অসমের মীনাক্ষী দাস একা বাইকে ভ্রমণ করেছেন ৬৪টি দেশ, গড়েছেন বিশ্বরেকর্ড। বিদেশের মাটিতে না তাঁর খাওয়ার খরচ লেগেছে, না থাকার। অবিশ্বাস্য মনে হলেও, সাহসে ও স্বপ্নে ভর করে অভূতপূর্ব যাত্রা সফল করেছেন তিনি।

মীনাক্ষি দাস।
শেষ আপডেট: 7 June 2025 15:17
দ্য ওয়াল ব্যুরো: অসমের গৌহাটি শহরের মেয়ে মীনাক্ষি দাস। আর পাঁচটা সাধারণ পরিবারের মেয়ের মতোই কেটেছিল ছোটবেলা। কিন্তু একটু বড় হওয়ার পর থেকেই স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন, মোটরবাইকে করে পৃথিবীটা ঘুরে দেখার। সেই স্বপ্নের পিছনে অবশ্য ছিল অজস্র বাধা, ঋণের বোঝা, সংশয়, সঙ্কট। তবে সব কিছুর পরেও মনে ছিল জোর, মুখে ছিল হাসি। আর ছিল, সামনে খোলা রাস্তা। আজ সেই মেয়ে একাই মোটরবাইকে পাড়ি দিয়েছেন ৬৪টি দেশ— গড়েছেন এক নতুন ইতিহাস!
মাত্র ১৬ বছর বয়সে প্রথম মোটরসাইকেলে ওঠা মীনাক্ষির। গাড়ি যদিও নিজের ছিল না, চালানোও হয়নি নিয়মিত। কিন্তু মনের মধ্যে তখন থেকেই গেঁথে গিয়েছিল, একদিন বাইকে করেই বিশ্ব ঘুরতে হবে। ধাপে ধাপে সেই স্বপ্নই যেন জীবনের দিশা হয়ে দাঁড়ায়।

২০১৯ সালে ফিটনেস ট্রেনার হিসেবে কাজ শুরু করেন। সে সময়েই নিজের জমানো টাকায় প্রথম বাইক কেনেন, Yamaha R15 V3। সেই বছরই, সেই বাইকে তিনি প্রথম ছুঁলেন বিশ্বের সর্বোচ্চ মোটরযোগ্য রাস্তা, লাদাখের উমলিং লা। তারপর একা বাইকে ঘুরলেন নেপালও। কিন্তু সেখানে থেমে থাকেননি মীনাক্ষি, তাঁর লক্ষ্য যে ছিল অনেক দূর!

ধীরে ধীরে, বাইকে করে বিশ্ব ভ্রমণের পরিকল্পনা করেন তিনি। লক্ষ্য, ৬৭টি দেশ। হিসেবমাফিক খরচ প্রায় ৫৪ লাখ টাকা। সাধারণ পরিবারের মেয়ে মীনাক্ষি কোথায় পাবেন এত টাকা! তাই শুরু হল স্পনসরের খোঁজ। কিন্তু সরকারি দফতর থেকে কর্পোরেট অফিস— সব জায়গা ঘুরেও বারবার ফিরে আসেন খালি হাতে।
অবশেষে নিজের কৃষিজমি বন্ধক রেখে, কিছুটা ক্রাউডফান্ডিং করে ও একজন অচেনা ব্যক্তির দেওয়া ১০ লাখ টাকা নিয়ে শুরু করেন রোমাঞ্চকর পথচলা। হাতে তখন মাত্র ২০ লাখ টাকা। তাই সই, শুরু তো হোক! পিছু হটার প্রশ্নই নেই।

