
অমিত শাহ, নরেন্দ্র মোদী, জগৎ প্রকাশ নাড্ডা
শেষ আপডেট: 19 May 2024 14:14
অমল সরকার
২০০৪-এর লোকসভা ভোটের প্রথম দফা শেষ। প্রাক্ নির্বাচনী সমীক্ষায় তামাম সংবাদমাধ্যমে আভাস ছিল, ‘অগলি বারী, ফির অটল বিহারী।’
বিহারে ভোট কভার করতে গিয়ে সন্দেহ দানা বাঁধল স্বয়ং বাজপেয়ীর কথায়। প্রথম দফার ভোটের পর বিহারের ছাপরার জনসভায় বাজপেয়ীকে বলতে শুনলাম, ‘না জানে বাক্সা মে ক্যায়া হ্যায়।’ অর্থাৎ প্রথম দফায় ভোট ইভিএমে কোন পক্ষে জমা হয়েছে তা নিয়ে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে সংশয়ের সুর। ততদিনে তাঁর কাছে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা এবং দলের এক্সিট পোলের রিপোর্ট চলে এসেছে। বাজপেয়ী বুঝে গিয়েছিলেন, কুর্সি দখলে রাখা কঠিন।
সেবার, টানা পাঁচ বছর প্রধানমন্ত্রিত্বের পর ‘ইন্ডিয়া শাইনিং’ তথা উজ্জ্বল ভারত গড়ার কৃতিত্ব দাবি করে নির্বাচনের ময়দানে অবতীর্ণ হন বিজেপির প্রথম প্রধানমন্ত্রী। ভোট মিটতে পদ্ম শিবির স্বীকার করে, স্লোগানটি ভুল ছিল। ব্যাঙ্ক-পোস্ট অফিস-পিএফের সুদ কমানো, নির্বিচারে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার বেসরকারিকরণ, সরকারি দফতরে কর্মী ছাঁটাই, বেকারি ইত্যাদিতে অতিষ্ট সাধারণ মানুষের কাছে ‘ইন্ডিয়া শাইনিং’ স্লোগান ছিল কাঁটা ঘায়ে নুনের ছিঁটা দেওয়ার মতো। আশ্চর্যের হল বাজপেয়ীর মতো পোড়খাওয়া নেতা এবং ততদিনে সংসদীয় রাজনীতিতে পঞ্চাশ বছর কাটিয়ে ফেলা নেতাও তা ভোটের আগে উপলব্ধি করেননি। তার একটি কারণ ছিল, বাংলা, কেরল বাদে বাজপেয়ী সরকারের জনবিরোধী সিদ্ধান্ত ঘিরে আম ভারতীয়ের ক্ষোভকে বিরোধী দলগুলি রাজপথে আছড়ে পড়া জন-অসন্তোষের রূপ দিতে পারেনি।
যদিও ২০০৪-এর নির্বাচনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা এটাই ছিল যে, রাজপথে অসন্তোষের ঝড় আছড়ে না পড়লেও জনমনে তা ফল্গুধারার মতো প্রবাহিত হতে থাকে। এই ব্যাপারে আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা বিহারে। যদি প্রশ্ন করা হয়, ভারতে কোন রাজ্যের মানুষ সবচেয়ে রাজনীতি সচেতন, বেশিরভাগেরাই হয়তো বাংলার কথা বলবেন। আমি চোখ বুজে বলব, বিহার। কেন একথা বলছি, সে প্রসঙ্গ অন্য কোনও লেখায় আলোচনা করা যাবে।
সেবার বাজপেয়ী সরকারের জনবিরোধী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বাংলার রাজপথে সিপিএম-সহ বামপন্থীদের দুর্বার আন্দোলনের ছিঁটেফোঁটাও বিহারে ছিল না। ভোট কভার করতে গিয়ে প্যাসেঞ্জার ট্রেনে, স্টেশনে, বাসস্ট্যান্ডে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে অবশ্য বুঝেছিলাম, বিজেপি ও বাজপেয়ী সরকার দারিদ্র, অশিক্ষায় জেরবার রাজ্যটিতে আগ্নেয়গিরির উপর বসে আছে।
ভোটের ফল নিয়ে ভবিষ্যৎবাণী করার দক্ষতা, যোগ্যতা আমার নেই। সাংবাদিক হিসাবে আমি ২০০৪ এবং ২০২৪-এর ভোটের একটা মিল দেখতে পাচ্ছি। তা হল, ‘মোদী হ্যায় তো মুমকিন হ্যায়’, ‘মোদীর গ্যারান্টি’ জাতীয় স্লোগান এবার অনেক মানুষের প্রতিরোধের মুখে পড়েছে। সংখ্যাটা কত, তাদের ভোটে মোদী ক্ষমতাচ্যুত হবেন কি না, আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়। কিন্তু ভোট ঘোষণার সময়ে যে মনোভাব সাধারণ মানুষের মধ্যে লক্ষ্য করেছি, তার অনেকটাই এখন উধাও।
এটাও লক্ষণীয় ছিল, যে মানুষেরা তখন বলেছেন, আবার মোদীই আসবেন, তারাও প্রধানমন্ত্রীর কোনও বিশেষ গুণ বা অবদানের জন্য তা বলতেন না। বরং, তা ছিল বিরোধীদের অনৈক্যজনিত হতাশার বহিঃপ্রকাশ। এখন সেইসব মানুষেরও কথার সুর বদলে গিয়েছে। ভোট কম পড়ার কারণ অনুসন্ধানে নেমে অনেকেই নিশ্চিত হতে চাইছেন, তা হলে কি মোদী বিদায় নিচ্ছেন?
