1.webp)
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী
শেষ আপডেট: 26 May 2024 15:47
অমল সরকার
এখন বোঝা যাচ্ছে, সম্বিৎ পাত্র হয়তো নেহাৎই মুখ ফসকে কথাটি বলেননি। বিজেপির জাতীয় মুখপাত্র হিসাবে নরেন্দ্র মোদীর মন-মানসিকতা তাঁর অজানা থাকার কথা নয়। তিনি জানেন তাঁর সর্বোচ্চ নেতা কোন পুজোয় তুষ্ট হন। সেই উপলব্ধি থেকেই বোধহয় বলে ফেলেছিলেন ‘জগন্নাথও মোদী ভক্ত।’ ভোটের ভরা মরশুমে সেই মন্তব্যের জন্য বিরোধীদের তীব্র ঝড়ের মুখে পড়েন ভুবনেশ্বরের সাংসদ। ‘মুখ ফসকে বলে ফেলেছি’ বলে কথাটি দ্রুত গিলেও নিয়েছেন। কিন্তু স্বয়ং মোদীর নিজের সম্পর্কে মুল্যায়নটি শোনার পর বলাই যায়, নেহাৎ নির্বাচন, তাই এযাত্রায় জগন্নাথের মানরক্ষা হল। নইলে সম্বিৎ পিছু হটে নেতার বিরাগ ভাজন হতেন কি না শতভাগ সন্দেহ আছে। বঙ্গ বিজেপির বছর সত্তরের এক নেতা লোকসভা নির্বাচনের পর দলীয় রাজনীতি থেকে অবসর নেবেন বলে মনস্থির করেছেন। দিন কয়েক আগে কথা প্রসঙ্গে বলছিলেন, নয়ের দশকের গোড়ার জয় শ্রীরাম ডাক শুনে বিজেপি এসেছিলাম। অবসরে যাচ্ছি মোদীর পার্টি থেকে। সেই নেতাই টিভির ব্রেকিং নিউজ দেখে ফোনে বলেছিলেন, 'শুনেছেন তো প্রধানমন্ত্রী দাবি করেছেন তিনি ঈশ্বরের দূত। পরমাত্মা তাঁকে নাকি পাঠিয়েছেন বিশেষ কোনও কর্ম সম্পাদনের উদ্দেশ্যে।
কী সেই কাজ, ফাঁস করেননি প্রধানমন্ত্রী। তবে এবারের নির্বাচনকে সামনে রেখে অভিনব এক রহস্য তৈরি করেছেন। বলেছেন, গত দশ বছরে যে কাজ করেছেন, তা নিছকই ট্রেলার। পূর্ণাঙ্গ ছবি রিলিজ করবেন ভোটের পর।
এক সাক্ষাৎকারে আরও বলেছেন, ‘ঈশ্বর আমাকে ২০৪৭-এ ‘বিকশিত ভারত’ এর লক্ষ্য পূরণের জন্য পাঠিয়েছেন। লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত পরমাত্মা আমাকে ফিরিয়ে নেবেন না।’
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেছেন, ‘মা বেঁচে থাকা পর্যন্ত মনে করতাম আমার জন্ম জৈবিক প্রক্রিয়ায় হয়েছে। মা গত হওয়ার পর মনে হয়েছে, আমাকে পরমাত্মা পাঠিয়েছেন। সেই জন্যই এত কাজের প্রাণশক্তি। কোনও কাজ আমাকে দিয়ে করানো বাকি। সেই জন্যই আমাকে পাঠানো হয়েছে।’
তিনি যে নিছকই কথার কথা বলছেন না তা স্পষ্ট করে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘লোকে পাগল বলে বলুক, আমি বিশ্বাস করি পরমাত্মাই আমাকে বিশেষ কাজে পাঠিয়েছেন।’
নরেন্দ্র মোদী জানেন, ২০৪৭-এ তাঁর বয়স হবে ৯৬। এখন তিনি ৭৩। জৈবিক উপায়ে সৃষ্ট মানুষের কি ৯৬ বছর বয়সে ভারতের মতো একটি দেশকে নেতৃত্ব দেওয়া সম্ভব? উত্তর হল, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপকে ইচ্ছা মতো বদলে নিলে তা মোটেই অসম্ভব নয়। বিশ্বের বহু দেশ এক ব্যক্তির আমৃত্যু শাসনের নিদর্শন রয়েছে। বয়স মাত্র ৪২ হলেও এখনই যেমন উত্তর কোরিয়ার স্বৈরাচারী শাসক কিম জং উন সম্পর্কে বলা যায় তিনিও দাদু কিম ইল সাংয়ের মতো আমৃত্য রাষ্ট্রীয় পদে আসীন থেকে যাবেন। সাংয়ের সময়কালে ৬ জন দক্ষিণ কোরিয় রাষ্ট্রপতি, ৭ জন সোভিয়েত রাষ্ট্রনায়ক, ১০ জন মার্কিন রাষ্ট্রপতি, ১০ জন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী, ২১ জন জাপানি ও ১২ জন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করেছেন। নরেন্দ্র মোদীও কি দক্ষিণ কোরিয় কিম ইল সাং, রুশ রাষ্ট্রপ্রধান ভ্লদিমির পুতিনের মতো