
দেশের ভোট ব্যবস্থার চিত্র
শেষ আপডেট: 2 June 2024 14:10
অমল সরকার
সাত দফার কার্যত নিস্তরঙ্গ ভোট শেষে শনিবার সন্ধ্যায় বুথ ফেরত সমীক্ষার ফল প্রকাশের পর রাজনীতি নিয়ে নিরাসক্ত মানুষও খানিক নড়েচড়ে বসেছেন। ভারতের এক্সিট পোল নিয়ে সীমান্তের ওপারেও কৌতূহল এতটাই যে বাংলাদেশের একটি টিভি চ্যানেলে শনিবার মাঝরাতের অনুষ্ঠানে যোগদানের আমন্ত্রণ রক্ষা করতে হয়েছিল ভারতের নির্বাচনের সম্ভাব্য ফল নিয়ে। তাদের সংবাদ বিশ্লেষণমূলক সেই অনুষ্ঠানের পয়লা আলোচ্য ছিল ভারতের বুথ ফেরত সমীক্ষা। বিশেষ কৌতূহল ছিল পশ্চিমবঙ্গের সম্ভাব্য ফল এবং নরেন্দ্র মোদীই ফের প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন কিনা তা নিয়ে।
মোটের উপর সব সংস্থাই বিজেপি তথা এনডিএ-কে বুথ ফেরত সমীক্ষায় কংগ্রেস-সহ বিরোধীদের তুলনায় অনেকটাই এগিয়ে রেখেছে। একটি সংস্থা এমনকী বিজেপির একশো ভাগ প্রতাশ্যা পূরণ অর্থাৎ চারশোর বেশি আসন পাওয়ার কথা জানিয়েছে।
ভারতে বুথ ফেরত সমীক্ষা আশি ভাগ ক্ষেত্রে মিলেছে বলে কারও কারও দাবি। আশ্চর্যের হল, ভোটের আগে প্রায় সব সংবাদমাধ্যম, সাংবাদিক দাবি করেছেন, ভোটারের মন কি বাত’ বোঝা এবারের মতো কঠিন হয়নি কখনও। লোকেরা মন খুলে কথা বলছেন না। অথচ, বুথ ফেরত সমীক্ষকদের কাছে তারা কে কাকে ভোট দিয়েছেন জানিয়েছেন। বিষয়টি যথেষ্ট কৌতূহলদ্দীপক তাতে সন্দেহ নেই।
যে কুড়ি ভাগ ক্ষেত্রে মেলেনি, ২০০৪-এর লোকসভা ভোট তার অন্যতম। সেবার বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যম মতামত এবং বুথ ফেরত সমীক্ষায় দাবি করেছিল অটল বিহারী বাজপেয়ীই দিল্লির কুর্সিতে থাকছেন। কিন্তু প্রথম দফার ভোটের পর স্বয়ং বাজপেয়ী আভাস দেন তিনি বিদায় নিচ্ছেন। বাস্তবে তাই হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গে ২০২১-এর বিধানসভা ভোটেও মতামত সমীক্ষায় বিজেপির ক্ষমতা দখলের ইঙ্গিত ছিল, যা মেলেনি।
২৪-এর লোকসভা ভোটের এক্সিট পোলের ফলাফল সেই কুড়ি শতাংশের তালিকায় থাকবে কিনা, ৪ জুন দুপুরের পর তা ক্রমে স্পষ্ট হতে শুরু করবে। তারপর আগামী পাঁচ বছর দেশ পরিচালনার দায়িত্বে যে দল বা গোষ্ঠীর থাকুক না কেন, সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনের কিছু বিষয় সরকার ও বিরোধী উভয়কেই মাথায় রাখতে হবে। তার কিছুটা যেমন ইতিবাচক, উৎসারিত আলো, তেমনই কিছু আছে ঘোর অন্ধকারে ডুবে যাওয়ার আভাস।
ভারতের নির্বাচনকে উৎসব বলা হয়ে থাকে মানুষের যোগদানের কারণে। জনসংখ্যার অনুপাতে ভোটদানের হার আশাব্যঞ্জক না হলেও সংখ্যার বিচারে তা উপেক্ষা করার নয়। কোটি কোটি মানুষের ভোটদানের মধ্য দিয়ে অষ্টাদশ লোকসভা গঠনের নির্বাচন সম্পন্ন হলেও এবারের মতো নিস্তরঙ্গ ভোটের নজির নেই। তার প্রধান কারণ, একটি বা দুটি ইস্যুতে এবার ভোট হয়নি। বলা ভালো এই প্রথম একটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হল যেখানে