দেশবাসীর ‘মন কি বাত’-এর সুলুক সন্ধান দেওয়ার হরেক আয়োজন প্রধানমন্ত্রীর আছে। এখন আর সন্দেহের অবকাশ নেই যে সরকারি ও দলীয় নানা সূত্র থেকে তিনি নিশ্চিত হয়েছেন, ‘মোদীর গ্যারান্টি’ মানুষ গিলছে না। তাই দ্বিতীয় দফার ভোটের পর মোদীর ভাষণে গ্যারান্টির জয়গান উধাও। পরিবর্তে ঝোলা থেকে সেই বহু ব্যবহৃত অস্ত্রটি বের করেছেন। মুসলিম জুজুর ভয় দেখিয়ে হিন্দুদের মন জয়ে নেমেছেন।
কোনও সন্দেহ নেই, নরেন্দ্র মোদী এই অপ-রাজনীতিকে আশ্রয় করে কিছু মানুষের মনোজগতে প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছেন। দশ বছরের শাসনে জনজীবনের দুর্বিষহ অবস্থার জেরে এবার সেই প্রক্রিয়াতেও ফুলস্টপ পড়ে গিয়েছে। ফলে বিভাজন রাজনীতি ছাড়া আর কোনও অস্ত্র তাঁর হাতে নেই।
ভোট বৈতরণী পেরতে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর দেশের সংখ্যালঘু সমাজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা এ দেশে নজিরবিহীন। মেরুদণ্ড থাকলে নির্বাচন কমিশনের এতদিনে প্রধানমন্ত্রীকে শুধু সতর্ক করাই নয়, প্রচার বন্ধ করার নির্দেশ জারি করা উচিত ছিল। উল্টে ভোট রেফারি বার্তা দিয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ না করাই ভাল। তারা কোনও পদক্ষেপ করবে না। ফলে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, রাহুল গান্ধী, মল্লিকার্জুন খাড়্গের মতো নেতাদের হেলিকপ্টারে তল্লাশির পর প্রধানমন্ত্রীর ক্ষেত্রেও তারা একই কঠোর পদক্ষেপ করবে, এটা ভাবাই বোকামি।
টিম মোদী ধরে নিয়েছিল, বিরোধীরা ছন্নছাড়া, অতএব, মোদীর গ্যারান্টির টানে দলে দলে মানুষ পদ্ম ফুলের বোতাম টিপবে। বাস্তবে সেটা হচ্ছে না টের পেয়ে প্রধানমন্ত্রীকে তাই নিজেকে প্রবীণ তোগাড়িয়া, উমা ভারতী, প্রজ্ঞা সিং ঠাকুরদের মতো তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির রাজনীতিকদের জায়গায় নিজেকে নামাতে হয়েছে।
মুসলিমদের নিয়ে ভীতি-ঘৃণা-বিদ্বেষ-হিংসা ছড়ানোয় পিএইচডি ডিগ্রিধারী বিজেপি ও বিশ্বহিন্দু পরিষদের এই নেতারা বহুকাল প্রচারের আলোর বৃত্তের বাইরে। হিন্দু হৃদয় সম্রাট হওয়ার দৌড়ে মোদী তাঁদের আগেই সাইডলাইন করে দিয়েছেন। কাউকে দ্বিতীয়, তৃতীয় হওয়ার অবকাশ রাখেননি। এমনকী অমিত শাহ, যোগী আদিত্যনাথেরাও এখন আর মূল গায়েন নন, দোহার মাত্র। মোদীর কথায় ধুয়ো ধরা তাঁদের কাজ।