রাষ্ট্রীয় ভূমিকা বদলে বদলে নিয়ে ক্ষমতার টিকে থাকবেন? তা অসম্ভব নয় নির্বাচনী ব্যবস্থাকে পুরোপুরি দুরমুস করে, যার অনেক নির্দশন এবারের ভোটে টের পাওয়া গিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক প্রচারের গুরুতর অভিযোগ নিয়ে কমিশন সরাসরি তাঁকে জবাবদিহি করতে বলার সাহস দেখায়নি। চিঠি দিয়ে সতর্ক করেছে প্রধানমন্ত্রীর পার্টির সভাপতিকে। রাহুল গান্ধীকে নিয়ে অভিযোগের প্রেক্ষিতে মল্লিকার্জুন খাড়্গেকে চিঠি পাঠিয়ে কমিশন ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করলেও আসল উদ্দেশ্য ছিল প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্নের মুখে না ফেলা।
নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ সংক্রান্ত মামলায় গত বছর সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি কেএম যোশেফ সরকারের কাছে জানতে চেয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে নির্বাচনী বিধিভঙ্গের অভিযোগ উঠলে নির্বাচন কমিশন কি ব্যবস্থা নিতে পারবে? অ্যাটর্নি জেনারেন আর ভেঙ্কটরমানি বিচারপতিকে সংযত হওয়ার পরামর্শ দিয়ে প্রসঙ্গ এড়িয়ে গিয়েছিলেন। সেই মামলার চূড়ান্ত পরিণতি আমরা জানি। সুপ্রিম কোর্ট কমিশনার নিয়োগের যে স্বচ্ছ ব্যবস্থা তৈরি করে দিয়েছিল, সংসদে বিল এলে মোদী সরকার সেটি বাতিল করে এই ব্যাপারে শেষ কথা বলার অধিকার প্রধানমন্ত্রীর হাতে ন্যস্ত করেছে। সেই ধারাবাহিকতা থেকে এমন আশঙ্কা প্রকাশ অন্যায্য নয় যে, নরেন্দ্র মোদী তৃতীয়বার ক্ষমতা দখল করতে পারলে আইন বদলে প্রধানমন্ত্রীকে কমিশনের নজরদারীর বাইরে রাখার ব্যবস্থা করা হবে।
গত দশ বছরে নির্বাচন কমিশনের মতো একাধিক সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকেই এক প্রকার সরকারি দফতর বানিয়ে নিয়েছেন তিনি। অনেকেরই মনে থাকবে আগের লোকসভা নির্বাচনেও তৎকালীন নির্বাচন কমিশন প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে বিধিভঙ্গের অভিযোগ নসাৎ করে নিজেদের নাক-কান কেটেছিল। তিন সদস্যের কমিশনের একজন ব্যবস্থা গ্রহণে আগ্রহ প্রকাশ করায় শেষ মাঝপথে কমিশন থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন সেই কমিশনারকে। লক্ষণীয়, এত কিছুর জন্য সংবিধান বদলানোর প্রয়োজন হয়নি। মোদী সরকারের বিগত পাঁচ বছরের কাজকর্ম থেকে বলা চলে ‘ঈশ্বরের দূত’ তৃতীয়বার ক্ষমতায় এলে সরকারের নীতি, পদক্ষেপকে বিচারের এক্তিয়ারের বাইরে নিয়ে যাওয়া অসম্ভব নয়। তারজন্য দরকার বিচারপতি নিয়োগের ক্ষমতা পুরোপুরি সরকারের করায়ত্ব করা। এই সংক্রান্ত যে আইন সুপ্রিম কোর্ট অসাংবিধানিক বলে বাতিল করে দিয়েছিল সেটি নতুন করে বলবৎ করা অসম্ভব নয়। কারণ, সরকারের পক্ষে কথা বলার বিচারপতিরা সংখ্যায় এখন নেহাৎ কম নন।
নরেন্দ্র মোদীকে তাঁর ভক্তরা অনেকদিন ধরেই ঈশ্বর প্রেরিত বলে দাবি করে তাঁকে হিটলারকে জীবন্ত করে তুলেছে। বারাণসীতে ‘হর হর মোদী’ ধ্বনী শোনা গিয়েছে। ‘মোদী হ্যায় তো মুমকিন হ্যায়’, ‘মোদী ম্যাজিক’, ‘মোদীর গ্যারান্টি’—মোদী সর্বস্ব এই সব স্লোগান শুনিয়ে অনেক আগেই বোঝানোর চেষ্টা হয়েছে, মোদী রক্তমাংসের তৈরি মানুষ নন। তিনি ঈশ্বরের দূত। কথাটা উত্তর কোরিয়ার স্বৈরশাসক কিম জং উনকেও বলতে শোনা গিয়েছে। হিটলার সম্পর্কে যা বলে বেড়াত গোয়েবলস বাহিনী।
