
রিমঝিম সিনহা।
শেষ আপডেট: 15 November 2024 18:59
২০২৪ সালের ১৪ অগস্টের রাত অনেকেই মনে রাখবেন। বাংলা তথা দেশের রাজনীতির ইতিহাসেও লেখা থাকবে সেই রাতের কথা। যে রাতে শহর কলকাতা তথা রাজ্যের নানা প্রান্ত শুনেছিল রাত দখলের ডাক, সে ডাকে সাড়া দিয়ে দেখেছিল জনপ্লাবনের আক্ষরিক অর্থ কী।
এই প্লাবনের মূল আহ্বায়ক যিনি ছিলেন, যাঁর ডাকে রাজপথে মানুষের বাঁধ ভেঙেছিল, তিনি রিমঝিম সিনহা। প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী। সেই রিমঝিমই এবার তাঁর লিঙ্কডইন প্রোফাইলে নিজের পরিচয় হিসেবে লিখলেন, ‘রিক্লেম দ্য নাইট- কি ক্যাম্পেইনার’ (Reclaim the night- key campaigner)। অর্থাৎ রাত দখলের ডাক দেওয়ার প্রথম ও প্রধান সূত্রধর।
প্রথম কথা এই দাবি সঠিক নয়। দিল্লিতে নির্ভয়া কাণ্ডের পর রাত দখলের অভিযান হয়েছিল। সেই সময়ে স্লোগান তোলা হয়েছিল—‘রাত কো কব্জা কর লো।’ তবে এখানে বিতর্কের বিষয় হল, আরজি কর হাসপাতালে খুন ও ধর্ষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আন্দোলনের তিনি যে ডাক দিয়েছিলেন, তা এখন তাঁর পেশাগত প্রতিভা হিসাবে ব্যবহার করতে শুরু করেছেন রিমঝিম।
ইদানীং এ ধরনের প্রতিভার কদর বেড়েছে। কিছু পেশাদার সংস্থা তাঁদের রাজনৈতিক দলের প্রচার কৌশল বা স্লোগান লেখার জন্য ব্যবহার করে। তাদের মধ্যে অন্যতম হল, 'আই প্যাক' বা 'অ্যাসোসিয়েশন অফ ব্লিলিয়ান্ট মাইন্ডস'।
এখানে জানিয়ে রাখা ভাল, লিঙ্কডইন ঠিক আর পাঁচটা সোশ্যাল মিডিয়া সাইটের মতো নয়। সেখানে সকলে মূলত কাজ খোঁজার সূত্রে লোকজন প্রোফাইল খোলেন। প্রোফাইলে নিজের যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও পেশাদারি দক্ষতার বর্ণনা থাকে। যা দেখে কাজের প্রয়োজনে ঘরোয়া বা বহুজাতিক সংস্খা কর্মী বা পেশাদার বা পরামর্শদাতা খুঁজে নেয়। বিভিন্ন কোম্পানির প্রোফাইল দেখে সেখানে আবেদনও করতে পারেন কর্মপ্রার্থীরা।
পুরোপুরি পেশাদার সে প্ল্যাটফর্মে রিমঝিম কাজ খোঁজার জন্য লিখেছেন, তিনি অনুবাদ করা বা সাবটাইটেল লেখার কাজ করতে পারেন। তবে তার আগেই উল্লেখ করে বসেছেন, 'রাত দখলের ডাক দেওয়ার কাণ্ডারি' ছিলেন তিনিই।
৯ অগস্ট আরজি করে তরুণী চিকিৎকের ধর্ষণ-খুনের পরে গোটা সমাজ যখন রাগে-ক্ষোভে ফেটে পড়ছে, জনমানসে যখন ক্রোধের ঝড় উঠেছে, তখনই সেইসব ক্ষোভ-ক্রোধগুলিকে একত্রিত করে পথের দিশা দেখিয়ে রিমঝিম সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছিলেন, 'আমি রাতে রাস্তায় থাকবো। ১৪ই অগাস্ট রাত ১১.৫৯ নাগাদ স্বাধীনতার, আমার নারী স্বাধীনতার জন্য রাতে বাইরে থাকবো। গান গাইবো-গান শুনবো-আড্ডা দেবো। যা ইচ্ছে তাই করব।' ক্ষোভের বারুদে বিক্ষোভের স্ফূলিঙ্গ লাগলে যা হয়, তাই হয়েছিল। সারা রাজ্য পথে নেমেছিল। সেই রাতে এবং তার পরে আরও অনেকগুলি রাতে।
