মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে নজির গড়েছিল তারা।

কেরলে নিপা
শেষ আপডেট: 13 January 2026 14:34
দ্য ওয়াল ব্যুরো: নিপা ভাইরাসের সংক্রমণ এদেশে নতুন নয়। কেরল বার বার আক্রান্ত হয়েছে। একাধিকবার ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। সেরাজ্যে এমন পরিস্থিতিতে কখনই আতঙ্ক ছড়ায়নি, পূর্বের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে তৈরি ছিল প্রশাসন, প্রস্তুত ছিল অপারেশন ম্যানুয়াল। মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে নজির গড়ে তারা। বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিজ্ঞতা, প্রস্তুতি আর দ্রুত সিদ্ধান্ত-এই তিন অস্ত্রেই কেরল সাফল্য পায়।
একের পর এক নিপা, তবু নিয়ন্ত্রণে
২০০১ সাল থেকে ভারতে মোট ছ’বার নিপা প্রাদুর্ভাব (Nipah Outbreak) দেখা দিয়েছে। তার মধ্যে সাম্প্রতিক চারটি, সবই কেরলে। ২০২৩-এর সংক্রমণে আগের অভিজ্ঞতাই কাজে লাগায় রাজ্য।
৯ সেপ্টেম্বর ২০২৩, কোঝিকোড় (Kozhikode) জেলায় প্রথম সন্দেহজনক নিপা আক্রান্তের খবর মেলে। নমুনা পাঠানো হয় পুনের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ভাইরোলজি (National Institute of Virology, NIV)-তে। ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ভারতের স্বাস্থ্য মন্ত্রক (Ministry of Health) জানায়, একই জেলায় ছ’জনের নিপা সংক্রমণ নিশ্চিত, মৃত্যু হয়েছে দু’জনের। এই তথ্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও (World Health Organization, WHO) নিশ্চিত করে।
সঙ্গে সঙ্গে কড়া পদক্ষেপ
প্রথম কেস ধরা পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই সতর্কতা জারি করে কেরল সরকার। কোঝিকোড়ের আক্রান্ত এলাকাগুলি কোয়ারান্টাইন (Quarantine) করা হয়। পার্শ্ববর্তী জেলা ও রাজ্যগুলিতে নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেয় প্রশাসন। গ্রামগুলিতে কোয়ারান্টাইন জোন (Containment Zone) ঘোষণা করে চলাচল ও জমায়েতে কড়াকড়ি, মাস্ক ও সামাজিক দূরত্ব (Social Distancing) বাধ্যতামূলক করে তারা।
১৪ সেপ্টেম্বর এক সপ্তাহের জন্য স্কুল বন্ধ করে অনলাইন ক্লাস (Online Classes) চালু করা হয়। কেন্দ্র ও রাজ্যের স্বাস্থ্য দফতর, NIV-এর বিশেষজ্ঞ দল এবং মোবাইল ডায়াগনস্টিক ইউনিট এলাকায় নামে। পয়েন্ট-অফ-কেয়ার মাইক্রো পিসিআর (PCR) ও এলাইজা (ELISA) পরীক্ষার মাধ্যমে দ্রুত শনাক্তকরণ সম্ভব হয়।
WHO জানায়, ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিশ্চিত আক্রান্তদের মোট ১,২৮৮ জন সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিকে (Contacts) চিহ্নিত করা হয়েছে। উচ্চ ঝুঁকির (High Risk) সংস্পর্শে থাকা ব্যক্তিদের ২১ দিনের কোয়ারান্টিনে রাখা হয়।
কবে শেষ ঘোষণা
কেরলে ছড়ানো নিপা স্ট্রেনের (Strain) ক্ষেত্রে সর্বাধিক ইনকিউবেশন পিরিয়ড (Incubation Period) ১৭ দিন ধরা হলেও, রাজ্যের স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (Standard Operating Procedure, SOP) অনুযায়ী ২১ দিন ধরা হয়। টানা ৪২ দিন দেখা হয়, নতুন কেস না মিললে ধরে নেওয়া হয় প্রাদুর্ভাব শেষ হয়েছে।
১৪ সেপ্টেম্বর শেষ কেস ধরা পড়ে। সেই হিসেবে ২৬ অক্টোবর ২০২৩ নিপা প্রাদুর্ভাব শেষ ঘোষণা করা হয়।
মানুষও তৈরি
কোভিডের (COVID-19) অভিজ্ঞতা এখানে বড় ভূমিকা নিয়েছিল। কোঝিকোড়ের মানুষ মাস্ক, স্যানিটাইজার, হাত ধোয়া-সবকিছুর সঙ্গে ততদিন ভালভাবেই অভ্যস্ত। জেলা সার্ভাইল্যান্স অফিসার লাথিকা অরুণ (Lathika Arun) বলন, “কোভিডের প্রশিক্ষণ আর অভিজ্ঞতা গোটা ব্যবস্থাটাকে অনেক শক্ত করেছে।” কমিউনিটি মেডিসিন বিশেষজ্ঞ টি এস অনীশ (TS Anish) জানান, মানুষও আগের নিপা থেকে শিখেছে, বাদুড়ে কামড়ানো ফল এড়িয়ে চলে, প্রাণীর সংস্পর্শে সতর্ক থাকে।
কেরল মডেলের শক্তি
WHO-এর মতে, কেরলের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি কেন্দ্র ও রাজ্যের সমন্বয়, বাড়ি বাড়ি নজরদারি, দ্রুত ল্যাব পরীক্ষা, আইসোলেশন সেন্টার তৈরি এবং মৃতদেহ ব্যবস্থাপনার সুস্পষ্ট প্রোটোকল। অনীশের কথায়, এনসেফালাইটিস (Encephalitis) বা অ্যাকিউট রেসপিরেটরি ডিস্ট্রেস সিনড্রোম (ARDS)-এর মতো লক্ষণ এক জনের মধ্যেও দেখা গেলে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতাই কেরলের বড় শক্তি।
রাজ্যে এখন একাধিক বায়োসেফটি লেভেল-২ (BSL-2) ল্যাব এবং ভাইরাস আলাদা করার জন্য BSL-3 সুবিধা রয়েছে। ২০১৯ সালে তৈরি হয়েছে আলাদা ভাইরোলজি ইনস্টিটিউট (Virology Institute)।
জলবায়ু পরিবর্তনের ছায়া
ভাইরোলজিস্ট শহিদ জামিল (Shahid Jameel) মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তন (Climate Change) ও বন কেটে ফেলা (Deforestation) বাদুড়ের উপর চাপ বাড়াচ্ছে। সেই চাপ থেকেই ভাইরাস শেডিং (Virus Shedding) বাড়তে পারে। খেজুরের রস (Date Palm Sap) বা ফলের মাধ্যমে মানুষের শরীরে সংক্রমণ ছড়ানোর আশঙ্কা তো রয়েছেই।
কেরলে ছড়ানো স্ট্রেনটি বাংলাদেশের (Bangladesh) নিপা স্ট্রেনের মতোই মারাত্মক, মৃত্যুহার ৬০–৯০ শতাংশ পর্যন্ত ছিল। তবু এই দফায় ছ’জনের মধ্যে চারজনকে বাঁচান চিকিৎসকরা। শুরুর দিকেই কেস ধরা পড়া ও দ্রুত চিকিৎসা-এর নেপথ্যে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেরল থেকে শিক্ষা নিতে হবে যেকোনও রাজ্যকে। এমন মারাত্মক ভাইরাসকেও কীভাবে আটকে দিতে হয় ভাল প্ল্যানিংয়ের মাধ্যমে, তা দেখার।