‘গণেশ জননী’ ছবিটিতেও গণেশ যেন বাংলার শিশুপুত্রে রূপান্তরিত হয়েছেন, পার্বতী’ও যেন রক্তমাংসের মা।
অবনীন্দ্রনাথের সব থেকে বেশি পরিচিত ও সব থেকে ‘বিতর্কিত’ ছবি নিঃসন্দেহে ‘ভারত মাতা’। বঙ্গভঙ্গের সময়ে সৃষ্ট এ ছবিটিতে ভারত-মাতা হলুদ বস্ত্র পরিহিতা; তাঁর চার হাতে যথাক্রমে ধরা বস্ত্রখণ্ড, বই, ধান্যগুচ্ছ এবং মালা। সীমন্তিনী’র মাথার কাছে জ্যোর্তিবলয়। এ ছবিতে অতি-সুস্পষ্ট ও একমাত্র হিন্দু রমণী চিত্রিত হবার কারণে এ চিত্র কতটা প্রকৃত ভারত মাতা’কে উপস্থাপিত করে সে নিয়ে বিতর্ক তীব্র হয়েছে এক সময়ে। হিন্দুত্ব ও ভারতীয়ত্ব’কে এক করে দেখার ‘যৌক্তিকতা’ নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। কিন্ত অবনীন্দ্রনাথ’কে খুব সহজে জাতিসত্তার প্রশ্নে রেস্টোরেটিভ নস্টালজিয়া-আক্রান্ত বলে দেগে দেওয়ার আগে দু’বার ভাবা জরুরি। আর যদি তাঁকে নস্টালজিয়ার ধারক ও বাহক বলে উল্লেখিত করার একান্ত প্রয়োজন থাকে, তাঁকে বরং রিফ্লেকটিভ নস্টালজিয়ার কাছাকাছি অবস্থান করা সত্তা বলে ভাবা যেতে পারে।

অবন ঠাকুরের আঁকা 'ভারতমাতা'

মাঝে মাঝে এ’ও মনে হয়- তথাকথিত ‘আধুনিকতা’র ঘেরাটোপে আটকে পড়ে আমরা অবনীন্দ্রনাথের গভীর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারলাম না। কী ভীষণ প্রাণবন্ত, আধুনিকতার সংকীর্ণ পরিসরটিকে অতিক্রম করে যাওয়া একজন মহাশিল্পী! আবার ফিরে আসতেই হচ্ছে রাণী চন্দ’র সেই বিখ্যাত বইটির কাছে, তিনি একদিনের অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করেছেন। চীনাভবনের দেওয়ালে ছবি আঁকা হচ্ছে, অবনীন্দ্রনাথ এসেছেন ছাত্রদের মাঝখানে। তিনি নন্দলাল বসু’কে বলছেন, ‘আচ্ছা নন্দলাল, জিজ্ঞেস করি, এই যে কনভেনশনাল আর্ট, এতে সত্যিকারের আনন্দ কে কতটুকু পায়? কনভেনশান একটা ধারা তো, ঘেঁষে অনবরত চললে তা থেকে আনন্দ পাওয়া যায় না। ছেড়ে দাও সব ছেলেমেয়েদের। কলাভবনের বাঁধা কাজ উলটে দাও…।’
ঠিক এ-কারণেই আমাদের রাজনৈতিক ও জাতিসত্তার সাবধানী, সংকীর্ণ, ঠুনকো অবস্থান থেকে শিল্পী অবনীন্দ্রনাথ’কে ধারণ করা মাঝে মাঝে বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। যদিও গদ্যশিল্পী অবনীন্দ্রনাথে সে সমস্যা নেই। আজ তাঁর চলে যাবার দিন… আক্ষেপ হয়, প্রতিটি ‘শিক্ষিত’ বাঙালির ঘরে যদি অন্তত একবার প্রবেশ করতেন অবনীন্দ্রনাথ! তাঁর হাত ধরে হয়তো ক্রমশ শিকড়হীন হয়ে ওঠা আমাদের সত্তা তার নিজের মাটি খুঁজে পেলেও পেতে পারত।       
 
 
 


```