জনপ্রিয়তার একটা পর্যায়ে মানুষকে ঈশ্বরের দূত বলে তুলে ধরা নতুন নয়। আম ভারতীয়ের মধ্যে ভক্তি এবং নিবেদনমূলক মানসিকতা তাতে বাড়তি মাত্রা যোগ করে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সামনে রেখে ১৯৭১-এ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের বিজয়ের পর ইন্দিরা গান্ধীকে বিরোধী দলেরও বহু এমপি সংসদের ভাষণে দেবী দুর্গার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। গরিবি হটানোর ডাক, ব্যাঙ্ক, বিমা, খনি ইত্যাদির রাষ্ট্রায়ত্তকরণ করে ইন্দিরা একটা সময় আম ভারতীয়ের চোখে সাক্ষাৎ দেবী দুর্গা হয়ে উঠেছিলেন।
নরেন্দ্র মোদীর ঝুলিতে তেমন একটিও যুগান্তকারী প্রভাব সৃষ্টিকারী পদক্ষেপের নজির নেই দলমত নির্বিশেষে আম ভারতীয় যা নিয়ে উচ্চ কণ্ঠে গর্ব অনুভব করে। ভোটের ভাষণে পাকিস্তানকে জড়িয়ে যে পরমাণ বোমা নিয়ে আস্ফালন করছেন, মোদীর কী দুর্ভাগ্য এই ক্ষেত্রেও প্রয়াত ইন্দিরা দেশকে এগিয়ে দিয়ে গেছেন। অযোধ্যায় রাম মন্দির নির্মাণে হিন্দুত্ববাদীদের মনোবাসনা পূরণ হলেও তাতে নরেন্দ্র মোদীর কোনও অবদান নেই। তিনি প্রধানমন্ত্রী বলেই হিন্দুরাষ্ট্রের স্বপ্নদ্রোষ্টারা তাঁর হাত দিয়ে মন্দির উদ্বোধন করিয়েছেন।
সেই মন্দির উদ্বোধনে মোদী ‘দেবতা থেকে দেশ, রাম থেকে রাষ্ট্র’ কথাটি বলে সংবিধানের প্রস্তাবনাকেই কার্যত বদলে নিয়েছেন, যেখানে শুরুতে বলা আছে, আমরা ভারতের জনগণ…….। নাগরিকের জায়গায় দেবতাকে বসিয়ে দিয়ে মোদী একপ্রকার জানান দিতে চেয়েছেন, তাঁর হাত দিয়ে রামলালার প্রাণ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে তিনিও এক অবতারে উত্তীর্ণ হলেন। তিনি অসীম শক্তিশালী, অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারেন, প্রায়ই মনে করিয়ে দেন তাঁর অতি বিস্বস্ত আজ্ঞাবহ অমিত শাহ।
বিজেপির অনেকেই মনে মনে এমন ধারণা, বাসনা বয়ে বেড়ান, চারশো আসনের স্বপ্নপূরণ সম্ভব হলে মোদী আরাধনা আনুষ্ঠানিক রূপ পাবে। দেখা গেল স্বয়ং মোদী ততদিন অপেক্ষা করলেন না। নিজেই নিজেকে ঈশ্বরের দূত দাবি করে বসেছেন। এবারে নির্বাচন পর্বে প্রচারকে তিনি যেভাবে পদে পদে বদলে নিয়েছেন, এটা তার অন্তিম পদক্ষেপ বলা চলে। ১৭ মার্চ ভোটের দিন ঘোষণা থেকে গত ১৫ মে পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী যে ১১১টি জনসভায় ভাষণ দিয়েছেন, লক্ষণীয় তাতে রাম মন্দির প্রসঙ্গ এনেছেন মাত্র ৩২ বার। মোদীর গ্যারান্টি নিয়ে বড়াই করেছেন মাত্র আটটিতে। অন্যদিকে, হিন্দু-মুসলিম প্রসঙ্গ এবং কংগ্রেসকে এক বগ্গা আক্রমণ করেছেন যথাক্রমে ৬০ ও ১১১ বার। তাঁর মুখে রাম মন্দির মাহাত্ম, মোদীর গ্যারান্টি মানুষ গিলছে না বুঝতে পেরে ঝুলি থেকে ধর্মীয় মেরুকরণে বিভাজনের পুরনো তাস বের করেছেন। শেষ পর্যন্ত তাতেও পুরোপুরি আস্থা না রেখে নিজেকে ঈশ্বরের দূত দাবি করে বোঝাতে চাইলেন তাঁকে সমর্থন মানে ভগবানের চরণে পুষ্পাঞ্জলী অর্পণ। কার্যত নিজেই জয় শ্রীমোদী স্লোগান দিয়েছেন। নরেন্দ্র মোদী তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসতে পারলে জয় শ্রীরাম স্লোগান চাপা পডে যাওয়া অসম্ভব নয়। সেই ভারতে বিপদ শুধু বিরোধী দল আর আম জনতার নয়, রক্ষা পাবেন না বিজেপি-সহ হিন্দুত্ববাদীরাও। শেষে 'জয় হিন্দ,' 'জয় জওয়ান জয় কিষাণ' বন্দনাগুলি না হারিয়ে যায়!