আরও একটা বিষয় নজর করার মতো। বছর দুই আগেও মুসলিম বিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযানে নামা সাধু সমাজ, যারা হিন্দুদের অস্ত্র সংগ্রহ, আরও বেশি সন্তানের জন্ম দেওয়ার তথা বলছিলেন, লোকসভা ভোটের মুখে তাঁরা তেমন একটা রা কাড়ছে না। যদিও আড়ালে সক্রিয় থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়ার নয়। হোয়াটসঅ্যাপে কত বিষ ছড়ানো হচ্ছে কে জানতে পারছে! কিন্তু প্রকাশ্য নীরবতাও উপেক্ষা করার নয়।
ভোটের ফল শেষ পর্যন্ত যাই হোক না কেন, একটা বিষয় পরিস্কার, হিন্দু-মুসলিম গবির-বড় লোক নির্বিশেষে মোদীর ছলচাতুরি অনেক মানুষ ধরে ফেলেছেন। মোদী মাহাত্ম্য মানুষ আর গব গব করে গিলছে না।
সাধারণ মানুষের এই উপলব্ধির কৃতিত্ব কোনও দল দাবি করার জায়গায় না থাকলেও রাহুল গান্ধীর অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই। মোদীর রাজনীতির ছলচাতুরি সহজ-সরল ভাষায় মানুষের সামনে ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরাতে তাঁর নিষ্ঠার প্রশংসা করতেই হবে। মোদীকে বিপাকে ফেলেছে কংগ্রেসের কৌশল বদল এবং বিরোধীদের ঐক্য। হবে না, হবে না করেও উত্তর প্রদেশ, মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু, ঝাড়খণ্ড, বিহারে এবারের বোঝাপড়া বিগত দুটি নির্বাচনে ছিল না। শতাব্দী প্রাচীন এবং সবচেয়ে বড় দল হওয়া সত্ত্বেও কংগ্রেসের এবার আঞ্চলিক দলগুলির গুরুত্ব, নেতৃত্ব মেনে নেওয়া, কাউকে প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসাবে তুলে না ধরার মতো সংযমী অবস্থানও মোদীকে বিরোধীদের মোকাবিলায় বিপাকে ফেলেছে।
ভোটের ফল, সরকার গঠন অনেক ‘যদি’, ‘কিন্তু’-র উপর নির্ভর করে। ২০২৪-এ দিল্লির কুর্সি বদল সম্ভব হবে কিনা, সে ব্যাপারে শেষ কথা বলার জায়গায় কেউই নেই। তবে এটা বলাই যায় ফল প্রকাশের আগেই নরেন্দ্র মোদী একটা ব্যাপারে পরাজয় মেনে নিতে বাধ্য হয়েছেন। দশ বছরের কাজের অতিরঞ্জিত সাফল্য দাবি করে যে গ্যারান্টির মুখোশ পরে তিনি ময়দানে অবতীর্ণ হয়েছিলেন, মানুষ তা ধরে ফেলায় মাঝপথে তাঁকে সেটি খুলে ফেলতে হয়েছে। ২০০৪-এর ভোট হয়েছিল দু-দফায়। এবারের মতো সাত দফায় হলে বাজপেয়ীও হয়তো মাঝপথে শহর, জাতীয় সড়ক, এক্সপ্রেসওয়ের রেল স্টেশন, বিমান বন্দরের বাইরে ‘ইন্ডিয়া সাইনিং লেখা হোর্ডিংগুলি সরিয়ে নিতেন। সাত দফা ভোটের সুবাদে মোদী যে সুযোগটা কাজে লাগাচ্ছেন। ‘অমৃতকাল’, ‘বিকশিত ভারত’, সবকা সাথ…., সংকল্প যাত্রা জাতীয় শব্দগুচ্ছ দিয়ে মন ভেজাতে না পেরে মোদী সেই হিন্দুত্বের সিঙ্গল ইঞ্জিনে চেপে বসেছেন, বিভাজনই যার চালিকা শক্তি।