প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর দেশ গড়ার ডাক, ইন্দিরার গরিবি হটাও, ব্যাঙ্ক-বিমা জাতীয়করণ, সেই ইন্দিরার বিরুদ্ধে জয়প্রকাশ নারায়ণের সম্পূর্ণ ক্রান্তি অর্জন এবং জরুরি অবস্থার বিরোধিতা, আটের দশকের গোড়ায় ইন্দিরার কেন্দ্রে শক্তিশালী সরকার গড়ার ডাক, তাঁরই চিতার ছবি দেখিয়ে ’৮৪-এর নির্বাচনে রাজীব গান্ধীর পক্ষে ভাবাবেগের ভোট, রাজীবের বিরুদ্ধে বোফর্স দুর্নীতি, নয়ের দশকের শুরুতে রাম মন্দির বনাম মণ্ডল ইস্যু, সেই দশকের মাঝামাঝি সময়ে তৃতীয় ফ্রন্ট্রের সরকার গড়ার ডাক, চলতি শতাব্দীর গোড়ায় বিজেপির সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে বিরোধীরের জোট, সেই সরকারকেই নরেন্দ্র মোদীর দুর্নীতি ও অপদার্থতার বানে কুপকাৎ করা, ২০১৯এ-এর ভোটে পুলওয়ামার ঘটনাকে সামনে রেখে দেশের সুরক্ষাকে হাতিয়ার করার মতো একমুখী ভোট-ঝড় দূরে থাক, সামান্য বাতাসও মালুম হয়নি এবার। সেটা দলগুলির ব্যর্থতা নাকি, সচেতন প্রয়াস, বিশেষ করে বিজেপি ও নরেন্দ্র মোদীর তা সুপরিকল্পিত কৌশল ছিল, এই মুহূর্তে তা বলা কঠিন। প্রচারের আবহে ‘ভোট টু মোদী’ কিংবা ‘নো ভোট টু মোদী’ কোনওটিরই অনুরণন ছিল না। তা থেকে বোঝা যাচ্ছে, দিনের শেষে নরেন্দ্র মোদীই এগিয়ে আছেন। ক্ষুব্ধ মানুষের মধ্যে তাঁকে নিয়ে তীব্র অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ দেখা যায়নি। বিরোধীদের ব্যর্থতাই এর প্রধান কারণ হয়ে থাকবে।
ফলে জাতীয় নির্বাচনে এবার অনেক বেশি গুরুত্ব পেল আঞ্চলিক ইস্যু। বাংলায় একশো দিনের কাজের প্রকল্পে দিল্লির টাকা আটকে দেওয়ার জবাবে বিজেপি ইস্যু করেছে চাকরি, কয়লা, গরু চুরির অভিযোগ। দু-পক্ষের মুখেই চোর চোর শোনা গিয়েছে, যা সবচেয়ে বেশি শোনা গিয়েছিল বোফর্স কামান কেনাতে দুর্নীতির মতো একটি সর্ব ভারতীয় ইস্যুতে।
পড়শি রাজ্য ওডিশায় বলতে গেলে ভোট হয়েছে মুখ্যমন্ত্রী নবীন পট্টনায়েকের শারীরিক অবস্থার ভাল-মন্দ নিয়ে। বিহারে আলোচ্য ছিল নীতীশ কুমারের ডিগবাজি। কাশ্মীরে মানুষ জঙ্গি হুমকি উপেক্ষা করে বিপুল সংখ্যায় ভোট দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন তাঁরা আসলে দ্রুত বিধানসভা নির্বাচন সম্পন্ন করে নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর এবং বিচ্ছিন্নতাবাদের অবসান চান। রাজ্যওয়ারি পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে বেশিরভাগ প্রদেশেই আঞ্চলিক প্রত্যাশা, ক্ষোভ-বিক্ষোভের প্রতিফলন ভোটের বাক্সে আছে। কেরল, তামিলনাড়ুতে বিজেপি যদি শেষ পর্যন্ত বিজয় নিশান ওড়াতে সফল হয় তবে তা অর্জিত হবে দ্রাবিড় জাতিয়তাবাদকে সিঁড়ি করে। অর্থাৎ বিজেপির কোর রাজনীতিকে পিছনের সারিতে ঠেলে দিয়ে। এইভাবে কম-বেশি সব রাজ্যেই লোকসভার এই ভোটে মাথা তুলল বিধানসভা নির্বাচনের ইস্যু। নির্বাচনী গণতন্ত্রের জন্য এর ভাল-মন্দ বিচার আগামী দিনে জরুরি।
