ভিসা না পেয়ে মন ভেঙে গেছে? পার্কস্ট্রিটের আনাচ কানাচে ঘুরে বেড়ানোর বদলে দক্ষিণ ভারতের সেই বিখ্যাত ‘ভিসা বালাজি’ মন্দিরে যান।

ছবি - দ্য ওয়াল
শেষ আপডেট: 25 November 2025 12:31
কঠোর হচ্ছে মার্কিন অভিবাসন নীতি। একের পর এক নিয়ম হাঁকিয়ে চলেছেন ট্রাম্প, সায় দিচ্ছে প্রশাসনও। ফলে ভিসা পাওয়া এখন আগের চেয়ে বেশ কঠিন। প্রাথমিকস্তরে অনেক ঝক্কি পোহাতে হয়, তাও যে হাতে ভিসা আসেই, তা বলা যায় না। সম্প্রতি অন্ধ্রপ্রদেশের এক চিকিৎসক মার্কিন ভিসা না পেয়ে হায়দরাবাদের ফ্ল্যাটে আত্মঘাতী হয়েছেন। এশহরেও এমন উদাহরণ খুঁজলে পাওয়া যাবে। ভিসা না পেয়ে চরম হতাশা নিত্য বিষয়।
আপনিও কি ভিসা পেতে পার্কস্ট্রিটে হেঁটে জুতোর সুকতলা খুঁইয়ে ফেলেছেন? বা একাধিক এজেন্সিকে টাকা দিয়ে ভিসা পাননি? হতাশা নয়, ভগবানে বিশ্বাস থাকলে কয়েক কিলোমিটার দূরে গেলেই মিলবে এর সমাধান। হ্যাঁ ঠিকই শুনছেন। কোনও এজেন্সি নয়, এখানে ভিসার ব্যবস্থা করেন ভগবান। ঐশ্বরিক ক্ষমতাবলে হাজার হাজার মানুষকে বিদেশ পাঠান, উপকার পেয়েছেন বলে আজ এই দেবতাকে 'ভিসা দেবতা'ও বলেন স্থানীয়রা।

বলছি 'চিলকুর বালাজি'র কথা। দক্ষিণ ভারত বিশেষ করে তেলঙ্গানা-অন্ধ্রপ্রদেশের মানুষজনের কাছে নতুন নাম নয়। হায়দরাবাদ থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে রঙ্গা রেড্ডি জেলার চিলকুর-এ রয়েছে। এই চিলকুর বালাজিকেই ভিসার দেবতা বলা হয়। প্রতিদিন কম করে হলেও তিন থেকে চার হাজার মানুষ পৌঁছন পুজো দিতে। বেশিরভাগ লোকেরই দাবি থাকে, 'ভিসাটা পাইয়ে দাও।' তাই মন্দিরে গেলে ব্যাগে অবশ্যই রাখেন পাসপোর্ট।
বালাজির নাম তো শুনেছেন, চিলকুর বালাজিকে তাঁরই ছোটবেলার অবতার বলে মনে করেন স্থানীয়রা। ইতিহাস প্রায় পাঁচশো বছরেরও বেশি সময়ের। স্থানীয় মানুষের কাছে এটি আগে ছিল খুব সামান্য একটা তীর্থস্থান। কিন্তু দেশের বহু মানুষের কাছে আজ ভিসা বালাজি (Visa Balaji)। প্রচলিত বিশ্বাস, এখানে প্রার্থনা করলে বিদেশযাত্রার অনুমতি বা ভিসা অ্যাপ্রুভাল দ্রুত মিলতে পারে। অভিবাসন-আইন যতোই কঠোর হোক, বালাজি কাউকে ফেরান না ফলে মন্দিরটির প্রতি ভরসা রাখা মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে।

স্থানীয়দের একাংশ বলছে এই খ্যাতি নতুন। মন্দির তৈরির উদ্দেশ্য ছিল কেবল উপাসনা। এখানে ভিসার ধারণা ছিল না শুরুতে। সময় যত এগিয়েছে, মানুষ ফল পেয়েছেন, এই মন্দিরের আলাদা পরিচয় তৈরি হয়েছে। অনেকের বিদেশযাত্রার প্রস্তুতিতে মন্দির দর্শন বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই মন্দিরে সে অর্থে কোনও নিয়ম নেই। কেউ কিছু আপনার ওপর চাপিয়েও দেবে না। বিগ্রহকে বাঁ হাতে রেখে ভক্তদের মন্দির প্রদক্ষিণ করতে হয় ১১ বার। বিশ্বাস অনুযায়ী, এতে ফল পাওয়া যায় হাতেনাতে। আর শুধু ভিসার চাহিদা ভগবান পূরণ করেন এমন নয়, ভক্তরা মন থেকে যাই চাইবেন, পূরণ হবে বলে মনে করা হয়। এছাড়া মন্দিরের বাইরে নারকেল পাওয়া যায়, তা মন্দিরের এক পাশে থাকা নারকেল ভাঙার জায়গায় ভেঙে দেন অনেকে। ভাল হয় সবকিছু, এমন বিশ্বাস রয়েছে।

