'সার্জিক্যাল স্ট্রাইক'-এর সঙ্গে তুলনা শিবাজির আকস্মিক হানার, বাবরকে বলা হচ্ছে ‘নির্মম দখলদার’। জাতীয় শিক্ষাক্রম পর্ষদ NCERT প্রকাশিত অষ্টম শ্রেণির সমাজবিজ্ঞান বইয়ে নতুনভাবে লেখা হয়েছে মুঘল ও মারাঠা অধ্যায়। আর তা ঘিরেই শুরু হয়েছে বিতর্ক।

ফাইল চিত্র
শেষ আপডেট: 17 July 2025 17:23
দ্য ওয়াল ব্যুরো: 'সার্জিক্যাল স্ট্রাইক'-এর সঙ্গে তুলনা শিবাজির আকস্মিক হানার, বাবরকে বলা হচ্ছে ‘নির্মম দখলদার’। জাতীয় শিক্ষাক্রম পর্ষদ NCERT প্রকাশিত অষ্টম শ্রেণির সমাজবিজ্ঞান বইয়ে নতুনভাবে লেখা হয়েছে মুঘল ও মারাঠা অধ্যায়। আর তা ঘিরেই শুরু হয়েছে বিতর্ক।
‘The Rise of the Marathas’ নামের অধ্যায়ে লেখা হয়েছে, “রাত্রির অন্ধকারে শত্রুশিবিরে শিবাজির আকস্মিক হানা একেবারে যেন আধুনিক ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’।” এই বাক্যটিতে 'সার্জিক্যাল স্ট্রাইক' শব্দটি বিশেষভাবে রঙিন হাইলাইট করা হয়েছে।
শিবাজিকে তুলে ধরা হয়েছে ‘সফল কৌশলী ও দূরদর্শী’ হিসেবে। তাঁর শৌর্যগাথা নিয়ে লেখা হয়েছে, “নিজের জীবদ্দশাতেই তাঁর কীর্তি ছড়িয়ে পড়েছিল গোটা ভারতবর্ষ এবং তার বাইরেও।” অন্যদিকে, বাবরকে পরিচয় করানো হয়েছে এক ‘নির্মম ও নিষ্ঠুর আক্রমণকারী’ হিসেবে, যিনি শহরের পর শহর ধ্বংস করে গড়ে তুলেছিলেন কঙ্কাল-স্তূপের স্তম্ভ।
অন্য অধ্যায়ে আরও বিস্ফোরক তথ্য:
‘Reshaping India’s Political Map’ নামের আরেকটি অধ্যায়ে লেখা হয়েছে, বাবর “নারীদলকে বন্দি করেন এবং ধ্বংস করা শহরগুলির মানুষের খুলি দিয়ে স্তম্ভ নির্মাণ করেন”। বাবরের ভারতে প্রবেশ নিয়ে বলা হয়েছে, “তিনি সমরখন্দ থেকে বিতাড়িত হয়ে উপমহাদেশে প্রবেশ করেন।”
এক সময় সপ্তম শ্রেণির পাঠ্যসূচিতে মুঘল ও দিল্লি সালতনতের ইতিহাস ছিল। নতুন পাঠক্রমে তা বদলে এসেছে মগধ, মৌর্য, শুঙ্গ, সাতবাহন রাজবংশ সংক্রান্ত অধ্যায়। বর্তমানে অষ্টম শ্রেণির সমাজবিজ্ঞান বইয়ে (‘Exploring Society: India and Beyond’) ঢুকেছে মুঘল ও মারাঠাদের নিয়ে আলোচনার নতুন পাঠ। বইটিতে 'ইতিহাসের অন্ধকার অধ্যায়' শীর্ষকে একটি নোট যোগ করা হয়েছে।
সেখানে লেখা, “নির্মম হিংসা, অত্যাচারী শাসন বা ক্ষমতার অপব্যবহারের উৎস বুঝে নেওয়াই অতীতের ক্ষত সারানোর পথ এবং ভবিষ্যতের নিরাপত্তার ভিত্তি।” সঙ্গে সংযোজিত ডিসক্লেমারও রয়েছে। তাতে লেখা, “অতীতের ঘটনার জন্য বর্তমান প্রজন্মকে দায়ী করা অনুচিত।”
প্রবীণ ইতিহাসবিদ ইরফান হাবিব দ্য প্রিন্ট-কে বলেন, “ইতিহাস ধর্মনিরপেক্ষ সত্যের ভিত্তিতে তৈরি হওয়া উচিত। অতীত পাল্টানো যায় না—কোনও অধ্যায় বাদ দিয়ে বা নতুন ব্যাখ্যা বসিয়ে তা সম্ভব নয়।” তিনি বলেন, “রাজপুতরাও কি কম নির্মম ছিলেন? তলোয়ারের শাসনই ছিল মূলনীতি, সংবিধান ছিল না। ধর্মের চোখে বিচার করাই অনর্থক।” তাঁর বক্তব্য, ইতিহাসকে বিকৃত করে ‘পুরাণে’ রূপান্তর করার এই চেষ্টা ‘অসার এবং হাস্যকর’।
শিবাজি বনাম মুঘল শাসক: ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি?
