
ছবি - শুভ্র শর্ভিন
শেষ আপডেট: 13 January 2025 17:02
ছবিটা সাদা-কালো। কনুইয়ের উপর জামার হাতা গুটিয়ে এক হাতে গানের খাতা, অন্যহাতে তাল দিয়ে দিয়ে গান করছেন অভিজিৎ চৌধুরী, ‘আমি চেয়ে চেয়ে দেখি সারাদিন’। কণ্ঠ শ্যামল মিত্র। ছবির নাম ‘দেয়া নেয়া’। ঠিক একই ধাঁচে হাতা গোটানো অবস্থায় হারমোনিয়ামে সুর তুলে ‘বড় খোকা’ হেমন্ত মুখোপাধ্যায় গান ধরেছেন, ‘আমি দূর হতে তোমারেই দেখেছি, আর মুগ্ধ এ চোখে চেয়ে থেকেছি’।
আসলে, প্রণয়ের যে ভাষা, তাতে চোখ-মুখ নিয়ে আকছার গান তৈরি হয়েছে, হবেও। রবীন্দ্রনাথের নিমন্ত্রণ কবিতায় যেমন রয়েছে, ‘মুগ্ধ প্রহর ভরিয়া তোমারে দেখা’, ঠিক তেমনই এ যুগের কবি, গায়কদের কলমেও ঠাঁই পেয়েছে সেই মুখগুলোর কথা, যাঁরা তাকালে ‘ক্যাবলা’ হয়ে যেতে হয়, আবেগের সমুদ্রে প্রেমের নৌকোডুবির সর্বনাশ হয়, আর না তাকালে... ধূসর বিকেল।
ইংরেজিতে একটা কথা আছে, ‘বাটারফ্লাইজ ইন স্টম্যাক’। ভালবাসার মানুষকে দেখলে বা তাঁর কাছাকাছি এলে অনেক সময়ে এমন অবস্থা হয়। লজ্জা, ভয়, উত্তেজনা- এমন অনেক অনুভূতির ইঙ্গিত একসঙ্গে মেলে। পেটের ভিতরে সেসব গুড়গুড়িয়ে ওঠে, ফুরফুরিয়ে দেয় মনকে।
এই সব প্রেমের তালে-সুরে ছন্দ কেটেছে, এল অ্যান্ড টি সংস্থার চেয়ারম্যান এসএন সুব্রহ্মণ্যমের কাঠ-কাঠ মন্তব্য। সারা সপ্তাহে ৯০ ঘণ্টা কাজ করার কথা তো তিনি বলেইছেন, এমনকি রোববার বাড়িতে বসে ‘বউয়ের মুখ না দেখে’ অফিস গিয়ে কাজ করার পক্ষেও মত রেখেছেন তিনি।
ঠিক কী বলেছেন তিনি? ‘সব কিছু যদি আমার নিয়ন্ত্রণে থাকত তা হলে আমি রবিবারও আমার কর্মীদের কাজ করতে বলতাম। কিন্তু আমি তা পারি না। আমি নিজে রবিবার কাজ করি। বাড়িতে এতক্ষণ থেকে কী করবে মানুষ? কতক্ষণ একজন বউয়ের মুখ দেখবেন? একজন স্ত্রীই বা কত ক্ষণ বাড়ি বসে তাঁর স্বামীর মুখ দেখতে পারবেন? তার চেয়ে ভাল হয় সকলে অফিসে গিয়ে কাজ করুন। তাতে জীবনে উন্নতি হবে।’
এমন মন্তব্যের পর চারদিকে সমালোচনার ঝড় ওঠে।সুব্রহ্মণ্যমের পাল্টা ব্যাখ্যা দিতে আসরে নামেন তাবড় শিল্পপতি থেকে শুরু করে বলিউড সেলেব, খেলোয়াড়রা। কিন্তু বউয়ের দিকে তাকিয়ে থাকা নিয়ে যতই প্রেম গদগদ শব্দ লেখা হোক, আর তাকিয়ে না-থাকার নিদান দিয়ে যতই কড়া মন্তব্য করা হোক, আসলে ঠিক কী করা উচিত?
‘দ্য ওয়াল’-এর তরফে এ ব্যাপারে মনোবিদ ডা: শ্রীতমা ঘোষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, 'দিনের লম্বা সময়টা যদি কাজের মধ্যেই থেকে যাই আর সেটা যদি প্রতিদিনই চলতে থাকে, কোনও বিরতি যদি না থাকে, তাহলে কাজের পারফরম্যান্সও ভাল হতে পারে না। এদিকে তাঁরা বাড়িতেও যথেষ্ট সময় দিতে পারেন না বা কোনও রকম দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। এই কারণে অনেক বহুজাতিক সংস্থাই সপ্তাহে চারদিন ওয়ার্কিং ডে-র দিকে চলে যাচ্ছে।'
তিনি জানান, এটা প্রমাণিত, যে কাছের মানুষের সঙ্গে সময় কাটালে বা তাঁর দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকলে একটা ভাললাগা কাজ করেই। সেক্ষেত্রে অফিস হোক বা অন্যান্য কাজে আরও মনোযোগী হওয়া যায়। কাজের মানও উন্নত হয়।
অন্যদিকে স্ট্র্যান্ডফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণাতেও বলা হয়েছে যে, ভালবাসার মানুষের দিকে বা তাঁর ছবির দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকলে মস্তিষ্কের ব্যথা প্রক্রিয়াকরণ অংশটির কার্যক্রম নিস্তেজ হয়ে যায়। যা অনেকটা ব্যথার ওষুধ বা প্যারাসিটামল হিসেবে কাজ করে। সহনীয় ব্যথা ৩৬ থেকে ৪৪ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।
কাজেই এসব মন্তব্যে কান না দিয়ে, অবসর পেলেই না হয় হাঁ করে খানিক তাকিয়ে থাকুন আপনার প্রিয় মানুষটির দিকে! সামনে না পেলে, ছবিই দেখুন না হয়। ছবিও না পেলে মনের চোখ তো আছেই। দেখতে দেখতে গেয়ে উঠুন, 'তোমায় হেরি গো স্বপনে শয়নে তাম্বুর রাঙা বয়ানে...।'