তবে এখন বিতর্কের মুখে রিমঝিমও। তা হল, ১৪ অগস্ট রাতের সাফল্যকে তাঁর পেশাগত পুঁজি করে নিয়েছেন তিনি।
জুনিয়র চিকিৎসকের আন্দোলনের অন্যতম মুখ কিঞ্জল নন্দ অবশ্য এ বিষয়ে কোনও মতামত দিতে চাননি। তিনি বলেন, 'যার যেটা মনে হয় লিখতেই পারে নিজের পরিচয় হিসেবে। কে কোন পরিচয় কীভাবে ব্যবহার করছে না করছে, সেটা সকলের ব্যক্তিগত বিষয়।'
তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষ অবশ্য প্রতিক্রিয়া দেবেন না বলেও, রিমঝিমদের খোঁচা দেওয়ার সুরে বলেন, 'মন থেকে কেউ আন্দোলন করেনি। সবাই রাজনৈতিক লাভের স্বার্থে বা ব্যক্তি' প্রচারের স্বার্থে আন্দোলন করেছিল। সেটাই এখন এভাবে সামনে আসছে।'
সিপিএমের বর্ষীয়ান নেতা সুজন চক্রবর্তীর মত, 'রিমঝিম এটা কেন লিখেছে, সেটা জানতে হবে। এই বিষয়টি নিয়ে আত্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে করে থাকলে তা অবশ্যই আপত্তিজনক।'

এই কারণটি জানার জন্য দ্য ওয়ালের তরফে ফোনে যোগাযোগ করা হয়েছি রিমঝিম সিনহার সঙ্গে। তিনি বলেন, 'আমার কাছে লিঙ্কডইন একটি সোশ্যাল মিডিয়া, যেখানে বহু মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়। আমি বহু মানুষকে দেখেছি, যাঁরা এইসব প্ল্যাটফর্মে সামাজিক পরিবর্তন নিয়ে নানা কাজ করছেন এবং সে কাজকে বাণিজ্যিকভাবে দেখেন না। আমার মনে হয়েছে, সোশ্যাল মিডিয়া দিয়েই রাত দখলের সঙ্গে মানুষ কানেক্ট করেছিলেন। লিঙ্কড ইনে বহু মহিলা রয়েছেন এবং আমরা কর্মরত নারীদের সুরক্ষা নিয়েও কথা বলছি। লিঙ্কডইনে তাঁরাও কথা বলবেন। আমি মনে করি না আমার কাজের সুরক্ষা নিয়ে আমি কেবল ফেসবুকে কথা বলতে পারি, লিঙ্কডইনে পারি না। আমার মনে হয়েছে, আমি তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারব, যাঁরা কর্মক্ষেত্রে নারীসুরক্ষা নিয়ে কথা বলতে চান।'
রিমঝিম আরও বলেন, 'অগস্ট থেকে শুরু করে এই পর্যন্ত আমি রাত দখলকে সামনে রেখে কোনও কাজ করিনি বা কোনও চাকরিও পাইনি। পরবর্তীকালেও এমন হবে না। আমি ফ্রিল্যান্সিং করি, সেই জায়গা থেকে আমি কোনও ক্লায়েন্টকেও বলিনি, যে রাত দখল করার ডাক দেওয়ার জন্য আমায় কাজ দিন। আমার মনে হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার পরিচয় ছাড়া কিছু নয় এবং সেই পরিচয় নিয়েই আমি বক্তব্য রাখব।'