নতুন পাঠ্যে শিবাজিকে ধর্মস্থানের উপর হামলা না-চালানোর বিষয়ে 'সতর্ক' বলা হয়েছে। উল্লেখ করা হয়েছে, মুঘলদের আত্মসম্মানে আঘাত দিতে শিবাজি সুরত আক্রমণ করেন। অন্যদিকে, আলাউদ্দিন খলজির অভিযানের সময় “শ্রীরঙ্গম, মদুরাই, চিদম্বরম এবং সম্ভবত রামেশ্বরমের মতো হিন্দু ধর্মকেন্দ্রগুলির ধ্বংস” ঘটেছিল বলেও দাবি করা হয়েছে।
অকবরের সময় নিয়েও পাঠ্যে রয়েছে বিতর্কিত ব্যাখ্যা। বলা হয়েছে, চিতোরগড় অভিযানের সময় তিনি দাবি করেছিলেন যে, “অমুসলিমদের বহু দুর্গ ও নগর দখল করে সেখানে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেছেন।” যদিও একইসঙ্গে বইয়ে অকবরকে 'সহিষ্ণু' বলা হয়েছে, আবার উল্লেখ করা হয়েছে যে প্রশাসনের শীর্ষস্তরে অমুসলিমদের সংখ্যা ছিল সীমিত।
আরও উদ্বেগের কথা জানালেন অধ্যাপক অরবিন্দ সিনহা
জেএনইউ-র অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক বলেন, “ইতিহাস মানে পক্ষপাতহীনতা। আপনি নির্বাচিতভাবে কাউকে গৌরবান্বিত বা কালিমালিপ্ত করতে পারেন না।” তাঁর মতে, “যদি অরঙ্গজেব থাকে, তবে প্রসঙ্গ আসবে শিবাজিরও। শাসকেরা যে প্রেক্ষিতে কাজ করেছেন, সেটাই বুঝতে হবে—বিচার করতে গেলে ইতিহাস বিকৃত হয়।” তাঁর তুলনা, “পাকিস্তানি পাঠ্যবইয়েও আদর্শগত রঙে ইতিহাস লেখা হয়—ফলে ছাত্রছাত্রীরা বাস্তব বিশ্লেষণ করতে শেখে না।” তিনি হুঁশিয়ারি দেন, “ইতিহাস নয়, এটা প্রোপাগান্ডা শেখানো।”
এনসিইআরের পক্ষ থেকে এই বিতর্কিত পাঠ্যসূচি নিয়ে এখনও পর্যন্ত সরকারি প্রতিক্রিয়া মেলেনি। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ইতিহাস শিক্ষার রাজনৈতিকীকরণ শুধু অতীত বিকৃত করে না, ভবিষ্যতের নাগরিকদের যুক্তিবোধও দুর্বল করে দেয়।