বোনকে আর্থিক কষ্টে হারিয়েও ভেঙে পড়েননি সেলভাকুমার। মাত্র ১ টাকায় সেলাই শেখিয়ে লক্ষ লক্ষ মহিলার জীবনে বদল আনছেন রোজ।

টেলর ব্রো (এআই ছবি)
শেষ আপডেট: 27 January 2026 15:49
দ্য ওয়াল ব্যুরো: অভাবের সংসারে একসময় হাল টেনেছেন। ভাই-বোনদের পড়িয়েছেন, মুখে তুলেছেন খাবার। বাবার মৃত্যুর পর সে জায়গা নিতে না পারলেও দায়িত্ব সামলেছেন তাঁর মতো করেই। কিন্তু কপালে যা লেখা থাকে, তা তো হবেই। অভাবের সংসারকে আলোর পথে নিয়ে গিয়েও হার মানতে হয় তামিলনাড়ুর সেলভাকুমারকে। আর সেই হারই তাঁর জেতার গল্প লিখে দেয় অজান্তে। জয় আর্থিক বা খ্যাতির নয়, এ জয়ে লুকিয়ে রয়েছে বহু মানুষের ভালবাসা, আশীর্বাদ ও শুভেচ্ছা।
সেলভাকুমার বিরুধনগর জেলার বাসিন্দা। এখন বয়স ৪৭-এর আশপাশে। একদম ছোটবেলায় বাবা তাঁদের ছেড়ে চলে যান। মা দেবকী একা সবটা সামলাতেন। বাড়িতে একটা সেলাই মেশিন ছিল, মা টুকটাক তাতে কাজ করতেন। ছোটবেলায় পড়াশোনা শেখার আগে সেলাই দেখেছেন। মা যখন একা সংসারের বোঝা ঠেলছেন, সেলভা তখন সেলাই শেখা শুরু করেন মায়ের পাশে বসে।
মাত্র ১৬ বছর বয়সে দাদার পড়াশোনার দায়িত্ব নেন। তাঁকে ইঞ্জিনিয়রিং পড়তে সাহায্য করেন। বোনকে বড় করেন, পড়াশোনা করান। সমাজের নিয়মে পরে বোনের বিয়েও দেন।
প্রাথমিকভাবে হেরে যাওয়ার গল্পটা এখান থেকেই শুরু। বোনের বিয়ে হয়ে যায়। সেখানে গিয়ে তিনি চরম দারিদ্যের সম্মুখীন হন। সঙ্গে স্বামীর মদ্যপান, অত্যাচার তাঁকে অবসাদের দিকে ঠেলে দেয়। অনেক চেষ্টা করেও সে দারিদ্র কাটিয়ে উঠতে না পেরে শেষে আত্মহত্যা করেন। বোনের মৃত্যু বদলে দেয় সেলভাকুমারের জীবন।
যে টাকার জন্য তিনি এত লড়াই করেছেন, পরিবারের কাউকে এতটুকু কিছু বুঝতে দেননি, সে টাকাই আজ বোনের প্রাণ কেড়ে নিল? এই যন্ত্রণা থেকেই স্থানীয় মহিলাদের মাত্র ১ টাকার বিনিময়ে সেলাই শেখানো শুরু করেন। আজ গোটা রাজ্যে তিনি ‘টেলর ব্রো’ নামে পরিচিত। গত ১৮ বছরে মাত্র ১ টাকার বিনিময়ে সেলাই শেখিয়ে তিনি বদলে দিয়েছেন লক্ষ লক্ষ মহিলার জীবন। সংখ্যাটা ছোট নয়—নিজের হাতে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন প্রায় ৪ লক্ষ ৬০ হাজার মানুষকে, আর পরোক্ষভাবে তাঁর ইউটিউবের (YouTube) মাধ্যমে সেলাই শিখেছেন আরও কয়েক লক্ষ।
প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত তাঁর ছোট দোকানে প্রশিক্ষণ নেন ৫০ জন। শুধু প্রশিক্ষণই নয়—নিজের পয়সায় তাঁদের দুপুরের খাবার, চা সবই জোগান সেলভা।
মহিলা, বিশেষভাবে দরিদ্র মহিলা, প্রতিবন্ধী, এমনকি রূপান্তরকামীদের জন্যও তাঁর দরজা খোলা। সেলভাকুমারের কথায়, “মহিলাদের হাতে নিজের রোজগার থাকতে হবে। তবেই তারা সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারবে।”
তিনি নিজে কোনও ফ্যাশন ডিজাইন কোর্স করেননি। পড়াশোনা ক্লাস টেন পর্যন্ত। তবু জ্যাকেট, শার্ট, ব্লাউজ—সব ধরনের আধুনিক ডিজাইন শেখান। যাঁরা প্রশিক্ষণের পর দোকান খুলতে পারেন না, তাঁদের জন্য নিজে সেলাই মেশিন কিনে দেন। একেকটি মেশিনের দাম ২২ থেকে ৩০ হাজার টাকা। এখনও পর্যন্ত ৫৭টি দোকান গড়ে দিয়েছেন-তার মধ্যে ১৭টি রূপান্তরকামীদের জন্য।
আর তাঁর ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে অন্তত ৪২ হাজার মহিলা ইতিমধ্যেই নিজেদের সেলাইয়ের দোকান খুলেছেন।
ডিজিটাল মাধ্যমেও সেলভাকুমারের প্রভাব বিরাট। ‘টেলর ব্রো’ ইউটিউব চ্যানেলের সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা ১৫ লক্ষ ৫০ হাজারেরও বেশি। সেখান থেকে মাসে আয় হয়, তা দিয়ে ৩০ দিনে দু’বার ১০০-২০০ জনকে নিয়ে বড় প্রশিক্ষণ শিবির করেন। হিসাব অনুযায়ী, ইউটিউবের মাধ্যমে প্রায় ৪০ লক্ষ মানুষ সেলাই শিখেছেন।
আর এই বদলে যাওয়া জীবনের এক উল্লেখযোগ্য উদাহরণ চেন্নাইয়ের তারামণির (Taramani) বাসিন্দা জীবিতা (Jeevitha)। স্বামীর দৈনিক মজুরির আয়ে কোনও মতে চলত সংসার। সরকারি জমিতে ঝুপড়িতে থাকতে হত। সেলভাকুমারের কাছে সেলাই শিখে আজ নিজের দোকান খুলেছেন তিনি। দু’জন মহিলাকে কাজও দেন। এখন থাকেন ভাড়া বাড়িতে, ছেলেদের পড়াশোনাও চলছে ঠিকঠাক।
১৮ বছর ধরে কোনও উৎসব পালন করেননি সেলভাকুমার। তাঁর একটাই লক্ষ্য—এক কোটি মহিলাকে সেলাই শেখানো। বলেন, “আমি নিজের বোনকে বাঁচাতে পারিনি। কিন্তু যাঁরা আমার কাছে আসে, তাঁদের পড়ে যেতে দেব না।”