
শিশু-ফোটোগ্রাফার সৌভী পাড়ুই
শেষ আপডেট: 29 November 2024 19:10
'আমার জীবনের এক একটা মুহূর্ত যদি কোনও সুপটু হাত লিখে ফেলতে পারত, তাহলে নির্ঘাত একটা সিনেমা তৈরি হয়ে যেত...'- সৌভী পাড়ুইয়ের এই কথাগুলো প্রথম শুনলে অতিনাটকীয় মনে হতে পারে অনেকেরই। মনে হতে পারে, সবার জীবনেই তো ওঠা-পড়া আছে। কিন্তু সে ওঠাপড়ার পাতাগুলো যখন সৌভী পরতে পরতে উল্টে দেখেন, তখন নিজেই যেন বিশ্বাস করতে পারেন না, এই জীবন সত্যিই পার করে এসেছেন, নাকি নিছক কোনও দুঃস্বপ্ন ছিল!
কলকাতার প্রথম 'চাইল্ড স্পেশ্যালিস্ট' ফোটোগ্রাফার হিসেবে অনেকেই এখন চেনেন সৌভীকে। তাঁর 'বিয়ন্ড কিউটনেস' এখন প্রায়ই ছবি তোলার জন্য ডাক পায় রাজ্যের নানা প্রান্ত থেকে। শুধুই ছোটদের ছবি। তা সে নিউবর্ন ফোটোশ্যুট হোক, বা অন্নপ্রাশন, বা জন্মদিন। ছোট ছোট শিশুদের খিলখিলে মুহূর্তদের ধরে রাখতে সৌভী এবং তাঁর সঙ্গীসাথীদের জুড়ি মেলা ভার।
কিন্তু যে কোনও 'প্রথম'-এর আগে একটা শুরু থাকে। সেই শুরু সবসময় মোটেও গোলাপ বিছোনো হয় না। কোনও কোনও শুরুর মধ্যে আবার অনেক শেষও মিশে থাকে, ভরে থাকে অনেক বেদনা, ভাঙন, বিচ্ছেদ।
বছর ৩২-এর সৌভী এই শেষ দলেই পড়েন। তাই আজও ক্যামেরা, লাইট, সাউন্ডের ঝলকানি পার করে কখনও পিছন দিকে ঘুরে তাকালে, দমদমের একটা সিনেমাহল ভেসে ওঠে মনের লেন্সে। রাধাশ্রী। কালের নিয়মে এখন আর নেই। কিন্তু সৌভীর কাছে ওই দিনগুলোর ছবি মলিন অথচ স্পষ্ট।
কীরকম? সৌভী বলছিলেন, 'এখন যে আরজি কর হাসপাতাল খবরের শিরোনামে, সেখানেই জন্মেছি। বাবা রাধাশ্রী সিনেমাহলে কাজ করতেন। সেই হলেই আমার বেড়ে ওঠা। রান্নাঘরের দরজাটা খুলতেই সিনেমা চলতে দেখতাম। নর্দমার গন্ধও নাকে আসত। মায়ের আঁচলের গন্ধে খানিকটা রেহাই পেতাম। এদিক সেদিক সাপের যাওয়া আসা তো আছেই।'
এসবের মাঝেই সৌভীর মা সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এদিকে সিনেমাহল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাবার তখন ছোট্ট ব্যবসা। স্ট্রাগলের চূড়ান্ত পর্যায়েই সুখবর এল, মা ডব্লিউবিসিএস পাশ করেছেন, চাকরি পেয়েছেন।
সৌভীর কথায়, 'আমার জীবনের সিনেমায় আবার গতি এল। একটা ভাল বাড়িতে গিয়ে উঠলাম আমরা। দিব্যি চলছিল সব। স্কুলের পাট চুকিয়ে কলেজেও ভর্তি হলাম। মা একটা ক্যামেরা কিনে দিয়েছিল আমায়। ছবি তুলতে ভালবাসতাম আমি। কিন্তু তার চেয়েও বেশি ভালবাসতাম পড়াশোনা। মায়ের মতো সরকারি অফিসার হতে চাইতাম। ডব্লিউবিসিএস প্রিলিমস ক্র্যাকও করলাম। কিন্তু হঠাৎ...'