মোদী-শাহ জুটি ঘোষণা করে দিয়েছেন, এরপর থেকে এক দেশ-এক ভোট নীতি কার্যকর হবে। তাই যদি হয়, তাহলে একটি বা দুটি জাতীয় ইস্যুতে ভোট হয়ে যাওয়া অসম্ভব নয়, বহু বিশেষজ্ঞ যা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। ২০২৪-এর ভোট সেদিক থেকে একটা ভিন্ন মাইল স্টোন বলা চলে।
যদিও আঞ্চলিক ইস্যু প্রধান হয়ে উঠলে কেন্দ্রের শাসক দলের মুখ রক্ষা সহজ হয়ে যাওয়া অসম্ভব নয়, যা এবারেই দেখা গেল। আমার পর্যবেক্ষণ হল, নরেন্দ্র মোদী আঞ্চলিক ইস্যুতে প্রচার সীমাবন্ধ রেখে কর্মসংস্থান, মূলবৃদ্ধির মতো বিষয়গুলির জবাবদিহির দায় এড়াতে সক্ষম হয়েছেন। আগামী দিনে যদি এটাই প্রবণতা হয়ে ওঠে তাহলে নাগরিক হিসাবে আমাদের স্বার্থপরতা কোন জায়গায় গিয়ে পৌঁছাবে সেটাও ভেবে দেখা জরুরি। যেমন, প্রধানমন্ত্রী প্রায়ই পূর্বাঞ্চলের পশ্চাৎপদতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশের পাশাপাশি তাঁর অ্যাক্ট ইস্ট নীতির কথা তুলে ধরে অনেক আশার কথা শোনান। লক্ষণীয় বিহার-বাংলা-ওড়িশা-ঝাড়খণ্ডের মতো পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলির মধ্যে কিন্তু এ নিয়ে কোনও বোঝাপড়া নেই। অথচ, রাজ্যগুলির যে কোনও একটির পশ্চাৎপদতা অপরটির সমস্যার কারণ।
এই নির্বাচনে মোদী একমাত্র যে জাতীয় অস্ত্রটি ব্যবহার করেছে তা হল, উগ্র হিন্দুত্বের জিগির তুলতে মুসলিমদের প্রতি নির্দয় ব্যবহার। তাদের কার্যত অভারতীয় বলে দেগে দিয়েছেন। সিএএ কারও নাগরিকত্ব কেড়ে নেবে না, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের এই ঘোষণা নিয়ে ঘোর সংশয় তৈরি হয়েছে প্রধানমন্ত্রী ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ সংখ্যালঘুদের বহিরাগত বলে দেগে দেওয়ায়।
মুসলিমদের যে কোনও প্রাপ্তিই হিন্দুদের ভাগে থাবা বসানো, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর এমন ধারণা নির্মাণের প্রতিক্রিয়া, পরিণতি নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। বাবরি মসজিদ ধ্বংস এবং গুজরাত দাঙ্গার পর প্রশাসন, সংবাদমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের সিংহভাগের নির্লিপ্ততা থেকে শান্তিপ্রিয় সাধারণ সংখ্যালঘু সমাজ উপলব্ধি করেছে, জলে বাস করে কুমিরের সঙ্গে লড়াই করে বাঁচা কঠিন। কিন্তু মৌলবাদীরা দমে যায় না। দু-পক্ষেরই মৌলবাদী শিবিরের ফের অতিসক্রিয় হয়ে ওঠা অসম্ভব নয়। ২০২৪-এর মতো আর কোনও নির্বাচন এমন আঁধার, অনিশ্চিয়তা তৈরি করেনি, তৈরি হয়নি সহাবস্থান ঘিরে এমন উৎকণ্ঠা। মিশ্র এলাকায় মিলিমিশে বাস করা বহু মানুষ আগামী দিনগুলি নিয়ে উৎকণ্ঠার কথা শুনিয়েছেন।
নরেন্দ্র মোদী অথবা বিরোধী কোনও মুখ, আগামী পাঁচ বছর যাঁর হাতেই দেশ শাসনের ভার থাকুক, ২০২৪-এর লোকসভা ভোটের ইতি ও নেতিবাচক দিকগুলিকে উপেক্ষা করতে পারবেন না। বিপদের মুখে উটপাখির বালিতে মুখ গুঁজে থাকার মতো দেশবাসীরও চোখ বন্ধ করে থাকার উপায় নেই। অন্ধ হলে প্রলয় বন্ধ থাকে না।