ইচ্ছে পূরণ হলে ১০৮ বার প্রদক্ষিণ করতে হয়। কোনও টাকা পয়সার ব্যাপার নেই, প্রণামী বাক্স পর্যন্ত দেখা যাবে না চত্বরে। অনেকেই মনে করেন, এখানে ভক্তির পাশাপাশি মানসিক দৃঢ়তার পরীক্ষা নেওয়া হয়। দেশে যেখানে বেশিরভাগ মন্দিরই অর্থভিত্তিক নিয়মে চলে, সেখানে চিলকুর বালাজি কেবল প্রার্থনার স্থান। ভক্তকে দায়িত্ব নিতে হয় কেবল নিজের মনঃসংযোগের।
বিদেশযাত্রার স্বপ্ন, আজকের যুবসমাজের প্রধান লক্ষ্যগুলোর একটা। সেই লক্ষ্য পূরণে অনেকের জন্য মানসিক অবলম্বন হয়ে দাঁড়িয়েছে চিলকুর বালাজি।
তবে, হায়দরাবাদের এই বিখ্যাত মন্দির ছাড়াও দেশে আরও কয়েকটি জায়গা রয়েছে, যেখানে গিয়ে প্রার্থনা করলে ভিসা পাওয়া যায় (মানুষের বিশ্বাস রয়েছে)।
চমতকারি হনুমান মন্দির, আমদাবাদ
আমদাবাদের চমতকারি হনুমান মন্দির। স্থানীয়রা বলেন, ভিসা হনুমান। এখানে ভক্তরা আসেন হাতে পাসপোর্ট নিয়ে। বিশেষ করে US H-1B বা L1 visa আবেদনকারীরা। নিয়ম সহজ। পাসপোর্ট হনুমানজির সামনে রেখে হনুমান চল্লিশা পাঠ। বিশ্বাস অনুযায়ী, আন্তরিক প্রার্থনায় ইচ্ছে পূরণ হয়। মন্দিরের পুরোহিত বারবার বলেন, মূল শক্তি বিশ্বাসে। অনেক ভক্ত দাবি করেন, মন্দির থেকে ফেরার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই অনুমতি মিলেছে। যুক্তি-তর্কের জায়গা থাকলেও বিশ্বাসের জায়গা ফলদায়ী, এটাই সকলে মনে করেন।

শহিদ বাবা নিহাল সিং গুরুদ্বারা, পঞ্জাব
পঞ্জাবের তালহাঁ গ্রাম। এখানকার গুরুদ্বারা পরিচিত, এরোপ্লেন গুরদ্বারা নামে। ভক্তরা এখানে ছোট খেলনার প্লেন হাতে পৌঁছন। বিশ্বাস, এই উপহার বিদেশযাত্রার পথ খুলে দেয়। ছাত্রছাত্রী থেকে চাকরিজীবী, অনেকেই আসেন। শুধুমাত্র ভিসা নয়, ভবিষ্যতের নিরাপত্তা, কর্মজীবনের উন্নতি, এসবও বড় ভূমিকা নেয়। গুরুদ্বারায় মানুষের ভিড় বাড়ছে। শাহরুখ খান ও তাপসী পান্নু অভিনীত ছবির শ্যুটিং হওয়ায় জনপ্রিয়তা তুঙ্গে।

শ্রী সিদ্ধি পীঠ চমতকারি হনুমান মন্দির, দিল্লি
দিল্লির নেব-সারাইয়ে আরেক ভিসা মন্দির। নিয়ম কড়া। ভক্তকে ৪১ দিন মাংস, অ্যালকোহল ও রসুন ছাড়া খাবার খেতে হয়। প্রতিজ্ঞা করতে হয় যেকোনও পরিস্থিতিতে এসব খাবেন না। বিদেশযাত্রার অনুমতি না আসা পর্যন্ত এই সংযম ভাঙা যায় না। অনেকের কাছে এটাই শেষ আশা। যুক্তিতর্ক ছাড়িয়ে বিশ্বাসই এখানে সব।

শ্রী লক্ষ্মী ভিসা গণপতি মন্দির, চেন্নাই
চেন্নাইয়ের এই মন্দিরে ভক্তরা পাসপোর্ট আনেন। সঙ্গে থাকে ধুপকাঠি। গণপতির সামনে মনকামনা জানান। এখানে ভিড় বাড়ছে বিশেষ করে চাকরিসংক্রান্ত বিদেশযাত্রার আবেদনকারীদের। মন্দিরের দাবি, ইচ্ছে পূরণের হার উল্লেখযোগ্য তাই ভক্তদের জন্য এই স্থান মানসিক প্রস্তুতির জায়গা। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার প্রতীক।

দেশের অর্থনীতি বদলাচ্ছে। মানুষের আকাঙ্ক্ষা পাল্টাচ্ছে পাল্লা দিয়ে। বিদেশযাত্রা আজ শুধুমাত্র একটি নথিভিত্তিক অনুমতি নয়, নিরাপত্তা, উন্নতি, উচ্চশিক্ষা, ভবিষ্যৎ-পরিকল্পনা, সব কিছুর সমাহার। ফলে ভিসা নিয়ে উৎকণ্ঠাও বাড়ছে। আশা জোগাচ্ছে এই ভিসা মন্দিরগুলি।