১৯৫২ সালে যাদবপুরের ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে সীমিত সুযোগ নিয়েই শুরু করেছিলেন তাঁর এই পরীক্ষা। নিজেই তৈরি করেছিলেন একটি বিশাল কাচের ঘর- যেখানে তিনি কৃত্রিমভাবে বৃষ্টি তৈরির পরীক্ষা করতেন।

ছবি- সংগৃহীত
শেষ আপডেট: 10 November 2025 15:11
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ঘন ধোঁয়ায় ঢেকেছে দিল্লির আকাশ। দূষণে শ্বাস নিতে কষ্ট, চোখে জ্বালা, রাস্তায় যেন সবসময় কুয়াশার চাদর। রাজধানী এখন একপ্রকার খোলা গ্যাস চেম্বার। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি সামলাতে সরকার আশ্রয় নিচ্ছে প্রযুক্তির- ‘ক্লাউড সিডিং’ (Cloud Seeding) বা কৃত্রিম বৃষ্টির। কিন্তু কোটি টাকা খরচ করেও দিল্লি ও আইআইটি কানপুরের এই যৌথ উদ্যোগ এখনও সফল হয়নি। তবে জানেন কি, ভারতের মাটিতে কৃত্রিম বৃষ্টির (Artificial rain India) ধারণা একেবারে নতুন নয়, প্রায় সাত দশক আগেই সফলভাবে এটি করে দেখিয়েছিলেন কলকাতার এক বিজ্ঞানী, ড. সুধাংশু কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় (Dr S.K. Banerji rain experiment), যিনি পরিচিত ছিলেন 'মেঘ ব্যানার্জি' নামে।
১৯৫২ সালে যাদবপুরের ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে সীমিত সুযোগ নিয়েই শুরু করেছিলেন তাঁর এই পরীক্ষা। নিজেই তৈরি করেছিলেন একটি বিশাল কাচের ঘর- যেখানে তিনি কৃত্রিমভাবে বৃষ্টি তৈরির পরীক্ষা করতেন। প্রায় দু'বছর ধরে সেই ঘরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানোর পর তিনি খোলা আকাশে পরীক্ষা শুরু করেন। সিলভার আয়োডাইড ও ড্রাই আইস ব্যবহার করে মেঘে রাসায়নিক পরিবর্তন আনেন, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই নেমে আসে সত্যিকারের বৃষ্টি।
এই সফল পরীক্ষার ফল ১৯৫৫ সালে ‘Artificial Rainfall’ নামে প্রকাশিত হয় এবং আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু মেমোরিয়াল লেকচারে উপস্থাপন করা হয়। পরে তাঁর কাজের স্বীকৃতি দেয় (Artificial rainfall experiment India) সিএসআইআর (CSIR) এবং পরবর্তীতে আইআইটিএম (IITM)।
ড. বন্দ্যোপাধ্যায় প্রেসিডেন্সি কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন। পরে তিনি বিজ্ঞান কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন এবং স্যার সি.ভি. রমনের প্রথম গবেষণা সহকারী হিসেবে কাজ করেন। পরে যোগ দেন আবহাওয়া দফতরে এবং ১৯৪৪ সালে তিনি হন প্রথম ভারতীয় জেনারেল ডিরেক্টর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বিদেশি যন্ত্রপাতি না পাওয়া যাওয়ায় তিনি নিজেই তৈরি করেছিলেন দেশীয় বিকল্প। এই উদ্যোগের জন্য তাঁকে ‘অর্ডার অব দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার’ (OBE) সম্মানে ভূষিত করা হয়। স্বাধীনতার পর তিনি ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন জাতিসংঘের অধীনস্থ ওয়ার্ল্ড মেটিওরোলজিক্যাল অর্গানাইজেশনে।
অবসর নেওয়ার পর তিনি যাদবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে গণিতের অধ্যাপক হিসেবে কাজ শুরু করেন। সেখান থেকেই তাঁর নতুন যাত্রা- আকাশ থেকে কৃত্রিম বৃষ্টি নামানোর চেষ্টা। তহবিল কম থাকায় অনেক যন্ত্রপাতি নিজেই বানিয়েছিলেন। নিজের টাকায়, অল্প সরঞ্জাম আর অদম্য কৌতূহল নিয়ে তিনি সফল হয়েছিলেন কৃত্রিম বৃষ্টি ঘটাতে।
পরীক্ষার পর সরকার তাঁর গবেষণাকে বড় পরিসরে চালানোর দায়িত্ব দেয় ন্যাশনাল ফিজিক্যাল ল্যাবরেটরিকে (NPL)। ড. বন্দ্যোপাধ্যায় এরপর চলে যান শান্তিনিকেতনের রতনপল্লিতে, যেখানে স্থানীয়রা ভালোবেসে তাঁকে ডাকত 'মেঘ ব্যানার্জি' অর্থাৎ যিনি মেঘ থেকে বৃষ্টি নামাতে পারতেন।
ড. সুধাংশু কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেই উদ্যোগ মনে করায়, বিজ্ঞান মানে শুধু তত্ত্ব নয়, সাহস আর কৌতূহলও। খুব কম সুযোগ, অল্প যন্ত্রপাতি, তবু ইচ্ছে আর পরিশ্রমের উপর ভর করেই প্রকৃতির সঙ্গে খেলায় মেতেছিলেন। আকাশ থেকে বৃষ্টি নামিয়ে বিজ্ঞানকে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন।
বর্তমানে দিল্লিবাসীর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ- ঠান্ডা আর দূষণের দুই দিক সামলানো। যতদিন না বাতাস পরিষ্কার হচ্ছে, ততদিন সচেতনতা আর সতর্কতাই একমাত্র ভরসা। কৃত্রিম বৃষ্টির চেষ্টা আগে ব্যর্থ হলেও পরিবেশ অনুকূল হলে আবারও কৃত্রিম বৃষ্টির কথাই ভাবতে পারে রাজধানী।