নেপাল দিয়ে যাত্রা শুরু, এরপর মুম্বই হয়ে ওমান যাওয়ার কথা ছিল মীনাক্ষির। কিন্তু প্রথমেই বিপত্তি। রাজনৈতিক অস্থিরতায় রুট বন্ধ হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে কাতার উড়ে যান বাইকসহ। অতিরিক্ত খরচ দাঁড়ায় প্রায় ২.৮ লাখ। এরপর অবশ্য বাহরিন, সৌদি আরব, জর্ডন, সব দেশই পার করেন অকুতোভয়ে।
কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতা সব জায়গাতেই বাধা হয়ে ওঠে। ইজরায়েলে আটকে পড়েন ১৩ দিন। তখনই বন্ধু হয়ে হাত বাড়িয়ে দেন, প্রিয়াঙ্কা নামের এক মালয়ালি মহিলা। খাওয়াদাওয়া, থাকার জায়গা তো দিলেনই, সেই সঙ্গে হাতে ধরিয়ে দিলেন ৫০০ ডলারও। বললেন, 'তুমি আমার অনুপ্রেরণা। তুমি সফল হলে আমারও আনন্দ হবে।'
জর্জিয়া থেকে তুরস্কে ঢুকতে ভিসা নিয়ে বিপদে পড়েন মীনাক্ষি। প্রচণ্ড ঠান্ডায় কেঁদে ফেলার মতো অবস্থা। পরের দিন সৌভাগ্যক্রমে আর এক অফিসারের কাছে দরবার করে, পেয়ে যান ভিসা। এরপর একে একে পাড়ি দেন ইউরোপের ৪০টিরও বেশি দেশ।
তবে এই রোমাঞ্চের গল্পের পরতে পরতে ছিল অভাবের কালো পাতা। দিনের পর দিন না খেয়ে চলেছেন খরচ বাঁচাতে। কোথাও রাত কাটিয়েছেন রাস্তার ধারে, কোথাও হোস্টেলের বেসমেন্টে। একবার শরীর এতটাই ভেঙে পড়ে যে, ভাবেন এবার বুঝি শেষ। কিন্তু থামেননি মীনাক্ষি।

একবার আচমকা মেয়াদ ফুরিয়ে গেল শেনজেন ভিসার। ফলে ম্যাসিডোনিয়া থেকে ৮৫০ কিমি একটানা বাইক চালিয়ে পৌঁছতে হল গ্রিসে। কিন্তু সেখানেও ভিসা মেলে না। তবুও লড়াই থামে না।
যাত্রার শেষে যখন ইউকে ঢোকার কথা, তখন ফের বাতিল হল তাঁর ভিসার আবেদন। দমে না গিয়ে, কলকাতায় ফিরে গিয়ে নতুন করে আবেদন করেন তিনি। ১০ দিনের মধ্যে ভিসা হাতে নিয়ে আবার ফিরে যান ইউরোপে। অনেকেই বলেছিলেন, এটা সম্ভবই না। কিন্তু অসম্ভবকে সম্ভব করবেন বলেই তো ঘর ছেড়েছেন!
এসবের মাঝে মত ছোট ছোট গল্প জুড়ে গিয়েছে জীবনে! নরওয়ের এক প্রৌঢ় নিজের প্রয়াত স্ত্রীর জুতো উপহার হিসেবে দেন মীনাক্ষিকে। বলেন, এটি এক ‘সহযাত্রী আত্মা’র প্রতীক। চিনের কয়েকজন ভারতীয় মহিলা মিলে পাঠান চার হাজার ডলার। এভাবেই প্রতিটি দেশে তিনি পেয়েছেন মানবিকতার সাড়া। ভাষা মেলেনি, পথ মেলেনি, কিন্তু মিলে গিয়েছে হৃদয়।

২০২৪ সালের ২২ ডিসেম্বর যাত্রা শেষে বাড়ি ফেরেন মীনাক্ষি। পরিবার, সন্তান, মা— সবাইকে জড়িয়ে ধরেন। হু হু করে কেঁদে ওঠেন সাফল্যে, যন্ত্রণায়, আনন্দে। কিন্তু ভিতরে তখনও তাঁর রয়ে গেছে রাস্তার টান। তিনটি দেশ, ওমান, ইরাক ও মায়ানমার যে বাকি থেকে গেছে, তাঁর তালিকার মধ্যে থেকে! আজ না হোক কাল, ফের তাই পথে নামবেন মীনাক্ষি। তা ছাড়াও যাবেন রাশিয়া, আমেরিকা।

মীনাক্ষি দাসের এই কাহিনি যেন শুধুই একটা বিশ্বরেকর্ড নয়। তিনি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন— মেয়ে বলে কিছুই অসম্ভব নয়। স্বপ্ন আর সাহসই শেষ কথা। তাই তো বাইকের চাকা ঘুরেছে, সঙ্গে ঘুরেছে শক্তি আর সাফল্য। চোখের জলকে হেলমেটের আড়ালে রেখে, অজস্র মানুষের হৃদয় ছোঁয়ার গল্পই সত্যি হয়েছে জীবনের খাতায়।