মেট্রো স্টেশনের হলুদ রঙের বিশেষ ধরনের টাইলসের দিকে তাকালেও অনেকেই গুরুত্ব দেননি, কিংবা ভেবেছেন এটা নিছক নকশা। কিন্তু বাস্তবে এই টাইলসগুলো ব্যবহারের নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য রয়েছে।

মেট্রো স্টেশনের হলুদ টাইলস
শেষ আপডেট: 18 May 2025 11:53
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভোর হল দোর খোলো খুকুমনি ওঠো রে। এই যে খুকুমনি উঠল বা তাকে যে ডাকল তাঁর দিন শুরু হল, সেটা রাতে শেষ হওয়া পর্যন্ত দৌড়ই একমাত্র সম্বল। এদিক ওদিক, একাজ ওকাজ করে দৌড়ে দিন কেটে যায়। প্রতিদিনের এই দৌড়ের মাঝেই আমরা অনেক কিছু দেখতে পাই না। ব্যস্ত সময়ে মেট্রো ধরার তাড়া, টাইমে অফিস ঢোকার চাপ বা বাড়ি ফিরে খাবারটুকু জোগারের চাপ। যার ফলে আমাদের চোখ এতটাই চারপাশের চেনা দৃশ্যের প্রতি অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ জিনিসও চোখ এড়িয়ে যায়।
এমনই এক জিনিস হল মেট্রো স্টেশনের হলুদ রঙের বিশেষ ধরনের টাইলস। অনেকেই হয়তো এগুলোর দিকে তাকালেও গুরুত্ব দেননি, কিংবা ভেবেছেন এটা নিছক নকশা। কিন্তু বাস্তবে এই টাইলসগুলো ব্যবহারের নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য রয়েছে। বিশেষ করে দৃষ্টিশক্তিহীন মানুষদের চলাচলের ক্ষেত্রে।
এই হলুদ টাইলসগুলোকে বলা হয় ‘ট্যাকটাইল পেভিং।’ এগুলোর প্রধান কাজ হল দৃষ্টিশক্তিহীন ব্যক্তিদের নিরাপদে পথ চলায় সহায়তা করা। বিশেষ ধরনের উঁচু-নিচু প্যাটার্নের মাধ্যমে এই টাইলসগুলো ব্যবহারকারীকে জানিয়ে দেয় কোন পথে যেতে হবে বা সামনে কোনও বিপদ আছে কি না। প্রায় সমস্ত মেট্রো স্টেশনেই কম-বেশি রয়েছে। লক্ষ্য করলে দিল্লি, মুম্বই বা কলকাতাতেও পাবেন। বিশ্বজুড়ে এটা এখন একটা গুরুত্বপূর্ণ ‘অ্যাক্সেসিবিলিটি টুল’ হিসেবে গণ্য হচ্ছে।

কোথা থেকে শুরু হল এই বিশেষ টাইলসের ব্যবহার?
তথ্য বলছে, প্রযুক্তিটির উদ্ভাবক হলেন জাপানের ইঞ্জিনিয়র সেইচি মিয়াকে। ১৯৬০-এর দশকে তিনি তাঁর এক দৃষ্টিশক্তিহীন বন্ধুর জন্য এই বিশেষ ধরনের ফুটপাথ ডিজাইন করেন, যাতে তিনি একা একাই চলাফেরা করা যেতে পারে। ১৯৬৭ সালে প্রথম এটি ব্যবহৃত হয় জাপানের ওকায়ামা শহরে। এরপর তা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং ধীরে ধীরে অন্যান্য দেশও গ্রহণ করে। আজ এই ‘ট্যাকটাইল পেভিং’ বহুল জনপ্রিয়।
এই ট্যাকটাইল টাইলস মূলত দুই ধরনের হয়। প্রথমটি হল দিক নির্দেশক টাইলস, যেগুলিতে সরলরেখায় উঁচু অংশ থাকে এবং তা ব্যবহারকারীকে সঠিক পথে নিয়ে যায়। দ্বিতীয়টি হল সতর্কতামূলক টাইলস, যেগুলির উপর ছোট ছোট উঁচু ডট থাকে। এগুলো মূলত ব্যবহারকারীকে সতর্ক করে দেয়—যেমন সামনে প্ল্যাটফর্মের ধার, সিঁড়ি, বাঁক বা কোনও প্রতিবন্ধকতা আছে। ফলে দৃষ্টিশক্তিহীন ব্যক্তিরা সহজেই বুঝতে পারেন কখন থামতে হবে, কিংবা কোনদিকে যেতে হবে।

এশিয়ার বেশ কিছু দেশে এই টাইলস ব্যবহারের দিক দিয়ে এগিয়ে রয়েছে। জাপানে তো এই ব্যবস্থা কেবল স্টেশনে সীমাবদ্ধ নয়—পথঘাট, সিঁড়ি, সরকারি ভবন, এমনকি দোকানপাটেও এই ট্যাকটাইল পেভিং বসানো হয়েছে। ভারতে দিল্লি, মুম্বই ও কলকাতার মতো শহরে মেট্রো স্টেশনে এই ব্যবস্থা চালু হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ারতেও ব্যাপকভাবে এই প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে।

বিশ্বের আরও অনেক দেশ একে গ্রহণ করেছে। যেমন, যুক্তরাজ্যে ২০২২ সালে দেশের প্রথম রেল নেটওয়ার্ক হিসেবে প্রতিটি প্ল্যাটফর্মে ট্যাকটাইল পেভিং বসানো সম্পন্ন হয়। আমেরিকায় তো এই ধরনের সতর্কতামূলক টাইলস বাধ্যতামূলক। কানাডার টরন্টো ও ভ্যাঙ্কুভার শহরেও একই রকম ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ায় ২০০৭ সালের আইন অনুযায়ী, এই ট্যাকটাইল পেভিংয়ের সঙ্গে রঙভিত্তিক কোড ব্যবস্থাও চালু করা হয়েছে—বিশেষ করে সিডনি শহরে।
সবমিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, এগুলোর মাধ্যমে দৃষ্টিশক্তিহীন মানুষজন শুধু নিরাপদে চলাফেরা করতে পারেন এমন না, স্বাধীনভাবে ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে শহরের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে পৌঁছতেও পারেন।