কথায় বলে, পরিস্থিতির চেয়ে বড় বিধাতা আর কিছুই নয়। তাই ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠা একটা তুলতুলে সংসার যখন তিনটে সুখী মানুষের হাতের ফাঁক দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা ঝরে পড়ার কথা, তখনই সব তছনছ হয়ে গেল।
'২০২০-তে মায়ের আচমকা ব্রেইন স্ট্রোক। সংসারকে যে পাখির ডানার মতো আগলে রেখেছিল, তার আচমকা অসুস্থতায় বাবা-আমি দু'জনেই বড্ড ভেঙে পড়েছিলাম। যদিও ডাক্তার-বদ্যি দেখিয়ে মা কয়েকদিনে খানিকটা সুস্থ হল। কিন্তু ওই যে কথায় আছে, সবার কপালে সুখ সয় না। সইল না। ১ মাস ১০ দিনের মাথায় মায়ের দ্বিতীয় স্ট্রোক। বিপর্যয় বলতে ঠিক কী বোঝায়, তখন বুঝেছি।'- সৌভী থামলেন। বোঝা যাচ্ছে, তাঁর গলা ভারী হয়ে এসেছে।
তবে শোক-তাপের পরেও জীবনের চিত্রনাট্য কখনওই ফুরোয় না। সে গল্প বলার জন্য যে প্যান্ডোরার বাক্স সৌভী খুলেছেন, তা প্রতিবেদকের কাছে শেষ অবধি অবারিতই রাখেন তিনি।
সেখান থেকেই জানা যায়, এত বিপদের মধ্যেও সৌভী মনে রেখেছেন, চিনে রেখেছেন, 'বন্ধু'দের। বেসরকারি হাসপাতালে মায়ের টানা ৭২ দিন চিকিৎসা করিয়ে যখন সর্বস্বান্ত তখন ওঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন ওঁর প্রেমিক আর সঙ্গীসাথীরা। নিমেষে বদলে যাওয়া সময়ে সেই হাতগুলোকে আঁকড়ে ধরেই মায়ের চিকিৎসার জন্য লড়ে গেছেন। নিজের ঘরেই তৈরি করেছেন আইসিইউ।
এই সময়ে চিকিৎসার খরচ তুলতে সুইগির চাকরি নিয়ে বাড়ি বাড়ি খাবার ডেলিভারিও করেছেন সৌভী। এই সময়েই, দু'মুঠো খাওয়ার তাগিদে, মায়েরই কিনে দেওয়া ক্যামেরা নিয়ে চিত্র সাংবাদিকতা শুরু করেছেন। সৌভী মনে করেন, তাঁর মা একসময়ে সব চেষ্টা ব্যর্থ করে চলে গেছেন ঠিকই, কিন্তু 'হেথায় নয় অন্য কোনওখানে' তিনি নিশ্চয়ই আছেন।
সৌভীর কথায়, 'নিউজ পোর্টালে দিব্যি কাজ করছিলাম। ছবি তুলছিলাম। কিন্তু বুঝলাম, গতে বাঁধা কাজ করতে ভাল লাগছে না। তাই মায়ের দেওয়া ওই ক্যামেরা দিয়েই প্রথম একটা দুটো অন্নপ্রাশনের ছবি তোলা শুরু করলাম। পোর্ট ফোলিও না থাকলে একটা নির্দিষ্ট পরিসরে জায়গা তৈরি করা খুবই মুকশকিল। ভাবিনি, ছোটদের ছবি তুলতে তুলতেই নিজের একটা পরিচয় তৈরি হয়ে যাবে। মনে আছে, ধার করে নতুন ক্যামেরা কিনে, সেটআপ তৈরি করে, এক বছরে ১০০টা বাচ্চাদের কাজ করেছিলাম। কয়েকজন মিলে দল তৈরি করে নাম দিলাম 'বিয়ন্ড কিউটনেস'। যতদূর জানি আমরাই সম্ভবত প্রথম প্রফেশনাল 'কিডস ফোটোগ্রাফার।'
সিনেমার অন্যতম দক্ষতাই হল মানুষের মন বুঝে তার সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা এর আছে। সৌভী পাড়ুইও ঠিকই বলেছিলেন। সিনেমা হলের চৌহদ্দি থেকে উঁচু-নিচু চিত্রনাট্য বয়ে তাঁর জীবনও সিনেমার থেকে কম কিছু না। কেউ কেউ বলে জীবন নিষ্ঠুর, কিন্তু সৌভী প্রমাণ করেছেন লাইফ যেমনই হোক, তাকে নিয়ে যেতে হবে 'বিয়ন্ড কিউটনেস'।