
শেষ আপডেট: 5 February 2024 13:18
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আমি কান পেতে রই..
গোপন কথা শুনিবারে..বারে বারে।
চাঁদের বুকে কান পাততে চলেছে ভারতীয় বিজ্ঞানীর যন্ত্র। চাঁদেরও শব্দ আছে। অতলান্ত মহাকাশের নিস্তব্ধ আঁধারে চাঁদও কথা কয়! চাঁদের মনের কথা জানতে যন্ত্র বসাবে নাসা। চাঁদের বুকে কান রেখে চাঁদের শব্দ চুপিচুপি পৃথিবীর মানুষকে বলবে।
নাসার নতুন মিশন ‘আইএম-১’। চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে এই যন্ত্র বসিয়ে দেওয়াই এখন লক্ষ্য নাসার। এ বছর ও আগামী কয়েক বছরে চাঁদে একাধিক অভিযান আছে নাসার। ‘আর্টেমিস’ নামে নাসার সেই চন্দ্রাভিযান নিয়ে তুমুল হইচই চলছে। তেমনই একটি মিশনে চাঁদে টুক করে সেই যন্ত্র বসিয়ে চলে আসবে নাসার চন্দ্রযান। সেই যন্ত্রই চাঁদের বুকে কান পেতে বসে থাকবে।
এই যন্ত্র কিন্তু মোটেও হেলাফেলা করার বস্তু নয়। এর কাজ খুবই কঠিন। নাসার গড্ডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারের ভারতীয় বিজ্ঞানী ড. নাতচিমুথুক গোপালস্বামী এই যন্ত্রটি তৈরি করেছেন। এর কাজ হল চাঁদের রেডিও তরঙ্গ পর্যবেক্ষণ করা। এই যন্ত্রের পোশাকি নাম ‘রেডিও ওয়েব অবজারভেশন অ্যাট লুনার সারফেস’। চাঁদের মাটিতে ইলেকট্রনদের হইহল্লা শুনবে এই যন্ত্র। সৌরবায়ু চাঁদের বুকে কেমন শোঁ শোঁ শব্দ তোলে সেই আওয়াজ রেকর্ড করবে। নিকষ কালো রাতে অন্ধকারে ডুবে যাওয়া চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে কী শব্দের জন্ম হয়, তাও শুনবে নাসার যন্ত্র।
যন্ত্রের উচ্চতা ৮ ফুটের মতো। তার মোটা মোটা শক্ত পা। চাঁদের মাটিতে গেঁথে বসিয়ে দেওয়া হবে। দিনে-রাতে সমানভাবে কাজ করবে ওই যন্ত্র। তার কাজ একটাই—কান পেতে শব্দ শোনা।
মহাকাশের স্বাভাবিক নিয়মেই রেডিও তরঙ্গের জন্ম হয় চাঁদে। ঠিক যেমন বৃহস্পতি, মঙ্গল, ছায়াপথের বিভিন্ন নক্ষত্র থেকে রেডিও রশ্মিরা বিচ্ছুরিত হয় মহাকাশে। এই তরঙ্গের নিজস্ব শব্দ আছে। চাঁদে মাঝেমধ্যেই ভীষণ রাগি সৌরঝড় আছড়ে পড়ে। সৌরবায়ুরা আগুনে চোখ করে ঘুরে বেড়ায়। তারও শব্দ আছে। চাঁদ মোটেই নিস্তব্ধ নয়।
ভারতীয় বিজ্ঞানী বলছেন, অতলান্ত ব্রহ্মাণ্ডের কোনও প্রান্তে চলছে কোনও রাক্ষুসে ব্ল্যাকহোলের ভূরিভোজ, হাড়-মাংস-অস্থি গোগ্রাসে খাওয়ার সময় ভেসে আসছে সেই মহারাক্ষসের শ্বাসের শব্দও। আবার কোথাও মহাজাগতিক মেঘ জমাট বেঁধে গুরগুর শব্দ তুলছে মহাকাশে। ব্রহ্মাণ্ডের জমাট বাঁধা অন্ধকার ফুঁড়ে বেরিয়ে আসা ‘বজ্রনির্ঘোষ’-এর সেই সব শব্দ মানুষের শ্রবণযোগ্য নয়। নাসা সেইসব শব্দ শোনে বিশেষ প্রযুক্তিতে যার নাম ‘সোনিফিকেশন’। প্রচণ্ড বিস্ফোরণে ছিঁড়েখুড়ে যাওয়া নক্ষত্রের মৃত্যুশয্যায় চার পাশে ছিটকে বেরিয়ে আসা রাশি রাশি উত্তপ্ত দেহাংশ থেকে যে আর্তনাদের শব্দ ভেসে আসে, তা একবার শুনিয়েছিল নাসা। মহাকাশে গর্ভে যখন নতুন তারার জন্ম হয়, সেই প্রসব যন্ত্রণার শব্দও মহাকাশের নিঃস্তব্ধতাকে ভেঙে খানখান করে দেয়। কিন্তু সেইসব মহাকাশে ঘটে চলা নানা ঘটনা। আর চাঁদ? এতদিন চাঁদের মাটিতে খোঁড়াখুঁড়িই করেছে নানা দেশের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা। কিন্তু চাঁদের বুকে কান পেতেছে ক’জন?
বিজ্ঞানী গোপালস্বামী বলছেন, প্রতিটি গ্রহ-উপগ্রহেরই নিজস্ব শব্দ আছে। এই যে চাঁদকে সারাক্ষণ চোখে চোখে রাখছে নানা দেশের চন্দ্রযানের অরবিটার, তাদেরও শব্দ প্রতিধ্বনি তুলছে চাঁদের বুকে। চাঁদের মাটির (রেগোলিথ) অণু-পরমাণুর মধ্যে নিরন্তর ধাক্কাধাক্কি, মারামারি চলছে। উত্তেজিত হয়ে উঠছে ইলেকট্রনেরা। ধুলোর ঝড় উঠছে চাঁদে। এই ঝড় বইবার শব্দ রেকর্ড করেনি কেউ। কারণ সেই প্রযুক্তি ছিল না। আইএম-১ মিশনে চাঁদের শব্দ শোনাই হবে কাজ। আর যদি কোনও রহস্যময় শব্দ, ধ্বনি বা প্রতিধ্বনি সেই যন্ত্রের শব্দফাঁদে আটকে যায়, তাহলে তো কথাই নেই! নতুন করে চাঁদকে নিয়ে ভাবনা শুরু হবে বিজ্ঞানীমহলে।